এরিক এক্স. লি

বিশ্বায়নবাদের আত্মাহুতি

মত-মতান্তর

| ১১ ডিসেম্বর ২০১৬, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:১৫
যখন দুর্দশা আসে, তখন স্রোতের মতো আসে। বিশ্বমন্দা, ইউরোজোন সংকট, নিশ্চল বাণিজ্য চুক্তি, রাশিয়া ও পশ্চিমের মধ্যে সংঘাত বৃদ্ধি, ইউরোপের রাজনৈতিক অভিজাতদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী বিদ্রোহ, আর সর্বশেষ ব্রেক্সিট। সবই হয়েছে ২০০৮ সালের আর্থিক বাজার ধসের পর থেকে। তাই এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, বিশ্বায়নের আবেদন ফুরোচ্ছে। কিন্তু এরপরও খুব কম মানুষই ধারণা করেছিল যে, বিশ্বায়ন বিরোধীরা শীর্ষস্থান তথা হোয়াইট হাউজ দখল করবে, তা-ও আবার এত দ্রুত।
বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডনাল্ড ট্রাম্পের অভাবনীয় বিজয়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে যুজছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া নিয়ে একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
নির্বাচনের পূর্বে শুধু তার প্রতিপক্ষ হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গেই সাক্ষাৎ করেন তিনি। কিন্তু নির্বাচনের পর একরকম তাড়াহুড়ো করে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নিউ ইয়র্কে ছুটে যান আবে। ইউরোপের নেতাদের অবস্থা আরো দোদুল্যমান। এমনকি জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে পূর্বশর্ত জুড়ে দিয়েছেন। আর রাশিয়ানরা দৃশ্যত নিতান্তই আহ্লাদে ভাসছে। অভিনন্দন জানিয়ে পাঠানো এক চিঠিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন লিখেছেন, ট্রাম্পের জয় ‘মস্কো ও ওয়াশিংটনের মাঝে সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সত্যিকার বিবেচনাবোধের ভিত্তিতে গঠনমূলক সংলাপ’ তৈরি করতে পারে।
কিন্তু এত কিছুর পরও সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শক্তিধর রাষ্ট্র চীনের অনুভূতি এখনো সম্ভবত অস্পষ্ট। নির্বাচনী প্রচারের সময়, বাণিজ্য নিয়ে ট্রাম্পের অসন্তোষের প্রধান টার্গেট ছিল চীন। অথচ, ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বাণিজ্য চুক্তি থেকে ট্রাম্পের সম্ভাব্য পিছু হটা থেকে তাৎক্ষণিক লাভবান হবে দেশটি। আর নিশ্চিত কারণেই, তার হস্তক্ষেপ-বিরোধী পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গি চীনের সঙ্গে মানানসই। আপাতত, লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে বেইজিং এখনো পুরো বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি প্রস্তুত করছে পাল্টা প্রতিক্রিয়া। কিন্তু আরো তাড়াতাড়ি করাটাই চীনের জন্য উত্তম। ট্রাম্পের জয়ের ফলে যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, সেখানে চীন হয় সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে, নয়তো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ও বৃহত্তম বাণিজ্যিক দেশ হিসেবে, চীন যে প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা-ই হয়তো বিশ্বের সমৃদ্ধি ও স্থবিরতা, এমনকি যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যকার পার্থক্য গড়ে দেবে।
বিশ্বায়নের উত্থান ও পতন
সত্তরের দশকে বেশ নিষ্পাপ ধারণা হিসেবে যাত্রা শুরু বিশ্বায়নের। বিশ্ব ক্রমেই বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ভ্রমণ ও তথ্যের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছিল। কিন্তু শীতল যুদ্ধের পর, এর ভেতর এক ধরনের আদর্শিক উপাদান প্রবেশ করানো হয়। এটি হচ্ছে, বিশ্বায়নবাদ। আর এখন কারও পক্ষে বিশ্বায়ন ও বিশ্বায়নবাদকে আলাদা করা বেশ দুরূহ কাজ।
বিশ্বায়নবাদ নিহিত আছে ওয়াশিংটন কনসেনসাস নব্য-উদারনৈতিক মতবাদে। শীতল যুদ্ধ পরবর্তী প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন প্রথম এই কনসেনসাসের উদ্যোক্তা। এটি অব্যাহত রেখেছে জর্জ ডব্লিউ. বুশ ও বারাক ওবামার পরবর্তী প্রশাসনগুলো। এই কনসেনসাসে কল্পনা করা হয়েছিল এমন এক বিশ্বের, যেটি অর্থনীতি, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সমন্বিত কিছু নিয়ম ও মানদণ্ড গ্রহণের দিকে অবিচ্ছেদ্যভাবে এগিয়ে যাবে।
