স র জ মি ন

হুন্ডি, স্বর্ণ আর মোবাইল ডিলাররা ডলার পৌঁছে দিতো ক্যাসিনোতে

মিজানুর রহমান, সিঙ্গাপুর থেকে

প্রথম পাতা ২০ অক্টোবর ২০১৯, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:২৬

সিঙ্গাপুরজুড়ে এখন একটাই আলোচনা-ক্যাসিনো অব্দি ডলার পৌঁছে দেয়া চিহ্নিত হুন্ডি-কারবারি, স্বর্ণ ব্যবসায়ী আর মোবাইল চোরাকারবারিদের এখন কী হবে? তারা কি ধরা পড়বে? ক্যাসিনোতে ঢাকা থেকে দলে দলে লোক যাওয়ার সুবাদে মাফিয়া ডনরা তাদের ওই অবৈধ ব্যবসাও নির্বিঘ্ন-নির্ঝঞ্ঝাট করে ফেলেছিলো! একাধিক কারবারি, ভুক্তভোগী আর ডলার, স্বর্ণ ও মোবাইল বহনকারী বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলে মাফিয়া গ্যাংদের কর্ম-কৌশলের চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দেয়া তথ্যের সূত্র ধরে অনুসন্ধানেও অনেক ঘটনার সত্যতা মিলেছে। চাঙ্গি এয়ারপোর্ট আর ‘বাঙালিপাড়া’ সরজমিন বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। সূত্র মতে, হুন্ডির কারবার আর স্বর্ণ চোরাচালানের মধ্যে যোগসূত্র অনেক পুরনো। কিন্তু ওই সূত্রের সঙ্গে মোবাইল চোরাকারবারীদের সম্পৃক্ততা নতুন ঘটনা। ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে ওই চক্র বাংলাদেশে লাখ টাকার ওপরের দামি মোবাইল সেট সরবরাহ করে। আর এতে ব্যবহার করা হয় সাধারণ শ্রমিক থেকে শুরু করে ট্যুরিস্ট এবং মেডিকেল অ্যাটেন্ডেন্টস হিসেবে আসা- যাওয়া করা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বাংলাদেশিদের। অবশ্য ‘ফিটিং খাওয়া’ বাহকদের এজন্য পারিশ্রমিক দেয়া হয়।
বিমানবন্দর টু বিমানবন্দর কন্ট্রাক্টে তাদের ব্যবহার করা হয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে অর্থাৎ মাফিয়া সিন্ডিকেটের নির্দেশনা মতো কাজ না করলে বাহককে দেশে এবং সিঙ্গাপুরে নির্যাতনসহ চড়া মূল্য দিতে হয়। এমনও ঘটনা আছে শাহ্‌জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মাল ডেলিভারি না করে এক পল্টিবাজ বাহক ড্রেস পাল্টে ডমেস্টিক টার্মিনাল হয়ে ফ্লাইটে যশোর চলে গিয়েছিল।

সিঙ্গাপুরে বসে এক সিন্ডিকেট তাকে যশোর বিমানবন্দর থেকে আটক এবং প্রশাসনের সহায়তায় পণ্য উদ্ধারে সক্ষম হয়। তারা এতটাই যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। চাঙ্গি বিমানবন্দরের নব প্রতিষ্ঠিত টার্মিনাল-৪ এ চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের বাংলাদেশি এজেন্টরা রীতিমতো অফিস খোলে ফেলেছে। সেখান থেকে তারা অন্য টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ করে। সরজমিন দেখা যায়, ব্যাগ-লাগেজ নিয়ে বিমানবন্দরে যারাই প্রবেশ করেছেন তাদেরই টার্গেট করছে একাধিক এজেন্ট। বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার লোকজনের চেহারায় সাযুজ্যতা থাকায় অনেক ইন্ডিয়ানকেও তারা প্রস্তাব করে বসে চোরাই পণ্য বহনে, যা ওই নাগরিকের জন্য বিব্রতকর আর বাংলাদেশের জন্য চরম লজ্জার। সরজমিন বাহনে রাজি হওয়া যাত্রীকে অতিরিক্ত মালামাল বহনে এজেন্টের চাপাচাপি এবং এ নিয়ে দরকষাকষির নির্লজ্জ চিত্র পাওয়া যায়। এ-ও জানা যায় ঢাকায় ক্যাসিনো বিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের কাছাকাছি সময়ে চাঙ্গি বিমানবন্দরে সিঙ্গাপুর পুলিশের ঝটিকা অভিযানে ৪২ জন আটক হন। এর মধ্যে ১২ জন ছিলেন নির্দোষ। তারা তাদের বন্ধু-স্বজনকে বিদায় জানাতে গিয়ে অভিযানের মুখে পড়ে যান। আইনের শাসনের কঠোর প্রয়োগে বিশ্বাসী সিঙ্গাপুর পুলিশ তাদের তাৎক্ষণিক মুক্ত করে দেয়। বাকি ৩০ জনকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় আরও ২০ জনকে। কিন্তু কে জানতো এটা যে ফাঁদ! ছেড়ে দেয়া বাংলাদেশিরা কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় লেনদেন করছে সেটি ফলো করে পরের দিনই অভিযান হয়।

তাতে আরও বেশ ক’জন ধরা পড়েন। বলাবলি আছে পরবর্তীতে ধরা পড়া লোকজনের ফাইল এখন দেশটির মিনিস্ট্রি অব ম্যানপাওয়ার সার্ভিস সেন্টারে (এমওএম)। তাদের দেশে ফেরত এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। চাঙ্গি বিমানবন্দরে সরজমিন দেখা যায়, ময়মনসিংহের একজন ভ্রমণকারী (নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন) বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে ঢাকা ফিরছিলেন। তেমন বাজার সদাই করেননি তিনি। সম্ভবত কোনো রোগীর সঙ্গে এসেছেন, (ভ্রমণের উদ্দেশ্যের বিস্তারিত বলতে রাজি হননি) বিমানবন্দরে পৌঁছার পর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর নামের এক চোরাকারবারি-এজেন্ট তাকে ৩টি মোবাইল বহনের প্রস্তাব করে। অনুনয়বিনয় করে সে তার পরিবার-স্বজনদের জন্য মোবাইলগুলো পাঠানোর কথা বলে তাকে রাজি করায়। প্রাথমিক সম্মতি পাওয়ার পর শুরু হয় জোরাজুরি। এজেন্ট তার পরিবারের জন্য কিছু স্বর্ণও পাঠাতে চায়। কিন্তু ওই যাত্রী তা বহনে কোনো অবস্থাতেই রাজি হচ্ছেন না। শুরুতেই তাকে অফার করা হয় ১০ হাজার টাকা। চাপাচাপির এক পর্যায়ে ১২ হাজার এবং সর্বশেষ ১৫ হাজার টাকার প্রস্তাবেও যখন তিনি রাজি হচ্ছেন না তখন শুরু হয় হুমকি-ধমকি। মাল না নিলে অসুবিধা হবে, কীভাবে ঢাকায় যাবেন দেখে নোবো, বাড়ি পৌঁছাতে পারবেন না- ইত্যাদি, আরও কত কী। উভয়ের গলার আওয়াজে উত্তাপ ছিল। কেউ কাউকে কথা বলতে একটুও ছাড়ছিলেন না। কথা বাড়ছিলো। আচমকা সোহেল নামে একজন এলেন। সম্ভবত এজেন্ট জাহাঙ্গীরের ফোন পেয়ে এসেছেন তিনি। তার আচরণে বিনয়-ভদ্রতার কোনো কমতি নেই। সোহেল পোশাক-আশাকেও বেশ মার্জিত, স্মার্ট। কথাবার্তার সূচনা থেকেই তিনি ইতিবাচক। মনে হয় অনেকটা যাত্রীর পক্ষেই কথা বলছেন। টার্গেট কোনোভাবে মালটা বহনে রাজি করানো। তা-ই হলো। মধ্যস্থতাকারী ভদ্রলোকের কথা ফেলতে পারলেন না যাত্রী। বিদায় বেলা তা-ই বলে গেলেন। অবশ্য এজন্য ঢাকায় পৌঁছে, মাল হস্তান্তরের সঙ্গে ২০ হাজার টাকা পাবেন তিনি। বিমানবন্দরেই মাল হস্তান্তর হবে। সূত্র মতে, সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় যায় স্বর্ণ আর দামি মোবাইল সেট। এখানে আসে ডলার। সূত্র এটি নিশ্চিত করেছে যে, ঢাকার বেশ ক’জন স্বর্ণ কারবারি সিঙ্গাপুরেই পড়ে থাকেন। তাদের দলনেতা ঢাকা মহানগরীর শাসক দলের এক নেতা। মূলত তিনিই সবকিছু ম্যানেজ করেন। বলাবলি আছে ছাত্র জমানায় তিনি না-কী খন্দকার মোশ্‌তাকের জনসভায় সাপ ছেড়ে দিয়ে সভা ভণ্ডুল করে সেই সময়ের রাজনীতিতে নাম ডাক অর্জন করেছিলেন।

তাঁতীবাজারসহ ঢাকাজুড়ে থাকা ওই স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সঙ্গে এখানকার হুন্ডি-কারবারিদের লিংক। স্বর্ণ পৌঁছে যায় নির্ধারিত স্থানে। প্রতিদিন সিভিল কন্ট্রাক্টে অর্থাৎ যাত্রী মারফত  যায় গড়ে প্রায় ৫০০ কেজি। একজন যাত্রী নিজের জন্য সর্বোচ্চ ১০০ গ্রাম স্বর্ণ বহন করতে পারে। বাংলাদেশের আইনে এই সুযোগ রয়েছে। খুচরা চোরাকারবারিরা বা এজেন্টরা এ সুযোগ নিয়ে থাকে। সূত্র মতে, প্যানিসোলা প্লাজায় এমন বড় সিন্ডিকেটও আছে যাদের যাত্রী বা এজেন্ট নিয়োগের প্রয়োজন পড়ে না। তারা সরাসরি বিমানবন্দর টু বিমানবন্দর কন্ট্রাক্টে যায়। সিঙ্গাপুরের আইনে স্বর্ণ বিক্রির কোনো লিমিট নেই, এমনটাই জানা গেছে। সমস্যা হয় বাংলাদেশে ঢুকতে। কাস্টমসের ঘাট পার হতে। কিন্তু সেটাও সহজ হয়ে যায় রাজনৈতিক প্রভাব এবং বখরা দিলে। বিমানবন্দরে তথা কথিত ভিআইপিদের স্ত্রীদের ব্যাগেও কেজি কজি স্বর্ণ যায় এমটাও জানিয়েছেন এক কারবারি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, বৃহত্তর কুমিল্লার একজন, বৃহত্তর বরিশালের ২ জন  এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহের একজন এমপি আছেন যাদের সিঙ্গাপুরে বাড়িঘর। ক্যাসিনো সম্রাট এবং তার জুনিয়র সহযোগীরা তো আছেনই। তারা এখানে যা করেন তার পেট্রোন হচ্ছেন নানা রকম কারবারি। এমপি-প্রভাবশালীরা মাঠ প্রশাসনকে ম্যানেজ করেন, রুটটা নিরাপদ করেন। বাকিটা কারবারিদের দায়িত্ব। যথাস্থানে, যথা সময়ে তারা বখরা- হয় টাকায় না হয় ডলারে পৌঁছে দেন।

জেলা-বিভাগ ধরে হুন্ডি বুকিং, ডায়েরিই বড় প্রমাণ: প্রতি শনি ও রোববার হুন্ডি-কারবারি এজেন্টদের হাট বসে মোস্তাফা সেন্টার সংলগ্ন বাঙালি পাড়ায়। ওই এলকায় জেলা-বিভাগ ধরে হুন্ডির টাকা বুকিং হয়। প্রত্যেক এজেন্টের হাতে ডায়েরি থাকে। এতে নোট করা মানে বুকিং হয়ে গেল। অনেকটা ফ্লেক্সিলোড পয়েন্টের মতো। তবে হুন্ডি বুকিং পয়েন্টগুলোর নামকরণ হয়েছে গাছ এবং হোটেলের নামে। যেমন তেঁতুলতলা, আমতলা, শাপলা হোটেল, ম্যাশ ক্যাফে ইত্যাদি। ওপেন সিক্রেট ওই অবৈধ লেনদেনে নানা ঘটনা ঘটে। যা পুলিশের নোটিশেও রয়েছে। হুন্ডি-কারবারিদের কাণ্ডকারখানায় এলাকাটা এমনভাবে চিহ্নিত যে, সময়ে-অসময়ে বাঙালিপাড়ার মাঠে সিঙ্গাপুর পুলিশ রীতিমতো চেকপোস্ট বসিয়ে চেক করে। প্রথমদিন ওই মাঠে অপেক্ষায় থেকে প্রতিবেদক নিজেই পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন। অবশ্য তাদের বক্তব্য বসবাসরত এবং ভিজিট ভিসায় আসা বাংলাদশিদের বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, দুষ্টরা চতুর। তবে বেশির ভাগ বাংলাদেশি সরল।



পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Kazi

২০১৯-১০-১৯ ১৭:৩৫:৫৮

Very large network operated to commit crimes. Unless government dig up to bottom it will not be fully successful. It depends on government.

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা -এর সর্বাধিক পঠিত