নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অজানা কথা

মত-মতান্তর

মনিরা আক্তার | ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৫৫
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জনের গৌরব। গৌরবের এই অর্জনে নারী পুরুষের সবার অংশগ্রহণ ছিল সম্মিলিত। অল্প কিছু পাকিস্তানী সুধিাভোগী বাদে সারা দেশের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা কারো অজানা নয়। কিন্তু সাধারণ কথায় মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন অর্জনের কথা আলাপ আলোচনা যাই আসুক না কেন, সে সব শুনলে মনে হয় এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের অবদান শুধু পুরুষের। নারী একটা বিশেষ শ্রেণী মাত্র। মুক্তিযুদ্ধে নারীর প্রসঙ্গটা আসে অনেক ইনিয়ে বিনিয়ে।
তাও আবার বীরঙ্গনা হিসাবে। বীরঙ্গনা বলেও নারীকে আরেক ধাপে চিহ্নিত করা হয় যে, তারা বিভিন্নভাবে পুরুষ দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলো। বিশেষ করে যারা পাক আর্মীদের দ্বারা শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
আমরা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীর সরাসরি অংশগ্রহণের বিষটি কেনজানি এড়িয়ে চলি বা খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করিনা। নারীর অংশগ্রহণ ছিলো যুদ্ধের মাঠে, চিকিৎসা কেন্দ্রে,তথ্য আদান প্রদানে এবং সংগঠক হিসাবেও। এর বাইরেও প্রতিটা ঘরের নারীরাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার কাজটি করেছিলেন অত্যন্ত যতœসহকারে। এই কাজটি করতে গিয়ে অনেকেই নানা ধরনের নির্যাতনের স্বীকারও হয়েছিলেন। তা যুদ্ধের সময় এবং যুদ্ধ পরবর্তি সময়। কিন্তু তার পরও মুক্তিযুদ্ধ মানে পুরুষের জয়গান। নারী শুধুই বীরঙ্গনা, বীর নয়। নারীর সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার বিষয়টি আমরা খুব সচেতনভাবে এড়িয়ে চলি। আমরা জানিনা, কোন কোন সেক্টরে কোন কোন নারী সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলে? জানিনা বিভিন্ন ক্যাম্পে কতজন নারী সেবর সাথে যুক্ত ছিলেন? কতজন নারী পুরুষের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এ সব তথ্য আমাদের কাছে অজানা। সে কারনে মুক্তযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহনের বিষয়টি কেমন যেন ধোঁয়াটে। আর মুক্তিযুদ্ধে নারী মানেই বীরঙ্গনা!
একটু খোঁজ নিলেই আমাদের আশেপাশে অনেক নারীদের বিরত্বের কথা জানা যাবে। কিন্তু সে দিকটা এড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণের বিষয় আসলেই আমরা রনাঙ্গনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বীরদের বদলে বীরঙ্গনা (নির্যাতিত নারী) বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে বেশী পছন্দ করি।  ফলে সারা দেশের অসংখ্য নারীদের কথা প্রায় অ-জানাই রয়ে গেল। বর্তমানের অনেক প্রতিথযসা নারী যেমন মালেকা বেগম, বেলা নবী, ডা. ফৌজিয়া মোসলেম, ডা.কাজী তামান্না, নিবেদিতা দাশ পুরকায়স্ত, ক্যাপটেন ডা. সিতারা বেগম, সাইদা কামাল, সুলতানা কামাল, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী আরো অনেক নারীর নাম তালিকায় উঠে আসবে। এমন কি পাহাড় ও সমতলের অনেক আদিবাসী নারীও তাদের সহজ সরল জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশমাতৃকার টানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকবাহীনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। গারো, হাজং, খাসিয়া, মনিপুরী, মারমা, ¤্রাে,সাওতাল, ওঁরাও আরো অনেকেই। স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছর পেরিয়ে গেলেও মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণের বিষয়টি আজোও অস্পষ্টই থেকে গেলো। এ বিষয়ে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম কি জানে নারীর গৌরব গাঁথা অংশগ্রহণের কথা? সভা, সেমিনার, বক্তৃতা সব যায়গায় তুলে ধরা হয় স্বাধীনতা সংগ্রামে নারী নিগ্রহের কথা। নারীর বীরত্বের কথা সস্ত্রসংগ্রামের কথা খুব একটা জোরালো গলায় বলতে শুনা যায়নি। আর তাই নতুন প্রজন্মের কাছেও মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ নির্যাতিত নারী হিসাবে। বীরত্বেও কোন ঘটনাই তাঁদের সামনে তুলে ধরা হয়নি। অসংখ্য নারীর বিভিন্ন ঘটনার দু একটি এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
পটুয়াখালির মনোয়ারা বেগম মনু যিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। তিনি ছিলেন সামনের কাতারের একজন লড়াকু সৈনিক। বিভিন্নধরনের গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আরেকজন করুনা বেগম,বরিশাল বাবুগঞ্জ এর মেয়ে। তিনিও গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রেনেড নিক্ষেপ করা সহ বিভিন্ন আর্মস প্রশিক্ষণ নিয়ে পুরুষের পাশাপাশি বিভিন্ন অপারেশনে যোগদেন। ভোলার হাটের মেহেরুন নাহার, তার কাছে মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে চাইলে উচ্ছসিত হয়ে বলেন ‘এত বছর পর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমাদের যে কেউ খেঁাঁজ নেয়নি তাতে দুঃখ না পেলেও আনন্দও পাইনি। আজ আপনারা যে এত বছর পরে এসেছেন তাতে আর কিছু পাই না পাই খুব আনন্দ লাগছে, এই যে আপনারা জানতে চাইছেন কেন মুক্তিযুদ্ধে গেলাম? কিভাবে গেলাম? যুদ্ধের কথা, আজ আমি যে বলতে পারছি তাতে আমার অনেক ভালো লাগছে গর্ব হচ্ছে একাত্তরে আমি দশম শ্রেনীর টগবগে তরুণী। যুদ্ধের তান্ডব দাহন যখন নিজের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে ভাবছি স্কুল বন্ধ, লেখাপড়া নাই, কাজ কর্ম নাই। চারদিক থেকে খবর আসছে তরুণ যুবকদের যুদ্ধে যাওয়ার খবর তখন আমিও তো যুবক বয়সে, অন্যরা যদি পারে তো আমরা পারবোনা কেন? কিছু করতে না পারি শত্রুদের বাঁধা তো দিতে পারবো। মরতে যদি হয় তো এভাবে বাড়িতে বসে ভয়ে মরবো কেন? লড়ে মারা যাবো। এ রকম মনে যখন তোলপাড় খেলছে একদি আমার মেজ দুলাভাই এসে যখন বললো যুদ্ধে যাওয়ার কথা আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম, সাথে সাথে বললাম, দাদা আমি যাবো, বলেন কোথায় যেতে হবে? আমার মা তখন গ্রামের মানুষ হলেও তিনি ছিলেন উদ্যোগী। তিনি আমার কাজে বাধা না দিয়ে বললেন কি তুই যাবি নাকি ? যা, তোর ভাইতো চলে গেছে তুই যাবি তো যা। আমি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়ি। মেহেরুন নাহার সেবিকা প্রশিক্ষনের পাশাপাশি সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন শত্রুর মোকাবেলা করার ও আত্মরক্ষার জন্য। মূল্যায়নের বিষয়ে কথা বলতেই বলেন, মূল্যায়ন নিয়ে আক্ষেপ নাই, দেশ তো স্বাধীন হয়েছে। আরেক মুক্তযোদ্ধা মর্জিনা খাতুন। যুদ্ধে গেছেন দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য। আমার অংশগ্রহণ যদি সামন্যও কাজে লাগে তবুওতো লাভ। যুদ্ধে যাওয়ার কারণে তার নামে অনেক দুর্নাম রটায় অনেকে। যুদ্ধ থেকে ফিরে এলে অনেকে আমার স্বামীকে বলে, এই বউকে নিয়ে তুই ঘর করবি? কিন্তু এসবে আমার স্বামী কোন পাত্তা দেয়নি। বরং আমার স্বামীর আমাকে নিয়ে গর্ব ছিলো।
ভোলার হাট চাঁপাই নবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী একটি অঞ্চল। এখানে স্থাপন করা হয়েছিল একটি নার্সিং ট্রেনিং ক্যাম্প। এই এলাকার অনেক নারী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় তাদেরই একজন তাসলিমা বেগম। তিনি বলেন, যেদিন দেশ স্বাধীন হয়েছিলো আমি নিজের আঙ্গুল কেটে রক্ত দিয়ে বাংলাদেশ শব্দটা লিখেছিলাম। যুদ্ধে যাওয়ার আগে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তিনি চুলে তেল দিবেন না সেই তাসলিমা কথা রেখে ছিলেন। দেশ স্বাধীন করে নিজের রক্ত দিয়ে নাম লিখে প্রমাণ করে দিয়েছেন যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। পিটিয়াই ট্রেনিং শেষ করে সে সময় বাড়িতেই বসেছিলেন। শুরু হয় যুদ্ধ চারদিক থেকে খবর পাই হত্যা নির্যাতনের। নারী, শিশু ,পুরুষ কেউ বাদ যাচ্ছে না। তখন মনে হলো দেশ স্বাধীন না হলে শান্তি আসবে না, তাই যুদ্ধে যাই দেশের শান্তির জন্য’। প্রথম বাড়িতে বলে যাইনি, কেম্পে ভর্তি হয়ে পরে বাড়িতে এসে বলি তখন বাবা আর বাঁধা দেননি। পরের দিন চলে যাই আবার কেম্পে। শামসুন্নাহার আরেক বীর। যিনি বলেন, আমাদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের সেই অভিজ্ঞতার কথা শুনলে অজও অনেকে বলে, ইস আমরা যদি যেতে পারতাম, এটাই আমার গর্ব যে, সেই ভাগ্যবানদের একজন আমি। বাগের হাটের যাত্রাশিল্পী মীরা বেগম,রংপুরের কনক প্রভা,এ রকম সারা বাংলায় অসংখ্য নারী আবেগের উচ্ছাসে দেশ মাতৃকার শান্তির টানে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে। অথচ মহান মুক্তি যুদ্ধে নারীর স্বীকৃতি মনে শুধুই বীরঙ্গনা (নির্যাতনের স্বীকৃতি) হিসাবে। নারী সেবার পাশাপাশি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেয়। আজও অনেকের নামের তালিকাই স্থান পায়নি। জেলা ভিত্তিক মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নারীদের নাম সেভাবে উঠে আসেনি। উঠে আসেনি  বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সে সব বীর নারীদের কথা। মুক্তি যোদ্ধাদের নামের সঠিক তালিকায় যোদ্ধা নারীদের নাম উঠে আসা এখন সময়ের দাবী। আগামী প্রজন্ম জানুক সঠিক তথ্য ও ইতিহাস।
লেখক: কলামিস্ট ও প্রামান্যচিত্র নির্মাতা

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ব্রাজিল ফুটবলের প্রধান ৯০ দিন নিষিদ্ধ

ঝিকরগাছায় ছাত্রলীগ কর্মী খুন, সড়ক অবরোধ

উৎসবের আমেজে সারাদেশ

জনগণের দেয়া রায় মেনে নেবে বিএনপি: ফখরুল

কংগ্রেস সভাপতি পদে রাহুল গান্ধীর আনুষ্ঠানিক অভিষেক

দুই নারীর একজন স্বামী, অন্যজন স্ত্রী

আ’লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত ১৫

নওগাঁয় যুবককে কুপিয়ে হত্যা

গার্মেন্টে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করছে এইচ অ্যান্ড এম

নাশকতার অভিযোগে ২০ শিবিরকর্মী আটক

বিএনপির বিজয় র‌্যালিতে যুবলীগ-ছাত্রলীগের হামলা

বিজয় উৎসব পালন করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ মুক্তিযোদ্ধাসহ আহত ৯

আমৃত্যু এক যোদ্ধার কথা

ছাত্রদলের পুষ্পস্তবক ছিঁড়লো ছাত্রলীগ

বঙ্গবন্ধুর গৃহবন্দি পরিবারকে যেভাবে উদ্ধার করেছিলেন কর্নেল তারা

ভারতে তিন তালাক বিরোধী খসড়া আইনে সরকারের অনুমোদন