তারল্য সংকট

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন

প্রথম পাতা

এমএম মাসুদ | ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪২
বিদায়ী বছরের পুরো সময় তারল্য সংকটে কেটেছে দেশের ব্যাংকিং খাত। নির্বাচন ঘিরে গ্রাহকরা বড় অঙ্কের আমানত তুলে নিলে তারল্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে, যা নতুন বছরের শুরুতেও এ থেকে বের হতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এ ছাড়া সুদহার কমানোর কথা বললেও ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা সেই সুবিধা না পেয়ে ঋণ কম নিয়েছেন। ফলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে ভাটা পড়েছে। এটি ৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমার জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন, অবকাঠামো দুর্বলতা, সুদের উচ্চহার এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটসহ নানা কারণকে দায়ী   করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নির্বাচনের বছরে ব্যাংকগুলোর ঋণে লাগাম টানতে গত বছরের জানুয়ারিতে ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) ও সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেয়ার সুযোগ কিছুটা কমেছে।
পাশাপাশি তারল্য সংকটে কমছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি।

এদিকে আগামী মার্চের মধ্যে ব্যাংকগুলোর এডিআর ৮৩.৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জরিমানা এড়াতে ব্যাংকগুলো চ্যালেঞ্জ নিয়ে নির্ধারিত সীমায় নামিয়ে আনার চেষ্টার ফলে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। গত ডিসেম্বর শেষে আরো কমে ১৩.২০ শতাংশে নেমেছে। এ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বরে ১৬.৮০ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ছিল। ডিসেম্বরের প্রবৃদ্ধি গত ৩ বছর ৩ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে দেশে বিনিয়োগ না হওয়ায় ২০১৫ সালে এমন পরিস্থিতি ছিল। ওই সময় ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩.৭২ শতাংশ। এর পর ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে ঋণ প্রবৃদ্ধি। ২০১৭ সালের নভেম্বরে বেসরকারি খাতে সর্বোচ্চ ১৯.০৬ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়। দীর্ঘসময় পর তা ১৪ শতাংশের নিচে নামল।

এদিকে এক অঙ্কে সুদহার নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারের কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে ব্যাংকগুলো, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করেনি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ডাবল ডিজিটে (১০ শতাংশের বেশি) ঋণের সুদ আদায় করছে দেশি-বিদেশি ২৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কম হচ্ছে, যার কারণে বেশ কিছুদিন ধরে ঋণ প্রবাহ কম রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের কারণে বড় বড় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে যায়নি, যার কারণে ঋণ প্রবাহ কমেছে। এ ছাড়া অবকাঠামো সমস্যা, সুদের উচ্চহার, গ্যাস-বিদ্যুৎতের সংকট, ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়ানোসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ মন্দা রয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচন শেষ হয়েছে, এখন বিরোধীপক্ষ থেকে যদি কোনো অস্থির কর্মসূচি না আসে; রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকে, আগামীতে বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করছি।

জানা গেছে, তারল্য সংকটের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানতের সুদহার বেড়ে গিয়েছিল। এতে বেড়ে গিয়েছিল ঋণের সুদহারও। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমানত ও ঋণের সুদহার যথাক্রমে ৬ ও ৯ শতাংশে বেঁধে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমানত সংকটের কারণে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। ২০১৯ সাল শুরু হয়েছে আমানতের সংকট দিয়েই। এক খাতের নামে ঋণ নিয়ে অন্য খাতে ব্যবহারের অভিযোগের পর গত বছরের ৩০শে জানুয়ারি এক নির্দেশনার মাধ্যমে ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) সীমা কমিয়ে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংকের ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৩.৫০ পয়সা এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোর ৮৯ টাকা ঋণ দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়। আগে যা ৮৫ এবং ৯০ টাকা ছিল। যেসব ব্যাংক এই সীমার ওপরে রয়েছে চলতি বছরের মার্চের মধ্যে তা নির্ধারিত সীমায় নামিয়ে আনতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের কারণে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা দ্বিধায় ছিল, ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ তথা ঋণ প্রবাহ কমেছে। নির্বাচন শেষ হয়েছে, প্রেক্ষাপটও পরিবর্তন হয়েছে। আশা করছি ঋণ প্রবাহ বাড়বে। এছাড়া আগামী মুদ্রানীতিতেও এ ধরনের নির্দেশনা থাকবে। এছাড়া আমানত ও ঋণে ৯ শতাংশ সুদহার বাস্তবায়ন করতে পারলে ঋণ প্রবাহ বেড়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সরকারকে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা সহায়ক নীতি প্রণয়ন করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ‘ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে এখন ১৭৬তম স্থানে রয়েছে। এ সূচক ব্যবসার পরিবেশে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৪২ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। আগের বছরের নভেম্বরে যা ছিল ৮ লাখ ২৬ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। এ সময় ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪.০১ শতাংশ।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, তারল্য সংকট ভয়াবহ আকার নেয়ায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে দেশের ১২ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। দেশের ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভালো অবস্থায় অর্থাৎ গ্রিন জোনে রয়েছে মাত্র ৪টি। ইয়েলো জোনে রয়েছে ১৮ এবং রেড জোনে ১২টি প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিবেদন তৈরিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর সুদহার বৃদ্ধিজনিত ঝুঁঁকি, ঋণঝুঁঁকি, সম্পত্তির (ইকুইটি) মূল্যজনিত ঝুঁঁকি ও তারল্য অভিঘাত এ চার ঝুঁঁকি বিবেচনায় নেয়া হয়। রেড জোনে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবিড়ভাবে তদারকি শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগযোগ্য আমানত রয়েছে ৮১ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা। কিন্তু এ আমানতের অর্ধেকের বেশি রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর হাতে। ২০১৮ সালের অক্টোবর শেষে এ ব্যাংকগুলোর হাতে বিনিয়োগযোগ্য আমানত ছিল ৪৫ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

নববধূকে সিগারেটের আগুনে ছ্যাঁকার অভিযোগ, মামলা

৩০ এপ্রিলের মধ্যে বিএনপির বাকিরাও শপথ নেবেন : হানিফ

লাবণ্যকে বহনকারী মোটরবাইক চালক আটক

সরকারের চাপে শপথ নিচ্ছে বিএনপির নির্বাচিতরা

‘গেট আউট’ মোকাব্বির যোগ দিলেন গণফোরামের কাউন্সিলে

‘সাংগ্রি-লা হামলায় নিহত হয়েছে জাহরান হাশমি’

শ্রীলঙ্কায় হামলার আশঙ্কা, মসজিদ বা গির্জায় প্রার্থনা না করার আহ্বান

নড়াইলে অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা

ইরাকে ৪৫ বাংলাদেশী শ্রমিক উদ্ধার

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রিজভীর নেতৃত্বে মিছিল

কথিত বাংলাদেশী অভিবাসী ইস্যুতে উত্তপ্ত ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ

‘মাসের ত্রিশ দিনই ক্যামেরার সামনে থাকতে হচ্ছে’

বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতিকে শোকজ

কুষ্টিয়ায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক ব্যবসায়ী নিহত

প্রয়োজন হলে ফের ইমরানের সঙ্গে কথা বলবেন মুনমুন সেন

মোদীকে কুর্তা-মিষ্টি পাঠানোর কথা মানলেন মমতা