শ্রীনিবাসের বয়ানে ক্রাইস্টচার্চ হামলা

তামিমের চোখ তখন ভেজা

এক্সক্লুসিভ

মানবজমিন ডেস্ক | ১৯ মার্চ ২০১৯, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪১
তামিম ইকবালের চোখ তখন ভেজা। প্রকৃতপক্ষেই বাংলাদেশের ড্রেসিং রুমে কারো চোখ তখন শুষ্ক নেই। শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা থেকে সামান্যর জন্য রক্ষা পেয়েছেন তারা। তারপর আশ্রয় নিয়েছেন হেগলি ওভাল ড্রেসিং রুমে। সেখানে কয়েক মুহূর্ত আগের ওই ঘটনার সম্প্রচার হচ্ছিল টেলিভিশনে। একটি দৃশ্যে দেখানো হলো মসজিদের ভেতরের একটি স্থান। প্রবেশ পথ থেকে এটা খুব বেশি দূরে নয়। এখান থেকেই হামলাকারী তার রক্তের নেশা শুরু করেছিল।
ঠিক এক সপ্তাহ আগে, এই একই স্থানে দাঁড়িয়েছিলেন তামিম ইকবাল। মুসল্লিতে ঠাঁসা ছিল সেদিন মসজিদ।  ভেতরে কোনো জায়গা না থাকায় এখানে দাঁড়িয়েই নামাজ আদায় করেছিলেন তিনি। তামিমের সঙ্গে ছিলেন ভারতীয় ভিডিও বিশ্লেষক শ্রীনিবাস চন্দ্রশেখর। তিনি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে ও আইপিএলে সানরাইজারস হায়দারাবাদের সঙ্গে কাজ শেষে জানুয়ারিতে যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশ টিমের সঙ্গে। তিনিই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কাছে এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
এতে বলা হয়েছে, একদিকে বিশৃঙ্খল অবস্থা, তার মধ্যেও টিমকে আরো স্বস্তিতে রাখার চেষ্টা করলেন শ্রীনিবাস। চূড়ান্তভাবে যখন বাস থেকে নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো বাংলাদেশ টিমের সদস্যরা, তখন বাসটি মসজিদের সামনে পার্ক করা। এ সময় খালেদ আহমেদ খুব বিতর্ক শুরু করলেন। তিনি তখন পরা ছিলেন দীর্ঘ সালোয়ার-কুর্তা। এ সময় শ্রীনিবাস তার জ্যাকেট খুলে নিলেন এবং খালেদকে তা পরতে বললেন। এ সম্পর্কে শ্রীনিবাস বলেন, আমি সুস্থ ছিলাম। তখন আমার পরনে ছিল একটি টি-শার্ট। আমার ভয় ছিল যদি হামলাকারী এসে পড়ে বা অন্য কোনো ঘটনা ঘটে তাহলে খালেদকে দেখবে পাঞ্জাবি পরা অবস্থায়। তাই মনে হলো তাকে যদি জ্যাকেট পরানো যায় তাহলে সেটাই হবে ভালো কিছু।
শ্রীনিবাস বলেছেন, এ সময় বাসের সামনের সারিতে একটি আসনে বসা ছিলেন তামিম ইকবাল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, সবাই বাসের মেঝেতে শুয়ে পড়ো। সবাই শুয়ে পড়লো। এ সময় গাড়ির সামনের সারিতে বসা ছিলেন তামিম ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। তারা দেখছিলেন কী ঘটছিল।
শ্রীনিবাস সাধারণত বাসের পেছনে ডানদিকের আসনে বসেন। সেখানেই বসা ছিলেন তিনি। সামান্য আগে তিনি প্রথম দৃষ্টিতেই বড় গোলমালের দৃশ্য দেখতে পান। তিনি দেখেন একজন নারী হেঁটে বেরিয়ে আসছেন। এরপরই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। এ বিষয়ে শ্রীনিবাস বলেন, আমি ভেবেছিলাম তিনি চেতনা হারিয়েছেন। তাকে সহায়তা করার জন্য আমরা তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের বাস থামাই। দেখতে পাই একটি বালককে, সে ওই নারীর সঙ্গে ছিল। সেই বালকটি তাকে টেনে তুলছে আর রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তখনই বুঝতে পারি কিছু একটা ঘটছে সেখানে। ঠিক তখনই তামিম চিৎকার করে আমাদেরকে শুয়ে পড়তে বললেন।
ওই হামলার পর দুটি রাত পেরিয়ে গেছে। শ্রীনিবাস এখনো ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। রোববার রাতে তার ভারতে পৌঁছার কথা। মিলিত হওয়ার কথা  মুম্বইতে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের কারোরই ভালো ঘুম হয়নি। হামলার দিন শেষে রাতে তারা সবাই ভোর ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত অধিনায়কের রুমে গাদাগাদি করে অবস্থান করেন। এমনকি তারা নিজেদের জন্য নির্ধারিত রুমে যাওয়ার সক্ষমতাও যেন রাখছিলেন না সে সময়। শ্রীনিবাস বলেন, আমরা যদি একা থাকতাম, তখন এই ভয়াবহতায় মনের কী অবস্থার সৃষ্টি হতো! আমাদের মনে হয়েছিল গ্রুপটি একসঙ্গে থাকাই আমাদের জন্য ভালো হবে।
যেখানে বাসটি দাঁড়ানো ছিল সেখান থেকে মসজিদটি দেখতে পাচ্ছিলেন তারা। শ্রীনিবাস বলেন, ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ দিশাহারার মতো দৌড়াচ্ছিলেন। সর্বত্রই ছিল আতঙ্ক। বাসের কাছে এসে কিছু মানুষ খেলোয়াড়দেরকে বাসের ভেতরেই থাকতে পরামর্শ দিলেন। হামলাকারী সম্পর্কে তথ্য দিলেন। ঠিক ওই সময় তামিম চিৎকার করেছিলেন এবং তাতে খেলোয়াড়রা মেঝেতে শুয়ে পড়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করা হলো। কিন্তু কেউই বিশ্বাস করছিলেন না নিউজিল্যান্ডের মতো জায়গায় এমন হামলা হয়েছে। এমনকি যখন শুয়ে পড়েছেন তখনও তামিম ইকবাল ক্রিকইনফোর একজন সাংবাদিক মোহাম্মদ ইসামকে ফোনকল করলেন। ওই সাংবাদিক বাংলাদেশি টিমকে মসজিদে নামাজ আদায় করতে যাওয়ার সময় দেখেছেন। কিন্তু তামিমের ফোনকল পেয়ে ওই সাংবাদিক মনে করেছিলেন তিনি মনে হয় কৌতুক করছেন। তামিম তাকে আবার কল করলেন এবং তাকে বললেন, শুনুন শব্দ। তখনই সবাই বিষয়টি সম্পর্কে বুঝতে পারলো।
শ্রীনিবাস বলেন, এ সময় কেউ কেউ পরামর্শ দেন পেছনের দরজা দিয়ে বাস থেকে নেমে চলে যাওয়া উচিত খেলোয়াড়দের। কিন্তু এমন প্রস্তাবে ভেটো দেয়া হলো। বলা হলো হামলাকারী কতজন আমরা তা নিশ্চিত নই। যদি বাইরে আরো হামলাকারী থাকে এবং সে যদি সোজা আমাদের দিকে চলে আসে?
আমাদের বাসের সামনে ও পেছনে গাড়ি পার্ক করা ছিল। তাই আমাদের বাসটি নড়তে পারছিল না। তাই সিদ্ধান্ত হলো সবাই বাসের ভেতরেই থাকবো।
দৈবক্রমে নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন বিলম্বিত হয়। সম্ভবত এ জন্যই ওইদিন বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের জীবন রক্ষা পেয়েছে। শ্রীনিবাস বলেন, ১০ মিনিট আগেই সংবাদ সম্মেলনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল বাংলাদেশ টিম। কিন্তু বলা হলো, মাহমুদুল্লাহর সংবাদ সম্মেলনের সময় ১০ মিনিট বিলম্বিত করা হয়েছে। ‘তাই আমরা ড্রেসিংরুমের  ভেতরেই ফুটবল খেলতে থাকি এবং তিনি আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে, ওই সংবাদ সম্মেলনে অনেক বেশি প্রশ্ন করা হয়েছিল’ (যার জন্য ওই বিলম্ব হয়)। শ্রীনিবাস বলেন, এখন সেই আতঙ্ক আর মর্মপীড়া ওই সময়ের আর বিস্তারিত ছাড়া কিছু মনে পড়ছে না। আমার এতটুকু মনে আছে যে, তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিম চিৎকার করছেন। বলছেন, দৌড় দিও না। দৌড় দিও না। বাসের ভেতরেই থাকো। এমনই আরো কিছু হয়তো বলছিলেন। বাংলাদেশের এই টিমে অনেক তরুণ খেলোয়াড় আছেন।
ওইদিন বিকালে তাদের মধ্য থেকে ১৮ জন ওই মসজিদে গিয়েছিলেন। পরিকল্পনা ছিল তাদের দুজন শ্রীনিবাস ও সৌম্য সরকার তাদেরকে মসজিদের বাইরে নামিয়ে দিয়ে আসবে। তারা হোটেলে ফিরবেন ট্যাক্সি ক্যাব ধরে।
শ্রীনিবাস আরো বলেন, যখন আমি ওই বাসে চড়লাম টি-শার্ট ও শর্টস পরে, তখন একজন সাংবাদিক এসে আমাকে বললেন, শর্টস পরে আপনার মসজিদের ভেতরে যাওয়া উচিত না। আমি জবাবে বললাম, আমি যেতে পারি যদি কারো একটি বাড়তি ট্র্যাক প্যান্ট পাই। অথবা সৌম্যকে নিয়ে হোটেলে ফেরার সম্ভাব্যতাই বেশি ছিল। তাই আমার মনে হলো আমাদের টিমের ১৬ জনের মসজিদে যাওয়ার কথা ছিল।
এক সপ্তাহ আগে শুক্রবারে ওয়েলিংটনে একই ঘটনা ঘটেছে। সেখানে শ্রীনিবাস ও সৌম্য দুজনে হিন্দু হওয়ার কারণে তারা খেলোয়াড়দের মসজিদে নামিয়ে দিয়ে বাইরে অপেক্ষায় থাকেন, যাতে তাদেরকে নিয়ে ফিরতে পারেন।  
সর্বশেষ ঘটনা সম্পর্কে শ্রীনিবাস বলেন, ওই এলাকাটি ঘিরে রেখেছিল পুলিশ। তারা বললেন, গাড়ি থেকে নেমে যেতে পারেন টিমের সদস্যরা। খেলোয়াড়রা তাই করলো। এ সময় তাদেরকে না দৌড়ে স্রেফ হাঁটার পরামর্শ দিলেন মুশফিক ও তামিম।
শ্রীনিবাস বলেন, তামিম ও ওই টিমের সঙ্গে আমি ছিলাম। মনে করতে পারি- হেগলি পার্কে যখন আমরা অনেক মানুষকে দেখতে পাই তখন পুরো টিমই আমার সঙ্গে ছিল। ওই পার্কের ভেতরকার মানুষগুলো মসজিদে নামাজ আদায় করতে যাচ্ছিল। আমরা তাদেরকে ঘটনা সম্পর্কে জানাই এবং ফিরে যেতে বলি।
ড্রেসিংরুমে ফেরার পর বাংলাদেশ টিমের সঙ্গে যোগ দেন স্পিন বোলিং কোচ সুনীল যোশি ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অন্য কর্মকর্তারা। এ সময় সবার চোখ দিয়ে অবাধে অশ্রু ঝরছে। সুনীল জোশি ও অন্য কর্মকর্তারা তখন সবাইকে সান্ত্বনা দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তারা এমন পরিস্থিতিতে সেখানে রইলেন দেড় ঘণ্টার মতো ছিলেন।
শ্রীনিবাস বলেন, এরই কোনো একপর্যায়ে আমাদেরকে বলা হলো ট্যুর বাতিল করা হয়েছে। শিগগিরই টিম ফিরে যাবে। এরপর তারা হোটেলে টিমের কাছ থেকে চলে গেলেন। সিদ্ধান্ত হলো খেলোয়াড়রা সবাই একরুমে থাকবেন। ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন টেলিভিশনে খবর দেখাচ্ছে। দেশে ফেলে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন খেলোয়াড়রা।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন