করোনা রিপোর্ট নিয়ে সংশয় বাড়ছে চট্টগ্রামে

ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম থেকে

শেষের পাতা ২ জুলাই ২০২০, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:২২

নমুনাই দেয়া হয়নি। বলা হচ্ছে করোনা পজেটিভ। তাও আবার একজন সাংবাদিকের। যার মাধ্যমে এই দুঃসংবাদ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসের আগেই। ভাগ্যিস, ওই নমুনায় পরিচয় হিসেবে সাংবাদিক লেখা ছিল না। তা না হলে জেনে-শুনে এমন ভুল করতো না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আবার করোনা পজেটিভ রিপোর্ট পাওয়ার একদিন পর সন্দেহবশত দ্বিতীয়বার নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ রিপোর্ট পেলেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটের সমন্বয়ক ডাক্তার আব্দুর রব মাসুম। সেখানেও
পরিচয় হিসেবে লেখা ছিল না ডাক্তার শব্দটি।
থাকলে হয়তো এমন ভুল করতো না চট্টগ্রামের চিকিৎসার তীর্থস্থান এবং ডাক্তার তৈরির কারখানা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, একদিনে এক নামে দুই ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষা করায় তথ্য প্রকাশে ভুল হয়েছে।
তাছাড়া করোনা পজেটিভ রিপোর্টটিও অফিসিয়ালি ছিল না। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ল্যাব থেকে সেই রিপোর্ট মৌখিকভাবে জানানো হয়েছিল ডাক্তার আব্দুর রব মাসুমকে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক্তার আব্দুর রব মাসুমও সুর মিলালেন একই সুরে। কারণ চাকরি বলে কথা। আব্দুর রব বলেন, স্ত্রীর করোনা পজেটিভ হওয়ায় গত শুক্রবার করোনার নমুনা পরীক্ষা করান তিনি। এর একদিন পর শনিবার আন-অফিসিয়ালি মৌখিকভাবে রিপোর্টটি সংগ্রহ করা হয়। রিপোর্টে পজেটিভ আসায় সংশয় কাজ করে। তাই পরদিন রোববার বিআইটিআইডি ল্যাবে আবার নমুনা পরীক্ষা করাই। সোমবার রাতে সেই রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। চমেক ল্যাবের পজেটিভ রিপোর্ট আসা সমপর্কে তিনি বলেন, রিপোর্টটি আমি আন-অফিসিয়ালি সংগ্রহ করি। তাও মৌখিকভাবে। ওখানে একদিনে একই নামে দুই ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাই তাড়াহুড়ো করে বলতে গিয়ে ভুল করেছে। তবে যে যাই বলুক-কথায় আছে একটি মিথ্যা ঢাকতে ১০টি মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। সাংবাদিকের বেলায় পরিচয় হিসেবে সাংবাদিক লেখা না থাকতে পারে। অবস্থার প্রেক্ষাপটে গুণী সাংবাদিকরা এখন সেই পরিচয় দিয়ে চলেও না। কিন্তু ডাক্তারের বেলায় পরিচয় হিসেবে নামের আগে ডাক্তার লেখা থাকবে না- এটা কি বিশ্বাসযোগ্য। এমন প্রশ্ন চট্টগ্রামের সচেতন মহলের। যাদের অনেকে শুধু ডাক্তার আর সাংবাদিকের বিষয় নয়, করোনা পজেটিভ রিপোর্ট পাওয়ার পর অনেকে বিস্ময় হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। একের পর এক রিপোর্ট কাণ্ডে নমুনা রিপোর্ট নিয়ে এখন সংশয়ে পড়েছেন চট্টগ্রামের লোকজন। চট্টগ্রাম মহানগরীর নাসিরাবাদ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা আবু মনসুর জানান, করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শের কথা বলে গত ১৭ই মে আমার নমুনা নিয়ে যাই। দুইদিন পর বলা হয় আমি করোনা পজেটিভ। কিন্তু আমার কোনো উপসর্গ ছিল না। আমি কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শেও যায়নি। এ অবস্থায় করোনা পজেটিভ রিপোর্ট পেয়ে আমার মাঝে সংশয় তৈরি হয়। তারপরও নির্দেশমতো হোম আইসোলেশনে থাকি। এর পরবর্তী রিপোর্টে আমার করোনা নেগেটিভ আসে। অথচ আমি কোনো ওষুধ খাইনি। আমার কোনো সমস্যাও হয়নি। এটি কোন্‌ ধরনের করোনা রিপোর্ট। আর এ নিয়ে আমার বাড়ি ও আশেপাশের জনমনে করোনাভাইরাস এখন হাস্যকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চমেক হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, করোনা সংক্রমণ চট্টগ্রামে দিন দিন বাড়ছে। এর জন্য করোনা চিকিৎসায় নানা অব্যবস্থাপনাই দায়ী। শুধু হাসপাতালে অক্সিজেন নেই, আইসিইউ নেই, শয্যা কম, তা নয়। অব্যবস্থাপনার ছাপ নমুনা পরীক্ষায়ও স্পষ্ট। এরমধ্যে একজনের নমুনা রিপোর্ট আরেকজনকে বলা। নমুনা না দিয়েও রিপোর্ট পজেটিভ আসা। নমুনা পরীক্ষায় ফোন নাম্বার না লেখা, ঠিকানা না লেখা, নামের বিভ্রান্তিসহ নানা কারণে চট্টগ্রামে দুই হাজারেরও বেশি করোনা শনাক্ত রোগী এখন নিখোঁজ। যাদের হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ। সব মিলিয়ে নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট এখন হাস্যকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ডা. আব্দুর রবের পজেটিভ রিপোর্ট ডকুমেন্টেট কিছু না। একই দিন এক নামে দুজন ব্যক্তি পরীক্ষা করায় তথ্যগত ভুলে ডা. রবকে জানানো হয়েছিল রিপোর্ট পজেটিভ। অফিসিয়ালি জানানো হয়নি। পরদিন সকালে যাচাই-বাছাই করে চমেক ল্যাব থেকে আবার জানানো হয় ডা. রবের করোনা পজেটিভ ছিল না, রিপোর্ট নেগেটিভ। সন্দেহ দূর করতে তিনি পরদিন বিআইটিআইডিতে নমুনা পরীক্ষা করান। সেখানেও রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের একজন সাংবাদিক নমুনা না দিয়েও করোনা পজেটিভ রিপোর্ট পাওয়ার বিষয়টি ভুল হয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। অধিদপ্তরের নির্ধারিত ০১৭২৯০২৪৬১২ নাম্বার থেকে ওই সাংবাদিককে নিজের মোবাইল নাম্বারে করোনা পজেটিভের অফিসিয়াল এসএমএসটি দেয়া হয়। সেখানেও কোথাও মিসিং তো রয়েছেই। আর এ বিষয়গুলো প্রচার পাওয়ায় করোনা রিপোর্ট নিয়ে চট্টগ্রামের মানুষের মাঝে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ই জুন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পত্রিকা দৈনিক পূর্বদেশের স্টাফ রিপোর্টার এম এ হোসাইন নিজের মোবাইল নাম্বারে করোনা পজেটিভ রিপোর্টের এসএমএস পান। সেখানে বলা হয়, ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারে নমুনা দেন তিনি। আর একইদিন নমুনা পরীক্ষা করে করোনা পজেটিভ শনাক্ত হন। এ বিষয়ে এমএ হোসাইন নিজের ফেসবুক পেইজে লিখেন, কী আশ্চর্য্য, ১৭ই জুন ঢাকা নয় চট্টগ্রামেও নমুনা দেয়া হয়নি। এরপরও তাকে করোনা পজেটিভ উল্লেখ করে অফিসিয়াল এসএমএস পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এতে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, সব গাঁজাখুরি কাজ-কারবার দেখছি।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Titu Meer

২০২০-০৭-০১ ১৮:০৮:১৯

হায় ! এ আমরা কোন দেশে বসবাস করছি ! এরা তো দেখছি মৃতকে জীবিত আর জীবিতকে মৃত ঘোষণা করতেও দ্বিধা করবে না ৷

আপনার মতামত দিন

শেষের পাতা অন্যান্য খবর

সড়কে ঝরলো ২৩ প্রাণ

৯ আগস্ট ২০২০

আজ থেকে শুরু কলেজে ভর্তি কার্যক্রম

৯ আগস্ট ২০২০

আজ রোববার থেকে শুরু হচ্ছে একাদশ শ্রেণিতে অনলাইন ভর্তি কার্যক্রম।  ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম শুরু ...

একদিনে করোনায় আরো ৩২ জনের মৃত্যু শনাক্ত ২৬১১

৯ আগস্ট ২০২০

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে আরো ৩২ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে মৃত্যুর ...

দের স্পিগেলের প্রতিবেদন

বাংলাদেশে মাদকযুদ্ধে মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে

৮ আগস্ট ২০২০



শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত