দেশপ্রেমের ঝান্ডা যখন সুপ্রিম কোর্টের হাতে

মত-মতান্তর

নাজমুল আহসান | ১৮ ডিসেম্বর ২০১৬, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৯:০২
বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজেপির জয়ের পর ভারত যে দক্ষিণ দিকে যাবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কমই ছিল। শুধু ভারত নয়, দেশে দেশে এখন ডানপন্থার রমরমা কারবার। পশ্চিমে বহুদিন পর তেঁতে উঠেছে রুক্ষ জাতীয়তাবাদীরা। কিন্তু এ ঢেউ দুনিয়ার সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রেই ফুলেফেঁপে উঠেছে সবার আগে। কংগ্রেসের দুর্নীতি আর একের পর এক কেলেঙ্কারি নিয়ে জনসাধারণ বিরক্ত ছিল বটে। কিন্তু বিকল্প হিসেবে জনগণ সুশাসন বেছে নেয়নি।
পঙ্গপালের মতো মানুষ ভোট দিয়েছে বিজেপিকে। দুর্নীতিবাজদের বিকল্প হয়েছে একদল ধর্মান্ধ উন্মাদ! গণতন্ত্রের এই এক দুর্বলতা।
বিজেপি এখন দল নয়। একটা আদর্শিক কাল্ট হয়ে উঠেছে। ধর্মের লেবাসযুক্ত হিন্দু জাতীয়তাবাদ যার কেন্দ্রে। রক্ষণশীলদের একটা কমন প্যাটার্ন হলো, তারা অতীতের গৌরবের স্মৃতি রোমন্থন করে বারবার। অতীতই যেন ভবিষ্যতের লক্ষ্যবস্তু। ট্রাম্প যেভাবে আমেরিকাকে আবার গ্রেট বানাতে চাইছে। এর অর্থ, আমেরিকা একসময় গ্রেট ছিল, এখন আর নেই। কিন্তু কখন আমেরিকা ‘গ্রেট’ ছিল, তা ট্রাম্পেরও জানা নেই। ফ্রান্স, বৃটেন, নেদারল্যান্ডের রক্ষণশীলরা নিজেদের অতীত সাম্রাজ্যবাদের স্বপ্নে বিভোর। তেমনি, বিজেপির মুলো হলো মহাভারতের অতীত। পাঞ্চিং ব্যাগ হিসেবে আছে পাকিস্তান। স্কাউন্ড্রেলদের বড় আশ্রয় ‘দেশপ্রেম’ এখন ভারতজুড়ে বেশ টনটনে। অর্ণব গোস্বামী যেমন আছে মিডিয়াতে, তেমনি হার্ভার্ড পড়–য়া সুব্রানিয়াম সোয়ামিও (স্বামী) আছে। জাঁদরেল সব স্কাউন্ড্রেল একেকটা। টুইটার-ফেসবুক থেকে শুরু করে পাড়ার অলিতে গলিতে দেশরক্ষকরা গিজগিজ করছে।
কিন্তু, এতসব থাকতেও ‘দেশপ্রেম’ আর ‘জাতীয়তাবাদে’র ঝান্ডা নিজ কাঁধে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সুপ্রিম কোর্ট কেন বোধ করলো, তা আশ্চর্য্য বৈ কি। সম্প্রতি, সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, মুভি থিয়েটারে জাতীয় সঙ্গীত বাজাতে হবে। জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে এরপর আয়েশ করে সানি লিওন দেখতে বসো, সমস্যা নেই! সুপ্রিম কোর্ট আরও বেঁধে দিয়েছে, শুধু জাতীয় সঙ্গীত বাজালেই চলবে না। সঙ্গে ভারতের জাতীয় পতাকাও থাকতে হবে। এমনকি উপস্থিত সকলকে তখন দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। আর না দাঁড়ালে? সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়নি। তাতে পুলিশের বয়েই গেছে। এক কাঠি সরেস হয়ে পুলিশ হলে হলে খোঁজ চালিয়েছে। দেশে তো অপরাধী আর নেই। তাই থানায় বসে মশামাছি না মেরে, না দাঁড়ানো পাবলিককে ধরে থানায় পুরে এক ঢিলে তিন পাখি মেরেছে পুলিশ। এক. বেতনটাকে হালাল করেছে। দুই. সুপ্রিম কোর্টের আদেশ পালন করেছে। তিন. নিজেদের দেশপ্রেমের দায়িত্বটাও পালন করেছে।  
ভারতের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিভিন্ন দিক সমীহ জাগানিয়া। যেমন, ভারতের পত্রপত্রিকাগুলো বেশ অনায়াসেই সুপ্রিম কোর্টের আদেশের সমালোচনা করতে পারছে। আমাদের দেশে এটা ভাবাটাও পাপ। কিন্তু, দেশটাকে উদারপন্থী গণতন্ত্র বলার সময় অনেক আগেই ফুরিয়েছে। পদ্ধতিগত গণতন্ত্র থাকায় সাধুবাদ ভারত পেতেই পারে। কিন্তু উন্নত উদারপন্থী গণতন্ত্র? তসলিমা নাসরীনদের ভারত আশ্রয় দেয়। কিন্তু মকবুল ফিদা হুসেনদের পালাতে হয়।
দুনিয়ার আরেক বড় গণতন্ত্র আমেরিকায় নাগরিকরা চাইলে প্রকাশ্যে নিজ দেশের পতাকা পোড়াতে পারে। জুতা বানাতে পারে। পদদলিত করতে পারে। যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। আর এটা বেঁধে দিয়েছে সে দেশেরই সুপ্রিম কোর্ট। ভারতের বিচার কাঠামো শক্তিশালী। কিন্তু আমেরিকার মতো উদার হতে না পারুক, এতটা নি¤œশ্রেণীর সংকীর্ণতা কী করে দেখালো একটা দেশের সর্বোচ্চ আদালত?
আমাদের দেশে ফেসবুক পোস্টের কারণে অনেকে গ্রেপ্তার হন। উদ্বেগের ঢল নামে। কিন্তু এই সেদিনও জাতীয় সঙ্গিতের প্রতি ‘অবমাননাকর’ ফেসবুক পোস্টের দায়ে ভারতে এক লোক গ্রেপ্তার হয়েছেন। এসব নিয়ে কেন প্রশ্ন তোলা হয় না? কয়েক দশকের জ্যেষ্ঠতা অনুসরণের প্রথা ভেঙ্গে মুসলিমকে সেনাপ্রধান হতে দেওয়া হয় না। নিজেদের ছবি নিরাপদে চালাতে একদল উজবুকের কাছে শরণাপন্ন হতে হয় বলিউড তারকাদের। এখনও ম্যাসাকারের জন্য দায়ীরা প্রকাশ্যে সগর্বে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। রাজ্যে রাজ্যে একটি বিশেষ প্রাণীর মাংস আইন করে নিষিদ্ধ রাখা হয়। একটি বিশেষ রাজ্যের জন্য সংবিধানে আলাদা বিধান থাকে থাকে। এই বৃহৎ গণতন্ত্রে আবার বিশ্বের সবচেয়ে বড় চক্ষু হন্তারক বাহিনীও থাকে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- থাকে নানান কিছিমের। সীমান্তে মানুষ মারে লাগাতার। এটা সমতার ডেমোক্রেসি নয়। ধর্মান্ধতা আর দক্ষিণপন্থার দুর্গন্ধময় মিশ্রণ।
ভারতেও বিবেকমান মানুষ আছেন। আয়রম শর্মিলা, অরুন্ধতী রায়, সিদ্ধার্থ ভারদারাজান আর কানাইয়া কুমাররা ভারতেরই। কিন্তু সময়টা যে এখন স্কাউন্ড্রেলদের।  

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ব্রাজিল ফুটবলের প্রধান ৯০ দিন নিষিদ্ধ

ঝিকরগাছায় ছাত্রলীগ কর্মী খুন, সড়ক অবরোধ

উৎসবের আমেজে সারাদেশ

জনগণের দেয়া রায় মেনে নেবে বিএনপি: ফখরুল

কংগ্রেস সভাপতি পদে রাহুল গান্ধীর আনুষ্ঠানিক অভিষেক

দুই নারীর একজন স্বামী, অন্যজন স্ত্রী

আ’লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত ১৫

নওগাঁয় যুবককে কুপিয়ে হত্যা

গার্মেন্টে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করছে এইচ অ্যান্ড এম

নাশকতার অভিযোগে ২০ শিবিরকর্মী আটক

বিএনপির বিজয় র‌্যালিতে যুবলীগ-ছাত্রলীগের হামলা

বিজয় উৎসব পালন করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ মুক্তিযোদ্ধাসহ আহত ৯

আমৃত্যু এক যোদ্ধার কথা

ছাত্রদলের পুষ্পস্তবক ছিঁড়লো ছাত্রলীগ

বঙ্গবন্ধুর গৃহবন্দি পরিবারকে যেভাবে উদ্ধার করেছিলেন কর্নেল তারা

ভারতে তিন তালাক বিরোধী খসড়া আইনে সরকারের অনুমোদন