যে কারণে তাপস-আতিককে বেছে নিলো আওয়ামী লীগ

স্টাফ রিপোর্টার

ঢাকা সিটি নির্বাচন- ২০২০ ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:৫০

ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে চমক দেখালো আওয়ামী লীগ। দক্ষিণ সিটিতে বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকনকে বাদ দিয়ে তিন বারের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। উত্তরে বর্তমান  মেয়র আতিকুল ইসলাম আতিকের ওপরই আস্থা রেখেছে ক্ষমতাসীন দল। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দুই সিটিতে কে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হচ্ছেন এ নিয়ে আলোচনা ছিল। দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন আবার মনোনয়ন পাবেন এমনটাও আলোচনা ছিল। কিন্তু কি কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত বাদ পড়লেন এমন জিজ্ঞাসা এখন মুখে মুখে। দলীয় সূত্র বলছে, দায়িত্ব পালনকালে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে সফলতা দেখাতে পারেননি সাঈদ খোকন। এছাড়া গত মওসুমে ডেঙ্গু অনেকটা মহামারি আকার ধারণ করেছিল।
এর পেছনে সিটি করপোরেশনকে দায়ী করেন অনেকে। এছাড়া সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ জমা হয়েছিল দলীয় হাইকমান্ডের কাছে। দলীয় প্রার্থী ঠিক করার আগে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এসব রিপোর্টেও সাঈদ খোকনের বিষয়ে নেতিবাচক তথ্য আসে। এ কারণে এ সিটিতে নতুন ও ক্লিন ইমেজের প্রার্থী দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

অন্যদিকে
উত্তর সিটিতে গত এক বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা আতিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বড় কোন অভিযোগ নেই। সিটি করপোরেশন নিয়ে তিনি বেশ কিছু পরিকল্পনা করেছেন। যার কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে। আবার কিছু বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। তাকে নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদেরও তেমন কোন আপত্তি নেই। এছাড়া ব্যবসায়ী মহলেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এ কারণে এ সিটিতে বিকল্প চিন্তা করা হয়নি। অন্যদিকে কাউন্সিলর পদে বেশিরভাগ পুরনোরা বাদ পড়েছেন। দলের নেতারা জানান, ক্যাসিনো কান্ডের ঢেউ লেগেছে প্রার্থী বাছাইয়ে। প্রার্থীদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিতর্কিতদের বাদ দেয়া হয়েছে। নতুন যাদেরকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তারা পরীক্ষিত। গতকাল ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ সময় তিনি দুই সিটি করপোরেশনের দুই মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন। পাশাপাশি ঢাকা উত্তরে ৫৪ এবং দক্ষিণে ৭৫ সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে সমর্থিতদের নামও ঘোষণা করেন। সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের নাম আজ ঘোষণা করা হবে বলে তিনি জানান। মনোনীত প্রার্থীদের নাম ঘোষণার আগে সমর্থকদের নিয়ে ধানমন্ডিতে দলের সভাপতির কার্যালয়ে উপস্থিত হন আতিকুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস। সভাপতিমন্ডলীর কক্ষে গিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বসেন তারা। মেয়র পদে মনোনীতদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা শেষে সাঈদ খোকনের বাদ পড়া নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি এতকিছু বলতে পারবো না। আমি শুধু এটুকু বলবো যারা মনোনয়ন বোর্ডে ছিলেন, তারা প্রার্থীদের জনপ্রিয়তার বিষয়টি দেখেছেন। গ্রহণযোগ্যতার দিকটি বিবেচনায় নিয়েছেন। সবার সম্মতিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা মনোনয়ন দিয়েছেন। এটা নিয়ে বাড়তি কিছু বলার নেই। নির্বাচনে ভোটাররা তাদেরকে মূল্যায়ন করবে আমি বা আপনি নই ।

নাম ঘোষণা শেষে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় ফজলে নূর তাপস নির্বাচিত হলে পুরান ঢাকার রূপ প্রস্ফুটিত করতে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করবেন বলে জানান। তিনি বলেন, জনগণ যদি আমাকে নির্বাচিত করে, তবে বৃহত্তর পরিসরে পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে স্বমহিমায় প্রস্ফুটিত করবো। রাজধানীতে যারা অবহেলিত, তাদের সব ধরনের নাগরিক সুবিধা দেয়া হবে। ইনশাআল্লাহ নির্বাচিত হতে পারলে ত্রিশ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে ২০৪১-এর স্বপ্ন সফল করবো। ফজলে নূর তাপস বলেন, যারা দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন, তাদের ধন্যবাদ জানাই। ঢাকা ১০ আসনের আপামর জনগণকে কৃতজ্ঞতা জানাই। যারা সবসময় অনেক ভালোবাসা দিয়ে আলিঙ্গন করে আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। এলাকার মানুষ যেমন ভালো বেসেছেন, আস্থা রেখেছেন তেমনি দক্ষিণের সব জনগণ আস্থা রাখবেন বলে আমি আশা করি। আওয়ামী লীগের এই মেয়র প্রার্থী বলেন, আগেও সংবাদমাধ্যমে বলেছি, আমি উপলব্ধি করেছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে উন্নত বাংলাদেশের জন্য নিরলস কাজ করে চলেছেন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য দিয়েছেন, এর জন্য উন্নত রাজধানী প্রয়োজন। আমি এই সুযোগটা গ্রহণ করতে চেয়েছি। নাগরিকসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ায় উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হককে স্মরণ করেন ফজলে নূর তাপস। তার কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন বলেও জানান। তিনি বলেন, আমি পূর্ণ সময় দক্ষিণের জনগণের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে কাজ করে যাবো। অনেকের মনে ক্ষোভ থাকতে পারে মনোনয়ন না পাওয়ায়।

দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ যাবেন না। সবার সহযোগিতা কামনা করি। এদিকে প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণার দুই ঘন্টার মধ্যে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন শেখ ফজলে নূর তাপস। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর দপ্তর থেকে জানানো হয়, বেলা দেড়টার দিকে শেখ ফজলে নূর তাপস স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ইতোমধ্যে তা গ্রহণ করা হয়েছে। যে কোনও সময় তার আসন শূন্য ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করা হবে। সিটি করপোরেশন আইন অনুযায়ী,ফজলে নূর তাপসকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিতে হলে সংসদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে। ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনির ছোট ছেলে। তিন মেয়াদ ধরে ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করে আসা তাপস বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদেরও নেতৃত্বে আছেন। তার বড় ভাই শেখ ফজলে শামস গত নভেম্বরে যুবলীগের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এদিকে ফজলে নূর তাপসের মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আনন্দ মিছিল বের করা হয়। ধানমন্ডিতে বিশাল মিছিল করেন তার সমর্থকরা। এছাড়া তাকে মনোনয়ন দেয়া দলীয় সভানেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন রাজধানীর ফুলবাড়িয়া সিটি প্লাজা মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। এ উপলক্ষে গতকাল বিকেলে সিটি প্লাজা মার্কেটের পক্ষ থেকে মিষ্টি বিতরণ করেছেন তারা।

প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন,আমি বাই ইলেকশনে এসেছি। জনগণ ভোট দিয়েছে বলেই দল আবারও মনোনয়ন দিয়েছে। ৯ মাসে যে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি সবাই জানেন। একদিনও সময় নষ্ট করিনি। আতিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকা উত্তরের আগামী নির্বাচনে সবার সহযোগিতা চাই। সবাই মিলে যেন ঢাকাকে গড়ে তুলতে পারি। চ্যালেঞ্জগুলো একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। দক্ষিণের মনোনয়ন পাওয়ায় তাপসকে ধন্যবাদ জানাই। আশা করি, সবাই মিলে সুন্দর ঢাকা উপহার দিতে পারবো। এ সময় মেয়র পদে মনোনয়ন পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি। এছাড়া ধন্যবাদ জানান, আওয়ামী লীগের স্থানীয় গভর্নমেন্টের মনোনয়ন বোর্ডের সব সদস্য ও অঙ্গসংগঠনকে। কৃতজ্ঞতা জানান জাতির জনকের প্রতিও। আনিসুল হকের মৃত্যুর পর চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে উপ নির্বাচনে জিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্বে আসেন আতিকুল ইসলাম। তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সাবেক এই সভাপতি আতিক এর আগে ব্যবসায়ী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।

আপনার মতামত দিন



ঢাকা সিটি নির্বাচন- ২০২০ অন্যান্য খবর



ঢাকা সিটি নির্বাচন- ২০২০ সর্বাধিক পঠিত