মামলায় জর্জরিত বিএনপি জামিন নিয়ে পেরেশান

দেশ বিদেশ

স্টাফ রিপোর্টার | ১৯ জানুয়ারি ২০১৯, শনিবার
 মামলায় জর্জরিত বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল। মামলার ভারে নাভিশ্বাস উঠেছে দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের। আসামি হিসেবে সেঞ্চুরি-ডাবল সেঞ্চুরি হয়েছে অনেকের। কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগই এখন ৩০-৫০টির বেশি মামলার আসামি। তৃণমূলের সক্রিয় কর্মীরাও বয়ে বেড়াচ্ছেন ৫-১০টি মামলার ভার। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা যখন বিজয় আনন্দ করছে তখন জামিনের জন্য বিএনপি নেতাকর্মীদের নিত্য ভিড় জমাতে হচ্ছে নিম্ন ও উচ্চ আদালতের বারান্দায়। কোনো মামলায় একদল জামিন পাচ্ছেন, কোনো মামলায় জামিন নামঞ্জুর হওয়ায় কারাগারে যাচ্ছেন আরেকদল। জামিন তৎপরতায় কেউ কেউ দলীয় নেতা বা দলীয় আইনজীবীদের সহায়তা পেলেও বেশিরভাগের সহায় পরিবার আর আত্মীয়-স্বজন। সবমিলিয়ে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা এখন আইনি জটিলতায় পেরেশান। শুধু জামিন নিতেই সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে নেতাকর্মীদের। বিএনপি কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতারা এমন পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, সারা দেশে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা ও কারাগারে আটক নেতাকর্মীদের মুক্তি নিয়ে বিপাকে বিএনপি। কেন্দ্র থেকে এসব মামলা পরিচালনার জন্য জেলা বিএনপিকে নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেয়া হলেও কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই বলে অভিযোগ তৃণমূল নেতাকর্মীদের। সারা দেশে মামলা ও আটক নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য কেন্দ্র থেকে গঠিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম ও জাতীয় আইনি সহায়তা কেন্দ্র গঠনের কথা বলা হলেও নেতাকর্মীরা জানাচ্ছেন সেগুলোর সহায়তা পাচ্ছেন না তারা।
বিএনপি ও অঙ্গদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া জোরদার হয়েছিল ওয়ান ইলেভেন আমলে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের প্রথম মেয়াদে সে ধারা অব্যাহত থাকলেও খুব জোরদার ছিল না। কিন্তু ২০১৫ সালে দশম জাতীয় নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে বিএনপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে টানা যে আন্দোলনে নেমেছিল দলটি তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে মামলা। বিশেষ করে ২০১৮ সালের প্রথম দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচার কার্যক্রম চলাকালে ও কারাগারে পাঠানোর পর বেশকিছু মামলা হয়েছিল। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন থেকে পরের এক মাস সারা দেশে থানায় থানায় হিড়িক পড়েছিল মামলা দায়েরের। বিএনপি নেতাকর্মীরা যেগুলোকে আখ্যায়িত করেছেন ‘গায়েবি মামলা’। সর্বশেষ একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন পর্যন্ত জোরদার ছিল এ তৎপরতা। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে নতুন নতুন আইনের ধারায় পুরোনো মামলাগুলো ভেঙে পৃথক মামলা হওয়ায়। এতে মামলার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ভোগান্তিও। বিএনপি স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানান, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আয়োজিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এসব মামলার বিষয়ে কথা বলে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছিল। তার কথা অনুযায়ী দুই দফায় সারা দেশে গায়েবি মামলার নথি দেয়া হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। কিন্তু কোনো সুফল আসেনি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৮ই নভেম্বর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর ৮ই জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪ হাজার ৪ শত ৭০টি মামলা হয়েছে। এতে এজাহার নামীয় আসামির সংখ্যা ১৬ হাজার ৮৩০ জন এবং অজ্ঞাত আসামির সংখ্য ৯৫ হাজার ৭৩৩ জন। এসব মামলায় ১৫ হাজার ৮৯৮ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অন্যদিকে ২০১৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে ৭ই নভেম্বর পর্যন্ত দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৪৫৩টি। এসব মামলায় এজাহার নামীয় আসামি ১ লাখ ১১ হাজার ৭৫ জন, অজ্ঞাত আসামি ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৫৭ জন। এ সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারের সংখ্য ১১ হাজার ৫৮ জন। এ ছাড়া ২০০৭ থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নানা সময়ে নানা আন্দোলন বা ইস্যুকে কেন্দ্র করে দায়েরকৃত হাজার হাজার মামলা তো রয়েছেই। দলের দপ্তর থেকে বলা হয়েছে- ২০০৯ সাল থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত মোট মামলার সংখ্যা ৯০ হাজার ৩৪০টি। আসামির সংখ্যা ২৫ লাখ ৭০ হাজার ৫৪৭ জন। এদিকে নির্বাচনকালীন ও পরে হামলার ঘটনা রয়েছে ৪ হাজার ১১৬টি। এসব হামলায় আহত হয়েছেন ১৭ হাজার ১৩ জন এবং নিহত হয়েছেন ১৭ জন নেতাকর্মী। ২০০৯ সাল থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত মোট হত্যার শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৫১২ জন। গুরুতর আহত ও জখম হয়েছেন ১০ হাজার ১২৬ জন।
দলটির নীতিনির্ধারকরা জানান, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর এখন তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। নির্বাচন কেন্দ্রিক নির্যাতিত তৃণমূল নেতাকর্মীদের পাশে অবস্থান নিয়ে দলকে চাঙ্গা করারও চেষ্টা করছেন। মামলা-হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের মামলা পরিচালনা, চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এর জন্য সারা দেশে আইনজীবীদের নিয়ে আইনি সহায়তা সেল গঠনের পাশাপাশি জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনায় নেতাকর্মীদের মামলা পরিচালনার জন্য আইনি সহায়তা ও আহত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বলা হয়েছে। এর জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে। যার অংশ হিসেবে নির্বাচনের দিন নিহত বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সায়েম আহম্মেদ সোহেলের কবর জিয়ারতসহ তার পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে গত সোমবার ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা সিলেট যান। এর আগে তারা নোয়াখালীর সুবর্ণচরে নির্যাতিত একজন নারীকে দেখতে গিয়েছিলেন। তাদের এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। সারা দেশে নেতাকর্মীদের মামলা ও কারাগারে আটক নেতাকর্মীদের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এসব মামলার উদ্দেশ্য এখন সবার কাছে পরিষ্কার। একতরফা নির্বাচনের জন্য তারা এসবের আয়োজন করেছিল। নির্বাচনের আগে-পরে আমাদের হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে এবং এখনো গ্রেপ্তার চলছে। আবার যারা উচ্চ আদালতের জামিন শেষে নিম্ন আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন তাদেরকেও জামিন নামঞ্জুর করে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে কারাগারে। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, সারা দেশে নির্যাতনের একটি খণ্ড চিত্র এটি। কারণ বহু মামলা-হামলার খবর কেন্দ্র পর্যন্ত আসে না। ফলে একটি সম্পূর্ণ হিসাব পাওয়া মুশকিল। যেসব নেতাকর্মী তাদের নামে মামলার কাগজ দিচ্ছেন, কারাগারে যাচ্ছেন, হামলায় আহত হচ্ছেন- কেন্দ্রে তাদের তথ্যই সংগ্রহ থাকছে। এদিকে একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তারকৃত বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের জামিন বা কারামুক্তি মিলছে না তেমন।
বিএনপি ও অঙ্গদলের নেতাকর্মীরা জানান, দলের নেতাকর্মীদের মামলা পরিচালনায় কিছু কিছু জেলা ও নির্বাচনী আসনের নেতারা সচেষ্ট। উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নেয়ার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে নিম্ন আদালতের মামলা পরিচালনায়ও তারা সহযোগিতা করছেন। দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, রোববার তার নিজ জেলা নোয়াখালীর ২৫৮ জন নেতাকর্মী উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে আরো কয়েকশ’ নেতাকর্মী উচ্চ আদালতে জামিনের জন্য ঢাকা আসবেন। নির্বাচনী সহিংসতার ক্ষতি এখনো তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক বলেন, উচ্চ আদালত থেকে প্রায় দেড় হাজার নেতাকর্মীর জামিন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে হয়েছে। এ সংখ্যা আরো বাড়বে। তবে এসবের বাইরে দেশের বেশিরভাগ আসনের চিত্র ভিন্ন। যেসব আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের নেতাদের প্রার্থী করা হয়েছিল সেসব এলাকার নেতাকর্মীদের অবস্থা হয়ে পড়েছে শোচনীয়। এসব নেতাদের অনেকেই নির্বাচনের পর এলাকা ছেড়েছেন। নেতাকর্মীদের কোনো খোঁজখবরই রাখছেন না। আবার বেশকিছু আসনে ‘হঠাৎ নেতা’দের মনোনয়ন দেয়ায় তারাও নির্বাচনের পর এলাকা ছেড়েছেন। সেসব এলাকার নেতাকর্মীরা এখন প্রতিদিন ধর্ণা দিচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে। দলীয় সূত্র জানায়, দলের নেতাকর্মীদের মামলা পরিচালনার জন্য কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন করা হলেও বাস্তবে এসব কমিটির কোনো অস্তিত্ব্ব খুঁজে পাচ্ছেন না নেতাকর্মীরা। নিজ উদ্যোগে কিংবা পারিবারিকভাবে বা জেলা বিএনপির পছন্দমতো আইনজীবীর সহায়তা নিয়েই তারা জামিনের জন্য আদালতে ছুটোছুটি করছেন। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের একজন আইনজীবী জানান, নির্বাচনের এক মাস আগে একটি জাতীয় আইনি সেল গঠন করা হয়েছিল। এই সেলে পাঁচজনের একটি কমিটি গঠন করা হলেও তা আর পূর্ণাঙ্গ করা হয়নি। দলের কেন্দ্র থেকে এ বিষয়ে কোনো সহায়তা কিংবা নির্দেশনাও ছিলো না। এর বাইরে ১৮ বছরের মেয়াদোত্তীর্ণ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম নামে একটি সংগঠন কাগজে কলমে থাকলেও এর কোনো কার্যক্রম নেই।


এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

৩১ বছর আগের ট্র্যাজেডি ছাপানোয় ক্ষুব্ধ স্টোকস

তারা টকশোর এ্যাংকর নাকি অনভিজ্ঞ বক্তা?

মাদারীপুরে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২

নয়াপল্টনে জড়ো হচ্ছেন ছাত্রদলের কাউন্সিলররা

সরকারি চাল বাড়িতে, চেয়ারম্যান-ডিলার গ্রেপ্তার

বৃটিশ পার্লামেন্ট স্থগিত নিয়ে আজ আবার শুনানি

ঢাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা, উত্তেজনা

রাজশাহীতে মা-ছেলে হত্যা মামলায় ৩ জনের ফাঁসি

বিক্রি করে দেয়া হয়েছে সেই ভবন!

প্রবাসীর স্ত্রী হত্যা, পিতা-পুত্র গ্রেপ্তার

চোখ খুলুন, হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করুন

বিল গেটসের চেয়েও ধনী

প্রবাসীর স্ত্রীর গোসলের দৃশ্য ধারণ, ব্ল্যাকমেইল

ঘাতক ট্রাক কেড়ে নিলো স্কুলগামী ২ ছাত্রের প্রাণ

‘কাশ্মীরে জায়গা করে নেবে সন্ত্রাসীরা’

রাঙামাটিতে জেএসএসের ২ কর্মীকে গুলি করে হত্যা