এএফপির রিপোর্ট

স্কুলে শিক্ষা বঞ্চিত হয়ে মাদ্রাসায় ঝুঁকছে রোহিঙ্গা শিশুরা, বাড়ছে উগ্রবাদের আশঙ্কা

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ১৯ জুন ২০১৯, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:২২
বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে রোহিঙ্গা শিশুদের পড়ার অধিকার নেই। ফলে তারা শিক্ষা গ্রহণের জন্য ধাবিত হচ্ছে মাদ্রাসার দিকে। সেখানে শিক্ষার মান নিম্নমানের বলে অভিযোগ সমালোচকদের। এর ফলে তাদের উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশী স্কুলগুলো থেকে রোহিঙ্গা শিশুদের বের করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকারের এমন নীতির সমালোচনা করেছে অধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো। অন্যদিকে দাতব্য সংস্থাগুলো ও জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ রোহিঙ্গা শিশুদের ১৮০০ অস্থায়ী স্থাপনায় শিক্ষা দিচ্ছে। সেখানে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার শিশু পড়াশোনা করছে।
কিন্তু তাও শুধু প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত। এই ফারাক পূরণ করতে গিয়ে রোহিঙ্গা গ্রুপগুলো এবং বাংলাদেশী ধর্মীয় গ্রুপগুলো এক হাজারের বেশি মাদ্রাসা স্থাপন করেছে। সেখানে মৌলিক আরবি শিক্ষা থেকে শুরু করে গ্রাজুয়েট স্তর পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষার সবটাই দেয়া হচ্ছে। তবে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক বলেছেন, আমরা জাতীয়তার ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে ব্যবধান করি না। বিশেষ করে যখন তাদের মধ্যে শিক্ষার দৃঢ় আগ্রহ থাকে এবং তারা আল্লাহর পথে থাকতে চায়। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়ে কমপক্ষে ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এর ফলে বাংলাদেশে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১০ লাখ। তাদের আশ্রয় হয় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে কক্সবাজারে। এখানকার মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মিল আছে। তাদেরকে কর্তৃপক্ষ অস্থায়ীভিত্তিতে আশ্রয় দিয়েছে। তাদের ছেলেমেয়েদের স্থানীয় স্কুলে পড়ার অধিকার প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। এর ফলে একটি প্রজন্ম হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে। এএফপি লিখেছে, এ বছর প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনার সরকার রোহিঙ্গা শিশুদের বিরুদ্ধে দমননীতি (ক্র্যাকডাউন) চালায়। স্কুলগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয় রোহিঙ্গা শিশুদের বহিষ্কার করতে। এর আগে পর্যন্ত অনেক রোহিঙ্গা শিশু ফাঁক গলিয়ে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল।

এমনই এক রোহিঙ্গা শিশু লাকি আকতার (১৫)। সে হ্নীলা গ্রামের স্কুল হারিয়েছে। সেখানে এক তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী ছিল শরণার্থী ক্যাম্পের। লাকির সামনে এখন আর কিছুই করার নেই। শুধু মাকে তার খুঁটিনাটি কাজে সহায়তা করে। কান্নায় ভেঙে পড়ে লাকি জানায়, আমি ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন তা আর সম্ভব না। এমনই আরেক রোহিঙ্গা শিশু হারেস (১৩)। তাকে টেকনাফের একটি স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বর্তমানে সে লেদা শরণার্থী শিবিরে একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। তার পিতা মোহাম্মদ খালেক বলেন, পড়াশোনা নিয়ে তার জন্য ব্যস্ত থাকা উত্তম। তা নাহলে সে ক্যাম্পের এদিক-ওদিক ঘোরাফিরা করবে। তাতে তার স্বভাব নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

সমালোচকরা সতর্ক করছেন। তারা বলছেন, শিক্ষার জন্য ভাল বিকল্প মাদ্রাসা নয়। তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ তাদের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলেছে, মাদ্রাসা থেকে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও চরমপন্থায় দীক্ষা দেয়ার বিষয়ে কোনো প্রমাণ নেই। এতে আরো বলা হয়, শিশু কিশোরদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ প্রত্যাখ্যান করায় এবং তাদেরকে অনিয়ন্ত্রিত মাদ্রাসার ওপর নির্ভরশীল করে দেয়ার ফলে অবশ্যই ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এর মধ্য দিয়ে ওইসব গ্রুপ এই ক্যাম্পে তাদের উপস্থিতি অর্জন করতে পারে।

নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অব অসলো’র উগ্রবাদ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুবাশ্বের হাসান বলেন, সরকারের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা উচিত। রোহিঙ্গা শিশুরা মানসিকভাবে দুর্বল, বিচ্ছিন্ন এবং ক্ষুব্ধ। পাশাপাশি তারা সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে খুবই ধর্মপরায়ণ।
এএফপি তার প্রতিবেদনে আরো লিখেছে, বেশ কিছু মাদ্রাসা পরিচালনা করে ইসলামপন্থি গ্রুপ হেফাজতে ইসলাম। ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে আইন বাস্তবায়নের দাবি সহ বিভিন্ন দাবিতে সাম্প্রতিক সময়ে সহিংস বিক্ষোভ করেছে তারা। ২০১৩ সালে তাদের হাজার হাজার নেতাকর্মী ঢাকায় সমবেত হন। তা থেকে সহিংসতা সৃষ্টি হয়। এতে কমপক্ষে ৫০ জন নিহত ও কয়েক শত মানুষ আহত হন। তবে সম্প্রতি এই গ্রুপটি সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় এসেছে। তাদের শিক্ষাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এই গ্রুপটির একজন সিনিয়র নেতা আজিজুল হক। কট্টরপন্থিদের সঙ্গে এই গ্রুপটির কোনো যোগসূত্র থাকার কথা তিনি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের অনেক মাদ্রাসার কারিকুলাম অনুযায়ী তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো ধর্মীয় শিক্ষা দিচ্ছে। এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

এই গ্রুপের মুখপাত্র ফজলুল করিম বলেন, এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য শেষ ভরসা। ধর্মের কারণে তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। সত্যিকার ধর্মীয় শিক্ষাই শুধু এ সম্প্রদায়ের কাছে স্বস্তি আনতে পারে। উল্লেখ্য, সাতটি মাদ্রাসা পরিচালনা করেন ফজলুল করিম। সেখানে পড়াশোনা করছে ২৫০০ শিক্ষার্থী।

কিন্তু সাধারণ স্কুলে পড়ার আগে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন মজিব উল্লাহ। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যথাযথ শিক্ষা পাওয়া যায় না। মজিব উল্লাহ বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান একটি মসজিদে নামাজ পড়ান। তিনি বলেন, এসব মাদ্রাসা শুধু কিছু ধর্মীয় শিক্ষক ও মসজিদের ইমাম তৈরিতে সহায়তা করে। আমাদের সন্তানদেরকে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো উচিত, যেখান থেকে তাদেরকে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে সহায়তা করবে। তা নাহলে এই প্রজন্ম একেবারে হারিয়ে যাবে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোঃ তারেক

২০১৯-০৬-১৯ ১৯:৪৭:৪৩

ইসরায়েলি সৈন্যরা ফিলিস্তিনি নাগরিকদের শত বছরের আপন বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে গুড়িয়ে দেয়,নিরীহ শিশুদের,নারীদের উপর নির্যাতন করে তারা কোন মাদ্রাসার ছাত্র ছিল ? এভাবে দু'কলম লিখা বন্ধ করুন আর না হলে পত্রিকা হিসেবে মানুষের গ্রহণযোগ্যতা হারাবেন।

Abdul Majid Bahadur

২০১৯-০৬-১৯ ১৬:৫৩:৩১

পৃথিবীতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড থেকে শুরু করে সকল প্রকার অপকর্ম করে আসছে আমেরিয়া ও ইসরায়েল। তাদের অপকর্মকে আড়াল করতে ইহুদী-খৃষ্টন ও নাস্তিকদেরকে মুসলমান সাজিয়ে সকল প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করতেছে তারা। অন্যদিকে তারাই মসজিদ, মাদ্রাসা ও ইসলামিক কোন কর্মকান্ড দেখলে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসীর ছায়া দেখে মুসলমানদের মধ্যে।

Arif Rabbani

২০১৯-০৬-১৯ ০১:০৫:২৬

মাদ্রাসা পড়লেই উগ্রবাদের কথা আসে কেন? বাংলাদেশে উগ্রবাদীদের পরিসংখ্যান কি তাই বলে? সব শিক্ষারই প্রয়োজন আছে; তবে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা না থাকলে মানুষ হওয়া যায়না। দেখেন না কারা সব লুটেপুটে খাচ্ছে?

সাইফুল

২০১৯-০৬-১৯ ০০:০৩:৩৯

মাদ্রাসায় পড়েলে উগ্রবাদী কতটা টিক না,

nuruzzaman

২০১৯-০৬-১৮ ২১:৪৩:৩৯

Islamic Institution teach manner. Make a good man to contribute for the other people.... Non Muslim Analysis is wrong ....Australian Mosque Imam not give statement correctly or not expose his word correctly.

আপনার মতামত দিন

রংপুরেই এরশাদের সমাধি

লক্ষাধিক বিও অ্যাকাউন্ট বন্ধ

যে কারণে পুঁজিবাজারে পতন থামছে না

মিন্নি গ্রেপ্তার

হাসপাতালে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের ভিড়

ছুরি নিয়ে কীভাবে গেল তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে

সব আদালতে নিরাপত্তা বাড়ানো হবে

ঘাতকের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, মামলা ডিবিতে

উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে উপজেলা পর্যায়ে কারিগরি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে

বাসর হলো না নবদম্পতির

১১ কোম্পানির দুধে সিসা ও ক্যাডমিয়াম

চীনা ডেমু ট্রেন আর কেনা হবে না

বিচারকদের নিরাপত্তা চেয়ে রিট

আসাদকে পাল্টা জবাব আরিফের

৩ মাস পর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন শুরু

বাঁচানো গেল না সার্জেন্ট কিবরিয়াকে