জঙ্গি প্রতিরোধে সোচ্চার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষাঙ্গন

নূর মোহাম্মদ | ২৬ জুলাই ২০১৬, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪০
সমপ্রতি কয়েকটি জঙ্গি ঘটনার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সম্পৃক্ত থাকায় সরকারি গোয়েন্দাদের কড়া নজরদারিতে আছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এই হামলার পর গুলশান, বারিধারার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো পর্যন্ত খোলেনি। চলতি মাসের ১৩ তারিখ ইংলিশ মিডিয়ামের সব স্কুল খোলার তারিখ থাকলেও স্কলাসটিকাসহ নামিদামি স্কুল গতকাল পর্যন্ত খোলেনি। আতঙ্কের মধ্যে যেসব স্কুল খুলেছে  সেখানে উপস্থিতির হার একেবারেই কম। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আতঙ্ক না থাকলেও বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ভুগছে ইমেজ সংকটে। এই সংকট উত্তরণে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
দেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথের বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। গুলশান ও শোলাকিয়া হামলায় এই প্রতিষ্ঠানের তিনজন ছাত্র জড়িত ছিল। এরপর নর্থ সাউথ নড়েচড়ে বসেছে। সরকারের নির্দেশনা ছাড়াও প্রতিদিন জঙ্গিবিরোধী সমাবেশ, মানববন্ধন, র‌্যালি করছে তারা। গত শুক্রবার শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেখানে ভিসি, ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অভিভাবকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। সেখানে  বেশকিছু পদক্ষেপের কথা জানান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, শিক্ষার্থীদের পূর্ণ কার্যক্রম ও গতিবিধি দেখতে সাতটি মনিটরিং টিম গঠন করা হচ্ছে। এখন থেকে শিক্ষার্থীদের সবকিছু পর্যবেক্ষণ করা হবে ৭টি টিমের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও সহযোগিতা কামনা করা হয়। ভিসি প্রফেসর আতিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, অভিভাবকদের উদ্বেগ দূর করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছি। একাডেমিক মনিটরিং করার পাশাপাশি তাদের আচরণ, চলাফেরা ইত্যাদি মনিটরিং করা হবে। এ জন্য বড় আকারে কাউন্সেলিং টিম কাজ করছে। আরো কয়েকটি টিম গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিদিন ক্লাসে উপস্থিত না থাকলে তার অভিভাবককে এসএমএস করে জানানো হবে। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরাসরি যোগাযোগ করবো। নজরদারি বাড়ানোর জন্য বিভাগ, ডিন এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা টিম গঠন করা হয়েছে। এছাড়া কাউন্সেলিং টিম তো আছেই। তারা প্রতি মুহূর্তের আপডেট আমাদের জানাবে। ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আজিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রত্যেকটি বিভাগের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য টিম করা হয়েছে। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কাজ করছে। তারা বিভিন্ন ভাবে তাদের ফলো করবে। অভিভাবকরা এসব টিমের কাছে যেকোন ধরনের তথ্য নিতে পারবে। ক্যাম্পাসে মনিটরিং বাড়ানো হয়েছে। শুধু রুম নয়, সিঁড়িসহ প্রত্যেক দেয়ালে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। অর্থাৎ ক্যাম্পাসে কেউ উগ্রপন্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে না।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ভিসি প্রফেসর ড. আবুল হাসান মোহাম্মদ সাদেক মানবজমিনকে বলেন, জঙ্গিবিরোধী সচেতনার জন্য ইতিমধ্যে আমি একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছি। তারাই সকল ছাত্রকে মনিটরিং করছে। যারা এক সপ্তাহের বেশি ক্লাসে অনুপস্থিত থাকছেন তাদের ব্যাপারে অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি খোঁজখবর নিচ্ছি। আমি নিজে প্রতিদিন ক্লাস রুম পর্যবেক্ষণ করছি। ভিসি বলেন, সিকিউরিটি গার্ড বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি ক্লাসরুমে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এশিয়ান ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ কর্মকর্তা রনি বলেন, আগামী ১লা আগস্ট উত্তরার বিরাট একটা অংশজুড়ে মানববন্ধন কর্মসূচি করা হবে। কালকে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা নিজ উদ্যোগে জঙ্গিবিরোধী একটি বিতর্ক ও র‌্যালি করবেন। এছাড়া প্রতিদিন ক্লাসের একটা অংশে শিক্ষকরা জঙ্গিবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিতে জঙ্গিবাদবিরোধী সমাবেশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহেল আহসান নিপু বলেন, অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের তালিকাসহ জঙ্গি প্রতিরোধ সেল করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শান্তি সমাবেশ ও মতবিনিময় সভা করা হয়েছে। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি।
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে মতবিনিময় সভা করেছে।  রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এই মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন বিভাগের ডিন ও শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ভিসি প্রফেসর ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান। এসময় তিনি কিছু দিকনির্দেশনা দেন। সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া নির্দেশনাবলী শিক্ষকদের বুঝিয়ে দেয়া হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতি আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাউন্সেলিং ও পর্যবেক্ষণ ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন ভিসি। তিনি বলেন, লক্ষ্য রাখতে হবে ছাত্র-ছাত্রীরা যে বিপথগামী না হয়। এসময় ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলাম, ট্রেজারার প্রফেসর  ড. এম কোরবান আলী উপস্থিত ছিলেন।  
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ বিভাগের প্রধান আবু সাদাত বলেন, ভিসি স্যারের নির্দেশে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের তালিকা প্রস্তুত শুরু হয়েছে এবং জঙ্গিবাদবিরোধী একটি মনিটরিং সেল পুরোদমে কাজ শুরু করেছে। প্রত্যেক বিভাগ, ডিন আলাদাভাবে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। ক্যাম্পাসে সিসিটিভি বাড়িয়ে সন্দেহজনক স্থানে নজরদারি চলছে। বিশেষ করে মসজিদ, লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরিতে সন্দেহজনক কেউ অবস্থান করছে কিনা বা কারা কী করছে তা পর্যবেক্ষণ চলছে। শিগগিরই আমরা বিভাগওয়ারি অভিভাবকদের সঙ্গে বসে জঙ্গিবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করবো। ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নিয়মিত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে বসছেন শিক্ষকরা। আর ক্লাসে নিয়মিত জঙ্গিবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন শিক্ষকরা। তিনি বলেন, ট্রাস্টি বোর্ডের নির্দেশনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি বডি এ নিয়ে কাজ করছে। কমিটির সদস্যরা গোয়েন্দা সংস্থার মতো ছাত্রছাত্রীদের ওপর নজরদারি করছে। অনিয়মিত ছাত্রছাত্রীদের তালিকা করে অভিভাবকদের সঙ্গেও কথা বলছি। এছাড়াও ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা  গেছে, তারাও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় অনুপস্থিতির তালিকা করা, কাউন্সেলিং, আলোচনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন