দূর দেশে’র কিছু গল্প কথা

প্রবাসীদের কথা

কাজী সুলতানা শিমি, সিডনি থেকে | ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬, শনিবার
অস্ট্রেলিয়ায় ডিসেম্বর-জানুয়ারি এ দু’মাস পুরোপুরি গরম থাকে। এ সময়টা খুব উপভোগের। বাচ্চাদের স্কুল ছুটি থাকে। তাই বাবা মা বা অভিবাবকেরা সে সময় ছুটি ম্যানেজ করার চেষ্টা করে। কেননা তা না হলে বাচ্চারা একা একা কেমন করে বাসায় থাকবে। ছুটি দিতে চাকরি প্রতিষ্ঠান গুলো তেমন কোন ঝামেলা করেনা এসময়। সামার টাইমে আমরা সব সময় লং ড্রাইভ–এ যাই। এবার ও তাই করেছি। খ্রিস্টমাস সময়টা অর্থাৎ ২৫ ও ২৬ শে ডিসেম্বর গিয়েছিলাম সিডনী থেকে ৭ ঘণ্টা ড্রাইভ ইডেন নামক একটা জায়গায়। অবশ্য আমাদের থাকার জায়গাটা ছিল অন্যখানে মিরিম্বিনা বিগফোর রিসোর্টে।
কোথাও যাওয়ার প্ল্যান থাকলে আমরা সব সময় ভোর ৫ টার আগে বাসা থেকে বেড়িয়ে পরার চেষ্টা করি। এতে শহরের ভেতরকার হলিডে ট্র্যাফিক এড়ানো যায়। তাই বাচ্চাদের বলে রাখি ব্রেকফাস্ট হবে ম্যাকডোনাল্ডসে। বাচ্চারা সেই লোভে লোভে আমাদের আগেই উঠে পরে ঘুম থেকে। ওরাই বরঞ্চ আমাদের তাড়া দিতে থাকে জলদি রওনা দেয়ার জন্য। সেদিনও  তাই হলো ভোরে উঠেই বেরিয়ে পড়লাম। পথে বেড়িয়ে মনে পড়লো আরে ২৫শে ডিসেম্বর খ্রিস্টমাসের দিন তো সবকিছু বন্ধ থাকবে। বিশেষ করে এতো ভোরে ম্যাকডোনাল্ডস ও খোলা থাকবেনা। এদিকে বাচ্চাদের কথা দিয়েছি পথে নাস্তা করাবো। কিন্তু কি আর করা সাথে যে হাল্কা কিছু খাবার নিয়ে বেড়িয়েছিলাম সেটা দিয়েই নাস্তা সারতে হোল। সারা পথ এবার নিজেদের সাথে নিয়ে যাওয়া খাবারের উপর নির্ভর করতে হল।
দোকানপাট খোলা না থাকায় পথে তেমন থামিনি। তাই বারোটার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। এখানকার হলিডে রিসোর্টগুলো স্টার ভিত্তিতে মানদণ্ড নির্ধারণ হয়। ফাইভ স্টার, ফোর স্টার এভাবে ক্রমান্যে্যে সুবিধার ভিত্তিতে রেটিং করা হয়। যেমন ফাইভ স্টার হলে সর্বাধিক সুবিধা সম্পন্ন হয়ে থাকে। আমরা ইন্টারনেট থেকে রিসোর্ট বুকিং দিয়েছিলাম। আমাদের বলা আছে যেহেতু ২৫ তারিখ খ্রিস্টমাস’ডে তাই অফিসে কোন লোক থাকবেনা। বুকিং ডকুমেন্ট ও চাবি রাখা থাকবে নির্দিষ্ট লকারে তার নাম্বার ই-মেইলে  দেয়া হয়েছে। যথারীতি আমরা পৌঁছেই সে লকারে সব পেয়ে গেলাম। রিসোর্ট দেখে আমার বাচ্চারা মহা খুশি কারণ বাচ্চাদের সুইমিং পুল থেকে শুরু করে যাবতীয় আনন্দ আয়োজন এখানে আছে। সন্ধ্যায় আবার বড়ো প্রোজেক্টরে মুভিও দেখানো হবে সমুদ্রের বালির উপর।
