পঞ্চগড়ে আহমদীয়াদের বাড়িঘর ও দোকানপাটে ভাঙচুর, পুলিশসহ অর্ধশত আহত

অনলাইন

পঞ্চগড় প্রতিনিধি | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, বুধবার, ১২:০৭ | সর্বশেষ আপডেট: ৫:১১
খতমে নবুওয়তের ব্যানারে তৌহিদী জনতার বিক্ষোভ ও তান্ডবের মুখে আহমদিয়া মুসলিম জামাতের পূর্ব ঘোষিত বার্ষিক সালানা জলসা বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। পঞ্চগড় সদর উপজেলার আহমদ নগরে অনুষ্ঠিতব্য সালানা জলসা বন্ধের দাবিতে প্রতিবাদী কাদিয়ানী বিরোধী বিক্ষুব্ধ জনতা শহরে ও জেলা শহরের আহমদনগরে তান্ডব চালিয়েছে। মঙ্গলবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ হাজারো জনতা শহরে মহাসড়ক দু ঘন্টা ধরে অবরোধ করে রাখলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে লাঠিচার্জ, কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। কাদিয়ানী বিরোধী হাজার হাজার মানুষ রাত ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত আহমদনগর এলাকার আহমদিয়া মুসলিম জামাতের লোকজনদের ৮টি বাড়িঘর ও ৫টি দোকানপাটে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ গ্রামবাসীদের ওপর হামলা চালায়।

এ সময় ২১ জন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে ৫ জনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জসহ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশসহ উভয়পক্ষের কমপক্ষে অর্ধশত আহত হয়। পরে বিজিবি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব এলাকায় টহল দিচ্ছে। ঘটনার পর রাতেই রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল্লাহ সাজ্জাদ, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মজিদ আলী, জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন ও পুলিশ সুপার মো. গিয়াসউদ্দিন আহমদ, পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল মহিউস সুন্নাহ, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এহেতেশাম রেজা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাঈমুল হাছানসহ জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের দেখতে যান।

তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। রাত সাড়ে ১১টায় পরিস্থিতি শান্ত হয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে সম্মিলিত খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ পরিষদ, ঈমান আকিদা রক্ষা কমিটি ও পঞ্চগড় যুব সমাজ নামে কয়েকটি সংগঠনসহ তৌহিদী জনতা ও কাদিয়ানী বিরোধী বিক্ষুব্ধ জনতা বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। মিছিল শেষে তারা পঞ্চগড় শহরের শেরেবাংলা পার্ক মোড় সংলগ্ন পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে। অবরোধের ফলে মহাসড়কের উভয় পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। এ সময় কাদিয়ানী বিরোধী বিক্ষুব্ধ লোকজন আহমদনগর এলাকায় যেতে চাইলে পুলিশ করতোয়া ব্রিজের ওপর তাদের পথরোধ করে।

পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে বিক্ষুব্ধ লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে আহমদনগরের দিকে রওয়ানা হলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ লোকজন পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে পুলিশও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে পুলিশ ও মুসল্লিদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। এতে পুলিশ ও বিক্ষুব্ধ লোকজন আহত হয়। পুলিশ ও জনতার ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে তৌহিদী জনতা ও কাদিয়ানী বিরোধী বিক্ষুব্ধ অপর একটি গ্রুপ শহরের রাজনগর এলাকা দিয়ে করতোয়া নদী পার হয়ে আহমদিয়া মুসলিম জামাতের আহমদনগর এলাকায় গিয়ে বাড়ি-ঘর দোকানপাটে হামলা চালায়। রাত ৯টা থেকে সোয়া ১১টা পর্যন্ত সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকে। এ সময় আতঙ্কে পঞ্চগড় বাজারের প্রায় সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। তবে কত রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়েছে তা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি।

জেলা প্রশাসন এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় মঙ্গলবার রাত ৮টায় তৌহিদী জনতা ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের নিয়ে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বৈঠকের আয়োজন করে। বৈঠকে জলসা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সালানা জলসা স্থগিতের ঘোষণার পরও বিক্ষুব্ধ জনতা মহাসড়ক অবরোধসহ আহমদনগরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। অবশ্য রাত সোয়া ১১ টার দিকে পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ গোলাম আজম পঞ্চগড় বাজার জামে মসজিদের মাইকে জেলা প্রশাসন কর্তৃক জলসা অনুষ্ঠানের অনুমতি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বানসহ কারো প্ররোচনায় বিভ্রান্ত না হয়ে সবাইকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেন।

আহমদনগর মুসলিম জামাতের প্রেসিডেন্ট তাহের যুগল দাবি করে বলেন, আমাদের ৪০ জনের মত লোক আহত হয়েছে। মেয়েদের টেনেহিঁচড়ে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি বাড়ি ও দোকানে অগ্নিসংযোগ করাসহ লুটপাট, সীমানা প্রাচীর ও আসবাবপত্রের ব্যাপক ভাঙচুর ও ক্ষতিসাধন করা হয়। জলসার অনেক মালামাল ভাঙচুর করা হয়েছে। তারা প্রায় দুই ঘন্টা তান্ডব চালালেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে তেমন একটা ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি। এ ব্যাপারে আমরা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার সাদাত সম্রাট জানান, পৌর মেয়র তৌহিদুল ইসলাম ও আন্দোলনকারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আমরা অবস্থানরত লোকজনকে প্রশাসন কর্তৃক জলসা স্থগিতের কথা জানাই। কিন্তু তারা নানাভাবে বিভ্রান্ত হয়ে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে রাখে। পরবর্তিতে কিছু লোকজন করতোয়া নদী পার হয়ে শহরতলীর আহমদ নগরে জলসা স্থলে যায়।

পঞ্চগড় থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু আক্কাস আহমদ জানান, রাতে জেলা প্রশাসন জলসা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে তার আগেই বিভিন্ন স্থান থেকে মুসল্লী ও সাধারণ মানুষ বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। তাদের ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও শান্ত করতেই পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। একই সময় কিছু মানুষ বিকল্প পথে শহরতলীর আহমদ নগরে গিয়ে পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের কয়েকটি ঘরবাড়ি ও জলসা স্থলের বেশ কিছু উপকরণ ভাঙচুর করে।

পুলিশ সুপার গিয়াস উদ্দিন আহমদ জানান, মুসল্লিদের বিচ্ছিন্ন একটি গ্রুপ এই হামলা করেছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি কারা কারা এর সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, মুসল্লিদের দাবি ছিল আহমদিয়া মুসলিম জামাতের জলসা বন্ধ করলে তারা তাদের দাবি দাওয়া তুলে নিবে। আমরা তাদের জলসা স্থগিত করার ঘোষণা দেয়ার পরও তারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এহেতেশাম রেজাকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিনদিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, আগামী ২২ থেকে ২৪শে ফেব্রুয়ারি আহমদনগর এলাকায় বার্ষিক সালানা জলসা আহবান করে আহমদিয়া মুসলিম জামাত। এটি বন্ধের দাবি জানিয়ে গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি সম্মিলিত খতমে নবুয়ত সংরক্ষণ পরিষদ পঞ্চগড় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে। আহমদিয়া মুসলিম জামাতও পাল্টা জলসা বিষয়েও সংবাদ সম্মেলন করে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

ওস্তাদজী আমান বাহাদু

২০১৯-০২-১৩ ০৭:৩৯:২৫

No good

Shamirul islam

২০১৯-০২-১৩ ০১:৫৬:৩৯

ইসলামে ধর্মের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। যে কোন মানুষ তার ধর্ম পালন করুক। কিন্তু কাদিয়ানীরা তো ইসলামের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে বলে মনে হচ্ছে। এর প্রতীকার হওয়া জরুরী। তাদের ধর্মের নাম অতি অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে তার পর যা ইচ্ছা তাই করুক।

Md.Mosfizur Rahman

২০১৯-০২-১৩ ০১:১৮:০৬

কে মুসলমান আর কে মুসলমান নয় এটা আল্লাহ্ বিচার করবে।

জাফর আহমেদ

২০১৯-০২-১২ ২৩:৩৯:২৩

আহমদ কাশিয়ানীর অনুসারীদের মুসলিম বলা যাবেনা। এরা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিব্র্যান্ত্রী ছড়ানোর জন্য ইহুদিদের সৃষ্টি।

আপনার মতামত দিন

এবার মালিবাগে পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা

বগুড়ায় নুরের ওপর হামলা

ধানের দাম নেই, চালে ছাড় নেই

বৃষ্টিতেও দৃঢ় মনোবল টাইগারদের

খালেদার মামলায় আদালত স্থানান্তরের বৈধতা নিয়ে রিট

তরুণ সাংবাদিক ফাগুনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যা মামলা

ট্রাভেল পারমিটে কড়াকড়ি জটিলতার আশঙ্কা

গতবছর ফেসবুকের কাছে ১৯৫ ব্যবহারকারীর তথ্য চেয়েছিল বাংলাদেশ

রঙ লাগিয়ে ঈদে সড়কে নামছে লক্করঝক্কড় বাস

তারেকের স্মৃতি হাতড়ে ফেরেন নুরুন নাহার

রাজাকারদের তালিকা সংরক্ষণের সুপারিশ

মামলার আগেই গ্রেপ্তার, শাহপরাণে তোলপাড়

ইতালিতে প্রদর্শিত হলো ড. ইউনূসের জীবনীভিত্তিক অপেরা

৩০শে মে সন্ধ্যায় শপথ নেবেন মোদি

পদত্যাগ করলেন মহারাষ্ট্র কংগ্রেস প্রধান

চিকিৎসকদের আরো দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান ডা. এ আর খানের