আলেয়া বেগমের অন্যরকম চিকিৎসা

ভারত

প্রতীক ওমর, বগুড়া থেকে | ২২ নভেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার
কখনো নিজেকে আলেয়া বেগম আবার কখনো ছমিরন নামে পরিচয় দেন তিনি। নাম যাই হোক মহিলার বয়স পঞ্চাশের একটু এপার-ওপার হতে পারে। অনেক বড় মাপের কবিরাজ তিনি। মানুষের যেকোনো রোগের চিকিৎসা আছে তার কাছে। পুরনো বাত ব্যথা, মাথা ব্যথা, আমাশয়, জন্ডিস, হাঁপানি, ধজভঙ্গ, মহিলাদের যাবতীয় রোগ, যৌনরোগ এমন কি ছোটখাটো ক্যানসারের টিটমেন্টও তিনি করতে পারেন। আর অবুঝ গাঁও-গ্রামের সাধারণ মানুষ রোগমুক্তির আশায় তার কথা বিশ্বাস করে কিনছে জংলি ঘাস লতাপাতা।
বগুড়ার মহাস্থান মাজারকে ঘিরে এরকম আরো অনেক আলেয়া বেগম, কুদ্দস কবিরাজদের সরব উপস্থিতি সব সময় লক্ষ্য করা যায়।
আলেয়া বেগম  জঙ্গলের ঘাস, গাছের লতাপাতা, শেকড়, ছাল এসব তার দোকানের ওষুধ হিসেবে রেখেছে। ওই সব তাকে পয়সা দিয়ে কিনতে হয় না। অবসর সময়ে নিজেই ঝোঁপঝাড়ে দৌড়ঝাঁপ করে তুলে আনে মানুষকে খাওয়ানোর জন্য ওই সব জঙ্গল।
আপনার কি ধরনের রোগ হয়েছে? দেশ বিদেশের নাম করা সব ডাক্তার, শত রকমের টেস্ট কোনো কিছুতেই কাজ হয়নি। চিন্তার কোনো কারণ নেই। বগুড়ার মহাস্থান মাজার এলাকায় আসবেন। সেখানে শত রকমের গাছের লতাপাতা, শেকড়, ছাল, বিভিন্ন গাছের ছোট বড় বিচি (বীজ) সঙ্গে তাবিজের ডিব্বা নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসে আছেন কবিরাজরা। এদের কাছে এমন কোনো রোগ নেই যে রোগের চিকিৎসা এরা দিতে পারে না। একই গাছের লতা, শেকড় অথবা ছাল হাজার রকম রোগের ওষুধ হিসেবে দিচ্ছে এরা। সঙ্গে রোগীকে বলে দেয় নিয়ত করে শরীরের সঙ্গে বেঁধে রাখতে অথবা শিলপাটায় পিশে খেতে। ব্যাস রোগীরা কবিরাজের কথামতো গাছের লতাপাতা, তাবিজ কিনে মাজারে এক ডজন মোমবাতি আর আগরবাতি খাদেমের হাতে দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বাড়ি যাচ্ছে। নিজের জন্য অথবা বাড়িতে থাকা বৃদ্ধ মা বাবার জন্য। ওষুধ হিসেবে নিয়ে যাওয়া ওই সব গাছের ছাল দিনের পর দিন পিষে খাওয়াচ্ছে তাদের। আসলে আদৌ কোনো কাজ হয় না এসব দিয়ে।
আমরা বর্তমান যুগকে আধুনিক বলি। জ্ঞান বিজ্ঞানে উৎকর্ষ লাভ করেছে বর্তমান বিশ্ব। জ্ঞান বিজ্ঞানের পথেই এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। বাংলাদেশও সেই গতিতেই চলছে। একশ’ বছরের পুরনো কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস, আজগুবি ধারণা একবিংশ শতাব্দীতেও ছিটেফোঁটা আছে তার প্রমাণ বগুড়ার মহাস্থানগড় এলাকা।
দেশের অন্যতম পর্যটন স্পটখ্যাত মহাস্থানে প্রতিদিন কয়েক হাজার বহিরাগত দর্শনার্থী বেড়াতে আসেন। বিভন্ন শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকার ভ্রমণ পিপাসুরা শাহ সুলতান বলখী (রহ.) এর মাজার দেখার জন্য আসেন।  
শুক্রবার এখানকার ওই ভণ্ড কবিরাজদের ব্যবসা বেশ ভালো জমে। ওইদিন মহাস্থানের ঐতিহ্যবাহী মাজার মসজিদে স্থানীয়দের পাশাপাশি অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিরা নামাজের জন্য আসেন। এদিকে ওই মসজিদ ঘিরে রাস্তা, ফাঁকা জায়গায় মাটিতে বিছানা পেতে বিভিন্ন রকমের ধাপ্পাবাজির মাধ্যমে সহজ-সরল মানুষের কাছে ওই সব বিক্রি করে। তাদের কথায় পূর্ণ আস্থা এনে কিনেও নেয় ওই সব লতাপাতা। জুমার নামাজ শেষে সব মুসল্লিরা যখন একসঙ্গে মসজিদ থেকে বের হন তখন কবিরাজরা বিভিন্ন রকমের ভঙ্গি প্রদর্শন, মাইক্রোফোনে হাজার রকমের আকর্ষণীয় লেকচারের মাধ্যমে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আগে থেকেই তাদের নিজস্ব কিছু লোকজন তৈরি থাকে, তারা সময় বুঝে নিজেরাই লোক দেখানো সেবা নেয়ার ভান করে। এতে অন্যরাও আকৃষ্ট হয়ে ভণ্ড কবিরাজদের খপ্পরে পড়ে লতাপাতা কিনতে উৎসাহিত হচ্ছেন।
মহাস্থানগড়ের ওই ভণ্ড কবিরাজদের কারবার দেখতে সরজমিনে গিয়ে দেখা মিলল, ৯০ বছরের একজন বৃদ্ধা হাজেরা বেওয়ার। তিনি কোমরের ব্যথার জন্য মহিলা কবিরাজের আস্তানায় হাজির হয়েছেন। বৃদ্ধ মহিলা তার কাছে শরীরে বাসা বাঁধা সব রোগের বর্ণনা দিলেন। বৃদ্ধা গরিব। ভিক্ষায় চলে তার সংসার। কবিরাজ বুঝতে পারলেন তার কাছে পর্যাপ্ত টাকা নেই। তাতে কি শরীরের সব রোগ সারানোর জন্য তিনি বৃদ্ধার কোমরে সুতোয় একটি তাবিজ বেঁধে দিলেন। বৃদ্ধা কবিরাজের হাতে বিশ টাকা দিয়ে চলে গেলেন রোগ মুক্তির আশায়।
এরকম অনেক মানুষ তার মতো কবিরাজদের কাছে রোগ মুক্তির আশায় ওষুধ ভেবে শারীরিক ক্ষতিকর জিনিস কিনছেন। এরা অত্যধিক চতুর হওয়ায় সম্পদশালী ব্যক্তিদের শিশু এবং স্ত্রীদের চিকিৎসা করার জন্য তাদের পটিয়ে থাকে। বিশেষ করে অনেক সম্পদশালী, ব্যবসায়ীর দাম্পত্য জীবনের দুর্বলতাকে খুব সহজেই কাজে লাগিয়ে তারা মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়।
কথা হয় মহিলা কবিরাজ আলেয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে মহাস্থান মাজার এলাকায় কবিরাজি করেন। যে মহিলার বাচ্চা হয় না তার ওষুধও তার কাছে আছে। সে আরো জানায়, তার বাবার কাছ থেকে কবিরাজি শিখেছেন। গাছের লতাপাতা-খাল-বাকলা আর তাবিজ বেচেই মাসে হাজার ত্রিশেক টাকা তার আয়।
এরকম শত শত কবিরাজ আমাদের চারপাশে তাদের অপচিকিৎসা দিয়ে সাধারণ মুনষকে পঙ্গুত্বের দিকে  ঠেলে দিচ্ছে। এরা অনেক সময় হাত-পা ভেঙে যাওয়া জটিল রোগীদেরকে বাঁশ দিয়ে বেঁধে চিকিৎসা করে থাকে। বিশেষজ্ঞরা ওই চিকিৎসাকে ভয়ঙ্কর ভাবেই দেখেন। শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কনসালটেন্ট অর্থোপেডিক্স সার্জারি ডা. রেজাউল করিম বলেন, এসব কবিরাজি চিকিৎসার ফলে অনেক সময় শরীরের চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। মাংসে পচন ধরে। শরীরের রগগুলো শুকিয়ে যায় এবং হাড়ের জয়েন্টগুলো শঙ্কুচিত হয়ে যায়। এতে অনেক সময় আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলতে হয়। 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন