সেই সিবিএ নেতাদের মন্ত্রণালয়ে তলব

তদন্ত শুরু, মুখ খুলতে শুরু করেছে ভুক্তভোগীরা

এক্সক্লুসিভ

স্টাফ রিপোর্টার | ১৯ মার্চ ২০১৯, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:০৮
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সিবিএ নেতাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়ম-দুর্নীতি ও সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে আরো একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। এই কমিটি ১৯শে মার্চ বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলামকে মন্ত্রণালয়ে তলব করেছে। অন্যদিকে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়া, দুদক ও মন্ত্রণালয়ের তলবের পর অত্যাচারিত হওয়া সিবিএ নেতা-কর্মচারীরা মুখ খুলতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে মতিঝিল থানায় পৃথক দুটি সাধারণ ডায়েরি ও আদালতে মামলা হয়েছে এ দুই সিবিএ নেতার বিরুদ্ধে।
সংগঠনের দায়িত্বে নির্ধারিত দুই বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অতিরিক্ত ৯ মাস ধরে (সিবিএ) দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি সিবিএ নেতাদের নিয়ে মানবজমিনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ১৩ই মার্চ দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌ মন্ত্রণালয়। যুগ্ম সচিব আবদুছ ছাত্তার শেখের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির অপর সদস্য হলেন- উপসচিব কাজী নজরুল ইসলাম। এছাড়া বিআইডব্লিউটিএ সিবিএ নেতাদের অনিয়ম, অত্যাচার ও দুর্নীতি তদন্তে গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি আরেকটি কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়।
ওই কমিটির কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। অন্যদিকে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ ও তদন্ত কমিটি গঠনের পর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ চার-পাঁচজন সিবিএ নেতার বিরুদ্ধে অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তঅদের কাছে নানা অভিযোগ আসছে। এসব অভিযোগের মধ্যে সভাপতি আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি ও তাঁর ছবি অবমাননার অভিযোগও রয়েছে। এই ঘটনায় গত বছর ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে সংস্থার কর্মচারী মজিবুর রহমানের করা মামলাটি মতিঝিল থানায় তদন্তাধীন রয়েছে।
জানা গেছে, সমপ্রতি বিষয়টি জানাজানি হলে আবুল হোসেনকে বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বিআইডব্লিউটিএ ইউনিটের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এই দুই সিবিএ নেতাসহ আরো কয়েকজন সিবিএ নেতার বিরুদ্ধে বিআইডব্লিউটিএ’র সংখ্যালঘু ও নিরীহ কর্মচারীদের নিপীড়নের অভিযোগও পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, এদেরকে মারপিট ও কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। হিসাব শাখার কর্মচারী সঞ্জীব দাসকে দৈহিক নির্যাতনের পর বদলি করা হয়েছে বরিশালে। অথচ সেখানে তার কোনো পদ নেই। প্রধান কার্যালয়ে সবার সামনে মারপিটের ঘটনায় সিএমএম আদালতে দায়ের করা অভিযোগ তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত শেষে সিবিএ সভাপতি আবুল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, সহসভাপতি আকতার হোসেন, অর্থ সম্পাদক নাজমুল কবির মজুমদার ও প্রচার সম্পাদক আলী হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেয় পিবিআই। মামলাটি বর্তমানে সিএমএম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
সংস্থার প্রকৌশল শাখার কর্মচারী তুষার কান্তি বণিককে মারপিটের ঘটনায় মতিঝিল থানায় করা সাধারণ ডায়েরির তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দেয় পুলিশ। সেখানে আবুল হোসেন, রফিকুল ইসলাম ও আকতার হোসেনকে অভিযুক্ত করা হয়। এরপর এ তিনজন আদালতে মুচলেকা দিয়ে জামিন পান। সর্বশেষ গত ১৪ই মার্চ দুপুরে আবুল হোসেন ও রফিকুল ইসলামের নির্দেশে সহসভাপতি আকতার, নাজমুল কবির মজুমদার, আলী হোসেন ও মনির শিকদার সিবিএ কার্যালয়ে গিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদক পান্না বিশ্বাসের কক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি নামিয়ে ফেলেন এবং তার চেয়ারে থাকা মুজিব কোর্টটিও ফেলে দেন। এরপর কক্ষটি তালাবদ্ধ করে দেন তারা। গত ৫ই ফেব্রুয়ারি সকালে নৌ নিরাপত্তা শাখার কর্মচারী শহীদুল ইসলামকে ইউনিয়ন কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে আবুল হোসেন, রফিকুল ইসলাম, আলী হোসেন, নাজমুল কবির মজুমদার ও মিজানুর রহমান তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও মারধর করেন। একইদিন বিকালে কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ করে তাকে ভোলা নদীবন্দরে বদলি করা হয়। মারপিটের ঘটনায় শহীদুল ইসলাম ওইদিন মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। যা তদন্তাধীন রয়েছে।
এছাড়া কয়েকজন সিবিএ নেতার বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি বিলাসী জীবন যাপনের তথ্য পাওয়া গেছে। সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জ সদর থানার আমলাপাড়ায় মোল্লার বিল্ডিং নামে পরিচিত বহুতল ভবনের যে ফ্ল্যাটে থাকেন, গাড়ি পার্কিসহ তার মাসিক ভাড়া ৩০ হাজার টাকা। অথচ এই কর্মচারীর বেতন সর্বসাকুল্যে ৩৫ হাজার টাকা। সকল ধরনের কর্তন শেষে তিনি মাসিক বেতন পান প্রায় ১৫ হাজার টাকা। তবে সমপ্রতি তার নামে ১০ কোটি টাকার জমি ক্রয়, দামি গাড়ি ব্যবহার এবং স্ত্রী-পুত্রের নামে দুটি ডকইয়ার্ডের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর গাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছেন। ইতিমধ্যে দুই ডকইয়ার্ড থেকে সাইনবোর্ডও নামিয়ে ফেলেছেন। এখন ডকইয়ার্ডের জন্য বিআইডব্লিউটিএ থেকে ইজারা নেয়া জমি ফেরত দেয়ার চেষ্টা করছেন। সহসভাপতি আকতার হোসেনের নামে রাজধানীর মুগদায় ৩৩/এ আহমদবাগে একটি বহুতল ভবনের চারতলায় কোটি টাকা মূল্যের ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে। তৃতীয় শ্রেণির এই কর্মচারী সস্ত্রীক সেখানে বসবাস করেন।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন