এরশাদ আর নেই

অনলাইন

স্টাফ রিপোর্টার | ১৪ জুলাই ২০১৯, রোববার, ৯:৪৩ | সর্বশেষ আপডেট: ৪:৫৪
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান (জাপা) সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)। আজ রোববার সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৮৯ বছর। তিনি স্ত্রী, ২ পুত্র, ও রাজনৈতিক সহকর্মীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। এরশাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জাপার যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক খান।

জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৩০ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রামে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার দিনহাটা গ্রামে। তার পিতা মকবুল হোসেন ও মাতা মজিদা খাতুন। পিতা ছিলেন উকিল। এরশাদ প্রথমে কুচবিহার ও পরে নিজ শহর রংপুরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন। এরপরে ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে যোগদান করেন। ১৯৬০-৬২ সালে তিনি চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে অ্যাডজুট্যান্ট ছিলেন। এরশাদ ১৯৬৬ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায় অবস্থিত স্টাফ কলেজে স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৬৮ সালে শিয়ালকোটে ৫৪তম ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি লাভের পর ১৯৬৯-৭০ সালে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে এবং ১৯৭১-৭২ সালে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।

পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৭৩ সালে এরশাদকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৩ সালের ১২ই ডিসেম্বর কর্নেল পদে এবং ১৯৭৫ সালের জুন মাসে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি লাভ করেন এরশাদ। একই বছর তিনি ভারতের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে প্রতিরক্ষা কোর্সে অংশগ্রহণ করেন। ওই বছরই আগস্ট মাসে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে তাকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদকে সেনাবাহিনী প্রধান পদে নিয়োগ দেয়া হয় এবং ১৯৭৯ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

১৯৮১ সালের ৩০শে মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের অব্যবহিত পর থেকেই সংবাদপত্রে বিবৃতি ও কভারেজের মাধ্যমে রাজনীতিতে এরশাদের আগ্রহ প্রকাশ পেতে থাকে। ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন। তিনি দেশের সংবিধানকে রহিত করেন। এছাড়া জাতীয় সংসদ বাতিল ও সাত্তারের মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করেন। এরশাদ নিজেকে দেশের সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করেন। যে সাংবিধানিক পদটি একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানেরই প্রাপ্য ছিল। তিনি ঘোষণা করেন যে ভবিষ্যতে সামরিক আইনের অধীনে জারিকৃত বিধিবিধান ও আদেশই হবে দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং এর সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ সকল আইন অকার্যকর হবে।

১৯৮৬ সালে এরশাদ জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ঐ বছরই এই দলের মনোনয়ন নিয়ে পাঁচ বছরের জন্য দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।  ১৯৮৮ সালে পুনরায় নির্বাচন দিলে সব দল নির্বাচন বয়কট করে। আন্দোলনের মুখে এরশাদ ৬ই ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।

ক্ষমতা হারানোর পর এরশাদ গ্রেপ্তার হন। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি কারাগার থেকে অংশগ্রহণ করেন এবং রংপুরের পাঁচটি আসন থেকেই নির্বাচিত হন। ওইসময় তার বিরুদ্ধে কয়েকটি দুর্নীতি মামলা দায়ের করা হয়। যার বেশ কয়েকটিতে দোষী প্রমাণিত হয়ে সাজাপ্রাপ্ত হন। ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। ছয় বছর কারাগারে থাকার পর ১৯৯৭ সালের ৯ই জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্তি পান। তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি ২০০০ সালে তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যার মধ্যে জাতীয় পার্টির (জাপা) মূল ধারারটির তিনি চেয়ারম্যান।

২০০১ সালের নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচন করে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে সংসদে যান এরশাদ। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তার স্ত্রী রওশন এরশাদ প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা হন। এরশাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে এরশাদ ও তার পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচন করলেও পরবর্তীতে বিরোধী দল হিসেবে সংসদে যান। এরশাদ হন প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা।

এরশাদের বড় একটি সফলতা ছিল দক্ষিণ এশীয় সহযোগীতা সংস্থা (সার্ক) গঠনে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নেয়া। এরশাদের অন্যান্য সফলতার মধ্যে রয়েছে উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা কার্যকর করা, শিল্প, ভূমি সংস্কার, শিল্পে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ উদার, গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি।

এছাড়া প্রেসিডেন্ট এরশাদ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পের বিরাষ্ট্রীয়করণ এবং দেশে ব্যক্তিখাতের বিকাশে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। এর অন্তর্ভুক্ত ছিল সরকারি মালিকানাধীন উত্তরা, পুবালী ও রূপালী ব্যাংকের বিরাষ্ট্রীকরণ। এসময়ে দেশে প্রথমবারের মত কয়েকটি বেসরকারি বাণ্যিজ্যিক ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিকে কার্যক্রম শুরুর অনুমতি প্রদান করেন। দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন ও সংস্কারেও এরশাদ সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়। দেশের মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করার মাধ্যমে দেশে জেলার সংখ্যা ৬৪টি করা হয় এরশাদ সরকারের আমলে। আর এগুলোর অধীনে ৪৬০টি উপজেলা বিন্যস্ত করা হয়। কেন্দ্রিয় ক্ষমতা বিকেন্দ্রিকরণের উদ্দেশ্যে এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৮শে এপ্রিল একটি প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও সংস্কার কমিশন গঠন করেন, যার সুপারিশ অনুযায়ী জনপ্রশাসনকে নতুন করে সাজানো হয়।

এরশাদ আমলের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল পুলিশসহ বিভিন্ন সিভিল পদে মাত্রাতিরিক্ত সংখ্যক সেনা কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ। প্রশাসনের আকার কমাতে তিনি অনেকগুলো অপ্রয়োজনীয় দপ্তর বিলোপ করেন এবং অনেক দপ্তর একীভূত করেন।  তিনি ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট বেঞ্চ বসিয়ে উচ্চতর আদালত বিকেন্দ্রিকরণেরও চেষ্টা করেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের রায়ের পরে তা খারিজ হয়ে যায়। এরশাদ সরকারের আরেকটি সফলতার মধ্যে ছিল প্রয়োজনীয় ভূমি সংস্কারের প্রয়াস। এ লক্ষ্যে ১৯৮২ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তবে তার অন্য অনেক উদ্যোগের মতোই ভূমি সংস্কারের উদ্যোগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে। তার একটি সৃজনশীল প্রয়াস ছিল পথশিশুদের জন্য ‘পথকলি ট্রাস্ট’ গঠন।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

হাফিজ জামিল

২০১৯-০৭-১৪ ১৩:১৫:৪৪

আল্লাহ'র কাছে উনার মাগফিরাত কামনা করি আল্লাহ যেনো উনাকে ক্ষমা করে তাহার কবরের জিন্দেগি শান্তিময় করে দেন।

মোঃ ইব্রাহিম খলিল

২০১৯-০৭-১৩ ২৩:৫৬:১৯

ওনার প্রতি সারা বাংলাদেশের মানুষের একটা খোপ আছে ইভেন আমারো,বর্তমান দেশে গণতন্ত্র হীনতার মুল কারিগর ওনি,তারপর ও বলবো যেহেতু দুনিয়া ছেড়ে পরপারে চলে গেছে রাগ অভিমান না করে ওনাকে ক্ষমা করে দেওয়া,

বাবুল চৌধুরী এইচ এম

২০১৯-০৭-১৩ ২৩:২৩:২০

ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাহে রাজেউন, সেনাশাসকের ধারাবাহিকতায় শাসন ক্ষমতায় এলেও মরহুম এরশাদ দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে যথেষ্ঠ অবদান রাখেন, তার শাসনামলে দেশের শিল্প বানিজ্য অর্থনীতি অনেক উন্নতি লাভ করে।তখন সমসাময়িক রাজনীতিক্ষেত্রে কিছুটা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিলেও মহকুমাকে জেলা থানাকে উপজেলাসহ প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রশংসার দাবী রাখে। কায়েমি স্বার্থবাদী আমলাতন্ত্রের অসহযোগিতার ফলে তাহার অনেকগুলো জনকল্যানমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হতে পারেনি।আমরা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করি ও শোকাহত পরিবার ও তার দলের প্রতি সমবেদনা জানাই।

sm mozibur

২০১৯-০৭-১৪ ১১:৩৩:৩৮

যা করেছে তা পেয়ে গেছে। একজন রাষ্ট্রপতির আমল আখলাক সাধারন মানুষ থেকে আলাদা হতে হয় যা তার ছিলোনা। ওনার রাজনৈতিক জিবনাটা ছিলো। গণতন্ত্রের জন্য কালো ছায়া। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিন।

Kazi

২০১৯-০৭-১৩ ২২:০৬:৪৪

দেশের সত্যিকারের উন্নয়নের উদ্যোগ ছিল তার শাসনামলে। বহু ভাল ভাল উদ্যোগ আমলাদের ষড়যন্ত্র ও দুর্নীতির কারণে সফল না হলেও নিঃসন্দেহে প্রচেষ্টার কমতি ছিল না। সড়ক পথে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভুতপূর্ব উন্নতি হয়েছে তার আমলে। দীর্ঘ সেতু ও সড়ক নির্মাণ করে ফেরি পারাপার বন্ধ করে যাতায়াতের সময় কমিয়ে দিয়েছিল তার পরিকল্পনা। তার এসব অবদান জাতি ভুলবে না। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। যে রাস্তা ও পুল (সেতু) নির্মাণ করে পরকালে পুলসিরাত সেতু নাকি পার হওয়া তার জন্য সহজ হয়।

আপনার মতামত দিন

রাঙ্গামাটিতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত

ঈদে সড়কেই প্রাণ গেল ২২৪ জনের

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আদৌ শুরু হচ্ছে কি?

কুমিল্লায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৮

এখনো উচ্চ ঝুঁকি ২৪ ঘণ্টায় ১৭০৬ রোগী ভর্তি

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ

ডেঙ্গুর প্রজননস্থলে কতটা যেতে পারছেন মশক নিধন কর্মীরা?

বৈঠকের পর চামড়া বিক্রিতে সম্মত আড়তদাররা

জনগণকে সতর্ক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার পরামর্শ

ছিনতাইকারীর হাতে খুন হন কলেজছাত্র রাব্বী

শিক্ষিকাকে গণধর্ষণের পর হত্যা

শহিদুল আলমের মামলা স্থগিতই থাকবে

ডেঙ্গুর ভয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ তবুও...

রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে ঢামেকে সংঘর্ষ, আহত ২৫

টার্গেট রাজনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ়করণ

ইউজিসি প্রফেসর হলেন ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