নি র্বা চ নী হা ল চা ল (হবিগঞ্জ ২)

ভিন্ন চিত্র, নানা হিসাব

শেষের পাতা

রাশেদ আহমদ খান, হবিগঞ্জ থেকে | ১৬ অক্টোবর ২০১৮, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ৯:০৮
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে হবিগঞ্জ-২ আসনে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। সম্ভাব্য প্রার্থীরা চষে বেড়াচ্ছেন গোটা মাঠ। এশিয়ার বৃহত্তম গ্রাম বানিয়াচং ও হাওরবেষ্টিত আজমিরীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসন। ঐতিহ্যবাহী কমলারানীর দীঘি, রাজবাড়ী, লক্ষ্মীবাওর জলাবন, বিথঙ্গলের আখড়াসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্য বানিয়াচং সুপরিচিত। অপরদিকে অবহেলিত উপজেলা হিসেবে পরিচিত আজমিরীগঞ্জ। মাইনরিটি ভোট ব্যাংক থাকার  সুবাদে এ আসনে অনেকটা সহজেই জয়লাভ করে আসছে আওয়ামী লীগ। আর তাই আসনটি আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে খ্যাত। তবে এবারের চিত্র অনেকটা ভিন্ন বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে আসন্ন নির্বাচনে কোন দলেরই সহজে বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগে রয়েছে একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী। এখন পর্যন্ত ১০ জন প্রার্থী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন বলে আলোচনা রয়েছে। বিএনপিতেও রয়েছেন দু’জন প্রার্থী। সেদিক থেকে ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে জাতীয় পার্টি। এ দলে রয়েছেন একক প্রার্থী। তবে সকল দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরাই ব্যস্ত এলাকায় গণসংযোগ ও লবিং এ।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আমির হুসেন মাস্টার, সাবেক এমপি শরীফ উদ্দিন আহমেদের পুত্র মিনহাজ উদ্দিন শরীফ রাসেল, যুক্তরাজ্য আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার এনামুল হক, আওয়ামী মহিলা আইনজীবী সমিতির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহফুজা বেগম, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হুসেন খান, যুক্ত্যরাজ্য প্রবাসী ড. মোহাম্মদ শাহ নেওয়াজ। এছাড়া আরো কয়েকজন প্রার্থী নিজেদের মতো করে মনোনয়ন চাইবেন বলে প্রচারণ চালাচ্ছেন। সাবেক সচিব ইকবাল খান চৌধুরীও মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে তার স্বজনরা প্রচার করছেন।

তবে টানা দু’বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মজিদ খান মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন অনেকটা এগিয়ে। সজ্জন ও ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি হিসেবে তার রয়েছে গ্রহণযোগ্যতা। দলের নীতি নির্ধারণী মহলও এ ব্যাপারে অবগত। তারপরও বর্তমান এ সংসদ সদস্যের ব্যাপারে চলছে নানামুখী আলোচনা। তার প্রতিপক্ষ শিবিরের অভিযোগ, এমপির স্বজন ও সহযোগীরা তাকে ব্যবহার করে সুযোগ নিচ্ছেন। অন্যদিকে বানিয়াচং উপজেলা সদরে রয়েছে ২টি গ্রুপ। এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আমির হুসেন মাস্টার। অপর গ্রুপটি চলছে সংসদ সদস্যের সমর্থনে। এছাড়া আজমিরীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনেও রয়েছে দলীয় কোন্দল। সদ্য সমাপ্ত উপজেলা চেয়ারম্যান পদে উপ-নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিজয়ী হন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আতর আলীর ছেলে আলাউদ্দিন মিয়া। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মিজবাহ উদ্দিন ভুইয়া বিপুল ভোটে পরাজিত হন। পরে নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান নিজেই সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। এসব কারণে সংসদ সদস্য মজিদ খানের সঙ্গে আলাউদ্দিন ও তার সমর্থকদের দূরত্ব বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাবে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত। দলীয় নেতা-কর্মীদের এসব মতভেদ দূর করতে না পারলে আগামী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে স্থানীয় ভোটারদের ধারণা।

তবে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে এমপি মজিদ খান এগিয়ে। বিগত দুই টার্মে তিনি এলাকার উন্নয়নও করেছেন নজরে পড়ার মতো। এছাড়া দলমত নির্বিশেষে সবার সঙ্গেই রয়েছে তার সু-সম্পর্ক। তাই নতুন প্রার্থীর কথা ভেবে ঝুঁকি নিতে চাইবে না দলের হাই কমান্ড।
অন্যদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আমির হুসেন মাস্টারের নামও আলোচনায় রয়েছে। ত্যাগী নেতা হিসেবে তার রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিচিতি। উপজেলা সদরে তার রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। আওয়ামী লীগের ক্রান্তিলগ্নে দলের জন্য দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন। দলীয় হাই কমান্ড তাকে মনোনয়ন দিবেন বলে মনে করেন তার সমর্থকরা। হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম শরীফ উদ্দিন ছিলেন সর্বজনগ্রাহ্য নেতা। তার গ্রহণযোগ্যতা কাজে লাগিয়ে নির্বাচন করতে চান তার ছেলে মিনহাজ উদ্দিন শরীফ রাসেল। দলের প্রতি বাবার ত্যাগ ও কৃতকর্মের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী তাকে মনোনয়ন দিতে পারেন বলে তিনি আশাবাদী। আর তরুণ নেতৃত্বের দিক বিবেচনায় ব্যারিস্টার এনামুল হক ও ড. মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী। ব্যারিস্টার এনামুল হক সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। আওয়ামী মহিলা আইনজীবী সমিতির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহফুজা বেগম মনোনয়ন চাইবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

  বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জীবন। আগামী নির্বাচনেও তার মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি অনেকটা চূড়ান্ত। তবে বানিয়াচং উপজেলা বিএনপির বিদ্যমান বিরোধ এখন অনেকটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। গেল বছর বানিয়াচং উপজেলা বিএনপির গঠিত কমিটিতে বাদ পড়েন কয়েকজন প্রভাবশালী বিএনপির ত্যাগী নেতা। বাদপড়া এসব নেতা ও তাদের সমর্থকরা অবস্থান নিয়েছেন ডা. জীবনের বিরুদ্ধে। বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশ করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন একটি গ্রুপ। দলীয় বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পৃথকভাবে পালন করছে এ গ্রুপটি। দুই গ্রুপের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষও হয়েছে ইতিপূর্বে। তারা বর্তমানে অবস্থান নিয়েছেন খালেদা জিয়া পরিবারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সৌদি আরব বিএনপির সভাপতি আহমদ আব্দুল মুকিবের পক্ষে। মধ্যপ্রাচ্যসহ প্রবাসী বিএনপিকে সংগঠিত করে আলোচনায় আসা এই নেতা মনোনয়ন পাবেন বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন তার সমর্থকরা।

জাতীয় পার্টির একক মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে রয়েছেন জেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক শংকর পাল। বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ আসনে রয়েছে সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংক। শংকর পাল প্রার্থী হলে সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসাতে পারেন বলে প্রচার করছেন তার সমর্থকরা। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন সাংবাদিক আফসার আহমদ রূপক। বিগত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তৃতীয় স্থান অধিকার করে তিনি চমক সৃষ্টি করেন। রুপকের নির্বাচনী পুঞ্জি হিসেবে রয়েছে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য যাওয়া রোগীদের নিঃস্বার্থভাবে সহযোগিতা করা। বিগত ২০ বছর ধরে নিরলসভাবে স্বাস্থ্য সেবা করে আসছেন তিনি। আর তার পুরস্কার হিসেবে গেল নির্বাচনে জাতীয় পার্টির চেয়ে বেশি ভোট পান তিনি। আগামী নির্বাচনেও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন বলে সভা-সমাবেশ চালিয়ে যাচ্ছেন।

সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ খান মানবজমিনকে বলেন, ২০০৮ সালে আমি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকার যে উন্নয়ন হয়েছে স্বাধীনতার পর এত উন্নয়ন হয়নি। শিক্ষা, যোগাযোগ, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, কৃষি বিদ্যুৎসহ সব ক্ষেত্রেই নজিরবিহীন উন্নয়ন হয়েছে। অবহেলিত বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ এ দুই উপজেলাকে উন্নত উপজেলায় রূপান্তরিত করেছি। মানুষের জন্য কাজ করলে তার প্রতিদান পাওয়া যায়। আমার বিশ্বাস দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা তার বিচক্ষণ দৃষ্টি দিয়ে আমার কাজের মূল্যায়ন করবেন। আর মনোনয়ন পেলে আগামী নির্বাচনে এ এলাকার মানুষও আমার কাজের উপযুক্ত মূল্যায়ন করবে।

   বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন মানবজমিনকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার মানুষের বাক স্বাধীনতা হরণ করেছে। বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও জেল জুলুমের মাধ্যমে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সাধারণ জনগণ অতিষ্ঠ। দেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। আমি দীর্ঘদিন থেকে এলাকায় চিকিৎসা সেবাসহ মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থেকেছি। আশা করি আমার দলও এর মূল্যায়ন করবে। আমার বিশ্বাস, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হলে এ আসনে বিএনপিকেই নির্বাচিত করবে জনগণ।

আহমদ আলী মুকিব বলেন, বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ উপজেলা দুটি হাওরবেষ্টিত হওয়ায় এলাকাটি খুবই অবহেলিত। আশির দশকের পর সেখানে উন্নয়ন হয়নি। তাই বিএনপির চেয়ারপারসনের  ঘোষিত ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এলাকার উন্নয়নে কাজ করছি। দলের চেয়ারপারসন যদি আমাকে মনোনয়ন দেন তাহলে আসনটি পুনরুদ্ধার করতে পারবো ইনশাআল্লাহ।’

জাতীয় পার্টির প্রার্থী শংকর পাল জানান, বিগত ২০০৮ সালের নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে আমার বিজয়কে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। আমি দীর্ঘদিন থেকে এলাকায় কাজ করে যাচ্ছি। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে জাতীয় পার্টি অবশ্যই বিজয়ী হবে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাংবাদিক আফসার আহমেদ রূপক জানান, সবকিছু নির্ভর করছে সুষ্ঠু নির্বাচনের উপর। রাজনীতিকদের দস্যুপনায় মানুষ এখন ভীতসন্ত্রস্ত। তাদের হাত থেকে মুক্তি পেতে চায় মানুষ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন থেকে বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ এলাকার গরিব অসহায় মানুষের সেবা করে যাচ্ছি। আশা করি এর মূল্যায়ন আমি পাবো।

আগামীকাল: ভোলা-২



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন