অর্ধশত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বিকল

শেবাচিম হাসপাতালের রোগ নির্ণয় কার্যক্রম বন্ধ

ভারত

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল থেকে | ২২ নভেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪৪
রোগ নির্ণয় করার জন্য আগের মতো দীর্ঘ লাইন নেই বরিশাল শের ই বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে। রোগীরাও এখন আর এ হাসপাতাল থেকে সেবা পাবার আশা করে না। কারণ এ হাসপাতালে ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ, কিডনি ডায়ালাইসিস, এনজিওগ্রামসহ প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি থাকার পরও সেবা পাচ্ছে না তারা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে অত্যাধুনিক এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রোগী ও তাদের স্বজনরা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, যন্ত্রপাতি মেরামত ও চালু করার জন্য তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না।
শেবাচিম হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের জুন মাসে চোখের লেন্সের পাওয়ার বাড়ানো ও ছানি কাটতে এ হাসপাতালে যুক্ত হয় ফ্যাকো মেশিন, ল্যাসিক মেশিন ও ইয়াগ লেজার, যা ক্রয়ে ব্যয় হয় প্রায় ১২ কোটি টাকা। তবে মেশিন পরিচালনা করার জন্য সে সময় টেকনিশিয়ান ছিল না। পরে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য চিকিৎসকসহ চক্ষু বিভাগের ৫ জনকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। পরে তারা দেশে ফিরে ৩৫ রোগীকে সেবা দিলেও ২০১৫ সালের শেষদিকে মেশিনগুলো বিকল হয়ে পড়ে। কারণে এ মেশিন পরিচালনা করার জন্য দরকার হয় গ্যাসের। তবে এ গ্যাস এদেশে পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে বারবার চিঠি দেয়া হলেও কোনো সুফল আসেনি। এক বছর ধরে বন্ধ পড়ে আছে সডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্লোরাইট নির্ণয় যন্ত্র ইলেট্রলাইট। ফলে সেবা বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা।
২০০৮ সালে আনা হয় কিডনি ডায়ালাইসিসের জন্য অত্যাধুনিক একটি মেশিন। কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় সেটি গত ৮ বছর ধরে প্যাকেট বন্দি হয়ে পড়ে আছে। জানা গেছে, প্রতি মাসে বরিশালের ৮ থেকে ১০ জন রোগীকে কিডনি ডায়ালাইসিস করতে ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে। রোগীর সব ধরনের তথ্যাদি সংরক্ষণে শেবাচিম হাসপাতালে বসানো হয় অটোমেশন। ২০১৪ সালের জুনে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা ১০০ কম্পিউটার সেট বিশিষ্ট অটোমেশনের কার্যক্রম চলছে না। হাসপাতালের ৪০টি বিভাগে এ জন্য যে কম্পিউটার দেয়া হয়েছিল, যা এখন বিকল। এজন্যও চলছে নার্স ও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। একই অবস্থা ৬৪টি ক্যামেরা সংবলিত সিসি ক্যামেরা। এর অনেকটা বিকল হয়ে পড়েছে। প্রায় ৪ কোটি টাকায় আনা হাসপাতালের আলট্রাস্নোগ্রাম ও এমআরআই মেশিন দুটিও অচল। একই ভাবে অচল ইন্টারকম টেলিফোন সার্ভিস। এখানকার সিটি স্কান মেশিনটিও সম্প্রতি মেরামত করা হয়েছে। এনজিও গ্রাম মেশিনটিও চলছে ধুঁকে ধুঁকে। প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে আনা এমআরআই এখন বিকল। এক মাস ধরে এ বিষয়ে চিঠি দেয়ার পরও তা সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। হার্ডবিট ও গতি নির্ণয়ের ইটিটি মেশিনটির মনিটর নষ্ট প্রায় ৩ মাস ধরে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুটি মনিটর এনে চেষ্টা চালালেও ভালো ফলাফল আনতে পারেনি। এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। এমনি ভাবে হাসপাতালের প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার শত শত মেশিন বিকল হয়ে পড়ে আছে। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের টেকনিশিয়ানরা প্রায় সবাই বেসরকারি বিভিন্ন ডায়াগনিস্টিক সেন্টারের সঙ্গে জড়িত। তারা ইচ্ছে করে মেশিনগুলো বিকল করে। যাতে তাদের বেসরকারি ডায়াগনিস্টিক সেন্টারে রোগীরা যান।
বড়গুনা জেলার আমতলী উপজেলার বাঁধঘাট এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলামের স্ত্রী শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি। তিনি জানান, হাসপাতালের কোনো মেশিন ভালো নেই। তারা বাহির থেকে তারা সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করাচ্ছেন। যে টাকা নিয়ে চিকিৎসা করাতে এসছেন তা আগেই শেষ হয়ে গেছে। পরে বাড়ি থেকে ধারে আরো টাকা এনে চিকিৎসা চালাচ্ছেন। তবে হাসপাতাল থেকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করাতে পারলে আগে যে টাকা নিয়ে এসেছেন তাতেই হতো। তিনি বলেন, এ হাসপাতাল থেকে সেবা পাওয়া যায় না। একই ভাবে অভিযোগ করেছেন বাবুগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আলী আজগর।
বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট এসএম ইকবাল জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার কারণে এ অবস্থা। কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থের কারণে তারা রোগীদের জিম্মি করে বাণিজ্য করছে। এমন অব্যবস্থাপনার এ দেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬/৭ লাখ লোক ভারতে গিয়ে চিকিৎসাসেবা নেয়। এর প্রতিরোধ দরকার।
বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মানবেন্দ্র বটব্যাল বলেন, অপচয় আর কর্তৃপক্ষের অদক্ষ্যতার কারণে শেবাচিম হাসপাতালে যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলোর সেবা পাচ্ছেন না বরিশালবাসী। যে কারনে মানুষকে অধিক টাকা খরচ করে রাজধানীতে ছুটতে হয়।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. এসএম সিরাজুল ইসলাম বলেন, ল্যাসিক মেশিনটির গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে ঢাকায় চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো সুফল আসেনি। তেমনি এমআরআই মেশিনের পাওয়ার সাপ্লাই হচ্ছে না। মেরামতকারী সংস্থা ৬ লাখ টাকা চেয়েছে মেরামতের জন্য যা দেয়া সম্ভব হবে না। তাই অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে মেরামতের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এক্স-রে মেশিনগুলো পাকিস্তান আমলের। মেরামত করানোর কয়েক দিনের মধ্যে বিকল হয়। আল্টাসোনোগ্রাম মেশিন মেরামতের কথা বলা হয়েছে। তারা ঢাকা থেকে ১৫ দিনের মধ্যে আসার কথা বললেও দুই মাসেও আসেনি। ইটিটি মেশিনের মনিটর নষ্ট। দুটি মনিটর আনা হয়েছিল। কিন্তু তা কাজ করছে না। এখন ঢাকা থেকে আনার জন্য বলা হয়েছে। হাসপাতাল পরিচালক বলেন, ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ মেশিন কোবাল দীর্ঘদিন ধরে বিকল। পরে ব্রাকি থেরাপি আনা হয়েছিল। কিন্তু তা এখনো বক্সবন্দি অবস্থা পড়ে আছে। এ সব বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে বারবার চিঠি দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কোনরকমে রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা দেয়া হচ্ছে।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন