খুচরা বাজারে এখনো বাড়তি দামেই চাল

প্রথম পাতা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:২১
বছরের শুরুতে সব ধরনের চালের দাম বস্তাপ্রতি বেড়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। কোনো কারণ ছাড়াই নির্বাচনের আগে ও পরে এই দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েন সাধারণ মানুষ। হঠাৎ চালের বাজারে অস্থিরতা কাটাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টরা তৎপর হওয়ায় পাইকারি বাজারে দাম বাড়া থেমেছে। কোনো কোনো  ক্ষেত্রে দাম কমেছেও। তবে খুচরা বাজারে এ পর্যন্ত বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে চাল। গতকাল রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে এ চিত্রই পাওয়া গেছে। হঠাৎ করে দাম বৃদ্ধির পেছনে মিল মালিক ও অসাধু সিন্ডিকেটদের কারসাজি রয়েছে বলে অভিযোগ খুচরা ও পাইকারি চাল ব্যবসায়ীদের। তাদের মতে, ৩০০ টাকা বাড়িয়ে ৫০ টাকা কমানো এটা একটা তামাশা ছাড়া কিছু নয়।
এদিকে সরকারি হিসাবেও বেড়েছে চালের দাম। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক সপ্তাহে চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে।

চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, চাল আমদানি প্রায় বন্ধ। সরকার আমনের চাল সংগ্রহ করছে। নির্বাচনের কারণে ধানের জোগান কমে গেছে। ফলে দাম কিছুটা বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে কাওরান বাজারে চাল নিয়ে আসেন ব্যবসায়ী ফারদিন আহমেদ। তিনি বলেন, মিল গেটে চালের দাম বস্তায় কমেছে ৫০ থেকে ৭০ টাকা। এর আগে বেড়ে ছিল ২০০ থেকে ২২০ টাকা। আশা করছি এর প্রভাব কয়েক দিনের মধ্যে খুচরা বাজারে পড়বে। কারণ আগের বাড়তি দামে কেনা চাল শেষ হলেই দাম কমতে থাকবে।

রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে জানা গেছে, বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে ভালো মানের মিনিকেট চালের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৪ থেকে ৫৮ টাকা। যা নির্বাচনের আগে ছিল ৫০ থেকে ৫২ টাকা। সে হিসাবে মিনিকেট চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ থেকে ৬ টাকা। তবে সব থেকে বেশি বেড়েছে মাঝারি মানের চালের দাম। বর্তমানে মাঝারি মানের চাল বিআর-২৮ ও লতা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৪ থেকে ৪৮ টাকা কেজিতে, যা আগে ছিল ৩৮ থেকে ৪২ টাকা। অর্থাৎ নতুন বছরে মাঝারি মানের চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৬ টাকা।

নির্বাচনের আগে ৩৪ থেকে ৩৬ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া মোটা চালের দাম বেড়ে হয়েছে ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। এ হিসাবে মোটা চালের দাম ৪ টাকা কেজিতে বেড়েছে। একইভাবে স্বর্ণা, নাজিরশাইল, পোলাওসহ সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। এদিকে মিল পর্যায়ে মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৫১ টাকা কেজিতে। সে চাল পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৫৩ টাকায়। আর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫৪ থেকে ৫৫ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে মিনিকেট চাল মিল পর্যায়ে বিক্রি হয় ৪৮ টাকায়। আর এ চাল কেজিতে ৪ টাকা বেশি দামে বিক্রি করেন মিল মালিকরা। এক সপ্তাহ আগে একই চাল পাইকারি বাজারে বিক্রি হয় ৪৯ টাকা।

টিসিবির হিসাবে, গত এক সপ্তাহে চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে সরু চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৩ টাকা। বাজারে বর্তমানে এ চালের দাম কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৬৫ টাকা দরে। আর মাসিক মূল্যের ভিত্তিতে সরু চালের দাম বেড়েছে ৪.৩১ শতাংশ। মোটা চাল ছাড়া সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। মোটা চালের দাম কমেছে ২.৪৪ শতাংশ।

ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, চালের দাম বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। দাম বৃদ্ধি অযৌক্তিক। সরকার সংশ্লিষ্টদের এর কারণ অনুসন্ধান করতে হবে।

রাজধানীর বাদামতলী-বাবুবাজার চাল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই নির্বাচনের পর চালের দাম বস্তায় বাড়ানো হয়েছে ৩০০ টাকা। এখন দেশে কোনো বন্যা, খরা, বৃষ্টি কিছুই হয়নি। সরবরাহও স্বাভাবিক রয়েছে। তাহলে কেন চালের দাম বাড়বে। চালের দাম বাড়ার যদি কোন কারণ থাকে তাহলো সিন্ডিকেট। মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে গতকাল পর্যন্ত সব ধরনের চালের ৫০ কেজির বস্তায় ৫০ টাকা কমেছে।

তবে চালের দাম স্বাভাবিক করতে হলে মিল মালিকদের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। সেই সঙ্গে বাজারে নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। কাওরান বাজারের পাইকারি চাল বিক্রেতা কামাল রাইস এজেন্সির মালিক আবদুল হান্নান বলেন, আমরা এখনো কম দামের চাল হাতে পাইনি। কম দামের চাল কিনতে পারলে কম দামে বিক্রি করবো। তিনি বলেন, আমাদের কাছে ম্যাসেজ আসে বস্তায় ৫০ টাকা বাড়বে। এর পর আবার ম্যাসেজ আসে ১০০ টাকা বাড়বে। এভাবে গত কয়েক দিনে বস্তায় ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে আমরা দাম কমার ম্যাসেজ পাইছি। কিন্তু আগের বেশি দামে কেনা চাল শেষ হলেই তার পর কম দামে বিক্রি করতে পারবো। আরেক খুচরা চাল বিক্রেতা খালেক বলেন, মনিটরিং না করায় মিল মালিকরা সুযোগ বুঝে সব ধরনের চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।

বাবুবাজারের সরকার ট্রেডিং এজেন্সির স্বত্বাধিকারী হাজী ইব্রাহিম বলেন, প্রথমে রশিদের চালের দাম বেড়েছে। এরপর একে একে সব কোম্পানি চালের দাম বেড়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ৫০ কেজির এক বস্তা মিনিকেট চাল বিক্রি করেছি ২৬০০ থেকে ২৬৫০ টাকা। এখন সেই চাল ২৭৫০ টাকা বিক্রি করতে হচ্ছে। ১৯৫০ টাকা বিক্রি করা বিআর-২৮ চালের বস্তা এখন বিক্রি করতে হচ্ছে ২২৫০ টাকা। এভাবে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে।

বাংলাদেশ অটোমেইল অ্যান্ড হাস্কিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, ধানের দামও বাড়েনি, চালের দামও বাড়েনি। ভোটের সময় একটু গ্যাপ ছিল। মোট চালের দাম সরকারের বেঁধে দেয়া দামেই বিক্রি হচ্ছে। কোন জেলাতেই মোটা চালের কেজি ৩৬ টাকা পার হয়নি। ঢাকায় কেন ৪০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে এটা সরকারের খোঁজ নেয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, যেকোনো মূল্যে চালের দাম স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে সরকার। চালের দাম গত দু-একদিনের মধ্যে দাম বাড়েনি। তবে টিআর-কাবিখা কর্মসূচি শুরু করলে দাম কমে যাবে। দাম বাড়ার বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী আরো বলেন, গোডাউনগুলোতে চাল মজুদ করে দাম বাড়ানো হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন