আমরাও সভ্য, ইউরোপবাসীকে জানাতে হবে

প্রবাসীদের কথা

রাকেশ রহমান | ২ ডিসেম্বর ২০১৬, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:১৩
মাসটা মার্চের প্রথম দিকে বেশ আমেজেই আছি। অনেক অনেক বছর পর প্রিয় বন্ধুর সাথে দেখা হবে প্রায় সাত বছর পর দেখা হবে। আমি প্রবাসী হয়েছি অনেক দিন প্রায় এক যুগের কাছাকাছি। বন্ধু নিউজিল্যান্ডের ইমিগ্রান্ট নাগরিক আর আমি ইউরোপের ইমিগ্রান্ট। বন্ধু আসছে ইউরোপ ঘুরতে আমি ছুটি পেয়েছি দশদিনের। তারপর শনিবার রবিবার ও অসুস্থতার বাহানা দিয়ে প্রায় ১৬ দিন হবে। বন্ধু আর আমি আবার হচ্ছি ভায়রা ভাই অর্থাৎ আমার শালিকার বর।
প্রায় ছয় মাস যাবত অপেক্ষায় আছি অপেক্ষার সময় শেষের দিকে বন্ধু চলে এসেছে আমার দেশে এখন শশুর বাড়ী ঘুরে রওনা দিয়েছে আমার শহরের উদ্দেশ্য। আমার শশুর বাড়ী ইউরোপের একটি দেশে যেই দেশে আমি থাকি কিন্তু ভিন্ন শহরে। আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ধানমন্ডির কোডা কলেজ থেকে আমাদের বন্ধুত্ব তারপর চষে বেড়িয়েছি গোটা ঢাকা শহর। আমাদের দুজনের বাড়ীই পুরানো ঢাকা কিন্তু পুরানো ঢাকার ঐতিহ্য আমরা বুকে ধারন করে আমরা ন¤্র,ভদ্র,সভ্য ভাবেই পথ চলায় অভ্যস্ত। অপেক্ষার পালা শেষ বন্ধু চলে এসেছে বউ নিয়ে আমার শহরে আমার বাড়ীতে, কিযে অনুভুতি দুই বন্ধুর বুকে বুক লাগিয়ে আবেগ প্রবোনিত সেই মূহুর্ত বলে বা লিখে বোঝানো যাবে না সম্পূর্নটাই হৃদয় দিয়ে উপভোগ করতে হবে।
আমার গৃহিনী বাড়ীতে বিভিন্ন খাবার তৈরি করেছিলো বিশেষ করে ঢাকার তেহরী সহ অনেক কিছু। আমরা আমার শহরের বিশেষ বিশেষ বিখ্যাত জায়গা গুলো ঘুরে খুঁজতে খুঁজতে এক স্থানে কয়েকদিন আগের ঝড়া বরফের একটু স্তুপ পেলাম। সেখানেই আমার বন্ধুকে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলে দিলাম বন্ধুর ইউরোপের ঝড়া বরফ দেখার খুব শখ ছিল।
আমার এখানে বন্ধু ছয়দিন ছিল। বন্ধুকে নিয়ে একটু বাসে উঠে ছিলাম শহরের বাস গুলো দেখাতে বেশ ভালোই বললো। কিন্তু সমস্যা হল বাসে উঠে ছিল দুই জন, সম্ভবত স্বামী স্ত্রী। পোশাক আশাকের কথা তো বাদই দিলাম। এই যে এতক্ষন বাসে আমরা ঘুরছি কি সুন্দর একটা পরিবেশ ছিল হঠাৎ করে সব পরিবর্তন হয়ে গেল বাসে তারা উঠার পর থেকেই পুরো বাস রান্নার একটা তরকারী তরকারী গন্ধ হয়ে গেল। আশপাশে লোকজন সরে গিয়ে তাদের বসতে দিল কিন্তু গন্ধে কাছের লোকজন নাকে হাত দিয়ে রইল। এতক্ষন তো বুঝতে পারিনি কোন দেশি! কিন্তু যখন তার স্বামী সম্ভবত দেশে ফোন করে কথা বলা শুরু করেছে তখন তো বুঝতে বাকি রইলোনা এরা তো আমাদের দেশি।
দুঃখে মাথা অন্য দিকে ঘুরাতেই বন্ধু আমাকে বলল, ওরে ভিসা দিসে কেডা? এত জোরে মানুষ কথা বলে নাকি ? আমরা সন্ধায় আবার বের হলাম রাতের শহর দেখতে বেশ জমজমাট, লোকজন ঘুরছে। আমরা ঘুরতে ঘুরতে আমাদের পা ধরে এসেছে ভাবলাম বসি কোথাও তাই আমার বসার আড্ডার প্রিয় জায়গা লাইব্রেরিতে যাচ্ছিলাম। ঐ রাস্তায় দুই পাশে রেষ্টুরেন্ট ও ছোট ছোট বার ক্যাফেটেরিয়া এবং বাইরে রাস্তায় ওদের রয়েছে চেয়ার টেবিল।
এক কথায় চমৎকার, রাস্তার চার পাশে ছিল আগের দিনের নাবিকদের ব্যবহিত কাঠের ড্রাম, সেই ড্রামের উপর রাখা কারো কফি কারো ওয়াইন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছে ও পান করছে কি সুন্দর পরিবেশ। কেউ কেউ সেই ১৯৫০/৬০ দশকের আভিজাত্যে সাজিয়েছে নিজেকে। বন্ধু আমার দেখছিল মুগ্ধ হচ্ছিল আর বলছিল, আসলেই ইউরোপিয়ানরা অনেক সৌখিন না দেখলে বুজতাম না।
রাতে বাসায় খাওয়া দাওয়া করে পরিবার বাসায় রেখে দুই বন্ধু বের হলাম। গেলাম ইউনিভার্সিটি এলাকায় সেখানে একটা রাস্তায় শনিবার করে সারা রাত বিয়ারের আড্ডা চলে। রাস্তায় হাঁটছি আর দেখছি দুই বন্ধু, ছেলে-মেয়েদের ও বন্ধু-বান্ধবীদের আড্ডা জমে উঠেছে। কোন ঝামেলা নেই, কোন মাতাল নেই, শুধু কথার গুঞ্জন চারিদিকে। কি সুন্দর দৃশ্য কি সুন্দর পরিবেশ!
আমরা হাঁটছি আর গল্প করছি আমি বলছি আমার বন্ধুকে দেখ আমার অনেক দিন হল বিদেশে কিন্তু নুন্যতম সভ্য, ভদ্র মনের মত দেশি মানুষ খুঁজে পেতে অনেক কষ্ট পেতে হয়। আমরা আজীবন বিদেশে থাকলেও বিদেশি হতে পারবো না কারন আচার ব্যবহার চাল চলন আমাদের পরিবর্তন হয় না। আমরা বিদেশীদের অপসংস্কৃতি বেছে নেই কিন্তু বিদেশিদের সততা ভদ্রতা সভ্যতা নিতে পারি না। আমরা চারজন হলেও গীবত শুরু করে দেই কিন্তু বিদেশিরা একশত জন মিলিত হলেও গীবত করে না। আমাদের ভিতরে মিথ্যের প্রচারটা অত্যাধিক এমনকি না জানলেও যে কোন প্রসঙ্গে আমাদের জিততেই হবে। বিদেশিরা পরিবার নিয়ে ঘুরতে পছন্দ করে আর আমরা পরিবারকে বাড়ী রেখে একা অথবা আরো কয়েকজন নিয়ে ঘুরতে পছন্দ করি। আমরা বিভিন্ন ভাবে ঘরের পরিবারকে আমাদের থেকে নিচে রাখতে বহু মিথ্যার আশ্রয় নেই। অনেকে নেশা করতে পরিবারকে মিথ্যে বুঝ দিতেও ভুল করেন না। আমার বন্ধু বলছে আসলেই দেশেই ভালো ছিলাম যার তার সাথে মিশতে হতোনা, নিজেদের লোকজনের সাথে এই বিষয় গুলো নিয়ে সমস্যা হয় না।
আমি বললাম, আসলে জানিস কিছুই না নূন্যতম পরিবারের শিক্ষা থাকলে এই সমস্যা গুলো হয় না। বিশেষ করে ইউরোপে এই সমস্যা বেশি। কারন ইউরোপ আসতে কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না সত্যি ঘটনার উদাহরণ দিচ্ছি দেশের নাম বলবো না কিন্তু ইউরোপের ভিসা পেয়ে খেজুর গাছ থেকে নেমে চলে এসেছে । বন্ধু খুব মজা পেল।
বললাম, তবে ভালো শিক্ষিত লোক নেই তাও না, আছে আমি এসে পেয়েছিলাম সেই সমাজ কিন্তু আজ চাকুরীর জন্য পরে আছি দূরে। বন্ধু আমার বললো, আমাদের দেশেও আছে একই ধরনের লোক যদিও আমাদের দেশ ইউরোপ থেকে কম উন্নত নয় তবে আদি সভ্যতার দেশে নূন্যতম যোগ্যতা ধারী লোক থাকার প্রয়োজন । আমি বললাম, তবে আমি চেষ্টা করি যেই দেশে আমি থাকি বা থাকবো সেই দেশের জনগনের সাথে বেশি মেলামেশার এতে তারা জানতে পারবে আমার দেশ সম্পর্কে আর আমি জানতে পারবো তাদের দেশ ও তাদের ঐতিহ্য।
বিদেশিদের সাথে মিশতে খরচ করতে হয় না; বরং বিদেশিদের সাথে মিশতে হতে হয় পরিষ্কার, ভদ্র ও নূন্যতম শিক্ষিত তা না হলে দেশ জাতি ধর্ম নিয়ে তাদের কি গল্প করবো। তবে শিক্ষিত মানুষের মূল্যায়ন হয় পৃথিবীর সব দেশে। আশাকরি বিদেশে আসার আগে আমরা চেষ্টা করবো নিজেদের কিছুটা হলেও গঠন করে আসতে।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন