মৃত্যু উপত্যকা মিয়ানমার সভ্যতা যেখানে এক অচেনা শব্দ!

মত-মতান্তর

হাবীবুর রহমান | ৭ ডিসেম্বর ২০১৬, বুধবার
আগুনে মানুষ পুড়িয়ে ফেলা, কুপিয়ে হত্যা করা, মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ এখন মিয়ানমারের নিত্যদিনকার ঘটনা। সভ্যতা এবং মানবতার মসৃণ পথ থেকে মিয়ানমার এখন শত শত মাইল দূরে অবস্থান করছে। একুশ শতকে এসে মানবতার এমন বিপর্যয় বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছে।
প্রভূত প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকারী দেশ মিয়ানমার বৃটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৮ সালে। আরাকান (রাখাইন) এ ভূখ-ের এক অন্যতম রাজ্য। মহাকবি আলাওলের কাব্যেও আমরা এ ভূখ-ের পরিচয় পাই। বহু শতাব্দী ধরেই এ রাজ্য মুসলমান রোহিঙ্গা ও হিন্দু রোসাঙ্গ আর মহাযানী বৌদ্ধদের মাতৃ-পিতৃভূমি।
আঠারো শতকের আগ পর্যন্ত এ রাজ্যের শাসনক্ষমতা ছিল হিন্দু রাজা এবং মুসলিম সুলতানদের হাতে। তাদের নিজস্ব ভাষা আছে, সংস্কৃতি আছে। সুতরাং রোহিঙ্গাদের নিয়ে অন্য যে অভিযোগই তোলা হোক না কেন, রোহিঙ্গারা যে এ ভূখ-ে বহিরাগত নয় সেটা প্রমাণিত সত্য। বরং এরাই এ অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো জাতিগোষ্ঠী।
এছাড়া বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) প্রথম প্রেসিডেন্ট উ নু রোহিঙ্গাদের আরাকানের অধিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে মিয়ানমারের প্রথম সংবিধান সভার নির্বাচনে তারা ভোটাধিকার লাভ করেছিল। ১৯৫১ সালে তারা আরাকানের অধিবাসী হিসেবে পায় পরিচয়পত্র। ১৯৫৯ সালে প্রধানমন্ত্রী উ বা রোহিঙ্গাদের আরাকানের জাতিগোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করেন। এছাড়াও ১৯৪৭ সালে স্বাধীন মিয়ানমারের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম শাও সোয়ে থাইক’র রোহিঙ্গাদের নিয়ে মন্তব্যÑ “রোহিঙ্গারা যদি স্থানীয় আদিবাসী না হয় তাহলে আমিও তা নই।”
কিন্তু ১৯৬২ সালে সামরিক সরকারের প্রতিষ্ঠার দিন থেকে রচিত হতে শুরু করে রোহিঙ্গাদের দুর্ভাগ্য-গাঁথা। নিজ ভূখ-ে তাদের করা হয় প্রশ্নবিদ্ধ। নতুন করে জন্ম নেয় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্ন। নাগরিক অধিকার থেকে শুরু করে রোহিঙ্গাদের সকল অধিকার লুট করা হয়।
“রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে বাঙালি অনুপ্রবেশকারী” এ যুক্তি দাঁড় করিয়ে ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’ নামে চালানো হয় রোহিঙ্গা উচ্ছেদ অভিযান।
সেই ১৯৬২ সাল থেকে শুরু। নানা তর্ক-বিতর্ক, অভিযোগের জের ধরে আজ অবধি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মিয়ানমারে চলছে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। বিশ্ব সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে নানাভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও সেটাকে আমলে নিচ্ছে না মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। নারী-শিশুসহ সর্বস্তরের মানুষের আর্তনাদে মিয়ানমারের মাটি প্রকম্পিত। তবুও সেই আর্তনাদ সেখানকার কর্তৃপক্ষের কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে না। করবে কি করে...! তাদের কানের পর্দা যে বর্বরতার কংক্রিটে গড়া।
বিশ্ববিবেককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ২০১২ সালের মিয়ানমারের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের মন্তব্যÑ “রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের জনগণ নয়, বিতাড়নই এ সমস্যার একমাত্র সমাধান।” এখন প্রশ্ন হলোÑ রোহিঙ্গারা তাহলে কোথাকার জনগণ? এদের উৎপত্তি কোথায়? রোহিঙ্গাদের আদি ইতিহাস অনুসন্ধানে এ প্রশ্নের উত্তর মিললেও সেটা মানতে নারাজ বর্তমান মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া, গণতন্ত্রের মানসকন্যা খ্যাত শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সূচি’র সমকালীন মিয়ানমারে এ জাতীয় অস্থিতিশীলতা তার নোবেল পুরস্কারকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সূচি’র সক্রিয় ভূমিকা না থাকাটা পরোক্ষভাবে এ জাতীয় হত্যাযজ্ঞের সমর্থনেরই শামিল।
ফলে মিয়ানমারে অস্থিতিশীলতা বাড়ছেই। বর্তমান মিয়ানমার যেন এক মৃত্যু উপত্যকা। সভ্যতা এখানে এক অচেনা শব্দ। বর্বরতা এখানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রোহিঙ্গাদের রক্ত এখানকার মাটিকে এতটুকু শুকাতে দিচ্ছে না। একুশ শতকের বিশ্ব মানচিত্রে এরকম একটি দেশ যে কোনো বিবেচনায়ই মানবতার জন্য চরম হুমকি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাব অনুযায়ী সম্প্রতি সেখানে রোহিঙ্গাদের ১২০০ ঘরবাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। মেরে ফেলা হয়েছে শত শত রোহিঙ্গাকে। প্রায় ত্রিশ হাজার নর-নারী ও শিশু সহায় সম্বলহীন হয়ে সীমান্ত পাড়ে মুক্তির প্রহর গুনছে। সমুদ্রে ভাসছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। মৃত্যুই তাদের চূড়ান্ত নিয়তি। অথচ প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্র তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছে না। রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয় দিতে সকল প্রতিবেশী দেশ নারাজ। যদিও জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ দেশগুলোর প্রত্যেকটিই শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার জন্য লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হবে কি হবে নাÑ সেটা সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের ব্যাপার। শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার মধ্য দিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাই এর একটি টেকসই সমাধান দরকার। এ সমস্যা সমাধানে বিশ্বসম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। আলোচনার মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের চলমান সংকট নিরসন করতে হবে। তা যদি না হয় একুশ শতকের সংঘাতহীন বিশ্ব গড়ার পথে এটা হবে এক অন্যতম বাধা। মানবতার জন্য যা এক চরম চপেটাঘাত।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোঃহেদায়েত উল্লাহ্

২০১৭-০৬-২১ ০০:০৬:১৫

আর আমাদের দেশে!

আপনার মতামত দিন

ব্রাজিল ফুটবলের প্রধান ৯০ দিন নিষিদ্ধ

ঝিকরগাছায় ছাত্রলীগ কর্মী খুন, সড়ক অবরোধ

উৎসবের আমেজে সারাদেশ

জনগণের দেয়া রায় মেনে নেবে বিএনপি: ফখরুল

কংগ্রেস সভাপতি পদে রাহুল গান্ধীর আনুষ্ঠানিক অভিষেক

দুই নারীর একজন স্বামী, অন্যজন স্ত্রী

আ’লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত ১৫

নওগাঁয় যুবককে কুপিয়ে হত্যা

গার্মেন্টে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করছে এইচ অ্যান্ড এম

নাশকতার অভিযোগে ২০ শিবিরকর্মী আটক

বিএনপির বিজয় র‌্যালিতে যুবলীগ-ছাত্রলীগের হামলা

বিজয় উৎসব পালন করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ মুক্তিযোদ্ধাসহ আহত ৯

আমৃত্যু এক যোদ্ধার কথা

ছাত্রদলের পুষ্পস্তবক ছিঁড়লো ছাত্রলীগ

বঙ্গবন্ধুর গৃহবন্দি পরিবারকে যেভাবে উদ্ধার করেছিলেন কর্নেল তারা

ভারতে তিন তালাক বিরোধী খসড়া আইনে সরকারের অনুমোদন