উগান্ডুদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নিয়ে গালগল্প

দেশ বিদেশ

আর রাজী | ২৩ এপ্রিল ২০১৯, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৩৪
লোকে বলে, পূর্বজনমে বিপুল পুণ্য করলেই কেবল উগান্ডুদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া যায়। কিন্তু কেন তা বলে? কেন হাত থেকে এই চাকরি ফস্কে গেলে লোকজন আত্মহনন করে বসে? তারই গল্প শোনাব আপনাদের।
১. এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের মতো শুরু থেকে শুরু না করে, মাঝ থেকে গল্প শুরু করা যাক। ধরেন, উগান্ডুদেশের একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি শিক্ষক। আপনার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মহোদয়ের বেশ খাতির আছে। আপনি নিয়মিত তার কাছে যান এবং তার শত্রু কারা, শত্রুরা তার সম্পর্কে কে কী বলে, বিশেষ করে সেই শিক্ষক, যিনি ভিসিকে এইডস (Acquired Intelligence Deficiency Syndrome) আক্রান্ত বলেছিলেন, তিনি আর কী, কোথায় বললেন ইত্যাদি সেসব তাকে নিয়মিত অবহিত রাখেন। ভিসি স্যার এইসব উপকারের বিনিময়ে আপনাকে নানান সুযোগ-সুবিধা-উপহার দিয়েই চলেছেন। এবার আপনি চাইলেন, নতুন একটা বিভাগ খুলে তার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হয়ে ইতিহাসে অক্ষয় স্থান করে নিতে। ভিসি মহোদয় এই মহতী আকাঙ্ক্ষার প্রশংসা করলেন এবং একদিন আপনি একটি বিভাগের সভাপতি হয়েও গেলেন।

২. এবার আপনার নতুন জীবন। আপনি খুঁজতে থাকলেন নতুন বিভাগে কাদের আপনি প্রভাষক পদে নিয়োগ দেবেন। খবরদার, অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, এমন কি সহকারী অধ্যাপক পদেও কাউকে নেবেন না। এরা আপনার নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব, স্বপ্নপূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন। এমন মানুষদের নিতে হবে যাদের কোনো না কোনো দুর্বলতা আপনি জানেন, বিশেষ করে তাদের যাদের শিক্ষক হওয়া ছাড়া আর কিছু করার মুরোদ নেই। খেয়াল রাখতে হবে যেন চাকরিটা পেয়ে তারা কৃতজ্ঞ বোধ করে আর সেই কৃতজ্ঞতার ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করতে প্রস্তুত থাকে। সিস্টেম জানা থাকলে এটা নিশ্চিত করা কোনো ব্যাপারই না। বাকি কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে হায়ার করা খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে চালিয়ে দিবেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের দুনিয়াতেও আপনার কদর বাড়বে।

৩. বছর ঘুরতে ঘুরতে আপনি নিশ্চয়ই চার-পাঁচ বা তারও বেশি প্রভাষক শিক্ষকের নিয়োগ করিয়ে ফেলতে পারবেন। সব আপনার বা আপনার গ্রুপের লোক। আপনার বংশীবাদক ও পদলেহী। সফল আপনি। অনেক দূর এগিয়ে গেছেন।
এরপর আপনার কাজ হবে নিজের যা যা আরাদ্ধ খায়েস আছে সেসব পূরণে নজর দেয়া। বিভাগ পরিচালনার জন্য যে কমিটিগুলো আছে, সেসবের প্রধান পদাধিকার বলে আপনি, সেখানে আর সবাই আপনার রিক্রুটেড ও অনুগত। আপনি সব কিছু তাদের দিয়ে গণতান্ত্রিক ও বিধিসম্মতভাবে পাস করিয়ে নিতে পারবেন।

এই প্রভাষকরা ক’দিন পরেই পদোন্নতির জন্য আবেদন করবেন। এ সবই নিজেদের ব্যাপার। যদি এর মধ্যে কেউ গোষ্ঠীচ্যুত না হয়ে থাকেন তাহলে সবাইকে নিয়েই এগিয়ে যাবে বিভাগ। আর কেউ যদি “বেশি বোঝে” তার শাস্তি সে পাবে। ভাবনা নেই, ফরেন বডি কোনো সিস্টেম নেয় না, উগরে দেয়।

এবার আপনি বিভাগ ছেড়ে ফ্যাকাল্টি/শিক্ষক সমিতি এসবের নানান পদের জন্য দেনদরবার করতে থাকেন। কেবল খেয়াল রাখতে হবে, বিভাগ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব সুযোগ-সুবিধা আছে সেগুলোর কোনো একটিও যেন অসতর্কতায় ফোসকে না যায়। অবশ্য আপনার চেলারা আছে, তারা সবই আপনার হয়ে নজরে রাখবেন।

৪. এই যে বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলো, তাতে লেখাপড়া গবেষণা ইত্যাদি কী হবে না হবে তা ঠিক করবে বিভাগ নিজেই। তারা স্বাধীন। শিক্ষকদের বিচার-আচার জবাবদিহি- তাও প্রাথমিকভাবে যার যার বিভাগের হাতেই। মানে, আপনার সহকর্মী শিক্ষককূলের হাতেই। সেখানে ঠিক থাকলে সব ঠিক। সবাই মিলেমিশে একটা জিনিস নিশ্চিত করবেন, পরিশ্রম যেন না বেড়ে যায়, আর আয় যেন না কমে। ব্যস, সফল আপনি।

৫. আপনি কী পড়ান, আপনি শুদ্ধ করে উগান্ডু ভাষা উচ্চারণ করতে পারেন কি না, যা পড়ান তার সঙ্গে  আপনার দেশের-বাস্তব জগতের- বর্তমান কালের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, শিক্ষার্থীরা বুঝলো কি না, তাদের কাজে আসলো কি না বা বিষয়টা নিজেই বুঝেন না বলেই যে আপনি মহান ইংরেজিতেই বৃতা দিয়ে যাচ্ছেন- এই সব নিয়ে কোনো দিন কেউ প্রশ্ন তুলবে না। তুললেও নিশ্চিত থাকেন, আপনার সহকর্মীরা আপনাকে রক্ষা করবেনই। এই বিপদে তো তারাও একদিন পড়তে পারে, তাই না?

সবার মধ্যে যদি সদ্ভাব বজায় থাকে তাহলে আপনার এবং আপনার সহকর্মীদের আর কোনো দিন কিছু নিয়ে টেনশন করতে হবে না। এবার কেবল এগিয়ে যাওয়া আর পাওয়ার পালা।

৬. আপনি বা আপনার সহকর্মীরা কে কীভাবে উচ্চতর ডিগ্রি পাচ্ছেন-দিচ্ছেন, কী মানের লেখাপড়া করে ডিগ্রি নিয়ে, নিবন্ধ বা বই লিখে পদোন্নতি নিচ্ছেন- এসব কেউ কোনোদিন খোঁজ নিতে যাবে না। “পায়ে-হাতে-ধরা” ডিগ্রিটা নিয়ে নিতে পারলে তো কেল্লাফতে। কীভাবে আর কী নিয়া এই ডিগ্রি কামালেন, তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। আপনার ও আপনার সহকর্মীদের আয় উন্নতি ঠেকায় কে? নানান কলাকৌশল প্রয়োগ করে উগান্ডুদেশের আর যে কোনো চাকরির চেয়ে স্বল্প সময়ে আপনি সর্বোচ্চপদে চলে যেতে পারবেন।

৭. এরপর আপনি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নেবেন, সান্ধ্যকালীন কোর্সের নামে সনদ বেঁচবেন, কনসালটেন্সি করবেন, সরকারি প্রকল্পে কাজের ধান্ধা করবেন, গবেষণার নামে সরকারি যেটুকু টাকা পয়সা পাওয়া যায় সেইসব যেনতেনভাবে গিলে খাবেন, জবাবদিহিহীন ছুটি কাটাবেন, টক-মিষ্টি শো করবেন, যা ইচ্ছা তাই করবেন, আপনাকে আটকানোর কেউ নেই। জবাবদিহি করার কোনো সিস্টেম নেই। যারা এসব করার জন্য আছে তারা তো সব আপনারই মতো, আপনারই ভাই-ব্রাদার। জানেন তো, কাকের মাংস কাকে খায় না। যদি কেউ খায়, তবে কমিউনিটির স্বার্থে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চয়ই নেয়া হবে। ভোটের একটা ব্যাপার আছে না?

৮. উগান্ডুদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি এক অদ্ভুত চাকরি। আপনি পরীক্ষায় প্রশ্ন করবেন, টাকা পাবেন; প্রশ্ন উগান্ডুদেশের ভাষা থেকে মহান ইংরেজি ভাষায় বা ভাইসভারসা ভাষায় অনুবাদ করবেন, টাকা পাবেন; পরীক্ষার হলে ডিউটি করবেন, টাকা পাবেন; খাতা দেখবেন, মাথা গুনে টাকা পাবেন; পরীক্ষার্থীদের ভাইভা নিবেন, টাকা পাবেন; প্রশ্নপত্র মডারেশনের জন্য টাকা পাবেন; প্রশ্নপত্র ফটোকপি করবেন, পৃষ্ঠাগুনে তার জন্যও টাকা পাবেন; নম্বরপত্র লিখবেন, তাও টাকা পাবেন। চাকরি থাকলে, ক্লাস নেন বা না নেন, মাস গেলে বেতন-বোনাস তো পাবেনই। ক্লাস নেয়ার বাইরে প্রতিটা কাজের জন্য আপনি সম্মানী পাবেন, সে হাউস টিউটর হন, প্রোভস্ট হন কিংবা যেকোনো দায়িত্বে থাকেন- অতিথিরক্ত আর্থিক সুবিধা আপনি পাবেনই।

