হঠাৎ বেড়েছে হত্যা, নৃশংসতা

প্রথম পাতা

শুভ্র দেব | ১০ জানুয়ারি ২০১৯, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:২৫
সারা দেশে হঠাৎ করেই বেড়েছে হত্যাকাণ্ড-নৃশংসতা। বিদায়ী বছরের শেষ সময়ে সারা দেশেই অপরাধপ্রবণতা অনেকটা কম ছিল। কিন্তু নতুন বছরের শুরু থেকে অপরাধ ও অপরাধীদের তৎপরতা অনেকটা বেড়ে গেছে। গত নয়দিনে সারা দেশে শতাধিক হত্যাকাণ্ড ও নারী শিশু ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, দিনের পর দিন অপরাধীদের মানসিকতা বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। আর পেছনে কাজ করছে মাদকের কুফল। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতার লোভ, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়া, সম্পত্তির লোভ, হিংসা-প্রতিহিংসা, সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক স্খলনের কারণে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি সোহেল রানা মানবজমিনকে বলেন, যেকোনো ধরনের অপরাধ ও অপরাধীদের দমন করতে পুলিশ তার সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে।
যখনই কোনো অপরাধ সংঘটিত হয় তখনই পুলিশ সেই ঘটনার তদন্ত শুরু করে। পুলিশ সবসময়ই চেষ্টা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে আসামিকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে।

৩০শে ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের দিন রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় গণ ধর্ষণের শিকার হন এক গৃহবধূ। তার স্বামী সন্তানকে বেঁধে নির্যাতনের পাশপাশি ওই নারীকে দল বেঁধে ধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় সারা দেশে ব্যাপক নিন্দার ঝড় উঠে। যদিও পরে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচনের দিন সারা দেশে সহিংসতায় অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনের আগে প্রচার প্রচারণা চলার সময় রাজনৈতিক সংহিসংতায় মারা যায় আরও কয়েকজন।

সর্বশেষ গত সোমবার ঢাকার ডেমরা এলাকায় ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দুই শিশুকে হত্যা করে দুই দৃর্বৃত্ত। এ ঘটনায় জড়িত দুজনকেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই ধরনের অন্য একটি ঘটনা ঘটেছে গেন্ডারিয়া এলাকায়। ওই এলাকায় দুই বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তিনতলা থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ উঠেছে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
৩রা জানুয়ারি রাজধানীর মিরপুর পল্লবী বাউনিয়াবাঁধ এলাকায় নিজের বৃদ্ধ মাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে মাদকাসক্ত ছেলে। নিহত ওই নারীর নাম কাজল রেখা (৫০)। তিনি মিরপুর ৫নং ওয়ার্ড যুবদল নেতা  রহিমের দ্বিতীয় স্ত্রী। ৬ই জানুয়ারি রাতে মিরপুরে কামরুজ্জামান ওরফে সুমন নামের এক যুবক (৩০) দুর্বৃত্তদের হামলায় মারা যায়। হামলায় গুরুতর আহত হয় আরও দুজন। তারা আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। ওইদিন রাতে কামরুজ্জামান মিরপুরের প্যারিস রোডে তাদের নির্মাণাধীন ভবনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। এসময় মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন যুবক তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। ৭ই জানুয়ারি  ডেমরার কোনাবাড়ীতে ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ৪ বছর বয়সী দুই শিশুকে হত্যা করেছে গোলাম মোস্তফা ও আজিজুল নামের দুই দুর্বৃত্ত। পাশাপাশি এলাকায় থাকতো এই দুই শিশু। তারা একই স্কুলে পড়তো। এ ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চলের সৃষ্টি হয়। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত দুই জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

গেন্ডারিয়া এলাকায় খিচুড়ি খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে দুই বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টা চালিয়েছিল ওই এলাকার ৪৫ বছর বয়সী নাহিদ। ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে সে ওই শিশুকে তিনতলার ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করে। এ ঘটনার পর এলাকাবাসীর বিক্ষোভ ও থানা ঘেরাও করে দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। গতকাল অভিযুক্ত ব্যক্তির ১২ বছর বয়সী মেয়ে বাবার বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছে।
৮ই জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের সদর উপজেলায় নিচের ক্লাসের এক ছাত্রকে নাম ধরে ডাকতে নিষেধ করার জের ধরে মেহেদী (১৬) নামের এক শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ যশোরের মনিরামপুরে শিশু তারিফ হোসেনকে হত্যা করে অপহরণকারীরা। তাকে অপহরণ করে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে সন্দেহভাজন অপহরণকারী মারা যায়। গতকাল রাজধানীর বংশালে ইউনূস নামের এক লন্ড্রি দোকানের কর্মচারী খুন হন ওই দোকানের আরেক কর্মচারীর হাতে। এ ছাড়া নোয়াখালীর সুবর্ণচরে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ভাতিজার হাতে চাচা দুলালের মৃত্যু হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানী সাদেকা হালিম মানবজমিনকে বলেন, অপরাধ থেমে নাই। অপরাধীরা সবসময় অপরাধ করে যায়। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পরে সব মানুষই যখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ঠিক তখনই বেশ কিছু নৃশংস ঘটনা ঘটে গেল। বিশেষ করে শিশুদের ওপর বর্বরতা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। কারণ অপরাধীদের প্রথম টার্গেট থাকে শিশুরা। কারণ তারা কিছু বলতে পারে না, প্রতিবাদ করতে পারে না। সামান্য চকলেট বা অন্য কিছুর লোভ দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা যায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আইনের জায়গাটা অনেক পলিটিক্যাল হয়ে গেছে। আইন ঠিকই আছে তবে যারা আইন প্রয়োগ করে তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে যান। আর যারা অপরাধ করে এসব সন্ত্রাসী বা দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিক একটা সম্পৃক্ততা থাকে। ফলে তারা বারবারই হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন করেই যায় এবং ছাড় পেয়ে যায়। আমাদের দেশের পুলিশ অন্যান্য কাজ যত দ্রুততার সঙ্গে করতে পারে যখন কোনো হত্যাকাণ্ড বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তখন তাদের এত দ্রুততা আমরা দেখতে পাই না। তাই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আমাদের সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এজন্য আমি মনে করি অত্যন্ত কঠিনভাবে এগুলো দমন করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। না হলে এসব অপরাধ কমবে না। এ ছাড়া এসব ঘটনা কমাতে হলে মাদকের ভয়াবহত কমাতে হবে বলে মনে করেন এই সমাজবিজ্ঞানী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচনের পরবর্তী সময় ও নতুন বছরের শুরুতে যেভাবে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে গেল সে তুলনায় নির্বাচনকালীন সময় ও তার আগে বড় ধরনের কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটেনি। কারণ ওই সময়টা রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সহনশীল আচরণ করে থাকে। ভোটের হিসাব নিকাশের কথা চিন্তা করে তারা তখন নিজেকে আদর্শবান ব্যক্তি বা দল হিসাবে প্রমাণ করতে চায়। সেই ভোটের হিসাবের সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়া বা না যাওয়ার বিষয়টি কাজ করে। ওই সময়টাতে যে একপক্ষের সঙ্গে আরেক পক্ষের মনমালিন্য হয়নি বিষয়টি এমন না। তখনও সহিংসতা হওয়ার মতো অনেক বিষয় ছিল। ঘটনার ইস্যু তৈরি হয়েছে তবে সহিংসতার দিকে যায়নি। তিনি বলেন, এ বছরের শুরুতেই অনেকগুলো ঘটনা আমাদের চিন্তিত করে তুলছে। বিশেষ করে নোয়াখালীতে যে ঘটনা ঘটেছে সেটি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আচরণের নেতিবাচক ইঙ্গিতের জানান দেয়। এর বাইরে বেশ কিছু সামাজিক নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেরকম তৎপরতা ছিল সেটি এখন অনেকটা শিথিল হয়েছে। আর এই সুযোগেই সামাজিক অপরাধ বেড়ে  গেছে। তৌহিদুল হক বলেন, মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা সবসময়ই থাকবে। সেগুলো পরস্পর সহনশীলতা, সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও দেশের প্রচলিত আইন মোকাবিলা করা সম্ভব।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন