রাতভর নাটকীয়তা

প্রথম পাতা

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার | ১৩ মার্চ ২০১৯, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৩৫
নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সকালে শুরু হয় বহুল প্রত্যাশিত ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন। সন্ধ্যার পর হলগুলো থেকে আসতে থাকে নির্বাচনী ফলাফল। হল সংসদের ফলাফল নিজ নিজ হলের প্রাধ্যক্ষরা ঘোষণা করলেও কেন্দ্রীয় সংসদের ফলাফল পৌঁছে দেয়া হয় সিনেট ভবনে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার অফিসে। অপেক্ষা বাড়তে থাকে প্রার্থী ও সমর্থকদের। টানটান উত্তেজনা। কেন্দ্রীয় সংসদের নেতৃত্বে কারা আসছেন- জানতে প্রার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা কৌতূহল। হলগুলো থেকে অসমর্থিত সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে ভিপি (সহ-সভাপতি) পদে এগিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফরম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুর। শিক্ষার্থীদের রায় নুরের ব্যালটে যাওয়ায় ঝুঁকিতে রয়েছেন ছাত্রলীগ থেকে এ পদে নির্বাচন করা সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। তারপরও আশাবাদী নেতাকর্মীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে অভিনন্দন জানানো হয় শোভনকে।

তবে ঘড়ির কাঁটা যত ডানদিকে ঘুরছে ততই সমীকরণ পাল্টাতে থাকে। অস্থিরতা বাড়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে। রাত সাড়ে ১০টায় রিটার্নিং অফিসের একটি সূত্রে জানা যায়, তিনটি হলের ফলাফল আসা বাকি রয়েছে। সেগুলো আসলে ফলাফল ঘোষণা করা হবে। অন্যদিকে হলগুলোর নির্বাচনী কাজে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অনেকে জানান, ভিপি পদে কোটা আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুর এগিয়ে রয়েছে। এর পরপরই সব হলের ফলাফল চিফ রিটার্নিং অফিসারের কাছে আসলেও ফল ঘোষণা করতে বিলম্ব করে প্রশাসন। রাত সাড়ে ১১টার পর থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে কিছুক্ষণের মধ্যে ফল ঘোষণা হবে জানানো হলেও অপেক্ষা শেষ হয় না।

রাত ১২টা পেরিয়ে ভোর সাড়ে ৩টা। দীর্ঘ প্রতীক্ষা প্রার্থী ও সমর্থকদের। রাত সাড়ে ১২টার দিকে ফলাফল ঘোষণা করতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কক্ষে আসেন ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পদাধিকার বলে ডাকসুর সভাপতি হিসেবে তিনিই ঘোষণা করবেন ফলাফল। কিন্তু রিটার্নিং অফিসারের কক্ষে বসে ফলাফল দেখতে থাকেন ভিসি। বৈঠকে বসেন প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত শীর্ষ শিক্ষকদের সঙ্গে। উপস্থিত ছিলেন কয়েকটি হলের প্রাধ্যক্ষ ও রেজিস্ট্রার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধি থেকে নির্বাচিত একজন সিন্ডিকেট সদস্যও। সেখানে ফলাফল নিয়ে নানা বিশ্লেষণ হয় বলে জানা যায় বিভিন্ন মাধ্যমে। এক পর্যায়ে রাত দেড়টার দিকে চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. এস এম মাহফুজুর রহমান ও মুহসীন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া রিটার্নিং কর্মকর্তার কক্ষ থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ফল ঘোষণা হবে; আমরা কোথায় ঘোষণা করা যায়- তার জায়গা খুঁজে আসি। কিন্তু তারা সিনেটের দ্বিতীয় তলা ঘুরে আবার আসেন তৃতীয় তলায়। এক পর্যায়ে চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, সিনেটের মূল মিলনায়তনে ঘোষণা হবে ডাকসুর নির্বাচিত প্রার্থীদের নাম। এরপর সাংবাদিক, প্রার্থী ও সমর্থকদের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হয় সিনেট মিলনায়তনে। সেখানে সাউন্ড সিস্টেম ঠিক করে সবাইকে সুশৃঙ্খলভাবে বসতে আহ্বান জানান রেজিস্ট্রার। প্রস্তুত করা হয় মঞ্চ।