৯. শিক্ষকতা করেন, গবেষণা করেন, জ্ঞানের সাধনা করেন, মাথার কাজ করেন- কী কঠিন কঠোর জীবন! এজন্য অন্য যেকোনো পেশার তুলনায় প্রচুর ছুটির ব্যবস্থা আছে আপনার জন্য। সপ্তাহে দুইদিন করে ১০৪  দিন তো ছুটি আছেই, আপনার বিভাগ আবার একদিন ডে-অফ রাখবে, আর আপনি নিজে একদিন ডে-অফ রাখবেন। মানে সপ্তাহে মাত্র চারদিন আপনি ছুটি তো পেয়েই যাবেন। এতে বছরে কম পক্ষে ২০০ দিন আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে না গেলেও চলবে। আর শীত গ্রীষ্ম বর্ষা, রোজা-পূজা-ইস্টার এসব ছুটিও তো নিতে হয় আপনাকে। বিদেশ যেতে হয়, অসুস্থতা পায়, এ ছাড়া আর্নলিভ নিতে হয়, ডিউটিলিভ নিতে হয়। শিক্ষাছুটি নিয়ে স-বেতন পাঁচ-ছয় বছর কাটানো তো মামুলি বিষয়। ছুটির গল্প না হয় আরেক দিন করা যাবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, কেরানিদের মতো আপনাকে দশটা পাঁচটা অফিস করতে হয় না, ক্লাস থাকলে আপনি ক্লাসের আগ দিয়ে যাবেন আর ক্লাস শেষেই বাসায় ফিরে আসতে পারবেন। চাই কি নিজে একটা ব্যবসাও চালাইতে পারবেন। সংসদের ভোটেও দাঁড়াইতে পারবেন। আর কি চাই?

সবচেয়ে বড় পাওয়া হচ্ছে, আপনার চাকরির মেয়াদ। অন্যান্য সরকারি চাকুরেদের চেয়ে অন্তত ৫ বছর বেশি চাকরি থাকবে আপনার। কেউ কেউ এক্সটেনশনও নিশ্চয়ই পাবেন। যোগাযোগ থাকলে ট্যেশে যাওয়ার আগ পর্যন্ত চাকরিরত অধ্যাপক থাকতে পারবেন। হা হা!

১০. এরপরও আপনি কাঁদতে পারবেন, ভাইবোন, মা-বাবা, শ্যালক-শ্যালিকাদের বলতে পারবেন, বাধা মায়নার চাকরি, ঘুষ নেই, কাউরে তো কিছু দিতে পারি না। সমাজ আপনারে বুদ্ধিজীবী গুনবে, সরকার আপনাদের কাউরে কাউরে পদক-প্লট-ফ্ল্যাটও দেবে।

১১. নটে গাছটি মুড়ে দেয়ার আগে: আল্লাহ না করুক, উগান্ডুদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ভাতা সুযোগ-সুবিধা আর কিছু বাড়ানো হলে, এখনকার মতো তেল আর টাকা নিয়া কেউ চাকরি নিতে আসবে না, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে অপহরণ করবে না; একে ফর্টি সেভেন রাইফেল নিয়ে এসে ব্যাপারটার ফয়সালা করবে। উগান্ডুদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া তখন আরো গৌরবের বিষয় হবে নিশ্চিত। প্রকৃত যুদ্ধজয়ীর সম্মান নিশ্চয়ই সমাজ শিক্ষকদের দেবে।

পাদটীকা: উগান্ডুদেশের বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকরা অপ্রীতিকর সত্য সহ্য করতে পারে না।
(আর রাজী: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক, লেখাটি ফেসবুক থেকে নেয়া)



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

সিরিজে সমতা ফেরালো এইচপি টিম

আপিল শুনানি এ বছরেই: আইনমন্ত্রী

২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৬২৬ জন হাসপাতালে ভর্তি

জন্মাষ্টমী শোভাযাত্রার নিরাপত্তায় ডিএমপির ১০ নির্দেশনা

মাদারীপুরে আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ৩০

সরষের মধ্যে ভূত থাকতে নেই: হাইকোর্ট

কাশ্মীর ইস্যু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়

‘ঝুঁকি নিয়েই রোহিঙ্গাদের প্রত্যবাসন শুরু করতে হবে’

ন্যায় বিচার এই দেশ থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে: রিজভী

মিঠামইনে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতির লোকজনের হামলা, নিহত ১

খালেদার মুক্তির জন্য রাজপথে আন্দোলন করতে হবে-দুদু

খেলোয়াড় ও দর্শকদের প্রিয় কোচ হতে চান ডমিঙ্গো (ভিডিও)

ঢাকায় ডেঙ্গুতে স্কুলছাত্রের মৃত্যু

ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন

প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিয়ে ঢাকা ছাড়লেন জয়শঙ্কর

কাশ্মীর ইস্যুতে আবার মধ্যস্থতার প্রস্তাব ট্রাম্পের