করোনা : বাড়ছে মৃত্যুর কাফেলা

মানবজমিন ডেস্ক

শেষের পাতা ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪১

চীনে শনিবার একদিনে করোনায় মারা গেছেন ১৪৩ জন। এ নিয়ে সেখানে মারা গেলেন কমপক্ষে ১৬৬৫ জন। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৬৮০০০। এর মধ্যে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ২০০৯ জন। চীনের বাইরে প্রায় ৩০টি দেশে আক্রান্তের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০০। ফ্রান্স, হংকং, ফিলিপাইন ও জাপানে একজন করে মোট চার জন মারা গেছেন। ওদিকে চীনের দাবি, আক্রান্তের সংখ্যা আগের তুলনায় কমে এসেছে। সর্বশেষ ডাটা প্রকাশের আগে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমে গেছে।
এর অর্থ এই নয় যে, এই মহামারি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। আমরা সম্পূর্ণ প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণমূলক প্রচেষ্টা নিয়েছি। এসব প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ ব্যাপক। এমনটা করতে পারে এরকম আর কোনো দেশ দেখিনি। ওদিকে মুদ্রা বা ইয়েনের মাধ্যমে যাতে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য ব্যাংক নোটকে জীবাণুমুক্ত করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারা ব্যবহৃত ব্যাংক নোট জমা করছে। তারপর সেগুলো জীবাণুমুক্ত করে বিতরণ করছে। শনিবার ফরাসি কর্মকর্তারা বলেছেন,  ফ্রান্সে বেড়াতে যাওয়া এক চীনা পর্যটক মারা গেছেন। তার দেহে করোনা ভাইরাস পাওয়া গিয়েছিল। এটাই এশিয়ার বাইরে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, জাপানে ডায়মন্ড প্রিন্সেস জাহাজে আটকে পড়া ৪০০ মার্কিনিকে উদ্ধারে একটি বিমান পাঠানো হচ্ছে। আরেকটি ক্রুজ শিপ নোঙর করেছে কম্বোডিয়ায়। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ৮৩ বছর বয়সী একজন নারীকে মালয়েশিয়া নেয়ার পর পরীক্ষায় তার দেহে করোনা ভাইরাস পাওয়া গেছে। বৃটেনে ৯ জন আক্রান্ত হওয়ার পর তাদেরকে চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সিঙ্গাপুরে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৫ জন। এ নিয়ে সেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ৭২। এর মধ্যে আঠারো জন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
ওদিকে নাগরিকদের প্রতি নতুন নির্দেশনা দিয়েছে চীন। ছুটি শেষে যারা রাজধানী বেইজিংয়ে ফিরছেন তাদেরকে স্বেচ্ছায় কুয়ারেন্টাইন করতে অথবা সরকার পরিচালিত এ সংক্রান্ত সেন্টারে যেতে বলা হয়েছে। এর ব্যত্যয় হলে শাস্তি ভোগের কথা বলা হয়েছে। ওদিকে আফ্রিকার দেশ মিশরে প্রথম একজনের দেহে এই ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। চীনের বাইরে ২৪টি দেশে কমপক্ষে ৫০০ মানুষের দেহে শনাক্ত হয়েছে করোনা ভাইরাস। এর মধ্যে একজন করে মানুষ মারা গেছেন হংকং, ফিলিপাইন ও জাপানে। এ সপ্তাহান্তে এই ভাইরাস নিয়ে গবেষণা বা অনুসন্ধান শুরু করার কথা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বাধীন মিশনের। তারা জোর দেবেন কীভাবে এই ভাইরাসের বিস্তার হচ্ছে ও এর ভয়াবহতার বিষয়ে। এই মিশনে রয়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা। তাদের সংখ্যা ১২। তাদের সঙ্গে আরো রয়েছেন চীনের ১২ জন বিশেষজ্ঞ।

বৃটেনে ‘৪ লাখ মানুষ মারা যাওয়া অযৌক্তিক নয়’
করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ উদ্বেগ বাড়ছে বৃটেনে। একজন বিজ্ঞানী সতর্ক করেছেন করোনা ভাইরাসে (কভিড-১৯) বৃটেনে মারা যেতে পারেন ৪ লাখ মানুষ। এ বিষয়ে পূর্বাভাসকে অযৌক্তিক বলে মনে করেন না বৃটিশ বিজ্ঞানী প্রফেসর নিল ফারগুসন। তিনি ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের স্কুল অব পাবলিক হেলথে কর্মরত। প্রফেসর ফারগুসন বলেছেন, এই ভাইরাসটি নিয়ে আমি খুব আতঙ্কিত। যতগুলো কিলার ভাইরাস আছে তার মধ্যে এটি অন্যতম। ওদিকে লেবার দলের দু’জন এমপি নিজেদেরকে কুয়ারেন্টাইন করে রেখেছেন। তারা বাতিল করেছেন পরবর্তী ইভেন্টগুলো। করোনা আতঙ্কে হিথ্রো বিমানবন্দরে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে সারা বৃটেনে ক্রমাগত উদ্বেগ বাড়ছে। তবে বৃটেনে যে ৪ লাখ মানুষ এতে মারা যাবেনই এমন পূর্বাভাস দিচ্ছেন না প্রফেসর ফারগুসন। তবে তিনি সতর্ক করছেন এই সংখ্যা অসম্ভব কিছু না। অনলাইন ডেইলি মেইল এ খবর দিয়ে বলছে, গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, বৃটেনের শতকরা ৬০ ভাগ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। প্রফেসর ফারগুসনের মতে, আমাদের এখনকার হিসাব বলছে, আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা এক ভাগ মানুষ মারা যেতে পারেন।

তিনি এই হিসাব এমন এক সময়ে প্রকাশ করলেন যখন বৃটিশ সরকার এটা নিয়ে কাজ করছে এবং আন্দাজ করছে যে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন বৃটেনের অর্ধেক মানুষ। তা কয়েক মাসের মধ্যে বৃটেনের প্রতিটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে হাসপাতালগুলো হিমশিম খেতে পারে। কারণ, তখন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে চিকিৎসার ক্ষেত্রে কাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে তা নির্ধারণ হয়ে পড়বে অনেক কঠিন। শনিবার দিবাগত রাতে প্রফেসর ফারগুসনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এতে কি ৪ লাখ মানুষ মারা যাবেন? তিনি জবাবে বলেন, জোর সম্ভাবনা আছে। কীভাবে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে সে সম্পর্কে আমরা জানি। আমরা আরো জানি বিগত দিনের মহামারিগুলোর ডাটা সম্পর্কে। এ ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রায় সবাই আক্রান্ত হতে পারেন। তবে এটা শিশুদের ক্ষেত্রে কিছু কম হতে পারে। ফলে শতকরা ৬০ ভাগ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। আগামী এক বছর বা এমন সময়ের জন্য আমরা যেটা জানি না তা হলো, যদি সবাই আক্রান্ত হয় তাহলে কি হবে। তখন কি অনুপাতে মানুষ মারা যাবেন তাও জানি না। আমাদের এখনকার হিসাব বলছে, আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা এক ভাগ মারা যেতে পারেন।

এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে এই ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ১৬৬৫। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৬৮ হাজার। ওদিকে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে চেকিংয়ে এবং বিভিন্ন আনুষঙ্গিক কারণে প্রতিদিন বিলম্ব হওয়ার কারণে ক্রমশ উদ্বেগ বাড়ছে। শুক্রবার সেখানে কয়েক ঘণ্টার এক দুর্ভোগের শিকারে পরিণত হন যাত্রীরা। কারণ, এদিন ওই সময়ে কমপক্ষে ৮টি বিমানকে করোনা ভাইরাস আতঙ্কে উড্ডয়ন করতে দেয়া হয়নি। মেইল অনলাইন জানতে পেরেছে যে, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে যাওয়া বৃটিশ এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটকে সেখানে টারমার্কে দু’ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। বিমানটি স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে অবতরণ করে। সম্প্রতি ওয়েস্টমিনস্টারে একটি বাস কনফারেন্সে যোগ দেন বৃটিশ দু’এমপি। তারা এখন নিজেদের নিজেরাই কুয়ারেন্টাইন করে রেখেছেন। কারণ, ওই কনফারেন্সে যোগ দিয়েছিলেন বৃটেনে করোনা আক্রান্ত ৯ জন রোগীর একজন। ওই দু’জন এমপি হলেন লেবার দলের লিলিয়ান গ্রিনউড এবং অ্যালেক্স সোবেল। তারা দু’জনেই নিজেদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছেন টুইটারে। বলেছেন, আসন্ন ইভেন্টগুলো পূর্ব সতর্কতা হিসেবে তারা বাতিল করেছেন। উল্লেখ্য, বৃটিশ পার্লামেন্ট থেকে মাত্র কয়েক স্টোন দূরে কিউইআইআই সেন্টারে ৬ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ওই বাস কনফারেন্স। এতে তারকা বক্তার মধ্যে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বাস বিষয়ক মন্ত্রী নোরবিটনের ব্যারোনেস ভেরে। 
 
চীন থেকে ভারতের আমদানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা
করোনা ভাইরাসের কারণে ভারতের আমদানির শতকরা ২৮ ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চীন থেকে দেশটির অবকাঠামো নির্মাণ, অটো শিল্প, রাসায়নিক ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের সরঞ্জাম আমদানি করা হয়। বলা হয়, চীনের এসব সরঞ্জামের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল ভারত। কিন্তু করোনা ভাইরাস বা কভিড-১৯ সংক্রমণের কারণে এই সরবরাহ চেইন বড় রকমের ঝুঁকিতে পড়েছে। শুধু ভারতেই এই সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন নয়, একই অবস্থা হতে পারে বিশ্বজুড়ে। ইলেকট্রিক মেশিনারি, মেশিনারি ও মেকানিক্যাল সরঞ্জাম, জৈব রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও অপটিক্যাল, অপারেশনের সরঞ্জাম- এই পাঁচটি বিষয়ে চীনের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল ভারত। ভারত সারা বিশ্ব থেকে যে পরিমাণ আমদানি করে তার মধ্যে এর শতকরা পরিমাণ প্রায় ২৮ ভাগ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে চীনে ভারত রপ্তানি করে শতকরা মাত্র ৫ ভাগ। ফলে এতে ভারতের রপ্তানি খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া।  

ভারত ২০১৮ সালে মোট আমদানি করেছিল ৫০৭০০ কোটি ডলারের পণ্য। তার মধ্যে চীন থেকে আমদানি করা হয়েছিল প্রায় ৭৩০০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ মোট আমদানির শতকরা প্রায় ১৪ ভাগ এসেছিল চীন থেকে।  করোনা ভাইরাসের কারণে চীনের কলকারখানা ও শিল্প ১৭ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ থাকতে পারে। এর ফলে উৎপাদন লাইনে দেখা দিতে পারে ঘাটতি। জৈব রাসায়নিক আমদানির ক্ষেত্রে চীন থেকে ভারত আমদানি করে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুরও বিভিন্ন মাত্রায় নির্ভর করে চীনের ওপর। চীন থেকে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ আমদানি করে ভারত।

আপনার মতামত দিন



শেষের পাতা অন্যান্য খবর

বড় সংকটে শ্রমবাজার

২৭ মার্চ ২০২০

করোনা ভাইরাস নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল

দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে সংক্রমণ

২৭ মার্চ ২০২০

আতঙ্কের জনপদ নিউ ইয়র্ক

আরো চার বাংলাদেশির মৃত্যু

২৬ মার্চ ২০২০



শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত