মৌলভীবাজারে থামছে না পাহাড় কাটা

বাংলারজমিন

ইমাদ উদ দীন, মৌলভীবাজার থেকে | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪৩
প্রয়োজনে ও অপ্রয়োজনে মাটি কেটে সাবাড় হচ্ছে টিলা। বিক্রি হচ্ছে মাটি। ন্যাড়া হচ্ছে পাহাড়। উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল। আবাসন ও খাদ্য সংকটে পড়েছে বন্যপ্রাণী। আর মহা হুমকিতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। কিন্তু তারপরও কিছুতেই থামছে না পাহাড় খেকো চক্র। এখন জেলাজুড়ে দিন দুপুরেই দেদার চলছে পাহাড় কাটা। বেপরোয়া পাহাড় খেকোচক্র। এমন অপকর্ম থামাতে তৎপর নয় সংশ্লিষ্টরা। দায়সারা গোছের দুয়েকটি অভিযানেই দায়িত্ব পালন শেষ। এমন উদাসীনতায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পাহাড়ি টিলা, প্রকৃতি ও বনজ পরিবেশ। এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। এখন প্রতিনিয়তই এমন দৃশ্যই চোখে পড়ছে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে। প্রভাবশালী চক্রের এমন বেপরোয়া মনোভাবে বরং দিন দিন এ ধ্বংসযজ্ঞ বেড়েই চলেছে। কেউ কেউ পাহাড় কেটে পাদদেশে বসতঘর বানাচ্ছেন। অনেকেই মাটি বিক্রি করছেন। আবার কেউ কেউ তৈরি করছেন রিসোর্ট বা বাগান। রাস্তা তৈরি বা মেরামতের অজুহাতসহ নানা ছুঁতায় কায়দা কৌশলে কাটা হচ্ছে পাহাড়। কিছুতেই থামছে না পাহাড় কাটা।

রহস্যজনক কারণে নির্বিকার স্থানীয় প্রশাসন। এ কারণে দিন দিন ছোট হচ্ছে এ জেলার পাহাড় ও বনাঞ্চলের  আয়তন। একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চালাচ্ছেন এই নিধনযজ্ঞ। পাহাড় কাটার এমন উৎসবে এ অঞ্চলের পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রভাবশালীদের খপ্পরে অস্তিত্ব সংকটে এ জেলার পাহাড়ি টিলা ও বনজ সম্পদ। জেলার কয়েকটি উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় এখন হরদম চলছে এমন বেআইনি কর্মযজ্ঞ। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে এলেই নির্বিচারে চলে পাহাড় কাটা। আর বর্ষা মৌসুমে ঘটে পাহাড় ধ্বংসের ঘটনা। তখন পুরো বর্ষা মৌসুম জুড়ে থাকে প্রাণহানি ও সম্পদ হানির চরম উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। এনিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে হতাহতের ঘটনা এড়াতে তখন স্থানীয় প্রশাসন হন তটস্থ। কিন্তু এখন অবাধে পাহাড় কাটা বন্ধে কোনো শক্ত প্রতিকার না নিয়ে বরং তারা অনেকটাই নীরব দর্শক। এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। তবে কোনো কোনো উপজেলায় মাঝে মধ্যে প্রশাসন উদ্যোগী হন।

চালান অভিযান। এতে কিছু দিনের জন্য পাহাড় কাটা বন্ধ হয়। অভিযান অব্যাহত না থাকায় কিছু দিন পর আবারো যেই সেই। স্থানীয়দের অভিযোগ কোথাও প্রশাসনকে লুকিয়ে। আবার অনেক স্থানে প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলে এই বেআইনি কর্মযজ্ঞ। এলাকাবাসী জানান ওই চক্র প্রথমে গাছ ও বনাঞ্চল উজাড় করে। তারপর সুযোগ বুঝে ওই ন্যাড়া পাহাড়ি টিলার মাটি কাটতে শুরু করে। সরজমিনে ওই সকল এলাকায় গেলে চোখে পড়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই অবাধে পাহাড় কেটে তা গাড়ি দিয়ে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য। কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা, ভাটেরা ও বরমচালে কমবেশি পাহাড়ি টিলা কাটা হলেও দেদার দিন দুপুরে পাহাড় কাটা হচ্ছে ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের পশ্চিম জালালাবাদ (৭ নম্বর) এলাকায়। সম্প্রতি একটি অভিযান হলে কয়েক দিন বন্ধ থাকার পরও আবার কাটা হচ্ছে পাহাড়। ওই এলাকার পার্শ্ববর্তী গ্রামের সড়ক দিয়ে এসকল পাহাড়ি মাটি পরিবহন করাতে অতিরিক্ত চাপে তা ভেঙে যাচ্ছে।

জানা যায় বড়লেখা উপজেলার পাহাড় ঘেষা কাঁঠালতলী, বিওসি কেছরিগুল, ডিমাই, শাহবাজপুর, সায়পুর, কলাজুরা, হাকাইতি, কাশেম নগর, জামকান্দি, মোহাম্মদ নগর, সাতরা কান্দি, গঙ্গারজল, জফরপুর, কাশেমনগর, গজভাগ, পূর্ব হাতলিয়া, বোবারথল, মোহাম্মদনগর, ছোট লেখা, ঘোলসা, চন্ডিনগর, মুড়াউল, আতুয়া, বড়াইল, কুমারশাইল, পূর্ব বানীকোনা, শ্রীধরপুর, মাধবকুন্ড, খলাগাঁও, মুড়াউলসহ অনেক এলাকায় আগে কাটা হয়েছে কিংবা এখন প্রকাশ্যে দিবালোকে  কম-বেশি কাটা হচ্ছে পাহাড়ি টিলা। এসকল এলাকার কোনো কোনো স্থানে এখন কিছুটা থামলেও বেশির ভাগ স্থানে গোপনে ও প্রকাশ্যে অবাধে চলছে পাহাড় কাটা। এমনটিই অভিযোগ স্থানীয় লোকজনের। জুড়ী উপজেলার উত্তর ভবানীপুর (মোকাম টিলা), ভজি টিলা, চম্বকলতা, বড় ধামাই, কচুরগুল, জামকান্দি, গোবিন্দপুর, জায়ফর নগর, গোয়াল বাড়ি, পশ্চিম জুড়ী ও পূর্ব জুড়ী ইনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় কমবেশি কাটা হচ্ছে পাহাড়। রাজনগরের উত্তরভাগ ইউনিয়নের যুদুরগুল এলাকার খাসের টিলা কেটে ভরাট হয়েছে শাহজালাল সার কারখানার আবাসিক এলাকার জমি।

বিশাল বিশাল টিলা কেটে তখন মাটি নেয়া হয় কারখানার ‘কলাবাগান’ আবাসিক এলাকায়। নির্বিচারে পাহাড় কাটার বিষয়ে তখন গণমাধ্যম সোচ্চার হলে প্রসাশনের তৎপরতায় মাস দিন তা বন্ধ থাকে। কিন্তু তারপরও থেমে নেই ওই উপজেলার বিভিন্ন ছোট বড় পাহাড়ি টিলার মাটি কাটা। পাহাড় কাটার অভিযোগ কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার সদরেও। শ্রীমঙ্গলে পাহাড়ি টিলা কেটে তৈরি হচ্ছে রির্সোট, হোটেল ও ফলদ বাগান । জানা গেল জেলা জুড়ে পাহাড় খেকো চক্র শুষ্ক মৌসুমে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রয় করে। আর বর্ষা মৌসুমে পাদদেশে তৈরি করে বসতঘর। পাহাড় কাটা ও বসতঘর তৈরির নেপথ্যে থাকে রাজনৈতিক ছত্রছায়া। তাই স্থানীয় প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করে। পরিবার পরিজন নিয়ে মাথা গোঁজার বিকল্প জায়গা নেই। তাই ওদের ছত্রছায়ায় ভূমিহীন মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ঠাঁই নেন। দীর্ঘ প্রায় ৩ যুগেরও বেশি সময় ধরে চলছে এমন বেআইনি কাজ। কিন্তু কিছুতেই তা থামছে না। জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এই ৩টি উপজেলার পাহাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা গেল এমন দৃশ্য।

এই ৩ উপজেলার স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যানুযায়ী পাহাড়ের চূড়া আর পাদদেশে এরকম ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের সংখ্যা প্রায় অর্ধলক্ষাধিক। স্থানীয় সূত্রে জানা যায় বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলায় ইতিপূর্বে মাটি কাটতে গিয়ে অন্তত ১২-১৫ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আর ভারি বর্ষণে টিলার মাটি ধসে মা মেয়েসহ গত ৫ বছরে অন্তত ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া পাহাড়-টিলা ধসে শিশুসহ অসংখ্য ব্যক্তি আহতও হয়েছেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপার) মৌলভীবাজার জেলা সমন্বয়ক আ স ম ছালেহ সুহেল মানবজমিনকে বলেন অব্যাহত টিলা কাটার ফলে এজেলার জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এ অঞ্চলের নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। আর এরই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে ভূমানচিত্রও। এজেলার প্রকৃতি বাঁচাতে ওই চক্রের বিরুদ্ধে  দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর দাবি জানান।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

জামিনে মুক্ত বিএনপির রবি

পাকুন্দিয়ায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে দুই কিশোর আটক

‘ইরানিদের হুমকি দেবেন না, সম্মানের সঙ্গে কথা বলুন’

খালেদা জিয়ার আদালত স্থানান্তরের প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহারে নোটিশ

মক্কায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইরান সমর্থিত হুতিকে অভিযুক্ত সৌদির

বিচারাধীন বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন, ব্যাখ্যা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের নেপথ্যে বামভোট নাকি মেরুকরণের রাজনীতি

মোদিকে থামাও

পাকিস্তানের বাংলাদেশ মিশনে ভিসা ইস্যু বন্ধ হয়নি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

হিমালয়ান ভায়াগ্রা নিয়ে দুই গ্রামের সংঘর্ষ

ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা আটকে গেলো হাইকোর্টে

কেরানীগঞ্জে আদালত স্থাপন সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক : মওদুদ

ভোট গণনায় কারচুপি ঠেকাতে ইসি’র দ্বারস্থ মোদি বিরোধী জোট

প্রেমিকার বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের লাশ উদ্ধার

ভারতে বিরোধীদের মধ্যে অস্থিরতা!

কুষ্টিয়ায় ধর্ষণ মামলায় প্রধান শিক্ষকের যাবজ্জীবন