জঙ্গিবিরোধী সিরিজ মতবিনিময় নেই সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা

শিক্ষাঙ্গন

| ২৬ জুলাই ২০১৬, মঙ্গলবার
সাম্প্রতিক দুই জঙ্গি হামলার ঘটনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী সম্পৃক্ত থাকায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ধারাবাহিক এ বৈঠকগুলোতে প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্যে সচেতনতামূলক বক্তব্য দিচ্ছেন শিক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তবে জঙ্গি কার্যক্রম প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা পাচ্ছে না। ইতিমধ্যে বেসরকারি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, কর্তৃপক্ষ, সিনিয়র শিক্ষকদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে। সারা দেশের প্রায় ২২ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও ১২শ মাদরাসার অধ্যক্ষদের সঙ্গে শেষ হয়েছে মতবিনিময়। আগামী ৩০শে জুলাই শেষ হবে এই মতবিনিময় সভা।
এছাড়া আগামী ২৭শে জুলাই ফাজিল, কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ এবং সর্বশেষ সারা দেশের পলিটেকনিক্যাল কলেজ ও ইনস্টিটিউট প্রধানদের নিয়ে বৈঠক করবেন শিক্ষামন্ত্রী। এসব মতবিনিময় সভা সফল করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো ধরনের প্রস্তুতি না থাকায় এর ফলাফল নিয়ে সন্দিহান সংশ্লিষ্টরা। তবে ব্যতিত্রুম ছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানটি। সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রায় ১২ ধরনের লিখিত নির্দেশনা দেয়া হয়। বাকিগুলোতে শিক্ষামন্ত্রী মৌখিকভাবে কিছু নির্দেশনা দিলেও ছিল না লিখিত সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা। বৈঠক অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠান প্রধানরা জানিয়েছেন, একজন শিক্ষার্থী ১০ দিন টানা অনুপস্থিত থাকলে তার তথ্য উপজেলা, জেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানানোর একটি লিখিত নির্দেশনা পেয়েছি। এর বাইরে গতকাল পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। তারা জানান, নানা কারণে অনেক বিষয়ে তারা সরাসরি কথা বলতে পারবেন না। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট লিখিত নির্দেশনা থাকলে তা বাস্তবায়ন সহজ হবে। গত শনিবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের নিয়ে বৈঠক করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আয়োজক ছিল ইউজিসি। সাড়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে কী করণীয় তা ছিল আলোচনার বিষয়। তবে শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের কী করণীয় তার লিখিত কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ সরাসরি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী হামলা হলে তার দায় ভিসি এড়াতে পারেন না। এর সঙ্গে যদি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী জড়িত থাকে তাহলে তো আরো না। বেশ কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন তিনি। এক প্রস্তাবনা তুলে ধরেন আরো ডজনখানেক ভিসি। তারা জঙ্গি প্রতিরোধে কী কী উদ্যোগ নিয়েছেন তা জানান। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কি করণীয়, তারা ফিরে গিয়ে কী বাস্তবায়ন করবেন তার কোনো নির্দেশনা দেয়নি মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি কর্তাব্যক্তিরা। অথচ, গত ১৭ই জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি-মালিকদের নিয়ে বৈঠকে জঙ্গি প্রতিরোধে ১২ ধরনের লিখিত নির্দেশনা দেয় পুলিশ। এসব নির্দেশনা প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দেয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তা বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ এসব নির্দেশনা নোটিশ বোর্ডে টানিয়ে দিয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা অভিযোগ করেন, লিখিত নির্দেশনা ছাড়া কাজ করতে সমস্যা হয়। নির্দেশনা না থাকায় আমরা দোলাচলে আছি। রাজধানীর আগাঁরগাওয়ের উপস্থিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলেন, নাম প্রকাশ করে এই ক্ষোভের কথা বলতে গেলে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রোষানলে পড়তে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর সামনে জাহাঙ্গীরনগরের ভিসি প্রকাশ্যে ভিসিদের সমালোচনা করেছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে তার করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দিতে হয় পুলিশকে। এরচেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে। তার অভিযোগ, ইউজিসি কর্মকর্তারা শুধু পরিদর্শনের নামে সম্মানী নেয়া নিয়ে ব্যস্ত। গুলশান হামলার পর বুয়েটসহ নামিদামি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গি লালিত হয় বলে খবরের কাগজে এসেছে। অথচ তাদের ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন ভিসি বলেন, সপ্তাহখানেক আগে ইউজিসিতে ভিসিদের পূর্বনির্ধারিত একটি বৈঠকে সাম্প্রতিক জঙ্গির বিষয়টি নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা হয়েছে। সেখানে ভিসিরা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দিয়েছেন। দুজন ভিসি এই প্রস্তাবগুলো সুপারিশ আকারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়ার কথা বলেন। কিন্তু দেয় হয়নি। ভিসি বলেন, লিখিত নির্দেশনা না থাকলে আমাদের কাজ করতে সমস্যা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা ও একাডেমিক কাজে যুক্তদের লিখিত নির্দেশনা দিতে হয়। আমরা সেটি পাইনি।
জানা গেছে, ইউজিসির এই ধরনের একটি নির্দেশনা তৈরি করার কথা ছিল। কিন্তু মাঝখানে তিনদিনের জন্য ভারত সফরে চলে যান সংস্থাটির চেয়ারম্যান। কাউকে এ কাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান বলেন, আমাদের নির্দেশনা ভিসিরা পেয়েছেন। খুবই স্পষ্টভাষায় আমি ও শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় নির্দেশনা দিয়েছি। লিখিত নির্দেশনার ব্যাপারে তিনি বলেন, এসব মনে রাখার মতো মেধা তাদের আছে। আশা করি ভুল করবেন না।  
একই অবস্থা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষদের বেলাও। সারা দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রায় ২২শ’ কলেজের অধ্যক্ষদের মতবিনিময় সভায় ছিল সুনিদিষ্ট নির্দেশনা। গতকাল সারা দেশে থেকে আগত প্রায় ১২শ’ দাখিল, আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষরা ফিরে গেছেন শূন্যহাতে। মতবিনিময় শেষে ভৈরবের একটি মাদরাসার সুপারিনটেনডেন্ট এই প্রতিবেদকে বলেন, কী বার্তা নিয়ে যাচ্ছি আমি নিজেও জানি না। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দেয়ার মতো লিখিত কোনো বার্তা মাদরাসা বোর্ড বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমাদের দেয়া হয়নি।
এ পর্যন্ত হওয়া মতবিনিময় সভায় দেয়া বক্তারা অনেকে রাজনৈতিক ধারায় বক্তব্য দিয়েছেন। চলমান সংকটের বিষয়ে সমন্বিত দিকনির্দেশনা এসেছে একেবারেই কম। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর দ্রুত জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এ কার্যক্রম চলছে। ভবিষ্যতে জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে সুনির্দিষ্ট আরো পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন