রংধনু সিএনজি স্টেশনে ৪৮ কোটি টাকার গ্যাস চুরি, নিশ্চুপ তিতাস

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ থেকে

শেষের পাতা ২৪ জানুয়ারি ২০২০, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪৮

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বালুয়াকান্দি এলাকায় রংধনু সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনে গ্যাস চুরির মহোৎসব চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এতে সরকার রাজস্ব হারালেও পকেট ভারী হচ্ছে তিতাসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার। অভিনব পদ্ধতিতে গ্যাস চুরির রহস্য উদ্‌ঘাটন করে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীতে অবস্থিত র‌্যাব-১১ এর সদর দপ্তরের একটি টিম। পরে ওই সিএনজি স্টেশনের ইঞ্জিনিয়ারসহ ৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড, ১ লাখ টাকা জরিমানা ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মোবাইল টিম। কিন্তু অভিযানের ৪০ দিন অতিবাহিত হলেও রহস্যজনকভাবে তিতাস গ্যাস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি রংধনু সিএনজি স্টেশনের বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং উল্টো নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেয়ার পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে তিতাসের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া রংধনু সিএনজি স্টেশন সড়ক ও জনপথ বিভাগের ২২ শতাংশ ভূমি লিজ নিয়ে পাম্পের প্রবেশ পথ হিসেবে ব্যবহার করলেও ২০১১ সালে ইজারার মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু নবায়ন না করেই ভূমি ব্যবহার করছে।
এতে সওজের ৭৫ লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে রংধনু সিএনজি স্টেশনের কাছে।

র‌্যাব-১১’র তথ্যমতে, রংধনু সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনের ইঞ্জিনিয়ার অঞ্জন কুমার এবং মালিক জাহিদ হাসান ও মুকুল গং পরস্পর যোগসাজশে তিতাস গ্যাস কোম্পানির প্রদত্ত মিটারের অগ্রভাগে বিশেষ ছিদ্র করে লোহার সরু তার প্রবেশ করে মিটারের পাখার গতিকে স্লো করে দিয়ে অভিনব কৌশলে গ্যাস চুরি করে আসছে। এ ভাবে প্রায় ৪ বছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি তিতাসের গ্যাস চুরি করে বিভিন্ন পরিবহন ও কোম্পানির কাছে অবৈধভাবে গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি কাভার্ডভ্যানের মাধ্যমে গ্যাস বিক্রি করে আসছে তারা। এরমধ্যে বিআরটিসি ও অন্যান্য অনেক কোম্পানির পরিবহনে মাসিক চুক্তিতে লাখ লাখ টাকার চোরাই গ্যাস বিক্রি করে আসছে। রংধনু সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনের কয়েক মাসের বিল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তিতাস গ্যাস কোম্পানিকে মাসিক গড় বিল দেয় মাত্র ৭০ লাখ টাকা। কিন্তু নভেম্বর মাসে শুধু সিপি বাংলা নামক একটি কোম্পানিতে সিলিন্ডার ভর্তি কাভার্ডভ্যানে গ্যাস বিক্রি করে ৭৯ লাখ টাকার। এ ছাড়াও ২৪ ঘণ্টা বিভিন্ন পরিবহনে গ্যাস বিক্রি করে আসছে। এভাবে রংধনু সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশন মাসে কোটি টাকার অধিক গ্যাস চুরি করে আসছে। সেই হিসাবে বিগত ৪ বছর ধরে প্রায় ৪৮ কোটি টাকার গ্যাস চুরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

র‌্যাব-১১’র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী পিপিএম জানান, এই জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১২ই ডিসেম্বর রাতে অভিযান চালিয়ে পাম্পের ৪ জনকে আটক করা হয়। পরে বাংলাদেশ গ্যাস আইন-২০১০ এর ১০ (ক) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে রংধনু সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনের ইঞ্জিনিয়ার অঞ্জন কুমারকে ২ মাস, ম্যানেজার মো. মানিককে ১ মাস, কর্মচারী মো. রাসেলকে ১ মাস এবং কর্মচারী শহিদুল ইসলামকে ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয় এবং রংধনু সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এবং তিতাস গ্যাস কোম্পানি তাদের প্রদত্ত মিটার খুলে নেয় ও ফিলিং স্টেশনের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়।
এদিকে ৪৮ কোটি টাকার এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ ‘গ্যাস’ চুরির পরও তিতাস কর্তৃপক্ষ গত ৪০ দিনেও রংধনু সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো তিতাসের অসাধু কর্মকর্তারা পাম্পটিতে পুনঃসংযোগ দেয়ার পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রংধনু সিএনজি ফিলিং স্টেশনের কয়েকজন অংশীদার থাকলেও পাম্পের অন্যতম পরিচালক সোনারগাঁর মোতাহার মাসুম সিকদার। ২০১৮ সালের আগস্টে গ্যাস চুরির দায়ে তিতাস এই পাম্পের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মিটার খুলে নিয়ে যায়। এরপর আবারো সেখানে সংযোগ দেয়া হয়।

ওদিকে পাম্পটি সড়ক ও জনপথের প্রায় ২২ শতাংশ ভূমি প্রবেশ পথ হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০১১ সালে ইজারার মেয়াদ শেষ হলেও নবায়ন ছাড়াই ভূমি ব্যবহার করছে তারা। এতে সওজ’র প্রায় ৭৫ লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে রংধনু সিএনজি ফিলিং স্টেশনটির কাছে।

এ বিষয়ে মোতাহার মাসুম সিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, র‌্যাবের দাবি করা ৪৮ কোটি টাকার গ্যাস চুরির বিষয়টি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। তিতাস তদন্ত করেছে। মিটার টেম্পারিং করে গ্যাস চুরির সত্যতা তিতাস পায়নি। শিগগিরই এর প্রমাণ আপনাদের দেয়া হবে। আশা করছি, আবার গ্যাসের সংযোগও পাবো। এবং সওজ’র ভূমির ইজারা নবায়নের জন্য আবেদন করেছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সোনারগাঁর জোনাল অফিসের ব্যবস্থাপক জাফরুল আলম সাংবাদিকদের জানান, রংধনু সিএনজি ফিলিং স্টেশনের গ্যাস সংযোগ আমরা বিচ্ছিন্ন করেছি। প্রতিষ্ঠানটি পুনঃসংযোগের জন্য আবেদন করেছেন। যেহেতু অসাধু গ্রাহক সেই কারণে আবেদনের বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখছি না।

র‌্যাবের দাবি করা ৪৮ কোটি টাকা গ্যাস চুরির বিষয়ে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে জাফরুল আলম বলেন, আমরা এখনো নেইনি। গ্যাস আইন-২০১৪ অনুযায়ী আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। সে অনুযায়ী সর্বশেষ তিন মাসে গ্রাহকের যে পরিমাণ বিল এসেছে তার গড় করে সে যদি বেশি ব্যবহার করে থাকে তাহলে তার ভিত্তিতে আমরা প্যানাল্টি নির্ধারণ করবো। তারপর সেটি যদি বোর্ড সভায় অনুমোদন হয় এবং বোর্ড যদি মনে করে গ্রাহককে পুনঃসংযোগ দেয়া যেতে পারে তাহলে সে (রংধনু সিএনজি) পাবে। তবে সে প্রক্রিয়া এখনো আমরা শুরু করিনি। এর আগে ২০১৮ সালে রংধনু সিএনজি ফিলিং স্টেশনের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল কিনা তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা  তার জানা নেই।

উল্লেখ্য, গ্যাস বিপণন নিয়মাবলী-২০১৪ এর ৮.২ (ক) অনুযায়ী উক্ত অপরাধের জন্য গ্রাহকের সংযোগ স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্নকরণের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া গ্যাস আইন-২০১০ এর ধারা ১০-এর উপ-ধারা-১ অনুযায়ী অপরাধ করলে গ্রাহককে অনধিক ১ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। কিন্তু রংধনু সিএনজি ফিলিং স্টেশনের চারজন কর্মচারীকে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হলেও মালিকদের কেউ শাস্তির আওতায় আসেনি।

আপনার মতামত দিন



শেষের পাতা অন্যান্য খবর

নাঈমে শেষ বিকালে স্বস্তি

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

কলকাতার ডায়েরি

কলকাতায় চলবে লন্ডনের মতো ছাদ খোলা দোতলা বাস

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০



শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত



বৃটিশ বিজ্ঞানীর দাবি

আসছে করোনা ভাইরাসের টিকা

একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

ইতিহাস কেউ মুছে ফেলতে পারে না