‘বাংলাদেশ মডেল’: ব্যাখ্যা দিলেন সেই পাকিস্তানি সাংবাদিক

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ৯ অক্টোবর ২০১৮, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:৪০
সপ্তাহ দুয়েক আগে একটি টিভি টকশোতে এক প্রখ্যাত পাকিস্তানী সাংবাদিক দেশটির নতুন ক্ষমতাসীন দল পিটিআইর প্রতি দাবি জানান, সুইডেন বানানোর আগে তারা পাকিস্তানকে আগে বাংলাদেশ বানিয়ে দেখাক। ওই টকশোর ভিডিও ক্লিপ বাংলাদেশে ভাইরাল হয়ে পড়ে। আর তা নিয়ে পাকিস্তানের দ্য নিউজ পত্রিকায় মতামত কলাম লিখেছেন জাইঘাম খান নামে ওই সাংবাদিক।
তিনি লিখেছেন, ওই ভিডিও ক্লিপ বাংলাদেশে ভাইরাল হয়ে যায়। এমনকি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও এ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি পাকিস্তানের প্রতি বন্ধুত্বের হাতও বাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন পত্রিকাও এ নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। এই পত্রিকাও (দ্য নিউজ) এ নিয়ে প্রতিবেদন করেছে।
তবে সেখানে আমার নাম উহ্য রেখেছে।
পাকিস্তানী পাঠকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, অনেক পাঠক একটি যৌক্তিক প্রশ্ন করেছেন। সেটা হলো, সেসব দেশকে অনুসরণ করে কি হবে, যাদের অবস্থান আমাদের মতোই? আমরা কেন বিশ্বের সবচেয়ে সেরা দেশগুলোকে অনুসরণ করার চেষ্টা করবো না?
পাকিস্তানকে সুইডেনে রুপান্তরিত করতে নিজের সক্ষমতার স্বপক্ষে ইমরান খান (প্রধানমন্ত্রী) দুইটি যুক্তি দিয়েছেন। প্রথমটি হলো, তিনি নিজে দীর্ঘদিন পশ্চিমে বসবাস করেছেন। অর্থাৎ তিনি পশ্চিমা উন্নয়নের রহস্য বের করে ফেলেছেন। দ্বিতীয় যুক্তি হলো, তৃতীয় বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের মতো তিনি নন। বরং, তিনি সম্পূর্ণ সৎ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, উন্নত দেশে পরিণত হওয়া হলো অনেকটা কোটিপতি হওয়ার মতো। মোটিভেশনাল স্পিকারদের জন্য বাস্তবতা পরিবর্তনের চেয়ে স্বপ্নের ফানুস উড়ানো সহজ।
নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে এই সাংবাদিক লিখেছেন, হুট করেই পশ্চিমা দেশগুলোর মতো উন্নত হওয়া সম্ভব নয়। কারণ তাদের অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থা কয়েক শতাব্দি ধরে বিবর্তিত হতে হতে আজকের অবস্থায় পৌঁছেছে। ফলে ঠিক কোন পন্থায় এগুলে উন্নত দেশ হওয়া যাবে তার কোনো দাওয়াই নেই। এছাড়া উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তাদের সমাজও ভিন্ন।
অপরদিকে বাংলাদেশকে অনুসরণ করা উচিৎ কারণ বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণ এশিয়ান দেশ। যেই দেশটির সঙ্গে আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার অনেক মিল রয়েছে। খুব বেশি দিনের কথা নয় যখন অনেক অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে দেখতেন। কারণ, দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা ছিল। আয়তন ছিল ছোট। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বেশি।
অথচ, আজকে বাংলাদেশের অগ্রগতি ভিন্ন কথা বলে। প্রবৃদ্ধি ৭.১ শতাংশ। কর্মসংস্থান বাড়ছে। মধ্যবিত্ত জনসংখ্যার আকার বাড়ছে। দারিদ্র্য কমছে। টানা ছয় বছর ধরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি ছিল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকবে। অথচ, এক দশক পর গত বছর পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি ৫.৮ এ উন্নীত হয়। এই অর্থবছরে এটি ৫ শতাংশে নেমে যেতে পারে।
এছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল গরিবরা পাচ্ছে। ১৯৯১ সালে বিশ্বব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী ৪০ শতাংশেরও বেশি বাংলাদেশী চরম দারিদ্র্যতায় বসবাস করতেন। আজকে এই হার ১৪ শতাংশেরও নিচে। অর্থাৎ, এই কয়েক বছরে ৫ কোটিরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে নিস্তার পেয়েছেন।
অপরদিকে পাকিস্তানের বাণিজ্য ঘাটতি বিশাল। গত অর্থ বছরে আমাদের আমদানি ছিল ৬১০০ কোটি ডলার, আর রপ্তানি ছিল মাত্র ২৩০০ ডলার। রেমিট্যান্স এসেছে ২০০০ কোটি ডলারের। এরপরও ১৮০০ কোটি ডলারের ব্যবধান।
বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী মডেল থাকায় পাকিস্তান আজ যে ধরণের সমস্যায় ভুগছে তা সেখানে নেই। বাংলাদেশের রপ্তানি এখন ৩৭ বিলিয়ন ডলার। ব্যবধান ১৫০০ কোটি ডলারের। অথচ, দুই দেশের টেক্সটাইল খাতের বড় পার্থক্য হলো, পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কাঁচা তুলা উৎপাদনকারী দেশ। অথচ, বাংলাদেশ কাঁচা তুলা উৎপাদনই করে না। পাকিস্তানের টেক্সটাইল শিল্পের মডেল পুরোপুরিই তুলাচাষীদের ঠকানোর ওপর ভিত্তি করে। জোর করে দাম কমিয়ে রাখায় ঠকছে কৃষক। ফলে আমাদের টেক্সটাইল খাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কম। এ কারণেই পাকিস্তানের তুলা উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো দেশের সবচেয়ে অনুন্নত অঞ্চল। আমাদের টেক্সটাইল খাত তুলা আমদানির ওপর নির্ভর করলে অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলতো। অথচ, বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত প্রথম থেকেই সম্পূর্ণ তুলা আমদানি নির্ভর।
পাকিস্তানে যেমন বিশেষ কিছু শিল্প ও খাত বেড়ে উঠেছে, বাংলাদেশে তেমনটা নয়। সেখানে উদ্যোক্তারা সুযোগ পেয়েছেন কাজ করার। পাকিস্তানে উৎপাদিত চিনি রপ্তানি করা যায় না। ফলে কিছু বিশেষ পরিবার সেই সুযোগে বিরাট ধনী বনে গেছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়াও সামাজিক খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি বেশ দারুণ। লিঙ্গ সমতার দিক থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৯৮ শতাংশ। মাধ্যমিক স্কুলে ৫৪ শতাংশ, যা ২০০০ সালেও ছিল ৪৫ শতাংশ। অথচ, এই অঞ্চলে প্রাথমিক (৭২%) ও মাধ্যমিক (৪৩) পর্যায়ে সবচেয়ে কম ভর্তির হার পাকিস্তানে।
বাংলাদেশের রাজনীতি পাকিস্তানের মতোই বিষাক্ত। তবে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ধর্মকে পরিচয়ের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে না। বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। পাকিস্তানের চেয়েও ভালোভাবে দেশটি চরমপন্থা প্রতিরোধ করেছে।
দুর্নীতি দিয়ে সব মাপা যায় না। বাংলাদেশ খুব সৎ কোনো দেশ নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে, বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৩, অথচ পাকিস্তানের ১১৭। কিন্তু অগ্রগতি বাংলাদেশই করছে।
পিটিআই হয়তো ইউরোপ ও ইউরোপের উন্নয়নের রহস্য সম্পর্কে সব জানে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে কিছু শিক্ষা নিলে তারা ভালো করবে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

sohelkhan

২০১৮-১০-০৯ ০৮:০৬:৩৩

বাংলাদেশের অগ্রগতি চোখে পড়ারমত বিশেষ করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ব্যাপক উন্নতিি হয়েছে, আশা করি উন্ননের এই ধারা অব্যাহত থাকবে ।

আবুল হোসেন ভূইয়া

২০১৮-১০-০৯ ০৩:৩৭:১৭

তার পরেও বলবে দেশের কোনো অগ্রগতি হয় নাই। আস্তে আস্তে এগুচ্ছে এভাবেই এগুবে। আমরা অস্থির জাতি সময় দিতে চাই না।

citizen

২০১৮-১০-০৯ ১৫:৩৮:১৫

Imran must have seen Zia Tree in KSA. He should follow Zia model of development and thats Bangladesh model. Bangladesh would have grown at double digits in millennium (2000) but didn't happened bcoz of politics.

আপনার মতামত দিন

পশ্চিম তীরে ইসরাইলি অভিযান, কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি আটক

প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অভিযোগে দু’জন গ্রেপ্তার

মৌলভীবাজারে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে গণসংযোগে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী

ধানের শীষ প্রতীকে প্রচারণা শুরু করলেন মন্টু

গানায় গলায় দড়ি লাগিয়ে সরিয়ে ফেলা হয়েছে গান্ধীর মূর্তি

বরগুনা জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গ্রেপ্তার

বগুড়ায় ফখরুলের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু

পাবনায় চলন্ত ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে নিহত ৩

ড. কামালের গাড়িবহরে হামলা

যুবদল নেতাসহ ৯ নেতাকর্মী আটক

টেকনাফ ‘বন্ধুকযুদ্ধে’ ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত

বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানালেন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী

যা হচ্ছে তাতে খারাপ অবস্থার দিকেই যাচ্ছি আমরা

নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় বেড়েছে দমনপীড়ন

‘আমার গানে তাদের উন্মাদনা দেখে অবাক হই’

প্রেস থেকে বিএনপি প্রার্থীর পোস্টার ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