হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন

নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় বেড়েছে দমনপীড়ন

শেষের পাতা

মানবজমিন ডেস্ক | ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪৭
নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও ভয় প্রদর্শনের মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে হুমকিতে ফেলেছে। শুক্রবার নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে  
 মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ কথা জানিয়েছে। বিবৃতিতে সংস্থাটি জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও অন্যান্য রাষ্ট্রের প্রতি প্রচারণাকালীন সহিংসতা বন্ধ এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নিশ্চিতের লক্ষ্যে সরকারের উপর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানায়।

এ বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা চালায়। এতে নিরাপত্তাবাহিনী নির্বিচারে আন্দোলনকারী ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও আটক করছে এরকম প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। একইসঙ্গে, শাসকদল আওয়ামী লীগের ছাত্র ও যুব সংগঠনের হুমকি প্রদান ও সহিংসতার কথাও উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে। এসব ধর পাকড় এখানে একটি ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করছে। বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচারণা ও নির্বাচনবিষয়ক বিরোধগুলো নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে সমাধান করতে পারছে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, রাজনীতিতে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকার পর্যায়ক্রমে বিরোধী মত ও স্বাধীনতাকে দমিয়ে দিচ্ছে।
প্রধান বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার, খুন ও গুমের শিকার হচ্ছে। এতে এখানে একটি দমন ও ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যা একটি নির্ভরযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশের নাগরিকদের নিজেদের সরকার বেছে নেয়ার অধিকার রক্ষার্থে সরকারের উচিত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বিরোধী দলের বিরুদ্ধে চলমান দমনপীড়ন বন্ধ করা। বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশের মিডিয়া স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং সংগঠন, সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনে দমনমূলক আইন প্রণয়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সেপ্টেম্বর মাস থেকে দমনপীড়ন তীব্র রূপ ধারণ করে। বিরোধী দল বিএনপি দাবি করেছে, সরকার তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৩ লাখেরও বেশি মামলা দায়ের করেছে এবং তাদের হাজার হাজার কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিরোধী জোট ঐক্যফ্রন্টকে টার্গেট করা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচন থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে এবং তাদের সদস্যরাও গ্রেপ্তারের শিকার হচ্ছে। দলটির মুখপাত্রের দাবি, শুধুমাত্র নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসেই তাদের ১৮৫৮ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিরোধী নেতাদের নির্বিচারে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে ৪৬টি মামলা রয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে রয়েছে ৪২ মামলা। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী সাইফুল আলম নিরব ২৬৭টি মামলায় লড়ছেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা সবাইকে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ নির্বাচন কমিশন শাসক দলের হয়ে কাজ করছে। যেখানে মাত্র ৩ জন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছিল সেখানে বিএনপির প্রায় ১৪১ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হতেই, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে অনেক মানুষ আহত হয়েছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সকল দলের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যাতে তাদের সমর্থকরা সহিংস আচরণ থেকে বিরত থাকে। অ্যাডামস বলেন, পাঁচ বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতায় বসে। দলটি তারপর থেকে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোকে উপহাসে পরিনত করে। এখন দাতা দেশগুলোর উচিত বাংলাদেশে মানবাধিক প্রতিষ্ঠায় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করলেও, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আসন্ন ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। যদিও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন আয়োজনের জন্য তাদের দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর বেশিরভাগ একইরকম। নাম, তারিখ ও স্থানভেদে কিছু পার্থক্য থাকলেও একই বিন্যাসে মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, এ ধরনের প্রায় ৩০ হাজার ‘মিথ্যা ও সাজানো’ মামলায় তাদের প্রায় ৩ লাখ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিছু কিছু মামলায় অভিযোগগুলো থাকে একদমই ভিত্তিহীন।

বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে তিনি হয় মৃত নয়তো অপরাধ সংগঠনের সময় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১৭ই অক্টোবর, মারা যাওয়ার এক বছর পর বিএনপি সমর্থক জসিম উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে একটি গ্যাস বোমা হামলার অভিযোগে মামলা দেয়া হয়। ২০০৭ সালে মারা যাওয়া মিন্টু কুমার দাস নামের এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে গত ১১ই সেপ্টেম্বর রাস্তা অবরোধের মামলা দেয়া হয়। মৃত, বিদেশে অবস্থানরত, পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের বিরুদ্ধে হওয়া এ ধরনের মামলার প্রেক্ষিতে পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল মোহাম্মদ জাভেদ পাটওয়ারি তদন্তের নির্দেশ দেন।

এছাড়াও, গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকজন বিরোধী নেতা হামলার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন, মানিকগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল আলমগীর এবং আরেক বিএনপি প্রার্থী শরীফুজ্জামান শরীফ। বিরোধী নেতা-কর্মীদের টার্গেট করে সহিংসতার খবর ক্রমাগত বেড়েই চলেছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটি দাবি করে, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় পুলিশ এ ঘটনা সম্পর্কে অবগত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষণায় উঠে এসেছে, গ্রেপ্তারের শিকার অনেকেই কারাগারে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নির্যাতিত বন্দিরা অভিযোগ করেছেন, তাদের ঘুষিসহ প্লাস্টিক পাইপ কিংবা আঁখের কাণ্ড দিয়ে মারা হয়েছে। ৫ই মার্চ বিএনপি নেতা জাকির হোসেন মিলন (৩৮) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন শেষে ফেরার সময় গ্রেপ্তার হন। তাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে আসা হয়। ১১ই মার্চ তাকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেসময় তিনি তার স্বজনদের জানান, তাকে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি তার দুই সন্তানকে দেখে রাখার অনুরোধ করে বলেছিলেন, আমি জানিনা আমার কি হবে। তার পরদিনই তিনি জেলে মারা যান। তার পরিবার জানিয়েছে, তার মরদেহে কালো দাগ দেখতে পেয়েছেন এবং তার আঙুলের নখগুলো তুলে ফেলা হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের এক সদস্য হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছেন, ডিবি পুলিশের কারাগারে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার কানে স্ট্যাপলার ব্যবহার করা হয়েছিল। একইসঙ্গে, লাঠি দিয়ে তার হাত ও পায়ের সন্ধিস্থলে পেটানো হয়েছে, পানিতে চুবানো হয়েছে এবং তাকে গুলি করার হুমকি দেয়া হয়েছে বলেও জানায় ওই শিবির কর্মী।

মিডিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে সুশীল সমাজের একজন সদস্য হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছেন, আমি মনে করি না আমরা কখনো এত খারাপ অবস্থায় ছিলাম। এমনকি আগের সেনাশাসন চলাকালীনও মানুষের কথা বলার অধিকার ছিল। সাংবাদিকদের রুদ্ধ এবং সাধারণ নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ ও সরকারের বিরোধী ও সমালোচকদের দমনে কর্তৃপক্ষ নানা আইনের ইচ্ছামতো ব্যবহার করছে। সরকার সমালোচকদের গ্রেপ্তারে তথ্য প্রযুক্তি আইন ব্যবহার করা হয়েছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ফেসবুকে প্রকাশ করায় চিত্রগ্রাহক ও অধিকারকর্মী শহিদুল আলমকে ৫ই আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয়। ১০৭ দিন আটক থাকার পরে তিনি মুক্তি পেয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, কারাগারে পুলিশ তাকে নির্যাতন করেছে। ফেসবুক পোস্টের কারণে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মইদুল ইসলামও।

২০১৭ সালে অধিকার নামে ঢাকাভিত্তিক একটি মানবাধিক সংস্থা ৮৬টি গুমের ঘটনা রেকর্ড করে। এ বছরের নভেম্বর মাস পর্যন্ত এরকম ঘটনা ছিল আরো ৭১টি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দাবি করেছে, কখনো গুম হওয়া কাউকে ছেড়ে দেয়া হয় বা কখনো আদালতে হাজির করা হয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তাদের মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অধিকার নভেম্বর মাসে ১২টি জোরপূূর্বক গুমের ঘটনা রেকর্ড করেছে। ১৮ই নভেম্বর ডিবি পুলিশ পরিচয়ে সোহাগ ভুঁইয়া নামের এক ছাত্রদল নেতাকে আটক করা হয়। ২৮শে নভেম্বর, একই পরিচয় দিয়ে রবিউল আউয়াল নামের আরেক অনলাইন এক্টিভিস্টকে আটক করা হয়। এরপর থেকে তাদের আর কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের উপর রাজনৈতিক চাপ এবং নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার হুমকির অভিযোগ রয়েছে। সমপ্রতি প্রকাশিত নিজের আত্মজীবনীতে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা দাবি করেন, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলাগুলো প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

মারা গেলেন মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোরসি

বালিশকাণ্ডে জড়িত প্রকৌশলী ছিলেন ছাত্রদল নেতা: প্রধানমন্ত্রী

একই দিনে সাকিবের মুকুটে দুই পালক

কাটারের কাটলো ৪৮ মাস

রামপালসহ বিতর্কিত সব প্রকল্প স্থগিত করার দাবি টিআইবির

আওয়ামী লীগ জিতলেও পরাজিত হয়েছে গণতন্ত্র:ফখরুল

‘মাশরাফিদের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে’

আইএসআইয়ের নতুন প্রধান জেনারেল ফয়েজ

দেশে ফিরতে রাজি হয়েছেন সাগরে আটকে পড়া ৬৪ বাংলাদেশি

যে মাইলফলক হাতছানি দিচ্ছে সাকিবকে

জামিন নাকচ, কারাগারে ওসি মোয়াজ্জেম

পাকুন্দিয়ায় চোরাই মোটরসাইকেলসহ একজন গ্রেপ্তার

ভূঞাপুরে পরিত্যক্ত ভবনে চলছে পাঠদান

দ্বিতীয় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচিতে ছাত্রদল

বিএনপির আরও অনেক নেতাকর্মীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হবে: রিজভী

৩০ বছরে বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে ২০০ কোটি