কিন্তু সেখানেও দীর্ঘ প্রতীক্ষা। ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান তখনো ব্যস্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার কক্ষে। এদিকে সিনেট মিলনায়তনে থাকা সবার মধ্যে ধৈর্যহারা ভাব। বিরক্তির ভাব উপস্থিত শিক্ষকদের মধ্যেও। এক পর্যায়ে রাত সোয়া ৩টার দিকে মিলনায়তনে ফলাফল ঘোষণা করতে আসেন ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান, প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মু. সামাদ, রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. এস এম মাহফুজুর রহমান, রেজিস্ট্রার এনামউজ্জামান। এসময় ভিসির পেছনে  পেছনে মিলনায়তনে আসেন ছাত্রলীগের ভিপি প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, জিএস প্রার্থী গোলাম রাব্বানী, এজিএস প্রার্থী সাদ্দাম হোসেন। এসময় সিনেট মিলনায়তনে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। উচ্ছ্বাস ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে। রাত ৩টা ১৭ মিনিটে ফলাফল ঘোষণা শুরু করেন ভিসি।

এসময় তিনি বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। আমি শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানাই তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের প্রার্থীকে বেছে নিয়েছে। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া কোনো ধরনের অঘটন ছাড়া এ নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারায় আমি সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি বলেন, গত কয়েকদিন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সহাবস্থান ছিল উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটিই বোঝায় ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ। তিনি বলেন, দীর্ঘ ২৮ বছর পরের এ নির্বাচন একেবারেই ত্রুটিমুক্ত হয়েছে বলে আমি দাবি করবো না। কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। এরপর ভিসি বলেন, ডাকসু গঠনতন্ত্রের ৮ (ও) অনুযায়ী প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা আমাকে চিঠির মাধ্যমে ফলাফল দিয়েছেন। সে ফল আমি এখন ঘোষণা করছি।’ ফল ঘোষণার শুরুতেই ভিসি বলেন, ‘সহ-সভাপতি নুরুল হক নুর। ভোট পেয়েছেন ১১ হাজার ৬২ এবং নির্বাচিত। এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মানি না মানি না, ভুয়া বলে স্লোগান দিতে থাকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। মলিন হয়ে যায় শোভনসহ নেতাদের চেহারা। উত্তেজিত কর্মীরা ভিসিকে দালাল ও রাজাকার বলে স্লোগান দেয়। আসন ছেড়ে এসে সামনের দিকে দাঁড়ায়। প্রায় ৩ মিনিট চুপ থাকার পর ভিসি আবার ঘোষণা করেন জিএস পদে নির্বাচিত প্রার্থীর নাম।

বলেন, সহ-সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। এসময় নেতাকর্মীরা করতালি দিয়ে রাব্বানীকে স্বাগত জানায়। একে একে ভিসি এজিএস সাদ্দাম হোসেন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরীসহ অন্যান্য নির্বাচিত প্রতিনিধির নাম ঘোষণা করলে করতালিতে নির্বাচিতদের অভিবাদন জানায় উপস্থিত নেতাকর্মীরা। যদিও সমাজসেবা সম্পাদক পদে কোটার প্রার্থী আকতার হোসেনের নাম ঘোষণা করলে প্রথমে হাততালি দেয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। পরে মানি না বলে স্লোগান দিতে থাকে। এদিকে ফলাফল ঘোষণা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগের এক নেতা বলেন, মাননীয় উপাচার্য আমার কিছু কথা আছে। এরই মধ্যে বিক্ষোভ করতে থাকে শোভনের অনুসারীরা। তারা টেবিল চাপড়ে চিৎকার করতে থাকে। আর নুরকে ভিপি হিসেবে মানবে না বলে স্লোগান দেয়। কটূক্তি করে স্লোগান দিতে থাকে ভিসির বিরুদ্ধেও। রাজাকার ও দালাল বলে ভিসিকে আখ্যা করে শোভনের অনুসারীরা। ‘শিবির নুরকে মানি না’, ‘এই ফল মানি না’, ‘নুরের চামড়া তুলে নেবো আমরা’, ‘শিবির ধরো, জবাই করো’ স্লোগান দেয়।

টেবিলে উঠে ভিসিকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করতে থাকে। উত্তেজিত শোভন অনুসারীরা এক পর্যায়ে সামনের সারিতে বসা শিক্ষকদের ওপর লাফ দিয়ে মঞ্চের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করে। লাঞ্ছিত করে ভিসিকে। ভাঙচুর করা হয় ভিসির সামনের টেবিলসহ নানা সরঞ্জামাদি। এরই মধ্যে মঞ্চে ছুটে আসেন শোভন, রাব্বানী সাদ্দাম। তারা নেতাকর্মীদের শান্ত করার চেষ্টা করলেও উত্তেজিত নেতাকর্মীরা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে ভিসির ওপর। চেয়ার ছাড়িয়ে সব শিক্ষক একদিকে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। দর্শক সারি থেকে একটি জুতা নিক্ষেপ করতে দেখা যায় ভিসিকে উদ্দেশ্য করে। নির্বাক ভিসি শুধু তাকিয়ে থাকেন শিক্ষার্থী নামধারী ছাত্রলীগের উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীরা। এরপর মঞ্চ থেকে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সবাইকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ করে বলেন, ‘স্যার আমাদের পিতৃতুল্য। সবাই চুপ করো।’ তিনি বলেন, ‘নুর ছাত্রী হল থেকে দরজা ভেঙে ব্যালট ছিনতাই করেছে। তার নামে মামলা হয়েছে। সে এখন আসামি।’ এ সময় দর্শক সারি থেকে স্লোগান ওঠে, ‘বহিষ্কার...বহিষ্কার’। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে চলা এ বিক্ষোভের এক পর্যায়ে ভিসিকে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসেন ছাত্রলীগের তিন নেতা ও শিক্ষকরা। কিন্তু পথে পথে বাধা দেয়া হয় ভিসিকে।

গুলির শব্দ শোনা যায় ক্যাম্পাসের কয়েকটি জায়গায়। নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ভিসিকে বাসভবনে নিয়ে আসেন। অন্যদিকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করে ভিসির বাসভবনের দিকে এগুতে থাকে। সিনেট থেকে বের হয়ে গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক পদে পুনরায় নির্বাচন চাই। নুরকে বহিষ্কার করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অন্যদিকে নেতাকর্মীদের মধ্যে শোভনের অনুসারীরা বিক্ষোভ অব্যাহত রাখে। পাশে থাকা হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের অতিথি কক্ষের পেছন থেকে ছোড়া দুটি ফাঁকা গুলির শব্দ শোনা যায়। ভিসির বাসভবনের সামনে জড়ো হয়ে নির্বাচনকে প্রহসন উল্লেখ করে সহ-সভাপতি পদে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এ সময় পর্যন্ত বিক্ষোভ চলতে থাকে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

১৮ মিনিটে ৫ গোল দিয়ে ম্যান সিটির রেকর্ড

পালাতে চেয়েছিল শামীম

খালেদের সেই টর্চারসেল

ক্যাসিনো ঘিরে অন্য সিন্ডিকেট

ভিআইপিদেরও হার মানিয়েছে ‘শামীম স্টাইল’

বশেমুরবিপ্রবি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা

কলাবাগান ক্লাবের শফিকুল ১০ দিনের রিমান্ডে

‘রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি’ সুচির দুই রূপে বিস্মিত ক্যামেরন

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা জাতিসংঘে

দুর্গা পুজো নিয়ে রাজনীতির দড়ি টানাটানি

শিক্ষায় এগিয়ে রিটা সম্পদে সাদ

নূরুল কবীরের চোখে যে দুই কারণে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান (অডিও)

বশেমুরবিপ্রবি’র ভিসির পদত্যাগ দাবি ভিপি নুরের

সওজের জায়গায় এমপি খোকার অবৈধ মার্কেট

দুর্নীতির দায় নিয়ে সরকারের পদত্যাগ করা উচিত: ফখরুল

তাদের মুখে রাঘব বোয়ালের নাম