মাছ চাই, না বড়শি চাই?

ষোলো আনা

আশির আহমেদ, জাপান থেকে | ১১ জানুয়ারি ২০১৯, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:১১
এটা একটা জনপ্রিয় চাইনিজ ছোট গল্প। ছেলে মাছ খেতে চাইলো। সরাসরি মাছ দিলে, সে একবারই মাছ খাবে। সাময়িকভাবে খুশি হবে। বাবা তাকে সেই সুযোগ দিলেন না। মাছ না দিয়ে ধরিয়ে দিলেন একটা বড়শি। মাছ ধরা শিখিয়ে দিলেন। ছেলের প্রথম কয়েকটা দিন কষ্টে কাটলো। কিন্তু মাছ ধরার কৌশলটা জানার কারণে সে সারা জীবন মাছ খেতে পারলো।

আপনি কী চাইবেন? মাছ? না কী মাছ ধরার কৌশল?  

১. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল জাপান। যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি কোনো অবকাঠামোই তো অবশিষ্ট ছিল না। ছিল না তেমন কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ। দেশটি নিজের পায়ে দাঁড়াতে বিশ্বব্যাংক থেকে টাকা ধার নিলো। সেই টাকা দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, চিকিৎসার অবকাঠামো তৈরি করলো। শিনকানসেন (পৃথিবীর দ্রুততম ট্রেন) টানলো, বড় বড় শহরগুলোকে হাইওয়ে দিয়ে কানেক্ট করলো। শত শত ফ্লাইওভার তৈরি হলো, পাহাড়ের ভেতরে সমুদ্রের নিচে টানেল তৈরি হলো। মজার ব্যাপারটি হলো- বিদেশ থেকে কোনো শ্রমিক আমদানি করলো না।

কোম্পানিগুলোর ম্যানেজার বাইরে থেকে আনলো না। টয়োটা, হোন্ডা, তোসিবা, সনি, হিটাচি এমন শত শত কোম্পানি কাজ করে দিলো নিজেদের লোক দিয়ে। সিইও থেকে শুরু করে ম্যানেজার, শ্রমিক সবই জাপানি। নিজেদের কর্মদক্ষতা বাড়লো, অভিজ্ঞতা বাড়লো। এই কোম্পানিগুলো কোথাও টেন্ডারে অংশগ্রহণ করলে বা কোনো কর্মচারী চাকরিতে আবেদন করলে কেউ বলতে পারবে না- যাহ তোদের অভিজ্ঞতা নেই, আগে অভিজ্ঞতা নিয়ে আয়, তারপর চাকরি।

জিডিপি হু হু করে বাড়তে লাগলো। ধারের টাকা ফেরত দিয়ে ২০ বছরের মাথায় আমেরিকাকে, বিশ্বব্যাংকে উল্টো ঋণী করে ফেললো। শুরু থেকেই জাপান বাইরে থেকে কোনো প্রডাক্ট কেনেনি। টেকনোলজি আমদানি করেছে।
ধরুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যকলাপ ধারণ করার জন্য ক্যামেরা লাগবে। ওনারা তিনজন নয় ছয়জন লোক পাঠাবেন। ক্যামেরা যাচাই বাছাই করার জন্য নয়। ক্যামেরা কিভাবে বানাতে হয় সেই টেকনোলজি শিখে মগজে ভরে আনার জন্য। যেন দেশে এসে শুধু প্রধানমন্ত্রীর জন্যই নয়, সাধারণ জনগণ ও এফোর্ড করতে পারে এমন ক্যামেরা বানাতে পারেন। নিজ দেশে কাজে লাগলে অন্য দেশেও কাজে লাগবে। রপ্তানি করো, আরো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করো। জিডিপি বাড়াও।

মাছ চাইলেই মাছ নয়, মাছ ধরার কৌশলটা শিখিয়ে দাও।

২. মালয়েশিয়ার মাহাতির মুহম্মদ জাপানে পড়াশোনা করেছেন। ক্যাপাসিটি বিল্ড করার জাপানিদের এই কৌশলটি শিখে গেলেন। আশি ও নব্বইয়ের দশকে স্ট্রাটিজিক্যালি দলে দলে মালয় গোষ্ঠীকে বিদেশে পাঠালেন। পড়াশোনার জন্য। স্কিল ডেভেলপমেন্ট এর জন্য। আমেরিকা, ইউরোপ আর জাপান। বিদেশ থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই সেই বিদ্যা কাজে লাগানোর মতো জায়গায় সেট করে দিলেন। প্রোডাক্টিভিটি বাড়লো, আয় বাড়লো। ম্যানেজার শ্রেণির লোক তৈরি হলো। বিদেশ থেকে যা আমদানি করলো তা হলো শ্রমিক শ্রেণির লোক। যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসার অবকাঠামো তৈরি হলো। নিজের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ালেন। এখন আর মালয় ছাত্রদের তেমন বিদেশে যেতে হচ্ছে না। বরং বাইরে থেকে মালয়েশিয়াতে বিদেশি ছাত্র আসা শুরু করেছে। চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে হচ্ছে না।

জাপানি কোম্পানিগুলোকে ইনভেস্ট করার উইন উইন সিচুয়েশন তৈরি করে দিলেন। জাপানিরা ইনভেস্ট করলেন। গাড়ি কোম্পানি, হোম ইলেক্ট্রনিক্স কোম্পানি। মাহাতির এর দল স্ট্রাটিজিটা এমনভাবে করলেন যাতে টেকনোলজিটা ট্রান্সফার হয়। স্কিল ডেভেলপমেন্ট হয়। ৫০ বছরে জাপান যা টেকনোলজি ডেভেলপ করেছে তা যেন পাঁচ বছরে ট্রান্সফার হয়। তার ফলাফল দেখেন। ’৮৫-র দিকে মালয়েশিয়ান ব্র্যান্ডের প্রোটন সাগা (মিতসুবিশি জয়েন্ট ভেঞ্চার) গাড়ি বাজারে এলো।

আর আমরা আমাদের মন্ত্রী, এমপিদের জন্য বিনা ট্যাক্সে কিভাবে গাড়ি আমদানি করতে পারি সেই পলিসি বানিয়ে দিলাম। অথচ আমাদের প্রগতি, র‌্যাংগস বা সদ্য ওঠা ওয়ালটন দিয়ে গাড়ির ১০% জিনিস ও তৈরি করে শুরুটা করলে কেমন হতো? ইতিমধ্যে মেইড ইন বাংলাদেশ একটা ব্র্যান্ড বেরিয়ে আসতো না? কয়েক হাজার লোকের কর্মসংস্থান হতো না? টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট, স্কিল ডেভেলপমেন্ট হতো না? সেই শুরুটা আজো সম্ভব। বেটার লেইট দ্যান নেভার।

ক্যামেরা থেকে শুরু করে হোম-ইলেক্ট্রনিক্সের এমন কোনো জাপানি প্রোডাক্ট নেই যাতে মেইড ইন মালয়েশিয়া লেখা নেই। একবার ম্যানচেস্টার থেকে জাপানি ফ্লাইটে করে জাপান ফিরছি। মুসলিম হালাল ফুড অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাম। দেখি বাক্সে হালাল একটা সিল দেয়া। লেখা Certified by MHCTA (Malaysian Halal Consultation and Training Agency)। কত জায়গায় এদের বিচরণ।

৩. ২০১০ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। বাংলাদেশের একজন নামকরা অর্থনিতিবিদ গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। জেমস ওয়াট নামের যে বৈজ্ঞানিক স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কার করেছিলেন, তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন ইন্সট্রুমেন্ট মেকার ছিলেন। গ্লাসগো শহরটা ঘুরিয়ে দেখালেন। শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা, ওয়াটার সাপ্লাই, পার্ক, টাউন হল ইত্যাদি। গ্লাসগো সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশনটা তৈরি হয়েছে ১৮৭৯ সালে। অন্যান্য অবকাঠামোগুলোও একই সময়ের তৈরি। বৃটিশ সরকার আমাদের দেশগুলো থেকে ট্যাক্স কালেক্ট করেছেন আর ব্যয় করেছেন জনস্বার্থে। অর্থনিতিবিদ বললেন, আর আমাদের অবস্থা দেখেন- শাহজাহান সাহেব আমাদের অবকাঠামোতে মনোযোগ না দিয়ে বানালেন তাজমহল, নিজের জন্য। জনগণের জন্য নয়। শায়েস্তা খাঁ টাকায় আট মণ চাল খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। যারা কিনলো তাদের উপকার হলো, কিন্তু যে চাল তৈরি করলো সেই কৃষকের বারোটা বাজলো। আট মণ চাল মানে ১৪ মণ ধান। ১৪ মণ ধান বিক্রি করে মাত্র এক টাকা আয় হতো। গরিব কৃষক গরিবই রয়ে গেল।
 
 (৫) ১৯৯৬ সালের কথা। ভারতে আইটি সেক্টরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বেড়েই চলছে। ভারতের সরকার বড় তিনটি কোম্পানির প্রধানদের ডাকলেন। ইনফোসিস, টাটা আর আজিম প্রেমজির উইপ্রোকে। ডেকে বললেন, দেশের উন্নতির জন্য আপনাদের কন্ট্রিবিউশন অনেক। সরকারের কাছে কী আপনাদের কিছু চাওয়ার আছে? তিন কোম্পানিই অবাক হলেন। বললেন, আমাদের একমাস সময় দেন। আমরা একটা লিস্ট দেব। ওনারা এক সপ্তাহ পরেই একটা উইশ লিস্ট দিলেন। তিন কোম্পানির তিন দাবি- (ক) Stay away from us (খ) Stay away from us (গ) Stay away from us।

জাপানের জাইকা আমাদের অনেক সাহায্য করেন। আমরা খুশি। এই খুশিটাকে স্বল্পমেয়াদী না করে দীর্ঘমেয়াদী করা চাই। শুনে থাকবেন বছর দুই আগে জাপানি সরকারের সঙ্গে আমাদের ৬০ বিলিয়ন ইয়েন এর একটা চুক্তি সই হয়েছে। বলেন তো দেখি এই টাকা কী সাহায্য? না কী ধার?  ধার নিচ্ছে কে ফেরত দিচ্ছে কে? আমরা যদি ধারই নিয়ে থাকি, তাহলে এই টাকাটা কন্ট্রোল করছে কে? প্ল্যান করছে কে, ইমপ্লিমেন্ট করছে কে? কতটাকার প্রোডাক্ট কিনছি? কত টাকার টেকনোলজি কিনছি? কতটাকার স্কিল ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে? টাকাটা ফেরত দিচ্ছি কবে?  

জাপান আমাদের একটা বন্ধু দেশ। প্রোডাক্ট না চেয়ে টেকনোলজি চাইলে ওনারা ‘না’ করবেন না। আমরা মাছ চাচ্ছি না কি মাছ ধরার টেকনোলজি চাচ্ছি, এই সিদ্ধান্ত দেয়ার দায়িত্ব আমাদের।




এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Raju

২০১৯-০১-১৪ ১৩:৩৫:২৬

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।very much inspiriable topic.

Dr. Md. Ershad Halim

২০১৯-০১-১২ ১২:২১:২৭

Excellent !!!!!

বজলুর রশিদ

২০১৯-০১-১০ ২২:৩৬:২৯

আমি 25 বছর বিদেশে সেই 25আগে মালয়েশিয়া গিয়ে ছিলাম ওনার লিখাই সবই ঠিক ।আমার মন চায় এমন উপদেশ লিখতে ।কথা গুলি বাস্তবে রুপ দিলে আর কাওকে বিদেশ যেতে হতনা ।সব সময় আমার প্রস্ন জাগে বিদেশে আমরা সবই পারি দেশে কেন পারি না ।তার মানে বরসী নেই ।আমার উক্তি তোমরা আমাকে বরসি দাও আমি তোমাদের কে মাছ খাওয়াব।এমন লেখা আরও লিখবেন ।

Md Noor sayed hossen

২০১৯-০১-১০ ২১:১০:২৫

Very brilliant writing. I hope our government will take steps for it.

Md Abdur Rahman

২০১৯-০১-১১ ১০:০৯:৩৩

what a Master Piece!!!!!

Sumon

২০১৯-০১-১০ ১২:১৪:৫২

চমৎকার বিশ্লেষণ। পড়ে অনেক ভালো লাগল। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্চা থাকলে দেশের উন্নতি আটকে থাকে না।

আপনার মতামত দিন

রাঙ্গামাটিতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত

ঈদে সড়কেই প্রাণ গেল ২২৪ জনের

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আদৌ শুরু হচ্ছে কি?

কুমিল্লায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৮

এখনো উচ্চ ঝুঁকি ২৪ ঘণ্টায় ১৭০৬ রোগী ভর্তি

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ

ডেঙ্গুর প্রজননস্থলে কতটা যেতে পারছেন মশক নিধন কর্মীরা?

বৈঠকের পর চামড়া বিক্রিতে সম্মত আড়তদাররা

জনগণকে সতর্ক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার পরামর্শ

ছিনতাইকারীর হাতে খুন হন কলেজছাত্র রাব্বী

শিক্ষিকাকে গণধর্ষণের পর হত্যা

শহিদুল আলমের মামলা স্থগিতই থাকবে

ডেঙ্গুর ভয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ তবুও...

রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে ঢামেকে সংঘর্ষ, আহত ২৫

টার্গেট রাজনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ়করণ

ইউজিসি প্রফেসর হলেন ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