প্রথম কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী

সন্ত্রাস-দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স সুশাসনের অঙ্গীকার

শেষের পাতা

কূটনৈতিক রিপোর্টার | ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:০৭
নব প্রতিষ্ঠিত সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন। একই সঙ্গে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন যে, তার সরকার অবশ্যই সন্ত্রাসবাদ ও দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শন করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকদের এভাবেই আশ্বস্ত করেন। বলেন, সন্ত্রাসবাদে কেউ বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে পারবে না। রাষ্ট্রীয়ভাবে সুশাসন এবং সর্বক্ষেত্রে আইনের শাসন নিশ্চিতেও বিদেশি বন্ধু-উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে অঙ্গীকার করেন নয়া বিদেশমন্ত্রী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে এবং মন্ত্রণালয়ের তরফে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানানো হয়। ৭ই জানুয়ারি সরকার গঠনের পর গতকালই প্রথম কূটনৈতিক ব্রিফিং হয়।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মা’র ওই ব্রিফিংয়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক এবং জাতিসংঘের অধীন সংস্থাগুলোর মোট ৫৫ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। সেখানে মন্ত্রী ছাড়াও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি এবং জ্যেষ্ঠ সচিব শহীদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনার শুরুতে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহযোগিতা কামনা করেন। সেখানে তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের গত এক দশকের সাফল্যচিত্র তুলে ধরে বলেন, আগামী দিনে অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে তার সরকার ২০২১, ২০৩০ ও ২০৪১ লক্ষমাত্রা অর্জন করতে চায়। মন্ত্রী তারুণ্য এবং নারীর ক্ষমতায়ন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সহযোগিতাও কামনা করেন।

মানুষের ক্ষমতায়ন, উন্নয়ন, সংস্কৃতি ও শান্তি, অটিজম সচেতনতার বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের  রেজ্যুলেশনে বাংলাদেশের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতেও আগ্রহ প্রকাশ করেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে সমর্থনের জন্য আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে ধন্যবাদ জানিয়ে বাস্তুচ্যুতদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া নিশ্চিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

এদিকে বৈঠক সূত্র বলছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে কোনো লিখিত বক্তৃতা করেননি। তিনি খোলামেলাভাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এ সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি, কূটনীতি, রোহিঙ্গা ইস্যু, তার (পররাষ্ট্রমন্ত্রীর) এলাকার নির্বাচন, সরকারের এসডিজি, ভিশন-২০২১, ভিশন-২০৪১ প্রভৃতি সম্পর্কে কূটনীতিকদের ব্রিফ করেন। নিজের বক্তব্য শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উন্মুক্ত আলোচনার আহ্বান জানালেও কোনো রাষ্ট্রদূত কোনো প্রশ্ন করেননি। বৈঠক শেষে কূটনৈতিক কোরের ডিন ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রদূত আর্যবিশপ জর্জ কোচেরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার, আগামী দিনের পরিকল্পনা (ভিশন) সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি আগামী দিনে বাংলাদেশের নাম ও খ্যাতি কিভাবে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে চান সেটি শেয়ার করেছেন। তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সাফল্য লাভের জন্য সবার সহযোগিতা চেয়েছেন। ডিন বলেন, আমি কূটনৈতিক কোরের প্রধান হিসেবে সবার পক্ষ থেকে তাকে শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন জানিয়েছি। সেখানে অন্য কেউ কোনো প্রশ্ন করেননি জানিয়ে তিনি বলেন, আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছি, তার মিশন বাস্তবায়নে আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’ একে অপরকে জানার জন্য কূটনৈতিক ব্রিফিংটি একটি উত্তম সুযোগ ছিল বলেও মন্তব্য করেন ভ্যাটিকান রাষ্ট্রদূত।
উল্লেখ্য, কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘বাংলাদেশ অন মার্চ টুওয়ার্ডস প্রসপারিটি, ইলেকশন মেনিফেস্টো ২০১৮ অব বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ শীর্ষক একটি পুস্তিকাও বিতরণ করা হয়েছে। সেখানে বর্তমান সরকারের খাতওয়ারি উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বিগত আমলে অর্জিত সব সাফল্যের উল্লেখ রয়েছে।

প্রত্যাশায় চ্যালেঞ্জ বেড়েছে, সবার সহযোগিতা চাই: ওদিকে কূটনৈতিক ব্রিফিং এবং একাধিক রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলাদা বৈঠকের পর গতকাল সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। সেখানে তিনি বলেন, আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কূটনীতিকদের সহযোগিতা চেয়েছি। বলেছি, শেখ হাসিনা সরকারের ধারাবাহিকতায় জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়ে গেছে। এটি আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জও। ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা সবার অংশীদারিত্ব চাই, সহযোগিতা চাই। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনারদের প্রতি তিনি এই বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি তাদের বলেছি, আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন চাই। হাতে নেয়া পরিকল্পনাগুলো শেষ করতে চাই এবং দেশটাকে উন্নত করতে চাই। আমাদের একাধিক রোডম্যাপ আছে।

২০২১, ২০৩০, ২০৪১। এবং এজন্য আমাদের অনেক কাজ করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রদূতদের জানিয়েছি যে, সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে উন্নয়ন করতে গেলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করা যাবে না। এজন্য সরকার সন্ত্রাসবাদের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। এজন্য বাংলাদেশ অন্য কোনো রাষ্ট্রকে তার ভূমি ব্যবহার করতে দেবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি তাদের বলেছি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান কঠোর। আমরা নতুন প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে চাই এবং তারা (বিদেশিরা) আমাদের অংশীদার হিসেবে সহযোগিতা করতে পারে।’ রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের সহায়তা কামনা করে তিনি বলেন, ‘তারা যেন আরও বেশি সোচ্চার হয়।

আমরা চাই রোহিঙ্গারা সম্মানের সঙ্গে তাদের ভূমিতে ফেরত যাক এবং এ বিষয়ে যেন তারা আমাদের সহযোগিতা করে।’ নিজ এলাকার নির্বাচন বিষয়ে তিনি রাষ্ট্রদূতদের বলেন, ‘আমার এলাকায় কোনো লোক নিহত হয়নি এবং সহিংসতাও হয়েছে খুব কম। অত্যন্ত আনন্দমুখর পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ১ লাখ ২৩ হাজার ভোট পেয়েছেন। আমি পেয়েছি প্রায় ৩ লাখের মতো।’ কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপে আমি এটিও শেয়ার করেছি। তারা আমাদের এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আমিও তাদের ধন্যবাদ দিয়েছি।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন