ঐক্যফ্রন্টের গণশুনানি

ভোট হয়েছে রাতেই, নেতাদের প্রতিও ক্ষোভ

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৩০
গণশুনানিতে অংশ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা। তারা প্রত্যেকেই নিজ নির্বাচনী এলাকার তথ্য-উপাত্ত ও দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তারা বলেছেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে এসেছে ততই প্রতিকূলতা তীব্র হয়েছে। প্রতিদিনই হামলার শিকার হয়েছেন প্রার্থীসহ দলের নেতাকর্মীরা। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার অন্তর্গত    উপজেলা ও পৌর বিএনপিসহ অঙ্গদলের নেতাকর্মী এবং প্রার্থীর এজেন্টদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে নির্বিচারে। পুরোনো মামলার পাশাপাশি তাদের গ্রেপ্তার করে আসামি করা হয়েছে গায়েবি মামলায়। প্রার্থীদের উপর হামলা ছাড়াও একপর্যায়ে ঘরবন্দি করে ফেলা হয় পুলিশি পাহারা বসিয়ে।

দলের নেতাকর্মীসহ এজেন্টদের সঙ্গে প্রার্থীদের করে ফেলা হয় বিচ্ছিন্ন। নির্বাচনের আগের রাতে তালিকা ধরে ৪০-৫০টি কেন্দ্রে ৩৫ ভাগ ভোট কাটার নীলনকশার কথা তারা জেনেছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসন ও সেনাবাহিনীকে অবহিত করা হলেও ন্যূনতম পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ২৯শে ডিসেম্বর কোথাও মধ্যরাতে, কোথাও বা সন্ধ্যার পর প্রিজাইডিং কর্মকর্তাকে চাপ দিয়ে ব্যালট নিয়ে ভোট কেটেছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। এ কাজে তাদের প্রকাশ্যে এবং সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছে নির্বাচন কমিশন ও পুলিশসহ পুরো প্রশাসনযন্ত্র। ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনটি মূলত আগের রাতে সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে প্রহসনে। ভোটের দিন ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে পারেন নি, গেলেও ভোট দিতে পারেন নি।

কারণ আগের রাতে ৩৫ ভাগ ভোট কাটার পরও জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে না পেরে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন দিনের বেলায় ভোট কেটে তা উন্নীত করেছে ৬০-৮০ ভাগে। ফলে মৃত, বিদেশে অবস্থানরত, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন লোকজনের ভোটও কাস্ট হয়েছে। অতীতের নির্বাচনগুলোতে যেসব কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থীরা দেড়-দুই হাজার ভোট পেতেন সেখানে এবার তাদের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৪০-৫০টি। এমনকি বহু কেন্দ্রে ধানের শীষের ভোট দেখানো হয়েছে শূন্য। এদিকে, গণশুনানিতে অংশ নেয়া দলীয় প্রার্থীদের তোপের মুখে পড়েন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। প্রার্থীরা জানতে চান, কোন যুক্তিতে শেখ হাসিনাকে বিশ্বাস করে নির্দলীয় সরকারসহ সাতদফা দাবি থেকে সরে এসে ও চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছিল।

সে সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক ও দূরদর্শী ছিল না। প্রার্থীরা জানতে চান, নির্বাচনের আগে যখন পরিস্থিতি চূড়ান্তভাবে প্রতিকূলে চলে যায়, তখন শীর্ষ নেতৃত্ব কেন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নি। ইতিহাসে নজিরবিহীন অনিয়ম ও কারচুপির মাধ্যমে সরকার নির্বাচনের সাজানো ফল প্রকাশ করার পরও কেন দ্রুততম সময়ে কোনো প্রতিবাদ বা আন্দোলন কর্মসূচি দিতে পারেন নি নেতারা। এ ব্যাপারে দলের অভ্যন্তরে একটি জবাবদিহিমূলক সভা আহ্বানের প্রস্তাবও দেন কয়েকজন। নির্বাচন ইস্যুতে কার্যকর প্রতিবাদ বা কর্মসূচি দিতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রার্থীরা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাতিল করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন আয়োজন ও বিএনপি দলীয় প্রার্থীদের প্রায় সবাই চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার জন্য শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর চাপ দেন। খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দাবিতে কঠোর কর্মসূচি দিতে শীর্ষ নেতাদের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। দুইপর্বে সাত ঘণ্টা শুনানিতে অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৪১ জন প্রার্থী ও নির্বাচনে গুরুতর আহত দুই নারী।

সুপ্রিম কোর্র্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে আয়োজিত একাদশ জাতীয় সংসদের তথাকথিত নির্বাচনের ওপর গণশুনানিতে সভাপতি ও প্রধান জুরির ভূমিকায় থাকা ড. কামাল হোসেন সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের মালিকানা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। আমরা কেউ এ স্বৈরাচারকে মেনে নেইনি, স্বৈরাচারকে সরাতে হবে। এ সময় তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি যুক্তিসঙ্গত ও অবিলম্বে তার নিঃশর্ত কারামুক্তি পাওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন। ড. কামাল হোসেন বলেন, আজকের গণশুনানিতে খালেদা জিয়ার মুক্তি একটি প্রধান দাবি। এটা নিয়ে আগেও জোরালো দাবি এসেছে। গণশুনানি থেকেও আমরা এই দাবি জানাচ্ছি।

এটাকে কোনো নির্বাচনই বলা যায় না খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি হওয়া উচিত: ড. কামাল
দেশব্যাপী অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যেন না হয় তার জন্য যত রকমের কৌশল নেয়া দরকার সরকার তার সবকিছু নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যেন মানুষ ভুলে যায়, তার সকল ব্যবস্থা করেছে সরকার। এটাকে কোনো নির্বাচনই বলা যায় না।

এটাকে নির্বাচনের নামে প্রহসন বলতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আমি মনে করি বিএনপি চেয়াপারসন খালেদা জিয়ার অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি হওয়া উচিত। গতকাল সুপ্রিম কোট মিলনায়তনে দিনব্যাপী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের নিয়ে গণশুনানিতে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ড. কামাল বলেন, দেশব্যাপী অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যেন না হয় তার জন্য যত রকমের কৌশল নেয়া দরকার সরকার তার সবকিছু নিয়েছে। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন যেন মানুষ ভুলে যায় তার ব্যবস্থা করেছে সরকার। এটাকে কোনো নির্বাচনই বলা যায় না। এটাকে নির্বাচনের নামে প্রহসন বলতে হবে। দেশের মালিককে তাদের মালিকানা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

সংবিধানকে অমান্য করা হয়েছে। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে আমাদের এই জিনিসগুলো দেখতে হচ্ছে। ড. কামাল বলেন, যে দলের নামে এগুলো করা হয়েছে সেই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর দল। যার ডাকে সাড়া দিয়ে লাখ লাখ যুবক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তার দলের নামে এগুলো হোক- এটা আমরা চাই না। ড. কামাল বলেন, এখন যারা আওয়ামী লীগ করে তারা বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ করে না। এখন আওয়ামী লীগের নামে যেটা হচ্ছে, এটা খুবই লজ্জাজনক। তিনি বলেন, এখন এক দলীয় শাসন নয়, এক ব্যক্তির শাসন চলছে। যেখানে যা ইচ্ছা তাই করা হচ্ছে। এখানে দলের কোনো ভূমিকা নেই। এক ব্যক্তিই সবকিছু করছেন। ঐক্যফ্রন্টের এ শীর্ষ নেতা বলেন, প্রশাসনে যারা আছেন তারা তো আজীবন চাকরি করবেন না। হয়তো রিটায়ার্ড করবেন। অথবা মারা যাবেন। যদি এখন মারা যান, আপনাদের যারা উত্তরসূরি রয়েছে তারা আপনাদের নিয়ে লজ্জাবোধ করবে।

একদিনের জন্যও তারা আপনাদের নিয়ে গর্ববোধ করতে পারবে না। আপনারা যে কাজগুলো করছেন, রাষ্ট্রের যে কাজগুলো রয়েছে, সংবিধানের যে দায়িত্ব রয়েছে, সেগুলো না করে দলীয় ও এক ব্যক্তির সেবক হিসেবে যে কাজ করে জীবন শেষ করছেন। এর জন্য আপানদের লজ্জা পাওয়া উচিত। বিবেককে জিজ্ঞেস করুন, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারাটা দেখুন। আপনাদের নিজের চেহারা দেখে নিজের ঘৃণা হওয়া উচিত। আপনাদের কারণে দেশের কোটি কোটি মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নির্বাচনের নামে যে প্রহসন করেছেন এটার প্রয়োজন কী? আপনাদের কে বাধ্য করেছে এগুলো করার জন্য? এটাকে নির্বাচন বলা যাবে না। এটা তথাকথিত নির্বাচন। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তো আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধেই লড়াই করেছি। তিনি বলেন, জনগণ ক্ষমতার মালিক। এটা সংবিধানে স্পষ্ট লেখা আছে। তাদেরকে মালিকানা থেকে বঞ্চিত করার চেয়ে বড় অপরাধ আর হতে পারে না। তাদের মালিকানা কেড়ে নিলে স্বাধীনতার ওপর আঘাত করা হয়।

তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে, দেশের নাগরিকের ঐক্য বৃদ্ধি করে যেন জনগণের মালিকানা ফিরিয়ে আনতে পারি, সেই চেষ্টা করতে হবে। যে স্বৈরাচার ক্ষমতা আত্মসাৎ করে, লুটপাট করে দেশকে ধ্বংস করছে, দেশের সংবিধানকে ধ্বংস করছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে, মানুষের অধিকারগুলোকে ধ্বংস করছে তাদের থেকে দেশকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। আমরা যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারি দেশটা কোনো স্বৈরাচারের না। কারণ, স্বাধীন দেশে জনগণ ক্ষমতার মালিক। এটা যদি না থাকে তাহলে স্বাধীন দেশ দাবি করা যায় না। ড. কামাল হোসেন বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে জোরালোভাবে বক্তব্য এসেছে। সব বক্তা এ ব্যাপারে বলেছেন। আমিও মনে করি অবিলম্বে তার নিঃশর্ত মুক্তি হওয়া উচিত। এই অনুষ্ঠান থেকেও এই দাবি যাওয়া দরকার।

এটা খুবই দুঃখজনক যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৮ বছর পরে এই ধরনের দাবি আমাদের জানাতে হয়। যারা গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য কাজ করছেন তদের কারামুক্তির জন্য আমাদের দাবি জানাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, এদেশের মানুষের আত্মবিশ্বাস আছে। আমাদের অতীত ইতিহাসও রয়েছে- স্বৈরাচার এদেশে কোনো দিন চিরস্থায়ী হতে পারেনি। আমরাও কোনো দিন স্বৈরাচার সরকারের শাসন মেনে নেইনি। আমরা বিশ্বাস করি দেশের মালিক জনগণ। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হব। সবাই এই দেশের মালিক হিসেবে ভূমিকা পালন করব। বর্তমানে দেশের যে অবস্থা। এই অবস্থা মেনে নেয়া যায় না। আমরা মেনে নিই না। এই অবস্থা থেকে আমরা ইনশাআল্লাহ অবশ্যই মুক্ত হব। এর আগে স্বাগত বক্তব্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণশুনানির সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, আমরা বিচারক না, কোনো বিচার করার ক্ষমতা আমাদের নেই, কর্তব্যও নেই। শুনানি হচ্ছে গণশুনানি, জনগণের উদ্দেশে এরা বক্তব্য রাখবেন।

বিচার যেটা হচ্ছে, সেটা ট্রাইব্যুনালে হবে। আর গণআদালত যেটা বলা হয় সেটার বিচার জনগণ করবে। ড. কামাল হোসেন বলেন, আমরা এসেছি অনুষ্ঠানটা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা হোক, সে জন্য। যে বক্তব্যগুলো আসবে, সেগুলো পরে প্রকাশ করা হবে। বই আকারেও প্রকাশ করা হবে। সবার বক্তব্য রেকর্ড করা হবে। তিনি বলেন, এই গণশুনানির মূল উদ্দেশ্য, সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। সংবিধানে আছে এই দেশের জনগণ এই দেশের মালিক। ভোটাধিকার রক্ষা করার জন্য আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধ করে জয়ী হয়েছিলাম। তিনি বলেন, সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদে লেখা আছে, জনগণ ক্ষমতার মালিক। এবার যে নির্বাচন হয়েছে, সেটা নিয়ে প্রার্থীদের অনেকে ট্রাইব্যুনালে মামলা আকারে ফাইল করেছে। দলের নেতাদের ধারণা হলো নির্বাচনের পদ্ধতি কী ঘটেছে, সেটা জনগণকে জানানো দরকার। ড. কামাল হোসেন বলেন, জনগণ যারা ক্ষমতার মালিক হিসেবে ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে চেয়েছিলেন, তাদের জানানো উচিত। নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা, কী ঘটেছিল। কোর্টে যেটা হবে, মামলা ফাইল করা হয়েছে, সেটা হবে।

কিন্তু জনগণ ক্ষমতার মালিক হিসেবে তাদেরও জানানো দরকার। চকবাজারে হতাহতদের স্মরণে শোকপ্রস্তাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গত ৩০শে ডিসেম্বর দেশে তথাকথিত একটি প্রহসনের নির্বাচন করা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকার কারণে দেশে যা ইচ্ছা তাই করছে সরকার। কোনো কিছুর জন্য তাদের জবাবদিহি করতে হয় না।
কুমিল্লা-১০ আসনের প্রার্থী মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, ৭০ সালের নির্বাচনে আমি ছাত্রলীগের নির্বাচনী সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলাম। এবারের নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির পক্ষে যে গণজোয়ার দেখেছি তা আমার ৫২ বছরের রাজনৈতিক জীবনে দেখিনি। শতভাগ জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন ব্যর্থ হলাম? এই বিষয়ে একটি জবাবদিহি থাকা দরকার বলে মনে করি। আগে কেন্দ্রীয় নেতারা কেন পারলেন না তা জানার জন্য একটি সমাবেশ দরকার।

তিনি বলেন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবরা যদি বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সমাবেশ দেন। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা যদি প্রোগ্রাম চান তাহলে প্রোগ্রাম দেবেন কে? বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া কিছুই সম্ভব হবে না। আর কিছু না করে খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যবস্থা করুন। তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন অথর্ব ও একপক্ষীয়। নির্লজ্জের মতো দায়িত্ব পালন করেছে। জীবনে অনেক দালাল দেখেছি কিন্তু নুরুল হুদার মতো নিম্নমানের দালাল দেখিনি। বিচারক প্যানেলের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা এমন একটি রায় দিন যেটা গণ-আদালতের রায়ে পরিণত হবে।  কারণ, আপনারা উচ্চ আদালতের বিচারকদের চেয়ে কম যোগ্য নন।  তিনি বলেন, সব জয় জয় নয়, সব পরাজয় পরাজয় নয়। শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিতে গেলেও হেরেছে দেশ ও দেশের মানুষ।

পাবনা-১ আসনের প্রার্থী ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেছেন, প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর ছত্রছায়ায় সংবিধান লঙ্ঘন ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) পদদলিত করা হয়েছে নির্বাচনের নামে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছত্রছায়ায় যারা ভোট ডাকাতিতে সহায়তা করেছে তারা অপরাধী। কারণ তারা সংবিধান লঙ্ঘন করে রাষ্ট্রকে আঘাত করেছে। রাষ্ট্রের এ আঘাত একটি ক্ষত হয়ে থাকবে। এ ক্ষত সহজে সারবে না। এর পরিণতি কী হবে ইতিহাসে ভুরি ভুরি নজির রয়েছে। তিনি বলেন, আরা জানি মামলা করে কিছু হবে না। মামলা নিয়ে আমারও তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার পরেও মামলা একটি রেকর্ড হয়ে থাকবে। নির্বাচনে আমাকে ৩ বার এজেন্ট দিতে হয়েছে। দুই দফায় এজেন্টদের গ্রেপ্তার করার পর তৃতীয় দফায় এজেন্ট দেয়া হলে এলাকা ছাড়া হতে হয়েছে নেতাকর্মীদের। গণশুনানিতে তিনি পাবনা-১ আসনের ভোটে অনিয়ম ও জালিয়াতির ১৮৯ পৃষ্ঠার প্রমাণ জমা দেন।

রাজশাহী-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, নির্বাচনের আগে তার এলাকায় মোড়ে মোড়ে নেতাকর্মীদের সাদা পোশাকের বাহিনী কড়া নজরদারিতে রাখে। দিনভর কড়া নজরদারির আর হামলার ভয়ে তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতেই পারেনি। তিনি বলেন, ভোট ডাকাতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়েছে, জয়ী হয়েছে ঐক্যফ্রন্ট।

চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসনের বিএনপি প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ভোটের আগেই ৭ই নভেম্বর থেকে কারারুদ্ধ ছিলেন। বাকলিয়া কেন্দ্রে তিনি ৮টি ভোট পেয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ১৮০০ ভোট; যা অবিশ্বাস্য। নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে আবেদন করলে তারা জানায় ভোটের নথি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

হবিগঞ্জ-১ আসনের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও গণফোরামের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, সাদা পোশাকে তার কর্মীদের তুলে নেয়া হয়। নির্বাচনের দেড় মাস আগে থেকেই কর্মীরা বাড়িছাড়া হয়েছেন।

কুড়িগ্রাম-২ আসনের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) আ ম সা আমিন বলেন, ৩০শে ডিসেম্বর বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হয় নাই। একটি কেন্দ্রে ধানের শীষে ভোট পড়ায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নিয়ে ব্যালট পেপার পুড়িয়ে ফেলেছিল। সেদিন তারা ব্যালট নয় গণতন্ত্রকে পুড়িয়েছিল। সংবিধান ও জনগণের ভোটের অধিকারকে পদদলিত করেছে। তিনি বলেন, ভোটের আগের দিন আমার স্থানীয় বাসার সামনে পুলিশের চৌকি বসিয়ে ধানের শীষের নেতা কর্মীদের বাসায় আসতে বাধা দিয়েছে, নির্বিচার গ্রেপ্তার করেছে। তাদের ছাড়াতে গেলে বলেছে ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছাড়া সম্ভব নয়।

নারায়নগঞ্জ-৫ আসনের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী এস এম আকরাম বলেন, সভা-সমাবেশ করতে মঞ্চ তৈরির জন্য নিজের এলাকা থেকে লোক পাওয়া যায় না। বাইরে থেকে আনতে গেলে বাধা দেয়া হয়। মুন্সিগঞ্জ থেকে মাইক ভাড়া করে আনতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ফরিদপুর-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী শ্যামা ওবায়েদ বলেন, দুর্নীতিবাজ ও ভোটের অধিকার হরণকারী এ সরকার যতদিন থাকবে ততদিন নিরীহ ও অসহায় মানুষকে হারাতেই থাকবো। মানুষ মনে করে ফরিদুপর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকা। যদি তা-ই হয় তাহলে রাতের আধারে ভোট কাটতে হবে কেন?
সিরাজগঞ্জ-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী রুমানা মাহমুদ অভিযোগ করেন, তার প্রচার মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। গুলিতে তার কর্মী মেরি বেগমের দুই চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বক্তব্য রাখার সময় তিনি মেরি বেগমকে নিয়ে মঞ্চে ওঠেন। মেরি বলেন, তাকে ভোট দেয়ার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে, নয়তো চোখ ফেরত দিতে হবে।

যশোর-৩ আসনের অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সরকারের এজেন্সির এক সদস্য আমাকে জানিয়েছিলেন রাত ১০টা থেকে ৫৮ কেন্দ্রে সিল মারা হবে। রিটার্নি কর্মকর্তাকে জানালে তিনি বলেন, আপনি ভুল শুনেছেন। মূলত সন্ধ্যা সাতটা থেকে সিল মারা হয়েছিল।

বরিশাল-৪ আসনের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী নুরুর রহমান জাহাঙ্গীর বলেন, ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনকে কোনো নির্বাচন বলা যাবে না। ভোটের নামে ডাকাতি হয়েছে। সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের হামলায় আহত হওয়ার পর আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সহায়তা চাইলে উল্টো তারা আমাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করেছে।

কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের জেএসডি মনোনীত ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে এলাকার মানুষের যে অভূতপূর্ব ভালোবাসা পেয়েছি তা জীবনেও ভুলার মতো নয়। করিমগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম সুমন আমাকে সহায়তা করায় তাকে নির্মম নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছিল।

মাদারীপুর-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন বলেন, মূলত ২০শে ডিসেম্বরের পর নির্বাচনের আকাশে অন্ধকার নেমে আসে। ১৩৪ কেন্দ্রের ৫৮টিতে রাতে আড়াইটায় ব্যালটে সিল মারে তারা। একটি কেন্দ্রে আমি গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে প্রতিহত করেছিলাম।

নাটোর-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন ছবি বলেন, ভোটের দিন আমাকে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। বেলা ১২টায় কেন্দ্রের সঙ্গে আলাপ করে ভোট বর্জনের ঘোষণা করে। তিনি জানান, নির্বাচনী প্রচারণাকালে তার সঙ্গে থাকা অনেক নারী কর্মীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা চালান ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা।
বরিশাল-৬ আসনের বিএনপি প্রার্থী আবুল হোসেন খান তার নির্বাচনী এলাকার বর্ণনা তুলে ধরে বলেন, শুধু ঐক্যফ্রন্টই নয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটাররাও ভোট দিতে পারেনি।

লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব জানে কীভাবে তার এলাকায় ভোট ডাকাতির মঞ্চায়ন হয়েছে। এধরনের ঘটনায় সারা দেশের জনগণকে প্রতিবাদ করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই পারবে জনগণের বিজয় ফিরিয়ে আনতে, গণতন্ত্র মুক্ত করতে।

গাজীপুর-৩ আসনের ঐক্যফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী ইকবাল সিদ্দিকী বলেন, একের পর এক মামলা দিয়ে ঐকফ্রন্টের নেতাকর্মীদের কার্যত এলাকা ছাড়া করে দেয় নির্বাচনের অনেক আগেই। প্রশাসনের সহায়তায় তারা মসজিদের খতিব প্রবীণ আলেমকে মামলা থেকে রেহাই দেয়নি।

টাঙ্গাইল-৮ আসনের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কন্যা কুড়ি সিদ্দিকী বলেন, ‘এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ চোর হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আর ঐক্যফ্রন্ট প্রকৃত অর্থেই বিজয়ী হয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট মানুষের মন পেয়েছে আর আওয়ামী লীগ তাদের মন থেকে চিরতরে মুছে যাচ্ছে।’

সাতক্ষীরা-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর ইসলাম হাবিব জানান তার এলাকায় ২৯শে ডিসেম্বর রাতে একদফা ভোট কাস্ট হয়ে গেলেও প্রশাসন পুরোপুরি বিজয়ী হবার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল না। আর এজন্য দিনের বেলায়ও ‘ভোট চুরি’ করতে কেন্দ্রে মহোৎসবে মেতে উঠে তারা। আর এ ধরনের কর্মকাণ্ডে প্রতিবাদ করতে যাওয়ায় তাকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা প্রশাসনের সহায়তায় কুপিয়েছে।

ঢাকা-৬ আসনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী বাঙালিদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আর ২০১৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর হাসিনা বাহিনী জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এটা শুধু ঢাকা শহরে নয়। সারা দেশে একই চিত্র। ৩০শে ডিসেম্বর কোনো ভোট হয়নি। ২৯শে ডিসেম্বর রাতেই সব ভোট হয়ে গেছে। এমনকি ইভিএমেও রাতের বেলায় প্রিসাইডিং অফিসারের আঙুলের ছাপ দিয়ে ওপেন করে ভোট দেয়া হয়েছে।

পরদিন দিনের বেলায় সেখানে যারা ভোট দিতে গিয়েছে তাদের বলা হয়েছে এখানে মেশিন নষ্ট। ভোট দেয়া যাবে না। ঢাকা-৬ আসনের ওয়ারি থানার সোনিয়া আকতার নামের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের এক এজেন্ট বলেন, আমি এজেন্ট হয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে গেলে পুলিশ কার্ড দেখে বলে আপনারটা পরে দেখা হবে। পরে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা এসে চলে যেতে বললে আমি বলি আমার দায়িত্ব আমি পালন করবোই। তখন তারা ১০-১৫ জন ছেলে আমাকে উঁচু করে ধরে নিয়ে ফিকে মারে। আমি তখন ২ মাসের গর্ভবতী ছিলাম। তাদের নির্যাতনের কারণে আমার গর্ভের সন্তানটাও মারা গেছে।

ঢাকা-৭ আসনের প্রার্থী ও গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসিন মন্টু বলেন, এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এই নির্বাচন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের হয়নি। নির্বাচন হয়েছে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে। পুলিশ প্রশাসনসহ সকল বাহিনী এক হয়ে জনগণের বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছে। একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পরে সমস্ত বাহিনীর শীর্ষ অফিসাররা সবার আগে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানায়- এটা আমার জীবনে কোনোদিন দেখিনি।

নরসিংদী-৪ আসনের প্রার্থী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, আমার এলাকায় যাওয়ার জন্য এসপির অনুমতি নিয়ে যেতে হবে বলে জানিয়ে দেন থানার ওসি। এরপর এলাকায় যখন প্রবেশ করেছি তখন সামনে রাম দা, লাঠিসোঁটা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। তখন আমি বিজিবির কাছে গিয়ে সহযোগিতা চাইলে আমাকে বলে আপনি কেন এসেছেন। তখন আমি তাদের বললাম আমি একজন প্রার্থী। আমি এলাকায় আসতে পারবো না? এরপর তাদের কাছে নিজের নিরাপত্তা চাইলে বলে বিজিবির গাড়ির সিটের উপর শুয়ে পড়তে। তার পর তারা ৬ জন আমার উপরে বসে পড়ে। তখন আমার হাটুটা ভেঙে যাচ্ছিল। বললে তারা বলে একটু কষ্ট তো হবেই। এই ছিল আমার নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থা।

ঢাকা-১ আসনের প্রার্থী আবু আশফাক বলেন, আমাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে এই নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করবে সরকার সেটা আমরা আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। কারণ নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দ দেয়ার পর কোথাও মামলা হয় না। কিন্তু এবারের নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দের পরও আমাদের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

কারচুপির বর্ণনা দিয়ে লালমনিরহাট-৩ আসনের প্রার্থী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, এই নির্বাচনে ভোট ডাকাতির চিত্র আমার কাছে রয়েছে। ভোটের আগে ছাত্রলীগের এক ছেলে আমাকে ফোন করে বললো, ছাত্রলীগের ১৪ জনকে বাছাই করে ভোট ডাকাতির জন্য ৫০ হাজার করে টাকা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনে ৭টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। আমি জানতে চাই- যে কেন্দ্রে ভোটার যায়নি সে কেন্দ্রগুলোতে কীভাবে শতভাগ ভোট পড়ে?

