মলিন চাদর ব্যবসা

অনলাইন

জয়নাল আবেদীন জয়, রূপগঞ্জ থেকে | ১২ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার, ৪:২৯ | সর্বশেষ আপডেট: ৪:৩৮
একদা শীত মানেই একটি চাদর মুড়ে জবুথবু হয়ে থাকা ছিল গ্রাম বাংলার চিরচেনা দৃশ্য। কিছুদিন পূর্বেও শীতে বিলাসী বস্ত্রের তালিকায় গ্রাম থেকে শহুরে বাবুদের অঙ্গজুড়ে লেপ্টে থাকতো বাহারী ডিজাইনের চাদর। কিন্ত হালের ফ্যাশনে কোর্ট, ব্লেজার, জ্যাকেট, সোয়েটারদের দাপটে চাদর শিল্প কোনঠাসা হয়ে পরলেও দেশের উত্তরাঞ্চলসহ কম উন্নত জেলাগুলোতে কমবেশী চাদরের প্রচলন চলছিলো। চাদর ব্যবহারকারীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে কাশ্মিরী চাদর হলেও দেশীয় চাদরের মাঝে সবচেয়ে বেশী শীতের চাদর তৈরী করে থাকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চন এলাকায়।

ভারতীয় চাদরের তুলনায় স্বল্পদাম, গুণগত মান আর ব্যতিক্রম নকশার কারনে কাঞ্চনের চাদরের চাহিদাও ছিলো অধিক। কিন্ত বিগত কয়েকবছর যাবত শীতের প্রভাব না পড়ায় ও অসাধু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভারত থেকে আমদানী করা চাদর দেশের বাজার দখল করায় দেশীয় চাদরের চাহিদা একেবারেনই নেই বললেই চলে। এতে করে চরম হতাশা ও উৎকন্ঠায় দিন কাটছে চাদর ব্যবসায়ীদের। বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় শতাধিক চাদর উৎপাদনকারী পাওয়ারলুম কারখানা।
বেকার হয়ে পড়েছে কমপক্ষে ৫ হাজার শ্রমিক।


সরজমিনে ঘুরে জানা যায়, স্বাধীনতার পরপর কাঞ্চন এলাকার মৃত মিছির আলী ভূইয়া প্রথম জাপান থেকে হ্যান্ড লুম মেশিন আমদানী করেন। তিনি প্রথম পলিষ্টার সুতা দিয়ে পাতলা চাদর উৎপাদন শুরু করেন। তখন দেশজুড়ে পলিষ্টার চাদরের কদর শুরু হওয়ায় একই এলাকার গোলজার হোসেন মোল্লা, হাজী রফিজউদ্দিন ভূইয়া, হাজী সাইজদ্দিন, মোঃ চানঁ মিয়া, আলফাজদ্দিন, হাজী আব্দুল বারেক মিয়াসহ অনেকেই হ্যান্ড লুম আমদানী করে চাদরের কারখানা গড়ে তুলেন। ১৯৮৩ সালে এলাকায় বিদ্যুৎ চলে আসলে তারা সবাই চাদর তৈরীর জন্য বৈদ্যুতিক পাওয়ারলুম স্থাপন শুরু করেন। তারা তখন শিয়াল কোর্ট ও এনডি নামক চাদর উৎপাদন করে দেশে শিয়াল কোর্ট ও এনডি চাদরের বিশাল বাজার তৈরী করেন। এভাবে অবহেলিত কাঞ্চন হয়ে উঠে চাদরের পল্লী।

চাদর শিল্পকে আরো উন্নত করার জন্য ১৯৯০ সালে বিদেশ থেকে জ্যাকেট মেশিন আমদানী করা হয়। আর সেই জ্যাকেট মেশিনের মাধ্যমে অত্যাধুনিক ডিজাইনের নানা বাহারী চাদর তৈরী শুরু হয়। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে এদেশে একটি সিন্ডিকেট ভারতীয় চাদর আমদানী শুরু করে। অন্যদিকে অসাধু সেসব সিন্ডিকেটের মাধ্যেমে ভারতীয় সুতা দিয়ে তৈরী চাদর দেশের বিভিন্ন বাজার ছড়িয়ে বাজার দখলের পক্রিয়া শুরু করে। এছাড়া গেলো দু‘বছর শীতের প্রভাব তেমন না থাকায় কাঞ্চন এলাকার চাদর ব্যবসায়ীরা তৈরী চাদর হাট-বাজারে পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে না পেরে চরম হতাশায় সময় পাড় করছেন। চাদর বিক্রি করতে না পেরে অনেক কারখানা মালিক বন্ধ করে দিয়েছেন কমপক্ষে  শতাধিক পাওয়ারলুম কারখানা। এ কারনে বেকার হয়ে পড়েছেন অন্তত ৫ হাজার চাদর তৈরীর কারখানা শ্রমিক।

এ ব্যাপারে ভাই ভাই টেক্সটাইল মিলের পরিচালক আওলাদ মাহবুব বলেন, কাঞ্চনের তৈরী ঐতিহ্যবাহী চাদর শিল্পকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে নরসিংদীর শেখেরচর বাবুর হাট, রূপগঞ্জের গাউছিয়া মার্কেট, টাঙ্গাইলের করটিয়া, শাহাজাদপুর, কুষ্টিয়ার পোড়াদহ, এনায়েতপুর, সোহাগপুর বাজার। সপ্তাহে একদিন করে সেসব এলাকায় হাট জমে উঠে। এছাড়া পর্যটন এলাকাখ্যাত সিলেট, কক্সবাজারে  এ চাদরের বেশ চাহিদা।

অপরদিকে,  রাজধানীর সদরঘাট, নিউ মার্কেটসহ বড় বিপনী বিতানে এ চাদরের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতি শীত মৌসুমে কাঞ্চন এলাকার এ সমস্ত পাওয়ালুম কারখানা থেকে  প্রায় ১২ থেকে  ১৪ লাখ পিস চাদর সেসব এলাকায় বিক্রি হতো। গত কয়েক বছর ধরে এদেশে অসাধু সিন্ডিকেট ভারতীয় চাদর দিয়ে বাজার দখল করে রেখেছে। এছাড়া দু‘বছর যাবত শীতের তেমন কোন প্রভাব না পড়ায় আমাদের এলাকার চাদর ব্যবসায়ীরা চরম হতাশায় দিন পার করছেন।

কাঞ্চন টেক্সটাাইল মলিক সমিতির সাধারন সম্পাদক এমায়েত হোসেন বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে শত প্রতিকুলতার মাঝে  সম্ভাবনাময় চাদর শিল্পকে স্থানীয়ভাবে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। যদি সরকারী পৃষ্টপোষকতা পাওয়া যায় দেশজুড়ে কাঞ্চনের মতো আরো অনেক এলাকায় তৈরী হবে আমাদের দেশীয় চাদর। রপ্তানী হবে দেশের বাইরেও। বিদেশী আগ্রাসন হটিয়ে দেশকে শিল্পসমৃদ্ধ করতে প্রয়োজন সরকারের কঠোর নজরদারি ও সদিচ্ছা। তাহলেই বাঙ্গালী দেহের আদর মিশ্রিত চাদরের বিশাল বৃত্তের এক কোনে ঝলঝল করবে আমাদের হলোগ্রাম ‘মেড ইন বাংলাদেশ’।

এ ব্যাপারে কাঞ্চন টেক্সটাাইল মলিক সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, দেশে ভারতীয় কাশ্মীরি চাদরের চাহিদা রয়েছে। আমরা সেই আদলে কটন সুতা দিয়ে চাদর তৈরী করি। তারপরও আমাদের চাদরের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া ব্যাংক থেকে কড়া সুদে টাকা তুলে ব্যবসা করার ফলে অনেকে সুদ দিতে দিতে নিঃস্ব হয়ে এ ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। আমরা সরকারের কাছে জোর দাবী জানাচ্ছি যাতে করে বিদেশী চাদর এদেশে আমদানী বন্ধ করে দেশের চাদর বাজারজাত করনের ব্যবস্থা গ্রহন করেন ও ব্যাংকের সুদের হার কমানোর ব্যবস্থা করেন। তা না হলে এ চাদর শিল্প এক সময় বিলুপ্তি হয়ে যাবে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

মুম্বইয়ে মার্কেট থেকে পিয়াজ চুরি (ভিডিও)

বিশ্বজুড়ে আড়াইশ সাংবাদিক জেলে, শীর্ষে চীন

চলন্ত বাস থেকে পড়ে মা-ছেলের মর্মান্তিক মৃত্যু

‘ভিন্নমতের কারণে ১০ বছরে ৩৫ লাখ আসামী, নিহত ১৫২৫, গুম ৭৮১’

সেনাদের পক্ষ নিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন সুচি

টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত চট্টগ্রামের

শায়েস্তাগঞ্জে ট্রেনের ঝাপ দিয়ে যুবকের আত্মহত্যা

সমকামিতা: আনোয়ার ইব্রাহিমকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ

মানবতাবিরোধী অপরাধ: টিপু সুলতানের ফাঁসি

অপহরণের ৫দিন পর মিললো শিশুর লাশ

তামিলদেরও নাগরিকত্ব বিলে আনার আহ্বান

নাগরিকত্ব বিল মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য

‘সুচির আত্মপক্ষ সর্মথনের সুযোগ আছে বলে মনে হয় না’

কলকাতার বাজারে পদ্মার ইলিশ কিনলে পেঁয়াজ ফ্রি

বৃটিশ নির্বাচনে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মুসলিম প্রার্থীদের রেকর্ড

শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ, স্কুল কর্মচারি গ্রেপ্তার