বদির ১৬ আত্মীয়সহ ১০২ ইয়াবা কারবারির আত্মসমর্পণ

জীবন ভিক্ষা চাইলেন আমান

প্রথম পাতা

রাসেল চৌধুরী/আমান উল্লাহ কবির, টেকনাফ (কক্সবাজার) | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:৩৬
মুখে হাসি, চেহারায় খুশির আমেজ। মঞ্চে উঠলেন ইয়াবা কারবারিরা। তাদের রজনীগন্ধা ফুলেল শুভেচ্ছা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। একদিকে হাজার হাজার মানুষের করতালি অপরদিকে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত ১০২ ইয়াবা কারবারি। সীমান্ত নগরী টেকনাফে দেশের প্রথমবারের মতো মাদক কারবারিদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে এই দৃশ্য সবার নজর কেড়েছে। মঞ্চের মধ্যে সবার নজর কেড়েছে টেকনাফ সদরের ৮ নং ওয়ার্ডের সদস্য এনামুল হক। প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগত ভাবে কিছু বলতে চাচ্ছি না, আমি সেই এনাম, ২০১৬ সালে কারাগারে থাকা অবস্থায় বিপুল ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। আমার সংসার তছনছ করে ফেলেছে একটি মহল।
আমাকে বিভিন্নভাবে মিথ্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে। যা সত্য নই।

এব্যাপারে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে কয়েকটি আবেদন করেছিলাম’। ইনশাআল্লাহ আমি ঘোষণা দিচ্ছি, টেকনাফকে আমরা মাদকমুক্ত করবো’। টেকনাফ আমাদের সীমান্ত এলাকা, এই সীমান্তে জন্ম নেয়াটাই আমাদের পাপ হয়ে গেছে’। সাংবাদিকদের অনুরোধ জানিয়ে এনাম বলেন, আমাকে বিভিন্নভাবে পত্রিকার হেডলাইন করা হয়েছে, যেখানে আমার রাজপ্রাসাদ বাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স, কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে। আপনারা জাতির বিবেক, কলম সৈনিক। আপনাদের লেখনীর মাধ্যমে একজন মানুষ সুন্দর জীবন গড়তে পারে। নিরপরাধ মানুষকে অপরাধী বানাতেও পারে। আমি সীমান্ত এলাকার একজন কৃতী ফুটবলার ছিলাম। আমি কি একজন ইয়াবা গডফাদার নাকি একজন সাধারণ এনাম। পরিশেষে তিনি সরকারের কাছে আকুতি জানিয়ে বলেন, জীবনে অনেক অন্যায় করেছি, আর করবো না, আমাদের প্রথমবার একটি জীবন ভিক্ষা দিন, মাদকমুক্ত সমাজ উপহার দেবো’।

১০২ মাদক ব্যবসায়ীর আত্মসমর্পণ: ১০২ ইয়াবা ব্যবসায়ী শনিবার দুপুর ১২টার দিকে টেকনাফ পাইলট হাইস্কুল মাঠে আত্মসমর্পণ মঞ্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর কাছে ইয়াবা ও অস্ত্র জমা দিয়ে। আত্মসমর্পণ করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত এসব ইয়াবা ব্যবসায়ীর মধ্যে ২৯ জন ইয়াবা গডফাদারও রয়েছেন। আত্মসমর্পণের পর তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশের হেফাজতে নেয়া হয়েছে। আত্মসমর্পণকালে তারা ৩ লাখ ৫০ হাজার ইয়াবা ও ৩০টি দেশীয় পিস্তল জমা দিয়েছেন। অপরদিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসায় তাদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। পুলিশের হেফাজতে থাকা ১০২ জন ইয়াবা কারবারিকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে আসা হয়। আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ার পর তাদের ফের পুলিশি হেফাজতেই নিয়ে রাখা হয়। আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির ১৬ স্বজন রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম বদির ভাই ব্যবসায়ী আবদুর শুক্কুর, আমিনুর রহমান, শফিকুল ইসলাম, বদির ভাগিনা মো. সাহেদ রহমান নিপু, বিয়াই সাহেদ কামাল ও খালাতো ভাই মন মন সেন। আত্মসমর্পণকারীদের দেখতে তাদের স্বজন ও এলাকার হাজারো মানুষ ভিড় জমান। তালিকাভুক্ত কয়েকজন ইয়াবা কারবারিকেও অনুষ্ঠানস্থলে দর্শক হিসেবে কাছে দেখা গেছে।
আত্মসমর্পণকারীদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, যারা আত্মসমর্পণ করেছেন তাদের আইনি সহায়তা দেবে সরকার। শুধু টেকনাফ নয়, সারা দেশ মাদকমুক্ত করা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অনুষ্ঠানে ইয়াবা কারবারিরা মোট ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৭০টি কার্তুজের পাশাপাশি সাড়ে তিন লাখ ইয়াবাও জমা দেন।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন অ্যান্ড ক্রাইম) মোহাম্মদ আবুল ফয়েজ, কক্সবাজার জেলার চারটি আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম, আশেকউল্লাহ রফিক, সাইমুম সরওয়ার কমল, শাহীন আক্তার চৌধুরী, জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, সাধারণ সমপাদক মুজিবুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন। জেলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে আত্মসমর্পণের এই অনুষ্ঠানটি হয়।

আত্মসমর্পণকারীদের ৯টি শর্ত: আত্মসমর্পণকারীদের ইয়াবা কারবারিদের ৯টি শর্ত দেয়া হয়েছে। শর্তগুলো হলো- ১. নিজের হেফাজতে থাকা সকল ইয়াবা ও অবৈধ অস্ত্র পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। ২. আত্মসমর্পণের আগে দায়ের হওয়া মামলা ও বিচার কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মে চলবে। ৩. ইয়াবা ব্যবসায় নিজের/পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়স্বজনের নামে-বেনামে অর্জিত সকল সমপদ দুদক, সিআইডির মানি লন্ডারিং শাখা ও এনবিআরের মাধ্যমে যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ৪. আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় দায়ের হওয়া মামলায় সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে সহায়তা প্রদান করা হবে। ৫. যে সকল মাদক ব্যবসায়ী এখনো সক্রিয় তাদের ব্যাপারে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে। ৬. আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত হলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকায় মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ড করতে হবে। ৭. ভবিষ্যতে কখনো মাদক ব্যবসা সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত হওয়া যাবে না। ৮. আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় তাদের বিরুদ্ধে যে মামলা রুজু হবে, সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে তাদেরকে আইনগত সুবিধা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ৯. মাদক ব্যবসার মাধ্যমে নিজের পরিবারের আত্মীয় স্বজনের নামে ও বেনামে অর্জিত সকল স্থাবর, অস্থাবর সমপত্তি যাচাইয়ের জন্য দুদক, (সিআইডি মানিলন্ডারিং শাখা) এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সকল সংস্থার কাছে তাদের তথ্যাদি প্রেরণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে তাদের অর্জিত সকল স্থাবর, অস্থাবর সমপত্তি যাচাই সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বদির চার ভাইসহ ১৬ স্বজনের আত্মসমর্পণ: আত্মসমর্পণ করেছেন সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির চার ভাইসহ ১৬ স্বজন। এর মধ্যে অন্যতম হলেন- বদির ভাই আবদুশ শুকুর, আমিনুর রহমান, মো. ফয়সাল রহমান ও শফিকুল ইসলাম, ভাগিনা সাহেদ রহমান নিপু, ফুফাতো ভাই কামরুল হাসান রাসেল, খালাতো ভাই মংমং সেন ও বেয়াই শাহেদ কামাল। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে আত্মসমর্পণ করেছেন- টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদের ছেলে দিদার মিয়া ও পৌর কাউন্সিলর নুরুল বশর প্রকাশ নুরশাদ, পশ্চিম লেদার নুরুল হুদা মেম্বার, ইউপি মেম্বার জামাল হোসেন, শামসুল আলম ও কক্সবাজারের আলোচিত ইয়াবা ডন শাহজাহান আনসারী।

ইয়াবা ডন শাহজাহান আনসারীর আত্মসমর্পণ: ইয়াবা ব্যবসা করে কোটিপতি বনে যাওয়া শাহজাহান আনসারীও আত্মসমর্পণ করেছেন। কক্সবাজারের শীর্ষ এই ইয়াবা ব্যবসায়ী শনিবার সকালে টেকনাফে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। সূত্র মতে, এক সময়ের পান দোকানি শাহজাহান আনসারী ইয়াবা ব্যবসা করে বর্তমানে কয়েকটি আবাসিক হোটেলসহ হাজার কোটি টাকার মালিক। কক্সবাজার পর্যটন এলাকার হোটেল লেগুনা বিচ ও জামান হোটেল তার ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। ইয়াবা ডন শাহজাহান আনসারী আত্মসমর্পণ করছেন বলে দীর্ঘসময় কক্সবাজারবাসীর মধ্যে নানা গুঞ্জন চলছিল। গতকাল তার আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সেটি সত্যি প্রমাণ হলো।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Mohammed Ali

২০১৯-০২-১৬ ২৩:২৩:৪৫

ইয়াবা ডনকে সাথে নিয়ে এই সমস্ত নাটক করার মানে কি?

জাফর আহমেদ

২০১৯-০২-১৬ ১১:৪৯:৫০

আসল বাবা কে বাহিরে বহাল তবিয়তে রাখলে আবার সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় বেশি লাগবে না।

Ruhul

২০১৯-০২-১৬ ১১:৩১:০৬

কক্সবাজার কি সরকারের এখতিয়ারের মধ্যে ? প্রশাসনের লজ্জা করা উচিত নয় কি ?

আপনার মতামত দিন

ফেসবুক লাইভে আহ্বান, পৌঁছামাত্রই গুলি

সন্ত্রাসী ব্রেনটনের আদ্যোপান্ত

সোমবার থেকে অনশনে যাচ্ছেন নন-এমপিও শিক্ষকরা

বরিশালে ভোটারশূণ্য কেন্দ্র, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের অলস সময়

মিরপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোট বর্জন, খোকসায় সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার প্রত্যাহার

‘মন্ত্রিপরিষদে অভ্যুত্থান পরিকল্পনা’, তেরেসা মের বিপদসঙ্কেত!

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা

গুম-খুনের সঙ্গে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকজনও জড়িত: রিজভী

সিলেটের সেই বাসচালক আটক

নৌকায় সিল, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার আটক, ভোট বর্জন দুই প্রার্থীর

‘পাকিস্তানের প্রস্তাবকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়’

সিলেটের মোড়ে মোড়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থান

ইভিএমেও সাড়া নেই ভোটারদের, আড়াই ঘন্টা বিকল

গাংনীতে দু’প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ৭

শাহনাজ রহমতুল্লাহর কালজয়ী গান

থাইল্যান্ডে ভোট আজ