ইউরোপের দালালদের টার্গেট বাংলাদেশি তরুণ-যুবকরা

দেশ বিদেশ

আবদুল মোমিত (রোমেল), ফ্রান্স থেকে | ১৭ জুন ২০১৯, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৩১
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আসার প্রলোভনে দালালদের খপ্পরে পড়ে  পুড়ছে হাজারো বাংলাদেশি তরুণ-যুবকের স্বপ্ন। দীর্ঘ ছয় মাসের পথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যান সিলেটের জকিগঞ্জের আব্দুস সামাদ। বিপদসঙ্কুল এই পথের প্রতিটি পদেই ছিল মৃত্যুর হাতছানি। আর কেউ যেন ইউরোপের স্বপ্নে বিভোর হয়ে এই মৃত্যু ফাঁদে পা না বাড়ান, সেই আহ্বান তার। সামাদ বলেন, সারাদিন জঙ্গলে শুয়ে থাকতাম আর সারারাত হাঁটতে হতো। টানা দশদিন এইরকম হাঁটতে হয় আমাদের।  শেষ দুইদিনে হয় খাদ্য সংকট। মারা যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে ছিলাম আমরা। এই পথের আরেক যাত্রী সিলেটের ফিরোজ।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বললেন তিনিও। ফিরোজ বলেন, প্রায় দশদিন হাঁটার পর আমরা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ঢুকেছিলাম। এরপর আরো নানানভাবে ঘুরে আমাদের ইউরোপে ঢুকতে হয়েছে। মে মাসে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকাডুবির ঘটনায় প্রাণ হারান ৬০ জনের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী। যার বেশির ভাগই বাংলাদেশি। এ অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমানো বাংলাদেশির পরামর্শ, উচ্চাভিলাসী জীবনযাপনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আর যেন  কেউ দালালের প্রলোভনে পা না বাড়ায়। বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী বলেন, ইউরোপের দালালদের টার্গেট বাংলাদেশি তরুণ-যুবকরা। আপনি যখন ইউরোপে পৌঁছান তখন আপনাকে রিসিভ করে এখানকার স্থানীয় দালাল,  সে জানে আপনি ২৫০০ ইউরো সঙ্গে এনেছেন, সে আপনার টাকা লুটে নেয়ার চিন্তায় থাকে। আপনাকে রিসিভ করা বাবদ ১০০ ইউরো, ট্যাক্সি ভাড়া ৫০ ইউরো, তার বাসায় নিয়ে রাখবে ৬০-৭০ ইউরো, বাসায় তুলে  দেবে ২০০-৩০০ ইউরো, হাউজ এগ্রিমেন্টের জন্য ৫০ ইউরো, মোট ৫০০ থেকে ৬০০ ইউরো আপনার কাছ থেকে হাতিয়ে নেবে। অথচ এখানে সর্বোচ্চ খরচ হচ্ছে ১২০ ইউরো। ফ্রান্সে আশ্রয় নেয়া মাসুদ তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, দালালদের খপ্পরে পড়ে ইউরোপে আসার স্বপ্ন এখন তার কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠছে। ইতালিতে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী রোকন, আবিদ, সুজন, সাব্বির বলেন, স্বপ্নের ইউরোপ ঢুকতে গিয়ে মৃত্যুকে জয় করেছি। কিন্তু দালালদের মন জয় করতে পারি নি। ইউরোপে ঢোকার পথে বর্ডারে পুলিশের হাতে ধরা পড়লে বা পুলিশের জেরার মুখে দালাল সম্পর্কে কোনো তথ্য দিলে তাদের সঙ্গে থাকা অন্য যাদের দালালরা আটকে রেখেছে তাদের প্রাণে  মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে থাকে। ফিলিপস নামে একজন ইউরোপের দালালের সঙ্গে কথা হলে সে জানায় যে, বাংলাদেশের সিলেট থেকে যে সমস্ত তরুণ-যুবক আসে তাদের কাছে প্রচুর টাকা থাকে এবং দালালরা সেই জিনিসটা জানে বলে এই সুযোগে তাদের কাছ থেকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে বা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে অনেক সময় সেই টাকাগুলো মুক্তিপণ হিসেবে আদায় করে  নেয়। বাংলাদেশি তরুণ-যুবকরা সব সময় তাদের টার্গেটে থাকে বলে সে স্বীকার করে। বাস্তব চিত্র হলো  ইউরোপে পৌঁছার পরও দালালদের ভয়ে অনেকেই মুখ খুলেন না। তাই পুলিশ প্রশাসন বস্তুনিষ্ঠ কোনো তথ্য না পাওয়াতে দালালরা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর দিয়ে যতো মানুষ প্রবেশ করেছেন, সেই তালিকার শীর্ষ দশ  দেশের নাগরিকদের মধ্যে প্রায়ই বাংলাদেশও থাকছে। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১৯ লাখ ৫৮ হাজার ১২৬ জন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছেন। ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ২১ হাজার ৪৬০ বাংলাদেশি ইউরোপ গেছেন ২০১৫ সালে। অথচ ২০১৪ সালে ওই সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ১৩৫। ২০১৩ সালে সংখ্যাটি ছিল ৯ হাজার ৪৯০ জন। ২০০৮, ২০০৯, ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে ওই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭ হাজার ৮৫, ৮ হাজার ৮৭০, ৯ হাজার ৭৭৫, ১১ হাজার ২৬০ ও ১৫ হাজার ৩৬০ জন। এভাবে সাগরপথে আসতে গিয়ে  শত শত  মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু, তবুও ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা থেমে নেই। প্রশ্ন হলো কবে থামবে? আর কতো মানুষের প্রাণ গেলে হুঁশ ফিরবে আমাদের? আর কবে সচেতন হবে মানুষ? অনেক বাংলাদেশিরই জানা নেই, ইউরোপের পরিস্থিতি এখন ভিন্ন। ইউরোপ এখন আর অবৈধভাবে আসা লোকজনকে আশ্রয় দিতে রাজি নয়, বরং কাগজপত্রহীন মানুষগুলোকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। এই তো বছর দুয়েক আগে ইউরোপ বলে বসলো, এক লাখ অবৈধ বাংলাদেশি আছে ইউরোপের দেশগুলোতে। তাদের ফিরিয়ে না নিলে ভিসা বন্ধের হুমকিও দিয়েছিলো ইউরোপ। ফ্রান্সে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার কাজী ইমতিয়াজ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি যে, বাংলাদেশিরা দালালদের খপ্পরে পড়ে সাগর পথ দিয়ে এসে একের পর এক জীবন বিলিয়ে দিচ্ছেন। আসলে এটা আমাদের কারো কাম্য না। আমাদের বাংলাদেশি বাবা-মায়েদের একটু সচেতন হবে হবে। তাদের সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য তাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে ইউরোপে আসার স্বপ্নে বিভোর শিক্ষিত তরুণ যুবকদের ইউনিভার্সিটি বা কলেজে লেখাপড়ায় আরো মনোযোগী হতে হবে।  নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে ইউরোপের বিভিন্ন নাম করা  ইউনিভার্সিটি থেকে একটা স্কলারশিপ পাওয়ার জন্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্টুডেন্ট ভিসা নিতে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে অথবা কোনো ট্যুরিস্ট ভিসা বা ভিজিটর ভিসার জন্য আবেদন করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তারপর বৈধ পথ অবলম্বন করে ইউরোপে আসা উচিত বলে তিনি মনে করেন। জীবন বাজি রেখে নদীপথে এসে বাবা-মা’র বুক খালি না করতে তরুণদের এবং মিডিয়াকর্মীদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান। ইউরোপের মিডিয়াকর্মীদের বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যভিত্তিক সংবাদ পরিবেশনের জন্য তিনি অনুরোধ করেন। মিডিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণ যুবকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে কীভাবে বৈধ উপায়ে ইউরোপ আসা যায়। আর নিরুৎসাহিত করতে হবে দালালদের খপ্পরে পড়ে সাগরপথে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ইউরোপে আসার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা থেকে। দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে তিনি বাংলাদেশিদের আরো সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন এবং এই দালালদের বিরুদ্ধে ইউরোপের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

RH Lavlu

২০১৯-০৬-১৬ ১৮:৩৯:২৮

ইউরোপের যাওয়ার বৈধ পথ তৈরি করুন দেশে বেকার সমস্যার সমাধান করুন। দেশে একটি সুন্দর জীবনযাপনের পরিবেশ সৃষ্টি করুন। আর না হলে বড় বড় কথা বলে লাভ নেই।

আপনার মতামত দিন

রেনু হত্যায় আরো একজন গ্রেপ্তার

শেষ কর্মদিবসে অবরুদ্ধ বিআরটিসি’র চেয়ারম্যান

সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা

সিআইএর ১৭ এজেন্টকে আটকের দাবি ইরানের, বেশ কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড

কিছুক্ষণের মধ্যেই যাত্রা শুরু করছে চন্দ্রযান-২

১৪ ঘন্টা পরও খোঁজ নেই

ছাত্রলীগ নেতা গুলিবিদ্ধের ঘটনায় তদন্ত কমিটি

রাতে আটক, ভোরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১৮ মামলার আসামি

৮ শর্তে খুলনায় সমাবেশের অনুমতি পেলো বিএনপি

স্ত্রীর প্রেমিককে ‘ছেলেধরা’ অপবাদে পিটিয়ে হত্যা

বরিস জনসন নাকি জেরেমি হান্ট

পুলিশকে কল দেয়ায় খুন সুমন

আজই কি তবে শেষ দিন!

ঢাবিতে আজও তালা, ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ

ডেঙ্গুজ্বরে হবিগঞ্জ সিভিল সার্জনের মৃত্যু

ওয়াশিংটনে ইমরান খান যা বললেন