গাড়ী থেকে নেমেই ওরা চলে গেলো জাম্পিং ক্যাসেলে। আসলে অনেকক্ষণ গাড়ীতে বসে থেকে ওরাও বিধস্ত  তাই লাফালাফি করার জন্য আর তর সইছিলো না। এখানে রিসোর্ট গুলোতে কেবিন বা ইউনিট ছাড়াও পাওয়ার ও নন-পাওয়ার ক্যাম্প সাইট থাকে। যে কেউ লং ড্রাইভে বেরুলে রাতে ক্লান্ত হয়ে পরলে তখন ক্যাম্পে টেন্ট বা তাবু পেতে ঘুমিয়ে নেয়। এ সুবিধাটা যে কোন উন্নত দেশে টুরিস্টদের কম খরচে ভ্রমণে উৎসাহিত করার জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটা বিষয়। আমি যখন নিউজিল্যন্ড ছিলাম সেখানেও এই সুবিধা দেখেছি। আমার কাছে অতি চমৎকার একটি পদক্ষেপ মনে হয়েছে। এখানে বাচ্চাদের ক্লাস ফাইবে উঠলে স্কুল থেকেই ক্যাম্পিং এ নিয়ে যায়। যাতে করে তারা যে কোন পরিস্থিতিতে এডজাস্ট করে নিতে পারে এবং স্বাবলম্বী হতে শিখে।
রিসোর্ট ছাড়া এমনিতেও ক্যাম্পিং এর বিভিন্ন সুবিধা আছে সারা অস্ট্রেলিয়া জুড়ে। লং ড্রাইভে বেরুলে ক্যারাভেন সাইন দেয়া থাকে পথে পথে। সেই সাইন ফলো করলেই ক্যাম্পিং সাইট খুঁজে পাওয়া যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের টুরিস্টরা কম খরচে বিশ্ব ভ্রমণে বেরুলে এই ক্যাম্প সাইট গুলোতে রাত কাটায়। অনেকদিন অনেক রিসোর্টে আমার কথা হয়েছে জার্মানি, ইটালি, ফ্রান্স, আমেরিকা থেকে আসা ইয়ং টুরিস্টদের সাথে। এমনকি কয়েকজন মেয়ে মিলেও মাস খানেকের জন্য বেরিয়ে যায় বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের উদ্দেশে। গাম ট্রি নামে একটা ওয়েব সাইট আছে যেটা পার্সোনাল ভাবে ও টুরিস্টদের নানা সাহায্য করে থাকে। একবার হল্যান্ডে থেকে আসা টুরিস্ট কাপল মিয়ান্ডার ও বিয়াট্রিসের সাথে বেশ সখ্যতা হয়েছিলো আমাদের। বলেছিলো আবার অস্ট্রেলিয়া এলে টুরিস্ট ক্যাম্পে নয় আমার বাসায় উঠবে তারা। এখনো যোগাযোগ আছে তাদের সাথে। ফুটফুটে দুটি ছেলে হয়েছে তাদের। থাক সে গল্প না হয় আরেকদিন করবো।   
আমাদের এই রিসোর্টেও ক্যাম্প সাইট আছে। তবে বেশীর ভাগই দেখছি ইরান, আফগানিস্তান ও লেবানিজ ক্যাম্পার। মাথায় হিজাব পরা। এতো দূর এই মফস্বল শহরে এরা ক্যাম্পিং এ এসেছে কেন ঠিক বুঝতে পারছিনা। পরে মনে হোল সম্ভবত আশেপাশেই থাকে। রেসিড্যান্সী নেই তাই হয়তো রিফুজি হিসেবে এই শহরতলীতে কোথাও কাজ করছে। ছুটির দিন তাই ক্যাম্পিং করছে। এই রিসোর্টে ক্যাম্প ফ্যাসিলিটি চমৎকার। তিনটা ঝকঝকে রান্নাঘর। মনে হচ্ছে নতুন বানানো নতুবা রেনুভেট করেছে। তাই মহিলা গুলো রান্নার ঘটিবাটি সহ সব সরঞ্জাম নিয়ে কেবল সারাক্ষণ রান্না আর ওয়াশিং নিয়েই ব্যস্ত। পুরুষলোক ও বাচ্চারা বসে বসে টিভি দেখছে। মহিলারা সারাক্ষণই কাজ করছে একেবারে বাড়ীতে যা করে। বেড়াতে এসেও তাদের শান্তি নেই। আমি আবার ঠিক তার বিপরীত। বেড়ানো ব্যাপারটা আমার কাছে একটা বিড়ম্বনা মনে হয়। প্রতিবার বেড়াতে যাওয়ার আগে কন্ডিশন থাকে আমি কিছুই করতে পারবেনা নেয়ায়েত প্রয়োজন না পড়লে। যদি কেবল বই পড়ার সুযোগ দেয়া হয় তাহলেই যাবো। ঘড়ে বাইরে কাজ করার ঝাক্কি ঝামেলা আমি নিতে পারবোনা। তারচে বরং ঘড়েই থাকি। ঘড়ে কাজ করবো আমি, বেড়াতে গেলে বাচ্চা ও তাদের বাবা। এভাবেই লং ড্রাইভে যাওয়ার শর্ত থাকে।
গাড়ী থেকে মালপত্র নামানোর আগে পুরো রিসোর্টটা দেখে নিতে ইচ্ছে হল। তাছাড়া একটু হাঁটাও দরকার।  অনেকক্ষণ গাড়ীতে বসায় শরীর থিতু হয়ে আছে। যে কোন হলিডে রিসোর্ট সাধারণত প্রাকৃতিক দৃশ্য, লেক কিংবা সমুদ্রের পাড়ে থাকে। এটা একেবারে সমুদ্রের পাড়ে। পাশাপাশি সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্য। দুয়ে মিলে এতোটাই অপূর্ব যেন কোন ছবির ক্যানভাস। আমার হাতে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা উপন্যাস। দোতলা বারান্দায় সমুদ্রের হাওয়া খেতে খেতে এখনি বইটি পড়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। এমন অসাধারণ পরিবেশ শুধু হাওয়া খেয়েও সময় কাটিয়ে দেয়া যায়। এম্নি এম্নি কিছুক্ষণ দোতলা বারান্দায় বসে রইলাম। সমুদ্রের হাওয়া আমার চুল গুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। এমন উতলা হাওয়া অনেকদিন উপভোগ করিনা। ইস জীবনটা বড়ো স্বপ্নিল। আমি চোখ বন্ধ করে মনের দরজা খুলে দিলাম।
বাচ্চাদের হৈ চৈ শুনে সম্বিৎ ফিরে এলো। অনেকক্ষণ লাফালাফি ঝাপাঝাপি করে ওরা নাকি এখন ক্ষুধার্ত। অগত্যা খাবারের হাল্কা আয়োজনে নামতে হলো। বললাম অল্প কিছু খেয়ে তোমরা সুইমিং পুলে যাও। আমি বসে থাকবো তোমাদের সাথে। এরমধ্যে তাদের বাবা বারবিকিউ করে ফেলবে। তিনি আবার বারবিকিউতে ভীষণ উৎসাহী। কোন ধরণের হেল্প ছাড়া একাই সব করতে পছন্দ করেন। মনে মনে বলি আউটিং এ আসা মন্দ না। ঘরে থাকলে তো শুধু কাজ আর কাজ। রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা উপন্যাসটি নিয়ে বাচ্চাদের সাথে সুইমিং পুলের দিকে হাঁটা দিলাম। বারবিকিউ শেষ হলে আমাদের ডাকা হবে। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে.........
 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন