শুধু উৎপাদনশীল খাতে সুদ হার এক অঙ্কে নামানোর চিন্তা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

শেষের পাতা ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:২৮

শুধু উৎপাদনশীল খাতের জন্য নেয়া ঋণের সুদহার এক অঙ্ক বা সিঙ্গেল ডিজিটে নামানোর চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ৯ শতাংশ হতে পারে। সুদহারের সীমা বেঁধে দেয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক গঠিত কমিটি এই সুপারিশ করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল  ইসলাম বলেন, মূল টার্গেট হলো সুদহারের সীমা সিঙ্গেল ডিজিট বা এক অঙ্ক। আর সেটা নিয়েই কাজ করা হচ্ছে। প্রতিবেদন জমা দেয়া হলে তখন পুরো বিষয়টা জানা যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সূত্রমতে, শুধু উৎপাদনশীল খাতে এক অঙ্ক সুদহারের সীমা বেঁধে দেয়ার সুপারিশের মধ্যে বৃহৎ শিল্পে মেয়াদি ঋণ (চলতি মূলধন বাদে) এবং এসএমইর উৎপাদনশীল কার্যক্রমের জন্য নেয়া ঋণে এ সুবিধা পেতে পারে। তবে সুদহারের সীমা আরোপের ফলে ব্যাংকগুলো যাতে এক্ষেত্রে ঋণ বিতরণে যেন নিরুৎসাহিত না হয় সে জন্য বিশেষ তদারকি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এসব সুপারিশ অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন আকারে জমা দেবে কমিটি।
এর আগে শিল্পঋণে সুদহারের সীমা বেঁধে দেয়ার লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের নির্দেশে গত ১লা ডিসেম্বর কমিটি গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামানকে প্রধান করে বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিদের নিয়ে গঠিত ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন হয়। কমিটি গঠনের পর সব ব্যাংকে চিঠি দিয়ে শিল্পঋণের সুদহার ও ঋণের পরিমাণ জানতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কুটির, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পে কোন ব্যাংকের কত ঋণ রয়েছে এবং খাতভিত্তিক ঋণের সুদহারের তথ্য নেয় কমিটি। তথ্য পর্যালোচনার পর শুধু উৎপাদনশীল খাতে এক অঙ্কে সুদহারের সীমা বেঁধে দেয়ার পক্ষে একমত হয় বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্প তথা সিএমএসএমই খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণস্থিতি ২ লাখ ৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ রয়েছে ৭৯ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। ব্যবসা তথা ট্রেডিংয়ে রয়েছে ৮৫ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা। সেবা খাতের আওতায় রয়েছে ৪০ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা। শিল্পঋণের ক্ষেত্রে গত জুন পর্যন্ত শিল্প খাতে মোট ঋণ ছিল ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি মূলধন ঋণ ছিল ৩ লাখ ১৯ হাজার ৭ কোটি টাকা। উৎপাদনশীল হিসেবে বিবেচিত মেয়াদি ঋণ রয়েছে ৮০ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর মোট শিল্পঋণের মাত্র ২০.২২ শতাংশ মেয়াদি ঋণ। বাকি ৭৯.৭৮ শতাংশ চলতি মূলধন। সরকারি খাতের ব্যাংকগুলো সব ধরনের শিল্পঋণ বিতরণ করছে ৯ শতাংশ সুদে। বেসরকারি খাতের অধিকাংশ ব্যাংক ৯ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শিল্প খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মেয়াদি ঋণ উৎপাদনশীল খাত হিসেবে বিবেচিত হয়। দৈনন্দিন ব্যবসা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন নামে চলতি মূলধন ঋণ নেন উদ্যোক্তারা। এসএমই খাতের উদ্যোক্তারা সেবা ও ট্রেডিং খাতের আওতায় চলতি মূলধন ঋণ নিয়ে থাকেন। বড় শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা সরাসরি চলতি মূলধন বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ঋণ নেন। ফলে শুধু উৎপাদনশীল খাতে এক অঙ্ক সুদহার বেঁধে দেয়া হলে ব্যাংকের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছে কমিটি।
কমিটির একজন সদস্য বলেন, মুক্তবাজার অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এমন কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে না যাতে ব্যাংকগুলোকে লোকসানে পড়তে হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে নজর রাখতে হবে, উচ্চ সুদের কারণে উদ্যোক্তারা যাতে নিরুৎসাহিত না হন। দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করে শুধু উৎপাদনশীল খাতে এক অঙ্ক সুদ কার্যকরের সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশে এক সময় নিয়ন্ত্রিত সুদহার ব্যবস্থা চালু ছিল। তবে মুক্তবাজার অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ১৯৮৯ সালে সুদহার নির্ধারণের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। অবশ্য বৈশ্বিক মন্দা-পরবর্তী ২০০৯ সালে কিছু ক্ষেত্রে সুদহারের সীমা আরোপ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মন্দা-পরবর্তী ২০১১ সালের মার্চে প্রি-শিপমেন্ট রপ্তানি ঋণে ৭ শতাংশ, কৃষি ও মেয়াদি শিল্পঋণে ১৩ শতাংশ এবং চাল, গম, ভোজ্যতেল, ডাল, ছোলা, পিয়াজ, খেজুর ও চিনি আমদানি অর্থায়নে সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ১২ শতাংশ রেখে বাকি সব খাতে সুদহারের ঊর্ধ্বসীমা তুলে নেয়া হয়। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে এক নির্দেশনার মাধ্যমে প্রি-শিপমেন্ট রপ্তানি ঋণ ও কৃষি ছাড়া অন্য সব খাতে সুদহারের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেয়া হয়। বর্তমানে প্রি-শিপমেন্ট রপ্তানিতে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ ও কৃষি ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ নিতে পারে ব্যাংকগুলো। অন্য সব খাতে নিজেদের মতো করে সুদ নিতে পারে। ২০১৬ ও ও ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অধিকাংশ খাতে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দিচ্ছিল ব্যাংকগুলো। তবে পরে তারল্য সংকটের কারণে সুদহার বেড়ে অনেক শিল্প ঋণে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। সরকারের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি হিসেবে গত বছরের জুলাই থেকে এক অঙ্ক সুদহার নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে ব্যাংকগুলো। কিন্তু তারপরও সুদহার এক অঙ্কে নামেনি। এর পর গত ১লা ডিসেম্বর আবারও দেশের সব ব্যাংক মালিক ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার শেষে সুদহার কমানো জন্য একটি কমিটি গঠনের নিদের্শ দেন অর্থমন্ত্রী। সেই কমিটি শুধু উৎপাদনশীল খাতের জন্য নেয়া ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার সুপারিশ করছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Hossain

২০১৯-১২-১৫ ১৭:৪৬:২৭

ব্যাংকের পরিচালকরা বেনামে এবং নিজেদের অফিস স্টাফদের নামে ঋন নেওয়া বন্ধ না হলে এই রেট কমানো সম্ভব হবেনা। কারণ এই ঋনের টাকা ফেরত আসবেনা।

আপনার মতামত দিন

শেষের পাতা অন্যান্য খবর

আতিকের ইশতেহার আজ থাকছে চমক

২৬ জানুয়ারি ২০২০

৩০ বছরের পরিকল্পনা তাপসের

২৬ জানুয়ারি ২০২০

সুজনের সংবাদ সম্মেলনে তথ্য

সিটি নির্বাচনে ব্যবসায়ী বেড়েছে

২৬ জানুয়ারি ২০২০

এবারের হারটা আরো বাজে

২৬ জানুয়ারি ২০২০

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক

আইসিজে’র রায় মিয়ানমারের মিত্র দেশগুলোর অবস্থান পরিবর্তনে প্রভাব ফেলবে

২৬ জানুয়ারি ২০২০





শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত



পাথর লুটে অঢেল সম্পদ

শ্রমিক হত্যায় গ্রেপ্তার আইয়ুব