চট্টগ্রামে ৬ মাসে ২৩ শিক্ষার্থীর অপমৃত্যু!

বাংলারজমিন

ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম থেকে | ১৯ জানুয়ারি ২০১৯, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:৩১
এসএসসি’র পর থেকে চাকরি করে মায়ের সঙ্গে সংসারের হাল ধরতে চেয়েছিলেন সোমা বড়ুয়া (১৮)। কিন্তু মায়ের এককথা- আগে লেখাপড়া, তারপর অন্য চিন্তা। মায়ের চিন্তা ছিলো এইচএসসি বা স্ন্নাতক শেষ করলে ভালো চাকরি পাবে সোমা। তাই মায়ের কথামতো নগরীর সরকারি সিটি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন সোমা। কিন্তু গত ১৬ই জানুয়ারি বুধবার সকালে কলেজে যাওয়ার সময় চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালি থানার সামনে সড়ক পার হচ্ছিল। ওই সময় বেপরোয়া গতির কাভার্ডভ্যান চাপায় তার স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে। কথাগুলো বলছিলেন সোমার চাচা উৎপল বড়ুয়া। তিনি বলেন, সোমার বাবা মানসিক প্রতিবন্ধী।
মা কুমকুম বড়ুয়া বোয়ালখালী উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমএলএসএস পদে চাকরি করেন। এইচএসসি’র পর বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। সোমা পড়ালেখায় অনেক ভালো। এইচএসসি শেষ করে পরিবারের হাল ধরার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু তা আর হলো না। অকালেই ঝরে গেল সেই স্বপ্ন। এমন আর একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল গত বছরের ২৫শে নভেম্বর সকালে পটিয়া উপজেলার শাহ্‌ মার্কেট এলাকায়। সেখানে ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হয় জান্নাতুল মাওয়া ইসা (১২)। সে স্থানীয় বিনিনিহারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। তার মৃত্যুতে শুধু পরিবার বা স্বজনরা নয়; কেঁদেছিলেন গোটা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও। ওইদিন জান্নাতুল মাওয়া ইসার বাবা-মা কফিন ধরে কেঁদে কেঁদে বলছিলেন- মা তুই ডাক্তার হবি। তুই না বলতি ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করবি। কথা না রেখে কেন তুই চলে গেলি। বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফাতেমা-তুজ-জোহরা বলেন, ইসা খুব মেধাবী ছিল। সে বলতো বড় হয়ে ডাক্তার হবে। ডাক্তার সে হতে পারতো। কিন্তু সড়কে ট্রাকচাপায় তার স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে। একই বছরের ২০শে নভেম্বর দুপুরে সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা কেফায়েত উল্লাহ আহমদ কবীর উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহসিন (১২) ট্রাকচাপায় নিহত হয়। এর আগের দিন ১৯শে নভেম্বর নগরীর বন্দর থানাধীন পুরাতন পোর্ট মার্কেট সংলগ্ন সড়কে টমটমের ধাক্কায় বেসরকারি সংস্থা ঘাসফুল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিইসি পরীক্ষার্থী সুমনা আকতার (১১) মারা যায়। ৫ই অক্টোবর বোয়ালখালীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন কলেজছাত্র আবির ইসলাম ফাহিম (১৮)। বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা শাখার একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন তিনি। একই বছরের ২৩শে সেপ্টেম্বর সিআরবি’র পলোগ্রাউন্ড এলাকায় বাসের ধাক্কায় আলমগীর হোসেন রিয়াদ (২৫) নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হন। রিয়াদ ছিলেন ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষার্থী। তার স্বপ্ন ছিল কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। ১৯শে জুন দুপুরে নগরীর জাকির হোসেন সড়কের হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালের সামনে বাসের ধাক্কায় নিহত হন চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তিথি বড়ুয়া (২১)। তার স্বপ্ন ছিল অর্থনীতিবিদ হওয়ার। কিন্তু তা আর হয়নি।  তিথি বড়ুয়ার অপমৃত্যু ঘটে নগরীর মহাসড়কে। গত ১৭ই জানুয়ারি সোমা, তিথি, ফাহিম ও রিয়াদের স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটেছে কিভাবে তা জানতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের শরণাপন্ন হন দৈনিক মানবজমিন-এর এই প্রতিবেদক। মহানগর পুলিশের পরিসংখ্যান বিভাগের পরিদর্শক মিজানুর রহমান বলেন, গত বছর মধ্য জুন থেকে এ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার সড়ক-মহাসড়কে ১৩৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এরমধ্যে অন্তত ২৩ জন শিক্ষার্থীর স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে। যাদের বেশির ভাগই বাস-ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চাপায় নিহত হয়েছে। সড়কে মৃত্যুর মিছিলের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মূলত ট্রাফিক আইন না মানার কারণে সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। এরমধ্যে সড়কে ট্রাফিক সাইন যেমন মানা হচ্ছে না। তেমনি ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া ও অপ্রশিক্ষিত চালক এবং অনিরাপদ সড়কই দুর্ঘটনার জন্য মূলত দায়ী। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের (আঞ্চলিক কমিটি) সভাপতি মোহাম্মদ মুছা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মালিকদেরও সচেতন হতে হবে। তারা চালকদের দৈনিক চুক্তিতে গাড়ি চালাতে দেন। এতে চালকরা অনেক বেশি যাত্রীর আশায় যে রুটে চলাচলের কথা সে রুটে চালায় না। নগরীতে ১৭টি রুট আছে। এসব রুটে যাত্রী থাকুক আর না থাকুক চালকদের নির্দিষ্ট গন্তব্য পর্যন্ত গাড়ি চালাতে হবে। অনেক সময় চালকরা অর্ধেক পথে বলে, গাড়ি আর যাবে না। এই বিষয়গুলো ট্রাফিক পুলিশকেও খেয়াল করতে হবে। মূলত রাস্তায় যানবাহনের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া গাড়ি কোথায় দাঁড়াবে তা মার্কিং করে দিতে হবে। যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী উঠালে চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ সেই দায়িত্বটি পালন করে না। শুধু ড্রাইভারের ওপর দোষ চাপিয়ে, শাস্তি দিয়ে যদি সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, তাহলে আমাদের আপত্তি নেই। আমার মতে, ট্রাফিক ও চালক উভয় পক্ষকে সংশোধন হতে হবে। বিআরটিএ সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে ৬০ হাজারেরও বেশি যানবাহন চলাচল করে। এরমধ্যে ৩০ হাজারেরও বেশি যানবাহন ফিটনেসবিহীন। যেগুলো প্রায় সময় দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। কেড়ে নিচ্ছে শ’ শ’ প্রাণ।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন