সফলতার মূলমন্ত্র!

যুক্তরাজ্য থেকে ডা: আলী জাহান

মত-মতান্তর ২৭ জুলাই ২০২০, সোমবার

আমরা অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করি যে সাফল্য হঠাৎ করে আসে। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে?

জীবনে কী হতে চান, কীভাবে হতে চান? কোথায় যেতে চান? লম্বা একটা তালিকা আছে? এ সম্পর্কে আরেকটু জানার ইচ্ছা আছে? নিজের যোগ্যতাকে বাড়াতে চান? একটু ভালোভাবে বাঁচতে চান? একটু সুখের মুখ দেখতে চান? সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে চান? আমার মনে হয় না যে এখানে এমন কেউ আছেন যিনি এই জিনিসগুলো চান না।

জীবন হচ্ছে সামনে এগিয়ে চলা। ধীরে ধীরে এবং ধারাবাহিকভাবে ছোট ছোট অর্জনকে সাথে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলা। তাহলেই একদিন বড় অর্জন ও সফলতা আসবে।

উপরের সবগুলো চাওয়া-পাওয়াকে হাতের নাগালে আনতে চাইলে একটা জিনিস আপনাকে মনে রাখতে হবে এবং তা হচ্ছে যে একাধিক কাজে আপনি একসাথে সফলতা পাবেন না। একের বেশি কাজ আপনি সফলভাবে একসাথে করতে পারবেন না।

এটি একটি সাধারণ বুদ্ধির ব্যাপার যে আপনি ইচ্ছা করলেই অনেকগুলো কাজ একসাথে করতে পারবেন না। সোজা কথায় আপনার হাতে সে পরিমাণ সময় এবং সামর্থ্য নেই। কাজেই একসাথে সম্পন্ন করার জন্য যদি আপনি অনেকগুলো প্রোজেক্ট হাতে নেন তাহলে কোন কাজই আপনি ভালো ভাবে করতে পারবেন না। কাজে সফলতা আশা তো পরের ব্যাপার।
গোঁড়াতেই হোঁচট খেয়ে বসে থাকতে পারেন। আপনাকে অস্থিরতা এবং বিষন্নতা পেয়ে যেতে পারে।

তাই উচিত হলো জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যকে প্রথমে আপনি নির্বাচন করুন এবং তার পেছনেই মূল সময় ও শক্তি ব্যয় করুন।যখন এটি সম্পন্ন হয়ে যাবে তখন পরবর্তী টার্গেটের দিকে আপনি এগিয়ে যান। মনোযোগকে কয়েক টুকরো করে আপনি সফলতা পাবেন না।

সাফল্য হঠাৎ করে বা একদিনে আসে না।
প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে যখন আপনি একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর আপনার পূর্ণ দৃষ্টি নিবন্ধন করবেন এবং তা অর্জনের জন্য ক্রমাগত চেষ্টা করে যাবেন। ডান বাম, সামনে-পেছনে দৃষ্টি না ঘুরিয়ে মূল লক্ষ্যের উপর দৃষ্টি ফেলুন।

পেশাগত জীবনে খুবই সফল একজন ব্যক্তির কথা শোনা যাক-
‘এ ধারণাটা প্রথমে আমার মাথায় আসে যখন আমি হাইস্কুলে এবং কলেজে ছিলাম। যেকোনো একটি টপিক বা সাবজেক্ট নিয়ে আমি যখন ব্যস্ত তখন অন্য কোন বিষয় বা সাবজেক্টে আমি মনোযোগ দিতাম না। প্রথম টপিকটি পুরোপুরি আমার আয়ত্তে আসার পরই আমি পরবর্তী টপিক বা সাবজেক্টে দৃষ্টি দিতাম।

খেয়াল করে দেখলাম যে আমি যদি একটি নির্দিষ্ট টপিকে কয়েক ঘণ্টা বা প্রয়োজনে কয়েকদিন একটানা মনোনিবেশ করে থাকি তাহলে এ জিনিসটি আমার কাছে সহজবোধ্য হয়ে আসে।একই সময় আমি খেয়াল করে দেখলাম যে আমার বন্ধুরা যারা অনেকগুলো টপিক বা সাবজেক্ট একসাথে করায়ত্ত করতে চাইছিলো তারা ব্যর্থতায় হাবুডুবু খাচ্ছিল।

আমার সামনে যদি এখন একটি প্রজেক্ট থাকে তাহলে আমি অন্য প্রজেক্টে হাত দেবো না।আমি যদি এখন নির্দিষ্ট একটি টপিক নিয়ে লিখতে থাকি তাহলে অন্য টপিকে আমি লিখতে বসবো না। আমি যদি আমার বাগানের কাজ করতে থাকি তাহলে ওই সময় আমার পড়াশোনার চিন্তা না করলেও চলবে। আমি যখন ডিউটিতে বসে আছি তখন আমার সংসারের চিন্তা করলে ডিউটিতে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। যদি আমি আমার ডিউটিতে সংসারকে টেনে নিয়ে আসি, তাহলে সংসার এবং ডিউটি কোনোভাবেই ভালো ভাবে সম্পন্ন হবে না’।

Gary Keller and Jay Papassan এর বই The One Thing এর একটি উল্লেখযোগ্য বাক্য হচ্ছে

‘জীবনে যেখানে আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে যখন আমি আমার কাজকে শুধুমাত্র একটি জিনিসের উপর আবদ্ধ করে রেখেছি এবং যেখানে আমার সাফল্য আসেনি সেখানে আমার দৃষ্টি একসাথে অনেকগুলো জিনিসের উপর ছিলো’।

আপনার হাতে কি অনেকগুলো কাজ? আপনার মনোযোগ কি একের অধিক বিষয়ে পড়ে আছে? আপনি ধরে নিতে পারেন যে কোন একটা বিষয়ে আপনার সফলতার সম্ভাবনা অনেক কম। ভাগ্য যদি আপনার খুব ভালো না হয় তাহলে এখানে আপনার সাফল্য আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ, কয়েকটা বিষয়ে আপনি একইসাথে পারদর্শী হতে চাইছেন। একসাথে অনেকগুলো বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করার জন্য আমাদের মস্তিষ্ক প্রস্তুত নযl

অধিকাংশ লোক বিশ্বাস করে যে সাফল্য একসাথে আসে। আসলেই কি তাই? Keller and Papassan এর মতে সাফল্য হচ্ছে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, লটারি জেতার মতো হঠাৎ করে বড়লোক হয়ে যাওয়া সফলতা নয়।

আপনার প্রতিদিনের অর্জন একেকটি আরেকটির সাথে যোগ হচ্ছে। এভাবে আপনি একটি দক্ষতা বা স্কিল (skill) অর্জন করছেন। ধরা যাক, আপনি ড্রাইভিং লেসন(lesson) নিচ্ছেন। প্রতিদিনের লেসনে আপনি একটি একটি করে জিনিস শিখছেন বা দক্ষতা অর্জন করছেন যা পরবর্তীতে আপনাকে একজন সুদক্ষ ও নিরাপদ ড্রাইভারে পরিণত করবে। প্রথমে একটি দক্ষতা অর্জন করুন। তারপরে পরের দক্ষতা অর্জনের দিকে এগিয়ে যান। আরেকটি দক্ষতা অর্জন করুন। তারপরে আরেকটি।এভাবে
বায়োডাটায় আপনার যোগ্যতার এবং দক্ষতার তালিকা আস্তে আস্তে বড় হতে থাকবে।

টাকা দিয়ে একটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরেকটু সহজ হবে। অধিকাংশ লোকই ধীরে ধীরে টাকা আয় করে।লটারি পেয়ে বা পৈত্রিক সম্পত্তি পেয়ে হঠাৎ কোটিপতি বনে যাওয়া লোকজন অবশ্য এই উদাহরণের মধ্যে পড়বে না। লটারি জেতা বা পৈতৃক সম্পত্তির গুনে ধনী হয়ে যাওয়া সফলতা নয়। বরং তা হচ্ছে আপনার সৌভাগ্য বা জুয়া খেলা। সফলতা অর্জনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া থেকে তা অনেক অনেক দূরে।

জীবনে সাফল্য অর্জন করার জন্য আপনাকে বিশেষ বুদ্ধিমান বা বিশেষ যোগ্যতা সম্পন্ন হতেই হবে এমন নয়। সবচেয়ে বড় ব্যাপারটি হচ্ছে যে যোগ্যতা বা দক্ষতা অর্জনের জন্য আপনার ভেতরে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আছে কিনা। আপনার সামনে হয়তো লম্বা একটা রাস্তা রয়েছে।সে রাস্তার দৈর্ঘ্য দেখে আপনাকে ঘাবড়ে গেলে চলবে না। পথ চলতে শুরু করতে হবে। এক রাস্তা পাড়ি দেওয়ার পর পরবর্তী রাস্তায় রওনা দিতে হবে।মনে রাখতে হবে প্রথম টার্গেট সম্পূর্ণ না হলে পরবর্তী টার্গেটে যদি আপনি চলে যান তাহলে ঝামেলায় পড়বেন। সফলতা বলুন আর যোগ্যতা বলুন সবকিছুই ধীরে ধীরে অর্জিত হয়, একদিনে হয় না। বাড়ির পাশে ১০ তলা ফ্ল্যাটের দিকে একটু তাকান। এ ফ্ল্যাট কি একদিনে তৈরি হয়েছে? একদিনে তৈরি হওয়া সম্ভব? না, একদিনে তৈরি হয়নি বা একদিনে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। এ বিল্ডিং কিন্তু ধীরে ধীরে-কয়েক মাসে বা বছরে তৈরি হয়েছে। টাকা আর লোকজন থাকলে ইচ্ছে করলেও আপনি একদিনে এ দালান গড়ে তুলতে পারবেন না।দালানের দ্বিতীয় তলা করতে হলে প্রথম তলা এবং বেজমেন্ট আপনাকে করতেই হবে। নাহলে এ দালান হেলে পড়বে। দালানের বেসমেন্ট এবং পাঁচতলার কাজ একসাথে করতে গেলে আপনার জন্য বিপর্যয় অপেক্ষা. করছেl

টার্গেট বা লক্ষ্যকে কয়েকটি ছোট ছোট অংশে ভাগ করুন। একটি অংশ দখলে আনার পর পরবর্তী অংশের দিকে এগিয়ে যাবার ব্যাপারটা অনেকেই বুঝতে পারে না। তাদের কাছে মনে হয় ধারণা সঠিক নয়। তাদের কাছে এতো সময় ধরে অপেক্ষা করার ধৈর্য নেই। কিন্তু মনে রাখবেন পাঁচ তলায় আপনাকে উঠতে হলে বেজমেন্ট থেকে বাকি চার তলা অতিক্রম করতেই হবে। আর যদি লাফ দিয়ে উপরে উঠতে চান তাহলে মনে রাখবেন আপনার জন্য দুর্ঘটনা অপেক্ষা করছে।

যে কোন ভাল কিছু করতে গেলে আপনাকে ধৈর্যশীল হতে হবে। লটারি ছাড়া হঠাৎ করে আপনার কোটিপতি বনে যাবার সম্ভাবনা নেই। ধৈর্যের সাথে আপনাকে আশাবাদী থাকতে হবে। তাহলে সাফল্য আপনার হাতে এসে ধরা দেবে।

স্টক মার্কেটের গুরু ওয়ারেন বাফের ( Warren Buffet) মধ্যে সাফল্য হচ্ছে হচ্ছে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তার কাছে সাফল্য হঠাৎ করে এক দিনে আসেনি। বছরের পর বছর ধরে স্টক মার্কেটে ইনভেস্ট করে একদিন সাফল্য তার কাছে ধীরে ধীরে আসতে শুরু করে।

শুধুমাত্র টাকা বা সম্পদ তৈরীর ক্ষেত্রে ওয়ারেন বাফেট উদাহরণ আনা ঠিক হবে না। একই উদাহরণ আপনার/ আমার স্বাস্থ্য, যোগ্যতা বা সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।

আপনার পক্ষে হঠাৎ করে একদিনেই খুব সুস্থ সবল মানুষ হয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হলে আপনাকে খুব ধীরে ধীরে তা অর্জন করতে হবে। পুষ্টিকর খাবার দাবার ছাড়াও আপনাকে নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে, দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে হবে এবং বড় রোগ বালাই এর কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। এসব ব্যাপার হুট করে একসাথে ঘটা সম্ভব নয়। অনেক সপ্তাহ, মাস বা বছর ধরে তারা ধীরে ধীরে জমা হয়ে আপনাকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বানাবে।

ধারাবাহিক কাজ করার বা সফলতা অর্জনের প্রভাব আপনি আপনার জীবনে দেখতে চাইলে প্রথমে ছোট একটি কাজ দিয়ে শুরু করুন। এটি শেষ করুন। তারপর এর প্রভাব দেখুন।
---
ডাঃ আলী জাহান
মনোচিকিৎসক, যুক্তরাজ্য
[email protected]

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

NEZAM

২০২০-০৭-২৭ ১৮:৪২:২৯

ধন্যবাদ ভাই

Md islam

২০২০-০৭-২৭ ১৫:০০:৪৫

Excellent.

Almas hossain

২০২০-০৭-২৭ ২২:১৫:৩৩

Helpful any person who want success,Thanks to writer

Md.Razaul Haque

২০২০-০৭-২৭ ০৭:৪৫:৩৩

Very good suggestions. Thank You Sir.

Mojibur Rahman

২০২০-০৭-২৭ ০৭:০০:৪১

চমৎকার বলা,লেখক কে ধন্যবাদ ভাই

আপনার মতামত দিন

মত-মতান্তর অন্যান্য খবর

ড্রাইভার মালেকের বালাখানা

দরজা আছে, দরজা নেই

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

আ/ম/ব/য়া/ন

একটি স্বপ্নের চাকরি এবং...

২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

রাজনীতিতে কোরাসবাজি

২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

পিয়াজ কথন

ভারতের অনুতাপ এবং দোজখপুর

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

চীন-ভারত দ্বন্দ্বের নেপথ্যে

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

বয়াতির আসর আর রাজনীতির মঞ্চ

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

কথার কথা

সবাই চায় সুন্দর পাত্রী

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

পর্যবেক্ষণ

ব্যর্থ রাষ্ট্রের প্রক্রিয়া

২০ আগস্ট ২০২০



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত