পরিবেশ সুরক্ষায় জাতিসংঘের শুধুই কি চাপাবাজি?

যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা

নিউ ইয়র্ক থেকে এনআরবি নিউজ | ১২ মে ২০১৬, বৃহস্পতিবার
নিউ ইয়র্ক সিটির এ্যাম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং এবং লিঙ্কন সেন্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোতে সূর্যের আলো, বাতাস অথবা পানির ¯্রােতে তৈরি বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্যে তাদের অতিরিক্ত ব্যয় হয় মাসে দুই কাপ কফির সমপরিমাণের অর্থ অর্থাৎ আগে প্রচলিত বিদ্যুত বিলের চেয়ে ১০ ডলার বেশি। পরিবেশ-বান্ধব এই বিদ্যুৎ সংয়োগ নেয়ার ফলে দৈনিক গড়ে ৩টি হিসেবে বছরে  ১৫ শতাধিক গাছ লাগানোর সমান কাজ করছে এসব গ্রাহক। পরিবেশ সুরক্ষায় এমন প্রক্রিয়া অবলম্বনের আহবান জানানো হয় জাতিসংঘ সদর দফতরসহ সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মিশন এবং কূটনীতিকদের বাসায়। মহাসচিব বান কি-মুনকে গত ৬ এপ্রিল একটি পত্রও প্রদান করা হয় পরিবেশ সুরক্ষায় জাতিসংঘ কার্যক্রমের পরিপূরক এ প্রক্রিয়ার ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করে। শুধু তাই নয়, বর্তমানে যে সংস্থা বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে একই সংস্থায় ফোন করলেই পরিবেশ বান্ধব ব্যবস্থার আওতায় যাওয়া সম্ভব বলে উল্লেখ করাও হয় ঐ পত্রে। এই পত্র প্রদানের দুই সপ্তাহ পর জাতিসংঘ সদর দফতরে জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং ২২ এপ্রিল সে সম্মেলনে সর্বসম্মত ‘প্যারিস জলবায়ু চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। ঘটা করে স্বাক্ষর প্রক্রিয়ার উদ্বোধন করেন মহাসচিব। বিশ্বকে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা থেকে রক্ষার লক্ষ্যে বক্তব্য-বিবৃতিরও খৈ ফুটেছে ঐ সম্মেলনে। কিন্তু যা করলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের পথ সুগম হতে পারে, সে ব্যাপারে নিজেরা বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণে কোন আগ্রই দেখাননি। ৬ এপ্রিলের ঐ পত্র মহাসচিব পেয়েছেন কিনা, পেয়ে থাকলে তিনি কোন পদক্ষেপ অবলম্বনের কথা ভাবছেন কিনা, সে ব্যাপারে জানার চেষ্টা করা হয়। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দু’দফা অনুরোধ প্রেরণ করা হয় মহাসচিবের মুখপাত্র ফারহান হকের কাছে। কিন্তু সুস্পষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি। তৃতীয় দফা অনুরোধের পর গত বুধবার ই-মেইলে ফারহান এনআরবি নিউজকে জানান, ‘ঐ চিঠি মহাসচিব পেয়েছেন কিনা সে ধরনের কোন নিশ্চিত তথ্য আমার কাছে নেই’। উল্লেখ্য, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের শেষাবধি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারি ড. এ কে এ মোমেন ঐ চিঠি দিয়েছেন মহাসচিব এবং সকল সদস্য রাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধিদের কাছে। ড. মোমেন বর্তমানে ঢাকাস্থ ‘বাংলাদেশ স্টাডি ট্রাস্ট’ নামক একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্কের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। জাতিসংঘে কর্মরত অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে আন্তর্জাতিক জনমত সোচ্চারে নিরন্তরভাবে কাজ করেছেন ড. মোমেন। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রথম শিকার হবে বাংলাদেশ।
নিউইয়র্ক সিটির অধিকাংশ অফিস এবং বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে ‘কন এডিসন’ নামক একটি সংস্থা। তাদের বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে কয়লা এবং তেল ব্যবহারের মাধ্যমে, যা পরিবেশ দুষণের জন্যে দায়ী। অথচ একই সরবরাহকারির মাধ্যমেই পরিবেশ সুরক্ষায় সক্ষম বিদ্যুতের সংযোগ নেয়া সম্ভব। শুধুমাত্র গ্রাহককে ফোন করে বলতে হবে যে, তিনি সূর্যের আলো অথবা পানি কিংবা বায়ু থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের সরবরাহ নিতে চান। এ জন্যে বাসায় অন্য কিছু করতেও হবে না। এমনকি, ছাদে স্থাপনেরও প্রয়োজন নেই বিশেষ কোন যন্ত্রের। এমন একটি কোম্পানীর নাম হচ্ছে ‘গ্রিন মাউন্টেন এনার্জি।’ জলবায়ু পরিবর্তনের যে ভয়ংকর আশংকা করা হচ্ছে তা থেকে পরিত্রাণে সামান্য হলেও সহায়তা করছে এই কোম্পানী। নবায়নযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব এ বিদ্যুতের জন্যে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে মাসে ২/৩ কাপ কফির মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ।
১৯৯৭ সাল থেকে এ কোম্পানী কাজ করছে এবং বর্তমানে তাদের গ্রাহক নিউইয়র্কের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে ইলিনয়, ম্যারিল্যান্ড, ম্যাসেচুসেট্্স, নিউজার্সি, পেনসিলভেনিয়া, টেক্সাস রাজ্যে। পরিবেশ সুরক্ষায় সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য’ অর্জনে ‘গ্রিন মাউন্টেন এনার্জি কোম্পানী’র গ্রাহক হবার জন্যে জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধিগণের কাছেও অনুরোধ-পত্র দিয়েছিলেন ড. মোমেন। বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধিও সে অনুরোধে সাড়া দেননি বলে সর্বশেষ প্রাপ্ত সংবাদে জানা গেছে।
নিউইয়র্ক সিটিতে অন্যতম উঁচু ভবন ‘এ্যাম্পায়ার এস্টেট বিল্ডিং’ এবং ‘লিঙ্কন সেন্টার’র মত অনেক বিখ্যাত ভবনেই ‘গ্রিন মাউন্টেন এনার্জি কোম্পানী’র বিদ্যুৎ গ্রহণ করা হচ্ছে। তারাও আগে কন-এডিসনের সরবরাহকৃত বিদ্যুতের গ্রাহক ছিল। ‘গো-গ্রীণ’ তথা পরিবেশ সুরক্ষার তাগিদে তারা এ কোম্পানীর গ্রাহক হয়েছে।
প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, ২২ এপ্রিল  নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে সই করেছেন ১৭৫ দেশের প্রতিনিধিরা। বিশ্ব ধরিত্রী দিবসে চুক্তিটিতে সই করেন সকলে। নতুন কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির জন্য এই সংখ্যাটি একটি রেকর্ড বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘ কর্মকর্তারা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির আশংকা করা হচ্ছে তা থেকে এ বিশ্বকে রক্ষায় সকলে দৃঢ় অঙ্গিকার ব্যক্ত করেন।  প্রায় ১৫টি দেশ, প্রধানত: ছোট ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো, ইতিমধ্যেই সমঝোতা চুক্তিটি অনুমোদন করেছে। কিন্তু কয়েক ডজন দেশকে এটি সই করতে কিছুটা সময় নিতে হয়েছে। চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে দ্বিতীয় পর্যায়ে তারা এতে সই করল।
এ সমাবেশে বক্তৃতায় জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেন, “প্যারিস চুক্তি ভবিষ্যতের সব প্রজন্মের জীবনধারা নির্ধারণ করে দেবে গভীরভাবে, সেই ভবিষ্যত যা ঝুঁকির মুখে ছিল।” পৃথিবীতে রেকর্ড তাপমাত্রার অভিজ্ঞতা আমরা অর্জন করে চলেছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছি। জাতীয় পর্যায় থেকে এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য আমি সব রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাই।’’
“আজ আমরা ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন চুক্তিতে সই করছি”-বলেছেন মুন।
বিশ্বব্যাপী ৪৬তম বিশ্ব ধরিত্রী দিবস উদযাপনের মধ্যে জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক প্রধান ক্রিস্টিয়ানা ফিগারেস এখন কী করা দরকার সেই বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “অধিকাংশ দেশের যা করা দরকার তা হচ্ছে, সই হওয়া চুক্তির নথিগুলো দেশে নিয়ে অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু করা, কারণ অধিকাংশ দেশকেই এ বিষয়ে সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।” কয়েক বছর আগেও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করতে একটি বৈশ্বিক চুক্তি সইয়ের ধারণাটি প্রায় অসম্ভব ছিল। সর্বপ্রথম আওয়াজ উঠে বাংলাদেশ থেকে। সে সময় অনেকে এ ধরনের আশংকার কথা আমলে নিতে চাননি। কিন্তু এখন নৈতিকভাবে সবাই বিষয়টি নিয়ে একমত হয়েছেন। মনোভাবের এই পরিবর্তনকে একটি একক রাজনৈতিক সদিচ্ছা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে চুক্তি সইয়ের পুরো পরিবেশ ছিল আশাব্যঞ্জক। কিন্তু কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করে আছে সামনে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে বাংলাদেশের সদ্য বিদায়ী স্থায়ী প্রতিনিধি ড. মোমেনের পত্র কতটুকু গুরুত্ব পেয়েছে এবং পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে নিজেদের আন্তরিক ভূমিকা প্রদর্শনের এ সুযোগের কতটা সদ্ব্যবহার করেছে জাতিসংঘ, সে তথ্য স্পষ্টভাবে জানা না গেলেও মহাসচিব যে বিন্দুমাত্র পদক্ষেপ নেননি সেটি নিশ্চিত হওয়া গেছে ‘গ্রীণ মাউন্টেন এনার্জি কোম্পানী’র বক্তব্যে। কোম্পানীর মুখপাত্র ডেনিয়েল মুচনীক এনআরবি নিউজের এ সংবাদদাতাকে জানিয়েছে যে, ‘জাতিসংঘ সদর দফতর কিংবা কোন মিশনের পক্ষ থেকে এখনও আমাদের সাথে যোগাযোগ করা হয়নি।’ এ কোম্পানীর ওয়েবসাইট থেকে জানা যায় যে, বর্তমানে চালু বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে কয়লা এবং অন্যান্য দ্রব্য থেকে যা কার্বন ডাইঅক্সাইড তৈরীতে সহায়ক। এর ফলে বায়ু দুষণ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অপরদিকে, ক্লিন এনার্জি তৈরী হচ্ছে বায়ু, পানি এবং সূর্যের আলো তথা প্রকৃতির উৎস থেকে। এটি পরিবেশ কলুষিত করে না। জনস্বাস্থ্যের জন্যেও হুমকি নয়। অর্থাৎ এ বিদ্যুৎ হান্ড্রেড পার্সেন্ট দুষণ মুক্ত।
এদিকে, নিউইয়র্ক সিটিতেও প্লাসিক ব্যাগের অবাধ ব্যবহার ঠেকাতে গত সপ্তাহে একটি বিল পাশ হয়েছে। সে অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে ৫ সেন্ট করে দিতে হবে প্লাস্টিক ব্যাগের জন্যে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের আরো দেড় শতাধিক সিটিতে প্লাস্টিক ব্যাগের ওপর বিধি-নিষেধ জারি হয়েছে পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে।
সর্বশেষ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নিউইয়র্ক সিটিসহ আশপাশের এলাকা কী ধরনের বৈরী পরিস্থিতির শিকার হতে পারে সে আলোকে সর্বসাধারণকে সজাগ করা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের স্বার্থে বিশেষ একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ‘এনার্জি রিসার্চ এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি।’ তারা একটি ওয়েবসাইট তৈরী করেছে। সেখানে রয়েছে সহ¯্রাধিক ম্যাপ, সমুদ্রের ওপরিভাগের ডাটা, তাপমাত্রার গতি-প্রকৃতি। এগুলো পরিবেশে বিরূপ প্রভাবের আভাস দেবে প্রতিনিয়ত। আর এহেন অবস্থা কী ধরনের প্রভাব ফেলবে অবকাঠামো, পরিবহন, জ্বালানী, পানি সম্পদ, ইকো-সিস্টেম, কৃষি উৎপাদন এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর, তা জানা যাবে। জনস্বার্থে এই ওয়েবসাইট তৈরী করে দিয়েছে কর্ণেল ইউনিভার্সিটি।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

তিন দিন ধীরগতি থাকবে ইন্টারনেটে

সন্তানকে ফিরে পেতে বাবা-মায়ের আকুতি

‘সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরে রোহিঙ্গা, তিস্তা ইস্যু থাকবে’

কে এই কিংবদন্তী নর্তকি ও গুপ্তচর মাতা হারি?

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্থায়ী ও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহবান স্পিকারের

রোহিঙ্গাদের জন্য ৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার সংগ্রহে ডোনার কনফারেন্স করবেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা

ইউপি চেয়ারম্যান ও আ’লীগের নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা

‘ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে সিদ্ধান্তের অধিকার সবারই আছে’

ঢাকায় আসছেন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো

আবারো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্ত্র-ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আহ্বান

কুয়েতে এসি বিস্ফোরণে মৌলভীবাজারের একই পরিবারের ৫ জনের মৃত্যু

৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে নানা প্রশ্ন

যুদ্ধ নয় আলোচনায় সমাধান

সিইসি’র বক্তব্য কৌশল হতে পারে

আড়াই ঘণ্টা আলোচনার পর হঠাৎ সংলাপ বয়কট

বর্মী সেনা কর্মকর্তাদের ওপর ইইউ’র নিষেধাজ্ঞা