হবিগঞ্জ-১ আসনের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, আমরা নির্বাচনের আগেই ধারণা করেছিলাম- সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ হয়তো আমাদের থাকবে না। নির্বাচনের সময়কালে নিজের বাড়ি মিটিং শেষে নেতারা যখন ঘর থেকে বের হয় সাদা পোশাকধারী লোক তাদের মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। মিথ্যা মামলার যে প্রক্রিয়া সরকার করেছে তা বুঝতে পারলাম। তিনি বলেন, নেতাদের না পেয়ে ১৬ বছরের ছেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নির্বাচনের রাতে প্রায় ২০টা ফোন এলো ভোট তো অর্ধেক হয়ে গেছে। ‘আমরা এমন সরকার চাই না মানুষ যাদের ভয় পাবে, আমরা এমন সরকার চাই যারা মানুষকে ভয় পাবে।’

পাবনা-৪ আসনের প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, আমার অনেক কেন্দ্রে এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। কেন্দ্র থেকে পিটিয়ে তাদের বের করে দেয়া হয়েছে। ২৬শে ডিসেম্বর মোটর সাইকেলে করে আমার ওপর পৈশাচিক হামলা করা হয়। বোমা ফাটিয়ে গুলি করতে করতে আমার সামনে আসে। তারপর পেছন থেকে একটা ছেলে আমাকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে। তিনি বলেন, তার আগেই পাবনা জেলার এসপি ও ডিসি বলেছিলেন, আপনার আসনে সিল মারা হবে। আমি বললাম, কত পারসেন্ট। তারা বলল ৩৫ পার্সেন্ট। আমি বললাম সমস্যা নেই তবুও আমি জয়ী হবো। কিন্তু রাতে সিল মারার পর আশ্বস্ত হতে না পেরে দিনেও সিল মেরেছে তারা। শীর্ষ নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমি শুধু বলতে চাই, নির্বাচন নিয়ে গণশুনানি করে কী হবে জানি না? আসুন আমরা এমন কোনো কর্মসূচি দিই, যে কর্মসূচির মধ্যদিয়ে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে পারবো। এর বাইরে কিছু হতে পারে না।

নরসিংদী-১ আসনের প্রার্থী খায়রুল কবির খোকন বলেন, আমাকে নির্বাচনের দুই মাস আগেই গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। সেখানে প্রতিদিনই সকাল বেলায় দেখতাম শত শত বিএনপি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে আনা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে এক পর্যায় এমন অবস্থা হয় যে কারাগারে তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

এছাড়া, বিএনপি চেয়াপারসনের উপদেষ্টা জয়নাল আবদীন ফারুক, জেএসডি সভাপতি আসম আবদুর রবের স্ত্রী তানিয়া রব, কক্সবাজারের শাহজাহান চৌধুরী, দিনাজপুরের আকতারুজ্জামান মিয়া, কিশোরগঞ্জের অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, রংপুরের সাইফুল ইসলাম, শেরপুরের মাহমুদুল হক রুবেল, জামালপুরের শাহ ওয়ারেস আলী মামুন, পিরোজপুরের রফিকুল ইসলাম দুলাল, ঝিনাইদহের সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ও কুষ্টিয়ার আহসান হাবিব লিংকন বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন- বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, গণফোরামের প্রেসিডিয়াম মেম্বার অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিক ও জেএসডির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন। এর আগে সুপ্রিম কোর্র্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে ‘একাদশ জাতীয় সংসদের তথাকথিত নির্বাচনের ওপর গণশুনানি’ শীর্ষক এই আয়োজন শুরু হয় বেলা ১০টায়। প্রধান জুরি ড. কামাল হোসেনের স্বাগত বক্তব্য ও পুরান ঢাকার চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতদের স্মরণে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শোকপ্রস্তাব উত্থাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় গণশুনানির কার্যক্রম। পরে নিহতদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন ও নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত করা হয়। ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গণশুনানিতে জুরি হিসেবে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ, প্রফেসর ড. নূরুল আমিন ব্যাপারী, সাবেক বিচারক আকম আনিসুর রহমান খান, প্রফেসর দিলারা চৌধুরী, অ্যাডভোকেট মহসিন রশিদ ও প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও লালমনিরহাট থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আসাদুল হাবিব দুলুর বক্তব্যের মধ্যদিয়ে শুরু হওয়া প্রথম পর্ব চলে দুপুরে একটা পর্যন্ত। মধ্যখানে জুমার নামাজ ও দুপুরের খাবারের জন্য দেড়ঘণ্টার বিরতি শেষে দুপুর আড়াইটায় দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়ে ড. কামাল হোসেনের সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয় বিকাল পৌনে ৬টায়। গণশুনানিতে উপস্থিত থাকলেও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, সেলিমা রহমান, শামসুজ্জামান দুদু, জেএসডি সভাপতি আসম আবদুর রব, তানিয়া রব, শহীদউদ্দিন মাহমুদ স্বপন, কৃষক শ্রমিক জনতালীগের কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, মহাসচিব হাবিবুর রহমান তালুকদার বীরপ্রতীক, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বক্তব্য দেননি।

এছাড়া, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদ, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, হারুন অর রশীদ, সাবেক এমপি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, শাহিনুর পাশা চৌধুরী, শাহ আবু জাফর, মাসুদ অরুন, সেলিম রেজা হাবিব, জিএম সিরাজ, আবু ইউসুফ খলিলুর রহমান, বিএনপি দলীয় প্রার্থী আবু সুফিয়ান, জসিম উদ্দিন সিকদার, জেবা খান, জাহিদুর রহমানসহ ঐক্যফ্রন্টের বেশ কয়েকজন প্রার্থী উপস্থিত ছিলেন। তবে গণশুনানিতে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী, দলের সিনিয়র নেতাদের বেশিরভাগ এবং ২০ দলীয় জোটের বেশ কয়েকটি দলের কোনো প্রার্থী অংশ নেননি। এছাড়া অন্যতম শরিক জামায়াতকে দাওয়াত দেয়া হয়নি। উল্লেখ্য, বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, নাগরিক ঐক্য নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একসঙ্গে ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ভোটের দিনই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে ‘অনিয়মের’ অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান ও নতুন নির্বাচনের দাবি জানায়। সে নির্বাচনে বিজয়ী ফ্রন্টের ৮ প্রার্থী শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভোটের ৫৩ দিন পর ফ্রন্টের প্রার্থীরা তাদের অভিযোগ ও অভিজ্ঞতা জানাতে এই ‘গণশুনানিতে’ উপস্থিত হন। এছাড়া একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরাও উপস্থিত ছিলেন।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Kazi

২০১৯-০২-২৩ ১৭:১৬:৪৮

যে দলের যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন আছে সে নির্বাচনী এলাকায় রাতের ভোট ও হয় নি। এটাই দেশে প্রচলিত নিয়ম। কি মন্তব্য করব।

Maksudur

২০১৯-০২-২২ ২০:০৯:০৯

Ki motamot dibo? Amader motamoter daam asey kii?

আপনার মতামত দিন

এবার মালিবাগে পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা

বগুড়ায় নুরের ওপর হামলা

ধানের দাম নেই, চালে ছাড় নেই

বৃষ্টিতেও দৃঢ় মনোবল টাইগারদের

খালেদার মামলায় আদালত স্থানান্তরের বৈধতা নিয়ে রিট

তরুণ সাংবাদিক ফাগুনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যা মামলা

ট্রাভেল পারমিটে কড়াকড়ি জটিলতার আশঙ্কা

গতবছর ফেসবুকের কাছে ১৯৫ ব্যবহারকারীর তথ্য চেয়েছিল বাংলাদেশ

রঙ লাগিয়ে ঈদে সড়কে নামছে লক্করঝক্কড় বাস

তারেকের স্মৃতি হাতড়ে ফেরেন নুরুন নাহার

রাজাকারদের তালিকা সংরক্ষণের সুপারিশ

মামলার আগেই গ্রেপ্তার, শাহপরাণে তোলপাড়

ইতালিতে প্রদর্শিত হলো ড. ইউনূসের জীবনীভিত্তিক অপেরা

৩০শে মে সন্ধ্যায় শপথ নেবেন মোদি

পদত্যাগ করলেন মহারাষ্ট্র কংগ্রেস প্রধান

চিকিৎসকদের আরো দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান ডা. এ আর খানের