নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

বাংলাদেশে নন্দিত আলোকচিত্রী নির্যাতনের শিকার

দেশ বিদেশ

মানবজমিন ডেস্ক | ১০ আগস্ট ২০১৮, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:১১
বাংলাদেশের নন্দিত আলোকচিত্রী শহিদুল আলম সর্বশেষ ২০১০ সালে পুলিশি ঝামেলায় জড়িয়েছিলেন। তখন তিনি প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতন ও ‘ডেথ স্কোয়াড’ নিয়ে একটি প্রকল্পের কাজ করছিলেন। পুলিশ তার গ্যালারি অবরুদ্ধ করে রাখে ও পরে বন্ধ করে দেয়। এই ঘটনা তার পক্ষে জাতীয় বিক্ষোভ উস্কে দেয়। এবার তাকে তুলে নেয়া হয়েছে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে। যা গত দু’সপ্তাহ বাংলাদেশকে স্থবির করে রাখে। রোববার ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ২০ পুলিশ কর্মকর্তা শহিদুল আলমের বাড়িতে অভিযান চালায়। ওই ভিডিওতে তিনি বলেছেন, সরকারপন্থি গুণ্ডারা তাকে মারধর করেছে।
পরে আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারেও একই দাবি করেন তিনি। সরকার যেভাবে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করেছে তার সমালোচনা করেন।
গ্রেপ্তারের পরে ৬৩ বছর বয়সী এ আলোকচিত্রীকে দু’জন পুলিশ কর্মকর্তার কাঁধে ভর করে খালি পায়ে আদালতে হাজির করা হয়। এসময় তিনি উচ্চস্বরে বলছিলেন যে, পুলিশি হেফাজতে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের বিচারক তাকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেন। যা কর্তৃপক্ষ বুধবার বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু পরে তাকে ফের পুলিশ কাস্টডিতে নেয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, তার হাসপাতালে ভর্তি করার মতো কোনো অসুস্থতা নেই।
ফেসবুকে শহিদুল আলমের পোস্ট করা ভিডিও অনুসারে, তিনি সরকারদলীয় যুবকদের হাতে নির্যাতিত সাংবাদিকদের একজন। রোববার তিনি হামলাস্থল থেকে কোনো রকমে পালিয়ে একটি গেস্টহাউজে আশ্রয় নেন। পরে ফেসবুক লাইভে এসে তার সঙ্গে যা ঘটেছে তা বলেন। এর কিছুক্ষণ পরে তিনি স্কাইপির মাধ্যমে আল জাজিরা টেলিভিশনকে সাক্ষাৎকার দেন। এতে একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ তাকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। সেখান থেকে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজও পুলিশ নিয়ে যায়। বুধবার তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু আল জাজিরা টেলিভিশনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকদের প্রতি সরকারের অনুসরণ করা নীতির পক্ষে কথা বলেন। তিনি বলেন, গণমাধ্যম স্বাধীন। কিছু সাংবাদিক হতাহত হয়েছেন। এটা সরকারের পরিকল্পনার অংশ না। শহিদুল আলমের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে এমনটি তিনি বিশ্বাস করেন না। তবে কোন পুলিশ কর্মকর্তা তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছে এমনটি প্রমাণ হলে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আন্তর্জাতিক মহল শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। প্রধান প্রধান সাংবাদিক সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর নিন্দা জানিয়েছে। ফ্রান্সের রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স দিনটিকে ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য কালো দিন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় প্রায় দুই ডজন সাংবাদিক পুলিশ ও শাসকদলীয় যুব সংগঠনের হেলমেট পরা, লাঠিবাহী সদস্যদের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন। বিক্ষোভকারী ও সাংবাদিকরা যখন তাদের হামলার শিকার হচ্ছিল, তখন পুলিশ তা বন্ধ করতে এগিয়ে আসেনি। লেখকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন পেন ইন্টারন্যাশনালের ‘রাইটার্স ইন প্রিজন কমিটির’ প্রধান ত্রিপতি সলিল বলেন, শহিদুল আলম একজন বিশিষ্ট আলোকচিত্রী, লেখক, শিল্পী ও মানবাধিকার কর্মী। তিনি বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত, প্রান্তিক, অসহায় ও নির্যাতিত মানুষদের জন্য অনেক কিছু করেছেন। তিনি ফটোগ্রাফারদের স্কুল পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছেন। একই সঙ্গে ঢাকা আলোকচিত্র উৎসবেরও শুরু করেন। বিশ্বের অনেক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ অনেক বিখ্যাত প্রকাশনায় তার ছবি প্রকাশিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি আলোকচিত্র সংগঠনের পরিচালক গ্যারি নাইট বলেন, শহিদুল আলমের কারণেই বাংলাদেশে তুলনামূলক অধিক বিশ্বমানের আলোকচিত্রী রয়েছে। তিনি এমন একজন ব্যক্তি যে একই সঙ্গে ত্রাণসংস্থা, সাংবাদিক, মিডিয়া প্রশিক্ষক ও স্কুলের পরিচালক। সব ক্ষেত্রে তিনি নিজেই অর্থায়ন করেন। এছাড়া, শহিদুল আলম ও তার সহধর্মিণী রাহনুমা আহমেদ অনেক বছর ধরে ঢাকার হাজারো টোকাইকে খাবার খাইয়েছেন। তাদেরকে সহযোগিতা করেছেন। শহীদুল আলমের আলোকচিত্র প্রতিষ্ঠান দৃক গ্যালারির ম্যানেজার রেজাউর রহমান বলেন, গোটা বিশ্ব থেকেই তার প্রতি সমর্থন জানানো হচ্ছে। এটা বিস্ময়কর ঘটনা। তাকে আজ তুলনামূলক ভালো মনে হয়েছে। হাসপাতাল থেকে যাওয়ার সময় তিনি আজ (গতকাল) নিজেই হেঁটেছেন।
শহিদুল আলমকে এমন একটি আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে যা প্রশাসনের সমালোচনাকারী যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার জন্য বাংলাদেশের সরকারকে বিরাট সুযোগ দিয়েছে। মঙ্গলবার তার শুনানিতে সরকার পক্ষের প্রসিকিউটর জানান, শহিদুল আলমকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা জিজ্ঞাসা করেন যে, কতদিন তিনি সরকারের সমালোচনা চালিয়ে যাবেন? জবাবে তিনি বলেছেন, ‘সরকারের পতন হওয়া পর্যন্ত।’ প্রসঙ্গত, বেপরোয়া গতির একটি বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ শুরু করে শিক্ষার্থীরা। তারা নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তা অবরোধ করে। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঢাকা শহরকে কার্যত অচল করে দেয়। যেখানে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষের বসবাস। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দিলে আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। কিন্তু ক্লাসে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে তথ্য দেয়ার জন্য শিক্ষকদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেয়ার পর আন্দোলনের তীব্রতা কমে যায়। কয়েকদিনের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা পদস্থ কর্মকর্তাসহ সবার গাড়ি থামিয়ে তাদের লাইসেন্স যাচাই করে দেখে।
স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুসারে, রোববার আহত দু’ডজন সাংবাদিকের মধ্যে অন্তত পাঁচ সাংবাদিককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ ও এর তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২শে জুলাই বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট সাবেক সম্পাদক সরকারদলীয় শতাধিক গুণ্ডার হাতে নির্যাতনের শিকার হন। গুরুতর আহত হয়ে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

চট্টগ্রাম ও সিলেটে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধরপাকড়

চট্টগ্রামেও সমাবেশের অনুমতি দিতে হবে: মান্না

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আহ্বান

সিবিআই’র শীর্ষ দুই নেতার লড়াই থামাতে মোদির হস্তক্ষেপ

সংলাপের দাবি অবাস্তব, অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয়: কাদের

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে: দুদু

কাশ্মিরিদের হত্যার নিন্দা ইমরানের

কলকাতায় দুর্গাপূজা কার্নিভাল নিয়ে বিদেশিদের আগ্রহ

পেপসি খেয়ে ৬০ বছর!

সরকারি চাকরি আইন সংবিধান পরিপন্থী ও বৈষম্যমূলক: টিআইবি

প্রার্থী হওয়া বা রাষ্ট্রীয় পদ পাওয়ার কোন ইচ্ছা নেই: ড. কামাল

সিএমএইচে এরশাদ

সিলেটের জনসভার দায়িত্ব সুলতান মনসুর, শাহজাহানের

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম

আপনারা চাইলে আমি পদত্যাগ করবো- মাহাথির

‘মন্ত্রিপরিষদ ছোট হলে উন্নয়ন কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে’