সৌদি আরবে শঙ্কায় লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক

শেষের পাতা

ওয়েছ খছরু, সৌদি আরব থেকে ফিরে | ২১ অক্টোবর ২০১৮, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:১৯
নতুন নতুন নিয়মের জালে আটকা পড়ছেন সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকরা। এ কারণে লাখ লাখ শ্রমিক অজানা আতঙ্কে ভুগছেন। যারা ব্যবসা করছেন তারাও হয়ে পড়ছেন তটস্থ। কেউ কেউ তল্পিতল্পা গুছিয়ে দেশের পথে রওনা দিয়েছেন। সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশিরা আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে সৌদি আরবের বিশাল শ্রম বাজার হারিয়ে ফেলবে বাংলাদেশ। সৌদি আরবকে তাড়িয়ে দিতে হচ্ছে না, নিয়মের জালে আটকা পড়ে দেশের পথে রওনা দিতে হচ্ছে শ্রমিকদের। ইতিমধ্যে অনেকেই দিচ্ছেনও।

মদিনা শহরেই বসবাস করেন বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি।
ওখানে বাংলা মার্কেট নামে বাঙালি এলাকা রয়েছে। বাংলাদেশিরাই সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। খেজুর, জায়নামাজ, জুতা, তসবিহসহ নানা পণ্যের দোকানের মালিক ছিলেন বাংলাদেশিরা। কিন্তু গেল কয়েক মাসে ব্যবধানে ওই এলাকায় বাঙালি দোকানের সংখ্যা কমে এসেছে। যে কয়েকটি দোকান রয়েছে সেগুলোও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বাংলা মার্কেটে বসবাসরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা জানালেন, সৌদি আরবে নতুন নিয়ম চালু হয়েছে ভিনদেশিদের যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোতে বাধ্যতামূলক সৌদিয়ান নাগরিকদের চাকরিতে নিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারের আয়কর বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে দিগুণ থেকে তিন গুণও। এ কারণে মদিনার বাংলা মার্কেট ও আশপাশ এলাকায় হাটলেই চোখে পড়ে অধিকাংশ দোকান বন্ধ। মদিনাতে বসবাসরত সিলেটের বালাগঞ্জের আব্দুল কাদির জানালেন, মদিনাতে যারা দোকান দিতেন তারা অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেছেন। সরকারের বেঁধে দেয়া নিয়মের কারণে তারা টিকতে পারছেন না বলে দেশে চলে গেছেন। এ কারণে দোকান বন্ধ থাকার দৃশ্যটি চোখে পড়ে বেশি।

উহুদের ময়দান ও আশপাশ এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কাজ করেন অন্তত ২০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক। প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে তারা পরিছন্নতা কর্মী হিসেবে ওখানে কাজ করেন। ওই এলাকার পরিচ্ছন্নতা কর্মী নরসিংদীর বেলাবো এলাকার আব্দুর রহমান। তিনি জানালেন, মাসে তারা ৫০০ রিয়াল বেতনে চাকরি করেন। এই টাকা বাংলাদেশের হিসেবে প্রায় ১২ হাজার টাকা। এতে তারা নিজেরাও খেয়ে বেঁচে থাকতে পারেন না। দেশে টাকা পাঠাবেন কী করে। তিনি জানান, প্রতি দুই বছর পরপর তাদের আকামা রি-এন্ট্রি করতে হয়। এতে খরচ পড়ে বাংলাদেশের হিসেবে প্রায় তিন লাখ টাকা। এই টাকা জোগাড় করা অনেক বাংলাদেশির পক্ষে সম্ভব হয় না। এ কারণে অনেকেই অবৈধ হয়ে পড়েছেন। ধরা পড়ে দেশে চলে গেছেন। আব্দুর রহমান জানান, আগে সৌদি আরবে এই নিয়ম ছিল না। সম্প্রতি সৌদিতে থাকা বাংলাদেশিরা এই নিয়মের মধ্য পড়েছেন।

মক্কার মিসফালাহ এলাকার পাশেই রয়েছে বাঙালিদের বাজার। প্রায় ৭০ বছর ধরে ওই এলাকায় পরিবারপরিজন নিয়ে বসবাস করেন কক্সবাজার এলাকায় দুই ভাই আব্দুল মনাফ ও তাহির আলী। তিন প্রজন্ম ধরে তারা বসবাস করে বাসাবাড়ি বানিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু নতুন নিয়মের কারণে তাদের আকামা রি-এন্ট্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের কফিলের তরফ থেকে সম্প্রতি সময়ে সহযোগিতা পাচ্ছেন না। ফলে পরিবারপরিজন নিয়ে তারাও পড়েছেন শঙ্কায়। নিজ বাসায় তারা কথা বলেন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। বললেন, বাঙালি বাজার ও আশপাশ এলাকায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির বসবাস। এখানে ব্যবসাবাণিজ্যে বাংলাদেশিদের আধিপত্য রয়েছে। কিন্তু সরকার মুখে কিছু বলছে না, আইন করে বাঙালিদের তাড়িয়ে দিতে শুরু করেছে। এমন কঠিন অবস্থায় অতীতে কখনো বাংলাদেশিরা পড়েননি বলে জানান ওই দুই ভাই। তারাও যেকোনো সময় দেশের পথে রওনা দিতে পারেন বলে আশঙ্কায় রয়েছেন।

মিসফালাহ এলাকার কবুতর চত্বর ও হেরেম শরীফের বাইরের এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে অনেক বাংলাদেশি বসবাস করেন। তারা মাসে কোম্পানীর মাধ্যমে মাত্র ৫০০ রিয়াল বেতনে চাকরি করেন। কিন্তু আকামা রি-এন্ট্রি করা নিয়ে তারা আশঙ্কায় রয়েছেন। এত টাকা তাদের পক্ষে যোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার কফিলও তাদের ওই টাকা দিচ্ছে না। কয়েকজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী জানালেন, সৌদি আরবে এখন পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবেই বাংলাদেশিদের চাকরি দেয়া হয়। অন্য কোনো পেশায় বাংলাদেশিদের তেমন আধিপত্য নেই। বাংলাদেশিদের চাকরিও দেয়া হয় না। ব্যবসাবাণিজ্য যারা করছিলেন তারা নতুন নিয়মের কারণে ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছেন। এ কারণে বাঙালি বাজারে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা দিন দিন কমেই চলেছে। পরিচ্ছনতা কর্মী হিসেবে নিয়োজিত থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এভাবে চলছে- সৌদি আরবে কেবল পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে ব্রান্ডিং হতে পারেন বাংলাদেশিরা। এতে করে ইমেজ সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ।

জেদ্দা এলাকায় বসবাস করেন সিলেট সদরের বাবুল মিয়া। তিনি জানালেন, ‘আকামা’ সঙ্গে নিয়ে ঘুরলেও কোনো লাভ হয় না। পুলিশ প্রায় সময় আকামা নিয়ে গায়েব করে ফেলে। এরপর ধরে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। কোনো কারণ ছাড়াই বর্তমানে সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের সঙ্গে এধরনের আচরণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সৌদি আরবে স্থানে স্থানে আছে পুলিশের চেকপোস্ট। এই চেকপোস্টে পুলিশের রোষানলে পড়েন বাংলাদেশি শ্রমিকরাই বেশি। তার কথা প্রমাণ মিললো মক্কার হেরেম শরিফ এলাকায়। ফজরের নামাজের পরপরই বাঙালি অধ্যুষিত মিসফালাহ এলাকায় পুলিশ চেকপোস্ট বসায়। তারা দেখে দেখে আকামা চেক করে। এমনকি বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ হজ্ব পালনে যাওয়া বাংলাদেশিরাও পড়েন ওই চেকপোস্টে তল্লাশির মুখে। ফলে ওমরাহ পালনে যারা মক্কা যান তাদের সব সময় পাসপোর্ট ও ভিসার কাগজ সঙ্গে রাখতে হচ্ছে। গত ১৫ দিনে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি ওমরাহ পালনে গিয়ে সঙ্গে কাগজপত্র না থাকা বেকায়দায় পড়েন। পরে হোটেল থেকে মুয়াল্লিমের মাধ্যমে কাগজপত্র এনে তাদের ছাড়িয়ে নিতে হয়েছে।


এমন কঠোর আইন সৌদি আরবে অন্য কারো জন্য নয়। পাকিস্তানি ছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার বিপুলসংখ্যক মানুষ ওমরাহ পালনে যান। তারা স্থানীয়ভাবে দেশের এম্বেসির সহযোগিতা পাওয়ার কারণে অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে ওমরাহ পালন করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশ এম্বেসির পক্ষ থেকে সে ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেই বলে জানালেন জেদ্দা এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা। তারা জানান, কোনো বাংলাদেশির সমস্যা হলে বারবার ধরনা দিলেও এম্বেসির কর্মকর্তাদের দেখা মিলে না। ফলে অসহায় অবস্থায় নিজেদের ঝামেলা নিজেদের মেটাতে হয়। মদিনার করিম আল হেজ্জাজ নামে বাংলাদেশি মালিকানাধীন এক আবাসিক হোটেল আগে পরিচালনা করতেন বাংলাদেশিরা। সম্প্রতি সময়ে ওই হোটেলে বাধ্যতামূলক চাকরি দিতে হয়েছে সৌদির কয়েকজন নাগরিককে। তারাই এখন হোটেল পরিচালনা করেন।

ফলে মালিকের কর্তৃত্বও দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে। ওই হোটেলের এক কর্মচারী জানালেন, যেসব সৌদি নাগরিকদের এখানে চাকরি দেয়া হয়েছে, তাদের উচ্চ মূল্যে বেতন দিতে হচ্ছে। এভাবে চললে বেশি দিন ওই মালিকের পক্ষে হোটেল চালানো সম্ভব হবে না। একদিন হোটেল ব্যবসাও গুটিয়ে দেশের পথে রওনা দিতে হবে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Abdul Mannan

২০১৮-১০-২১ ০৭:৪৯:০৮

Our Goverment should be take action against the saudi wrong rule...

রুবেল

২০১৮-১০-২০ ১৮:৪০:২২

ভাল হয়েছে,,দেশে চলে অাসলে প্রবাসীর বউরা পরকীয়া করতে পারবে না।। সব প্রবাসী দেশে এসে কিছু করুক।।

আপনার মতামত দিন

বিদেশি চ্যানেলে দেশি পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধের ঘোষণা

‘এসএসসি পরীক্ষায় ফরম পূরণে অতিরিক্ত ফি আদায় করলে ব্যবস্থা’

‘পুলিশ হেড কোয়ার্টারে বসে কারচুপির ষড়যন্ত্র করছে’

মনোনয়ন পাচ্ছেন না বদি-রানা

আমজাদ হোসেনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন প্রধানমন্ত্রী

রফিকুল ইসলাম মিয়ার ৩ বছর কারাদণ্ড

এরশাদ কন্যা মৌসুমীর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

প্রেস পাস পুনর্বহাল সাংবাদিক অ্যাকস্টার

গাংনীতে অস্ত্র-মাদকসহ আটক ১

এরশাদকে ছেড়ে যাবো না

পর্যবেক্ষকরা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ভোট পর্যবেক্ষণ করবেন: ইসি সচিব (ভিডিও)

ভারতভুক্তির তিন বছর পর সাবেক ছিটবাসীরা জমির স্বত্ব পাচ্ছেন

‘পাকিস্তানকে বলির পাঁঠা বানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র’

ফিরলেন এরশাদ

মহারাষ্ট্রে সেনাবাহিনীর অস্ত্রভান্ডারে বিস্ফোরণে নিহত ৬

বাংলাদেশী রেজাউরের কাণ্ড!