গাইড ও কোচিংয়ের বৈধতার সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী

শিক্ষাঙ্গন

স্টাফ রিপোর্টার | ১৮ ডিসেম্বর ২০১৬, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:৫৭
বিএসবি এবং ক্যামব্রিয়ান এডুকেশন গ্রুপের চেয়ারম্যান লায়ন এম. কে. বাশার পিএমজেএফ। পুরো ক্যারিয়ারে কাজ করেছেন শিক্ষা নিয়ে। বর্তমানে তিনি লায়ন ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ডিস্ট্রিক গভর্নর। এর আগে তিনি লায়ন ক্লাব ঢাকা ইমপিরিয়াল প্রেসিডেন্ট ও সেত্রেুটারি ছিলেন। এফবিসিসিআই সদস্য ছাড়াও তিনি লায়ন ফাইন্ডেশনের আজীবন সদস্য। বিভিন্ন টিভিতে শিক্ষা নিয়ে বেশ কিছু প্রোগ্রাম পরিচালনা ও উপস্থাপনা করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ ৭৫টি দেশ ভ্রমণসহ বিভিন্ন সভা, সেমিনারে অংশ নিয়েছেন তিনি। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার নূর মোহাম্মদ।   


গাইড বই ও কোচিংয়ের বৈধতা মানে সৃজনশীল পদ্ধতিকে গলাটিপে হত্যা করা। সরকারের এই সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী। এটার ফলে মৃত সৃজনশীল পদ্ধতির পুরোটাই মুখ থুবড়ে পড়বে। শতভাগ শিক্ষার্থী গাইড ও কোচিংনির্ভর হবে। শিক্ষকরা ক্লাসে সরাসরি গাইডবই থেকে পড়াবে। হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের বিস্তার ঘটবে। একটা পাঠ্যবইয়ের বিপরীতে শত শত গাইডবই ছাপা হবে। শিক্ষার মান আরো তলানিতে যাবে। শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাবে। অভিভাবকরা একপর্যায়ে এটার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামবে। সম্প্রতি মানবজমিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ক্যামব্রিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান এম কে বাশার এসব কথা বলেন। গাইড বইয়ের বৈধতা দেয়া হবে তবে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে কেন সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল প্রশ্ন রেখে এম কে বাশার বলেন, গাইড বইয়ের বৈধতা দেয়া মানে সৃজনশীলতা গলা টিপে হত্যা করা। ১৯৭১ সালের মতো জাতিকে মেধাশূন্য করার প্রক্রিয়া অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সৃজনশীল পদ্ধতির চালু সময় বলা হয়েছিল, এই পদ্ধতিতে ছেলেমেয়েরা মূল বই পড়বে এবং প্রশ্নের উত্তর দেবে। কিন্তু গত কয়েক বছর আমরা কী দেখলাম। স্কুল নয়, বোর্ড প্রশ্ন পর্যন্ত গাইডবই থেকে হুবহু ছাপিয়ে দেয়া হয়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে প্রায় ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী গাইড বইয়ের সহায়তা নেন। প্রায় ৬৫ ভাগ শিক্ষক গাইডবই থেকে পড়ান, প্রশ্ন করেন। এই অবস্থায় সরকার গাইড ও কোচিংকে যদি সরকার বৈধতা দেয় তবে শিক্ষার্থী মূল বা পাঠ্যবই থেকে আরো দূরে চলে যাবে। মূল বই বাদ দিয়ে সবাই গাইডের ওপর নির্ভরশীল হবে। তিনি বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতির চালুর আগে পড়ালেখার পদ্ধতি, বই, শিক্ষকসহ অবকাঠামোকে সৃজনশীল উপযোগী করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। সেখানে হাত না দিয়েই চালু করা হয়। যার ফলে এখন যা হওয়ার তাই হচ্ছে। জরুরিভিত্তিতে এখানে হাত দেয়ার প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি। সৃজনশীল পদ্ধতিতে গাইডবই সহায়ক বা ছায়া হিসেবে থাকলে ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী তখন শতভাগ গাইড নির্ভরশীল হবে। অন্যদিকে শিক্ষকরা ক্লাস সরাসরি গাইডবই নিয়ে ক্লাসে করাবেন। তিনি বলেন, পাঠ্যবই একটা বিষয়ের জন্য একটা ছাপা হয় কিন্তু গাইড বই একটার জন্য ১০০ ছাপাতে সমস্যা নেই। এতে শিক্ষার্থীরা এক পাঠ্যবইয়ের জন্য একাধিক গাইড বই কিনতে হবে। শিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাবে। হাজার হাজার কোটি বাণিজ্য হবে, অভিভাবকদের পকেট থেকে টাকা যাবে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা কিছু শিখতে পারবে না, আইন প্রণয়ণকারীদের পকেটে টাকা যাবে। তার মতে, শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা এখন আন্দোলন করছে না, কারণ শিক্ষার্থী অভিভাবকরা চান কত সহজে ভাল নম্বর পাওয়া যায়। কিন্তু একটা সময় এসে ঠিকই আন্দোলন করবে যখন অভিভাবকরা বুঝবেন এই শিক্ষা তার কর্মজীবনে কোনো কাজে লাগছে না।
ঘনঘন শিক্ষা পদ্ধতি বদলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, একটা পদ্ধতি থেকে আরেকটা পদ্ধতিতে যাওয়া মানে কয়েকশ’ কোটি টাকা বাণিজ্য হওয়া। এটাই যখন মুখ্য উদ্দেশ্য হয়, তখন পদ্ধতি বদল হবেই। বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা আপগ্রেডেট উদাহরণ টেনে বলেন, কৃষি, শিল্পায়নে প্রতিনিয়ত যে পরিবর্তন হচ্ছে তা সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয় করতে পদ্ধতি ঠিক রেখে কারিকুলাম ও সিলেবাসে পরিবর্তন আনা হয়। কিন্তু আমাদের এখন সব বদলে যায়। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নতুন পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হতে সময় ব্যয় হয়। এটাতে অভ্যস্ত হতেই হতেই আরেকটি পদ্ধতি এসে হাজির হয়। এজন্য শিক্ষকরা দ্রুত শেখার জন্য গাইড বা অন্যান্য কিছুর সহায়তা নেন। শিক্ষার বিভিন্ন খাতের অগ্রগতিতে সন্তেুাষ প্রকাশ করে বাশার বলেন, গত কয়েক বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক বেড়েছে, ভর্তির হার প্রায় শতভাগ হয়েছে। সরকার শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। কিন্তু এখন সেই শিক্ষার মান রক্ষা করতে না পারলে এক সময় রড সিমেন্টবিহীন বিল্ডিংয়ের মতো ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হবে। শতভাগ শিক্ষিত হবো কিন্তু এর কোনো মার্কেট মূল থাকবে না। এজন্য টেকশই উন্নয়নে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে পুরো কারিকুলাম ও সিলেবাসে পরিবর্তন আনতে হবে। প্রযুক্তি শিক্ষার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। শিক্ষকদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষক দিতে হবে। শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে হবে। শ্রীলংকা শিক্ষায় বিপ্লবের কথা উল্লেখ করে লায়ন বাশার বলেন, তারা নানা সমস্যা জর্জরিত ছিল। সেখানে থেকে বের হওয়ার পর শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিশ্বের নামি নামি বিশ্ববিদ্যালয়কে সেখানে ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার কারার অনুমোদন দিল। শিক্ষার ব্যাংক লোনসহ সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দেয়া জন্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বলা হলো। বাংলাদেশে স্টাডি সেন্টারের অনুমোদন না দেয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশের নামী-দামি বিশ্ববিদ্যালয় ইচ্ছে করলেই এখানে সার্টিফিকেট বিত্রিু করতে পারবে না। স্টাডি সেন্টারের অনুমোদন দিলে দেশে আন্তর্জানিত মানের শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হবে। দেশের শিক্ষার মান উন্নত হবে যারা ভাল তারাই ঠিকতে পারবে। তিনি বলেন, কোয়ালিটি শিক্ষার ছাড়া প্রতিযোগিতা বিশ্বে জনশক্তি রপ্তানি সম্ভব না। কারণ, আগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে সরাসরি দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হওয়া যেত। এখন সেটি হয় না। তাকে এক থেকে দুই বছরের ফাউন্ডেশন কোর্স করতে হয়। কারণ, আমাদের শিক্ষার মান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা ধর্মান্ধ পরিবেশে বড় হচ্ছে। তাদের পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দেয়া হয় না। ফলে একটা সময় এসে সে জঙ্গিসহ বিভিন্ন উগ্রপন্থার সঙ্গে জড়িত হচ্ছে। এটা রোধ করতে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক সমন্বিতভাবে চেষ্টা করতে হবে।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

যুদ্ধাপরাধের ২৯তম রায়ের আপেক্ষা

ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে চাঁদ দেখা কমিটির সভা কাল

সিরিয়া ইস্যুতে আবারো রাশিয়ার ভেটো

হারিরির সৌদি আরব ত্যাগ

ঢাকায় চীন-বাংলাদেশ বৈঠক শুরু

প্যারাডাইস পেপারসে শিল্পপতি মিন্টু ও তার পরিবারের নাম

ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে আসছে রোহিঙ্গারা, ইউএনএইচসিআরের উদ্বেগ

নৌকায় বসেই ভাষণ দেবেন শেখ হাসিনা

‘নতুনরা সব সময় পরিবর্তন নিয়ে আসে’

নিজ দলে বিদ্রোহ, আজ মুগাবের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ

ছোট্ট শিশুদের দুর্নীতির প্রশিক্ষণ

ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক গ্রেপ্তার

রাবিতে হলের সামনে থেকে ছাত্রী অপহৃত

সীমানা বিন্যাস আইন নিয়ে বিপাকে ইসি

সেনা অভ্যুত্থানের পর প্রথম জনসমক্ষে মুগাবে

ইরাক ও ইসরায়েল সুন্দরী একসঙ্গে সেলফি তুলে বিপাকে