৯ বছর পর মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রদল

শেষের পাতা

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:৫৯
মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রদল নেতাদের স্বাগত জানান ছাত্রলীগ নেতারা
এ এক অন্যরকম পরিবেশ। ছাত্র রাজনীতির আঁতুড়ঘর খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন যেন ফিরেছে পুরনো চেহারায়। ৯০-এর দশকের মতো পাশাপাশি টেবিলে বসে নিজেদের রাজনীতি চালিয়েছে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো। ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর সরব উপস্থিতি মধুর ক্যান্টিন ও এর আশপাশকে করেছে সরগরম। গতকাল সকালে দীর্ঘ ৯ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মধুর ক্যান্টিনে প্রবেশ করে ছাত্রদল। এ সময় তাদের স্বাগত জানায়  ছাত্রলীগ ও বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো। প্রায় দুই ঘণ্টা মধুর ক্যান্টিনে অবস্থান শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা। এরপর ছাত্রলীগও সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়।

এ সময় তারা ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ও আসন্ন ডাকসু নির্বাচন নিয়ে নিজ নিজ সংগঠনের অবস্থানের কথা তুলে ধরেন।
ছাত্রদলের পক্ষ থেকে জানানো হয় তারা এখন থেকে নিয়মিত মধুর ক্যান্টিনে আসবেন। অন্যদিকে ছাত্রলীগও তাদের স্বাগত জানিয়েছে। তবে তারা ছাত্রদলকে সম্মেলনের মাধ্যমে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেয়ার আহ্বান জানায়। অন্যথায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের বয়কট করবে বলে জানায় ছাত্রলীগ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জনায়, সকাল পৌনে ১১টায় ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১০-১৫ জন নেতাকর্মী মধুর ক্যান্টিনে প্রবেশ করে। মধুতে প্রবেশ করেই তারা সেখানে অবস্থান করা ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইনের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এসময় সাদ্দম হোসাইন ছাত্রদলকে মধুতে স্বাগত জানান এবং বসার টেবিল দেখিয়ে দেন। এরপর ছাত্রদল নেতারা বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। কুশল বিনিময় শেষে ছাত্রদল নেতারা মধুর ক্যান্টিনের উত্তর-পূর্ব কোণে বসেন। এ সময় তাদের পাশে বসা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মুহুর্মুহু স্লোগান দিতে থাকেন। মধুর ভিতরে ও বাহিরে থাকা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ করে বিভিন্ন ধরনের কটূক্তিমূলক স্লোগানও দেন।

বেলা সাড়ে ১১টায় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান ও পৌনে ১২টায় কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসান মধুর ক্যান্টিনে আরো বেশ কিছু নেতাকর্মী নিয়ে প্রবেশ করেন। এ সময় ছাত্রদল নেতাকর্মীরাও জিয়া-খালেদা-তারেকের নামে স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে ছাত্রদল ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর মধ্যে স্লোগান দেয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হলে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নিজ দলের উত্তেজিত কর্মীকে থামিয়ে দেন। এদিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা যখন মধুর ভিতের অবস্থান নিয়েছেন তখন মধুতে প্রবেশ করেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। এ সময় ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও বাম সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের নেতারা একই টেবিলে বসে আড্ডা দেন। ছাত্রদল নেতাদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দাপটে ছাত্রদল কোণঠাসা হয়ে পড়তে থাকে।

২০১০ সালের ১৮ই জানুয়ারি ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল বের করলে ছাত্রলীগের হামলার মুখে পড়ে। ওই বছর ২১শে জুন মধুর ক্যান্টিনে যাওয়ার চেষ্টা করে ফের ছাত্রলীগের মারধরের শিকার হন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। পরের বছর ১৮ই জানুয়ারি ছাত্রলীগের হামলার এক বছর পূর্তিতে আবারো মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করলে শাহবাগে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এরপর দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে প্রবেশ থেকে বিরত ছিল ছাত্রদল। তবে বিভিন্ন ইস্যুতে তারা দোয়েল চত্বর, শহীদ মিনার, বাংলা একাডেমিসহ ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভ করেছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের আগস্টে ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর ডাকা উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিতে মধুর ক্যান্টিনে আসলে ছাত্রলীগের ধাওয়ায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল ছাত্রদল। গত বছর ও চলতি বছর ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ডাকা পরিবেশ পরিষদের সভাসহ বিভিন্ন সভায় ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের বিশেষ নিরাপত্তায় অংশ নিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় তফসিল ঘোষণার আগ মুহূর্তে গত ৭ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে স্মারকলিপি দিয়েছে ছাত্রলীগ।

স্মারকলিপি শেষে তারা ক্যাম্পাসে মিছিলও করে। এদিকে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা অবস্থান শেষে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা বেলা পৌনে ১টার দিকে মধুর ক্যান্টিন ত্যাগ করেন। এ সময় তারা ক্যাম্পাসে মিছিল করেন। মধুর ক্যান্টিন ত্যাগের আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা। নয় বছর পর মধুর ক্যান্টিনে আসার প্রতিক্রিয়ায় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা মনে করি, ডাকসুকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ইতিবাচক ও গণতান্ত্রিক যে রাজনীতির সূচনা হয়েছে, আজকে এই পথচলার যাত্রা শুরু। আমাদের এই ক্যাম্পাসে অবস্থান অব্যাহত থাকবে।

আমরা চাই, ছাত্র রাজনীতির অতীত গৌরব এবং পরমত সহিষ্ণুতা ও সবার সহাবস্থানের যে যাত্রা শুরু হয়েছে, সেটা অব্যাহত থাকুক।’ এ সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসান বলেন, ‘আজকে প্রথম (মধুর ক্যান্টিনে) এসেছি, আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদেরকে সহযোগিতা করবে, সহাবস্থানটা স্থিতিশীল হবে। একটি সামগ্রিক সুষ্ঠু পরিবেশ বিরাজ করবে এবং তারপর ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হোক।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সাত দফা দাবি দিয়েছি। তফসিল তিন মাস পেছানো, রাজনৈতিক সহাবস্থানটাকে স্থিতিশীল করা।’ রাজীব আহসান বলেন, ক্যাম্পাসে সব দলের সহাবস্থান স্থায়ী হওয়ার নিশ্চয়তা, নির্বাচনের কেন্দ্র হল থেকে একাডেমিক ভবনে স্থানান্তর করা, প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে যেসব ধারা এখানে বিদ্যমান আছে- সেগুলোর পরিবর্তন করার যে দাবি ছিল তা আদায়ে তার সংগঠন অনড় রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন হবে, এটাকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখছি, ইতিবাচক চিন্তা করছি এবং ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের যৌক্তিক দাবিগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পূরণ করবে, সে বিষয়ে আমরা আন্তরিক ও আত্মবিশ্বাসী। আমরা বিশ্বাস করি, তারা অধিকাংশ ছাত্র সংগঠনের দাবিগুলো আন্তরিকভাবে মেনে নেবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে রাজীব আহসান বলেন, ‘ভোটার তালিকায় আমাদের যারা অন্তর্ভুক্ত আছে এবং রাজনৈতিকভাবে আমরা সবার সঙ্গে কথা বলছি। আমরা পুনঃতফসিল দাবি করছি এখনো। তারপর আমাদের প্রার্থী তালিকা বা অন্যান্য বিষয় চূড়ান্ত করব।’ একই সময়ে ছাত্রদলকে পাশে রেখে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুর শোভন বলেন, ‘ছাত্রদল আজকে মধুর ক্যান্টিনে এসেছে, তাদেরকে আমি স্বাগত জানাই। একটা কথাই বলব, আপনারা নামে ছাত্রদল, কিন্তু কাজেকর্মে ছাত্রদের সঙ্গে আপনাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। দীর্ঘ দিন ধরে আপনাদের সম্মেলন হয় না।

ছাত্র সংগঠন হিসাবে বলতে চাই, আপনারা সম্মেলন করে সাধারণ ছাত্রদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেন। তা না হলে যে বিষয়টা হবে, আপনারা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রহণযোগ্যতা পাবেন না এবং সাধারণ ছাত্ররা আপনাদের বয়কট করবে।’ শোভন বলেন, ‘ছাত্রদল এতদিন মধুতে না এসে আমাদের দোষারোপ করেছে। কিন্তু তারা আজকে এসে বুঝতে পারল, আমরা কারও বাধা না, আমরা আমাদের নিজেদের রাজনীতি করি, যার যার রাজনীতি সে সে করবে।’ এরপরই ছাত্রদলের পুনঃতফসিলের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, ‘গঠনতন্ত্র ও আচরণবিধি অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গঠনতন্ত্র ও আচরণবিধি সবার সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত হয়েছে। এখন তফসিল পেছানো বা গঠনতন্ত্র সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই।’ উল্লেখ্য, দীর্ঘ ২৮ বছর পর আগামী ১১ই মার্চ ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার শেষ সময় ২রা মার্চ; যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হবে ৩রা মার্চ। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে ৫ই মার্চ।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

পর্নো তারকা মিয়া খলিফার পক্ষ নিলেন নাইজেরিয়ার মিউজিক মুঘল

উত্তাল সমুদ্রে ১৩০০ যাত্রী নিয়ে জাহাজের বিপদসংকেত, উদ্ধারে ৫ হেলিকপ্টার ও কয়েকটি জাহাজ

সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে বাস থেকে ফেলে ‘হত্যা’

প্রধানমন্ত্রীকে আজীবন সদস্য করার প্রস্তাব নুরের আপত্তি

যারা ভয় পান তারা দায়িত্ব ছেড়ে দেন

ঢাকায় গাড়ি চোরের ৫০ সিন্ডিকেট

গণহত্যা বিষয়ক জাতিসংঘ দূত ঢাকায়

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে নিয়ে নানা জল্পনা

তৃতীয় ধাপের ১১৭ উপজেলায় ভোট আগামীকাল

স্বর্ণ আমদানির দুয়ার খুলছে

দেনমোহরের দাবিতে বাংলাদেশে ফিলিপাইনের নারী

দু’দশকে বন্ধ হয়েছে এক হাজারের বেশি সিনেমা হল

ঢাকায় সড়ক পারাপারে বিশৃঙ্খলা কমছে না

শীর্ষ আলেমদের জন্য দেহরক্ষী চাইলেন আল্লামা শফী

যারা ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না তারা কীভাবে গণতন্ত্রের কথা বলে

চিকিৎসা নিতে গিয়ে আটক ছিনতাইকারী