দেশে দেশে সীমান্তের প্রাসঙ্গিকতা ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে, এমনকি অদৃশ্য হয়ে যাবে। সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য হার মানবে বৈশ্বিক মূল্যবোধের কাছে। নির্বাচনী গণতন্ত্র ও বাজারভিত্তিক পুঁজিবাদ ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বব্যাপী। শেষ পর্যন্ত, সব দেশই কমবেশি একইভাবে শাসিত হবে।
এ পুরো প্রক্রিয়া সমর্থন দিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের বলিষ্ঠ ও কোমল ক্ষমতা। নব্য-উদারনৈতিকতাবাদের বংশধর, নব্য-রক্ষণশীল ও উদারনৈতিক হস্তক্ষেপবাদীরা আমেরিকাকে ঠেলে দিয়েছে আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধে। এই যুক্তির পেছনে এটিই আংশিকভাবে প্রযোজ্য। আর এখানেই সমস্যা। বিশ্বায়নবাদ হলো ট্রোজান হর্স। এটি বিশ্বায়নকে হজম করে ফেলেছে। বিশ্বায়নকে এই মতবাদ এমন এক শক্তিতে পরিণত করছিল। যেদিন নিজের ঔদ্ধত্যের ভারে এটি ধসে পড়ে, তার আগ পর্যন্ত একে অরোধ্য মনে হচ্ছিল।
পশ্চিমে বিশ্বায়নবাদের শীর্ষস্থানীয় ভক্তরা হয়ে উঠে এ মতবাদের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। সম্পদ ও ক্ষমতা ক্রমেই শীর্ষস্থানীয়দের কবলে চলে যায়। তারা মুক্ত বাণিজ্য, বহু সংস্কৃতিবাদ, বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠান, এমনকি বিদেশের মাটিতে ক্ষমতা পরিবর্তন ও দেশগঠনে তারা সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের স্বপ্ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বেশিরভাগ মানুষকে, যারা মধ্যবিত্তের অন্তর্গত। শীতল যুদ্ধ জয়ের এক প্রজন্ম পরই যুক্তরাষ্ট্র দেখতে পেয়েছে তার শিল্পঘাঁটি খালি হচ্ছে। অবকাঠামো খাত ভগ্নদশায় পড়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা অবনতির দিকে গেছে। আর ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সামাজিক বন্ধন।
অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়িয়েও, বিশ্বায়নবাদের দরুন সামাজিক মূল্যবোধে যে পরিবর্তন আসে, তা সামাজিক ঐক্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বই ‘বোলিং অ্যালোন’-এ এই প্রক্রিয়া সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরেছেন রাজনীতি বিজ্ঞানী রবার্ট পাটনাম। এ বইয়ে তিনি আমেরিকান সম্প্রদায়গুলো ধসে পড়ার মর্মভেদী বর্ণনা দিয়েছেন। অন্য কথায় বলতে গেলে, বিশ্বায়নের নামে আমেরিকান অভিজাতরা এক সাম্রাজ্য গড়ছিলেন। কিন্তু এর বিনিময়মূল্য তারা চুকিয়েছেন একটি জাতি বিকিয়ে দিয়ে।
একই জিনিস ঘটেছে ইউরোপে। ব্রাসেলসের আমলারা, আর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজধানীতে তাদের মিত্ররা চির বিস্তাররত এক সেট মানদণ্ড ঠেলে দিচ্ছিলেন। ফলে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মানুষের স্বার্থ ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছিল। কিছু ইউরোপিয়ান দেশে তরুণদের বেকারত্ব ৫০ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা অনেকদিন স্থায়ীও হয়ে ছিল। নিজেদের শাসন ধরে রাখতে যে-ই ব্যালট বক্স বিশ্বায়নবাদী অভিজাতরা ব্যবহার করে আসছিলেন, এখন সে-ই ব্যালট বাক্সের মাধ্যমেই তাদেরকে উৎখাত করা হলো।
লড়াইয়ের সুযোগ
অনেক বছর ধরে নিজেদের প্রাজ্ঞ প্রমাণ করে আসছেন চীনা নেতারা। তাই ট্রাম্পের আমেরিকার সঙ্গে অভিন্ন স্বার্থ হাসিল করার অভুতপূর্ব সুযোগ চীনা নেতাদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। ট্রাম্পের স্বপ্নের সঙ্গে চীনের ধারণার মৌলিক মিল রয়েছে। শক্তিশালী সার্বভৌম রাষ্ট্র কার্যকরী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য। সংস্কৃতির প্রাধান্যতাকে অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে। জাতীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে কখনই সার্বজনীন নিয়ম চাপানোর স্থান পাওয়া উচিত নয়। যখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বেশি কার্যকরী, তখন বহুমাত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ দমাতে ব্যবহার করা উচিত নয়। এসব বক্তব্য ট্রাম্প বা সি জিনপিং বলতে পারতেন।
আর ব্যবহারিক পর্যায়ে, এমন অনেক পলিসি আছে যা যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়কেই লাভবান করতে পারে। ট্রাম্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি হলো আমেরিকার জরাজীর্ণ অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করা। তিনি ১ ট্রিলিয়ন ডলার এই খাতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এটিও যথেষ্ট না হতে পারে। তার লক্ষ্য প্রশংসনীয়। কারণ, এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অতি প্রয়োজনীয় জীবনীশক্তি সঞ্চারিত হবে। কারণ, এতে তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান ও নতুন সড়ক, বিমানবন্দর, বাঁধ ও বিদ্যমানগুলোর সংস্কার। কিন্তু আর্থিক চাপ ও শিল্প সামর্থ্যের মতো চ্যালেঞ্জ এক্ষেত্রে বিশাল।
অবকাঠামো নির্মাণের কিছুনা কিছু চীনও জানে। নিজের বিভিন্ন বক্তৃতায় এমনটা ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। অর্থাৎ, ট্রাম্পও বিষয়টা জানেন। প্রচারাভিযান চলাকালে ট্রাম্প শিবির থেকে বেশ উচ্চৈ স্বরে বলা হয়, চীনের তুলনায় আমেরিকার অবকাঠামো খাত তৃতীয় বিশ্বের মতো। এ খাতে যুক্তরাষ্ট্রে নিজের উল্লেখযোগ্য সামর্থ্য নিয়ে যেতে পারে চীন। পাশাপাশি, চীন পারে আমেরিকাকে এশিয়ান ইনফাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকে নিয়ে যেতে। চীন সহজ শর্তে ও দ্রুত শিল্প সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে পারে। এটি চীনকে খুবই লাভবান করবে। কারণ, দেশটিতে এখন পুঁজি ও সামর্থ্যে থই থই করছে, আর তাই এসব এখন অন্যত্র ঢালা প্রয়োজন। আর এটি করতে গেলে বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারের চেয়ে আর ভালো কোনো দেশ হতে পারে না।
ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, দুই দেশেরই গুরুত্বপূর্ণ অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। ট্রাম্প ও চীন উভয়েই দৃশ্যত একটি বিষয় নিয়ে একমত যে, বিশ্বশান্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক হুমকি আসছে নন-স্টেট সংগঠন থেকে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় যেসব ক্ষতি বিশ্বায়নবাদ করেছে, তার অন্যতম হলো রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেয়া। কারণ, এর ফলে আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসবাদ বিস্তার লাভ করেছে। জাতীয় সীমান্ত মুছে দিয়ে ও ভালো বিকল্প ছাড়াই জাতীয় সরকারগুলোর ক্ষমতা ধ্বংস করে বিশ্বায়নবাদ আরও বিপজ্জনক এক বিশ্ব সৃষ্টি করেছে। কয়েক বছর ধরে চীনের নিন্দা করে আসছে বিশ্বায়নবাদীরা। কারণ, দেশটি নিজেদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় সক্রিয় ছিল। কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা ও স্বার্থ সুরক্ষায় চীন দৃশ্যত অন্যদের চেয়ে ভালো করেছে। চীন ও ট্রাম্পের আমেরিকা এখানে অনেকখানি অভিন্ন অবস্থান খুঁজে পেতে পারে।
এমনকি বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের একত্রিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্বায়নবাদী অভিজাতদের ব্যাখ্যায় মুক্তবাণিজ্য ও সংরক্ষণবাদের মধ্যে বৈপরীত্য দেখা যায়। যারাই বৈশ্বিক মানদণ্ডকে পরিহার করে চলবেন তারাই সংরক্ষণবাদের তকমা গায়ে মাখানোর ঝুঁকিতে থাকেন। কিন্তু বিশ্বায়নবাদীদের এই বৈপরীত্য মিথ্যা। বাণিজ্য এগিয়ে নেয়া ও একই সময়ে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের বাণিজ্য বিস্তারের প্রস্তাব অর্থাৎ রিজিয়নাল কম্প্রেহেন্সিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) বিশেষভাবে ট্যারিফ ও ইন্ডাস্ট্রি মানদণ্ডে ভিন্নতাকে অনুমোদন করে। কারণ, এসব বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভিন্ন হয়ে থাকে।
অপরদিকে ওবামার টিপিপি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে একসেট নিয়ম চাপিয়ে দেয়া হবে। এক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রয়োজনীয়তা মাথায় রাখা হয়নি। অথচ, এ দেশগুলোর অর্থনৈতিক শক্তিমত্তাও এক নয়। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, অনেক আমেরিকানই মনে করেন এই চুক্তি খোদ তাদের দেশের প্রয়োজনের সঙ্গেই জুতসই নয়। চীন রপ্তানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে নিজেদের অর্থনীতি নতুন করে সাজাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় চাহিদা ও সার্ভিস শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে চায় দেশটি। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় নিজেদের উৎপাদন খাত শক্তিশালী করতে। তাই উভয় দেশ নিজেদের বাণিজ্য বিস্তৃত করার নতুন পন্থা আবিষ্কার করার ভালো পর্যায়ে রয়েছে।
শেষ কিন্তু একমাত্র নয়। ট্রাম্প মনে হয় সজ্ঞানে ধরতে পেরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি যা ক্ষতি বয়ে এনেছে। ইতিহাসবিদ পল কেনেডি একে বলেছেন, সাম্রাজ্যবাদী বাড়াবাড়ি। আমেরিকান অভিজাতরা দুনিয়াকে তাদের দেশের ধাঁচে নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। আর তা করতে গিয়ে তাদের ও দুনিয়াকে বড় ধরনের ক্ষতি পোহাতে হয়েছে। দুনিয়ার মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশেরও কম মানুষের বাস যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ দেশটির। কিন্তু দুনিয়ার মোট সামরিক ব্যায়র ৪০ শতাংশ করে থাকে আমেরিকা। ট্রাম্প বলেছেন, এ ধরনের হস্তক্ষেপবাদ খর্ব করতে চান তিনি। বৈশ্বিক অভিজাতরা তার নিন্দা জানিয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে। কিন্তু দুনিয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়া আর অন্য দেশগুলোকে উপদেশ দেয়া যে কীভাবে তাদের দেশ পরিচালিত করা উচিত- এ দু’য়ের মতো বিশাল তফাৎ। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে জড়িত থাকা উচিত যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু সেখানে ক্ষমতার পট পরিবর্তন আর দেশ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া থামানো উচিত।
আদর্শ প্ররোচিত বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে আসতে ট্রাম্পকে উৎসাহিত করার মধ্যে চীনের স্বার্থ আছে অনেক। আর দুনিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দায়িত্ব আছে চীনের। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের ভূরাজনৈতিক অঙ্গভঙ্গি নরম করে আরো শান্তিপূর্ণ অঞ্চল গড়তে পারে দেশটি। যেমনটি ফিলিপাইনের সঙ্গে করেছে চীন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বোঝা কিছুটা নিজ ঘাড়ে নিতে পারে দেশটি। কারণ, চীন ওই অঞ্চলের শীর্ষ তেল আমদানিকারকে পরিণত হচ্ছে দ্রুত।
এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা
ট্রাম্পের বিজয় কোনো দুর্ঘটনা নয়। আমেরিকান সমাজে এক ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন হচ্ছিল, যা অভিজাতরা বেশিদিন ধরে অগ্রাহ্য করে গেছেন। আর এর সর্বোচ্চ সীমা হলো ট্রাম্পের বিজয়। ২৫ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব যে পথে ছিল, সেখান থেকে সরে আসতে বাধ্য করবে এসব অনুঘটক। এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, চীনের নেতারা যাতে এই বাস্তবতা ধরতে পারেন ও যথাযথ পালটা পদক্ষেপ নিতে পারেন। যদি চীনও একে ভুলভাবে নিয়ে থাকে, তাহলে বাণিজ্য যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এমনকি সামরিক সংঘাতও ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে এটি হবে থুসিডাইডিস ফাঁদের ক্লাসিক উদাহরণ।  এক্ষেত্রে এক উদীয়মান শক্তি আরেক প্রতিষ্ঠিত শক্তিধর দেশে ভীতি ছড়ায়। তাদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে যুদ্ধ। দুনিয়ার সঙ্গে লেনদেনে নিজের স্বার্থ আগে রাখার যৌক্তিক কারণ আছে যুক্তরাষ্ট্রের। আর অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে চীনেরই এ বিষয়টি বুঝতে হবে। পাশাপাশি, চীনই পারে, অন্য যেকোন দেশের চেয়ে, ট্রাম্পের আমেরিকাকে নিজের জাতীয় অগ্রাধিকার সফলভাবে স্থাপনের জায়গা করে দিতে।
বিশ্বায়নবাদের মৃত্যুর মানে এই নয় যে বিশ্বায়নেরও ইতি ঘটেছে। বরং, আন্তঃসম্পর্কের বিস্তার সম্ভবত বাড়তে থাকবে। এক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে সেক্যুলার ট্রেন্ড। অন্য কথায়, কার্যকর বৈশ্বিক শাসন অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে এখন বেশি প্রয়োজন। কিন্তু এই শাসনব্যবস্থা আর কোন অবস্থাতেই বিশ্বায়নবাদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে হতে পারবে না।
দুনিয়ার দরকার নতুন এক বিশ্বব্যবস্থা। যা বিংশশতাব্দীর আদর্শিক ফল্টলাইনের ভিত্তিতে হবে না। বরং, এর কেন্দ্র হবে দেশে দেশে বৈচিত্র্য, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও সাংস্কৃতিক অখণ্ডতা। একক বৈশ্বিক মানদণ্ডে দুনিয়াকে পরিচালনার চেষ্টা করার বদলে, দেশগুলো একে অপরকে মুক্তভাবে সহযোগিতা করতে পারবে এমন উপায়ে যা তাদের নিজ নিজ প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেবলমাত্র, শক্তিশালী স্বার্বভৌম রাষ্ট্রই একে অপরের সঙ্গে কার্যকরভাবে সহযোগিতা করতে পারে এবং প্রয়োজন মোতাবেক বিশ্বব্যবস্থার মঙ্গলে নিজের সার্বভৌমত্ব নরম করতে রাজি হতে পারে।
যদি আমরা একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী একবিংশ শতাব্দী চাই, চীনের উচিত ট্রাম্পের আমেরিকার সঙ্গে নতুন ভবিষ্যৎ গড়তে কাজ করা। যদিও দুই ক্ষমতাধর দেশের প্রতিযোগিতা অনিবার্য, তবুও দুনিয়ায়ে তাদের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিন্ন স্বার্থ এই মতপার্থক্যকে দূরে সরিয়ে রাখবে। নিশ্চিতভাবেই, চীনের নেতাদের ভালোভাবেই পরামর্শ দেওয়া হবে যে, গত এপ্রিলে ট্রাম্প নিজের মেজর পররাষ্ট্র বিষয়ক বক্তৃতায় যা বলেছেন তার দিকে মনোযোগ দিতে। তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে চাই। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। এ দুই দেশের সঙ্গে আমাদের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। আমাদের অবশ্যই খোলা চোখে এসব বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু আমাদেরকে একে অপরের শত্রু হতেই হবে, এমন নয়। আমাদের উচিত অভিন্ন স্বার্থের মাধ্যমে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা।’
অনেকেই তখন কেয়ামত ভেবে ফেলেছিলেন। অনেকেই আমেরিকা ও দুনিয়ার কী হবে, তা নিয়ে ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তাই আশাবাদের প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্বের আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে হটানোর কোন পরিকল্পনা চীনের নেই। তবে এটি স্বাভাবিকভাবেই নিজের চারপাশে নেতৃত্বস্থানীয় স্থান চায়। আর আমেরিকার উচিত নিজের পুনর্গঠনে মনোযোগী হওয়া। যদি দুই দেশের এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে নিজে বাঁচার ও অন্যকে বাঁচতে দেয়ার এবং একসঙ্গে কাজ করার প্রজ্ঞা ও বাস্তবজ্ঞান থাকে, তাহলে তারা সম্ভবত বৈশ্বিক শাসন নিয়ে নতুন এক ঐক্যমত্য প্রণয়ন করতে সক্ষম হবে। আর এটি দুনিয়াকে আরও স্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত করবে।
বিশ্বায়নবাদ আত্মাহুতি দিয়েছে। একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্ম হয়েছে। চলুন এর সঙ্গে এখনই জড়িত হই।

(এরিক এক্স. লি সাংহাই ভিত্তিক একজন ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট ও রাজনীতি বিজ্ঞানী। এ লেখাটি ফরেইন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তার নিবন্ধের কিছুটা সংক্ষেপিত অনুবাদ। অনুবাদ করেছেন নাজমুল আহসান।)

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

M.A. Awal

২০১৬-১২-১১ ০৭:৫৭:৩০

Globalization is to merge all religious, social, political, economic elements with the will of Satan.

আপনার মতামত দিন

হলিউডে যৌন নির্যাতন ও একটি হ্যাসট্যাগ

আমাজন স্টুডিওর প্রধান কর্মকর্তার পদত্যাগ

চট্টগ্রামে মহাসড়কের পাশে নারীর লাশ

চট্টগ্রামে হোটেলে জুয়ার আসর, ব্যবস্থাপকসহ আটক ৬২

‘আওয়ামী লীগ ইসিকে স্বাধীনতা প্রদান করেছে’

বাংলাদেশেও সেখানকার মতো বিচার ব্যবস্থা দেখতে চান

ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে আহত দুই পুলিশ

‘দর্শকরা একজন শিল্পীর কাছে সব সময় ব্যতিক্রমী কিছু দেখতে চায়’

অস্ট্রেলিয়া গেলেন প্রধান বিচারপতির স্ত্রী সুষমা সিনহা

বিতর্কে নয়া রসদ

মৌলভীবাজারে শোকের মাতম

বিয়ানীবাজারের খালেদের দুঃসহ ইউরোপ যাত্রা

১১ দফা প্রস্তাব নিয়ে ইসিতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ

‘প্রধান বিচারপতি ফিরে এসেই কাজে যোগ দিতে পারবেন’

খালেদা জিয়া ফিরছেন আজ

ব্লু হোয়েলের ফাঁদে আরো এক কিশোর