রাজধানীতে কেন এত দুর্ঘটনা?

শেষের পাতা

মরিয়ম চম্পা | ২২ জুলাই ২০১৮, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:২২
সম্প্রতি রাজধানীর কালশী ফ্লাইওভার থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে নামার পথে একটি বাস ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় শাহরিয়ার সৌরভ সেজানকে। মোটরসাইকেল থেকে সড়কে ছিটকে পড়লে আরেকটি বাস তাকে চাপা দেয়। টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় কিছুদূর। শাহরিয়ারকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ১লা জুলাই সকাল ১০টার দিকে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। শাহরিয়ার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ৩৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।
তার বাড়ি ঠাকুরগাঁও শহরের হলপাড়ায়। তিনি টিচ ফর বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠনে ফেলোশিপ করছিলেন।

এ ঘটনায় বাসটি আটক করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, কালশী ফ্লাইওভার থেকে শাহরিয়ার মোটরসাইকেল চালিয়ে নামার সময় হোটেল র‌্যাডিসন ব্লুর কাছে বসুমতী পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস তাকে ধাক্কা দেয়। পরে পুলিশের সহায়তায় বাসের নিচ থেকে বের করা হয় গুরুতর আহত শাহরিয়ারকে। তিনি পরিবারের বড় সন্তান ছিলেন। পুরো পরিবারের দায়িত্ব তার ওপর ছিল। শাহরিয়ারের এমন মৃত্যু কিছুতেই মানতে পারছেন না তার পরিবার ও বন্ধুরা। ঘটনার পর ফেসবুকে পরিচিতদের দেয়া স্ট্যাটাসে ঝরেছে কষ্টের আহাজারি।

রিফাত ফারজান নিপুণ নামে একজন আহাজারি করে লিখেছেন, খুব অবেলায় চলে গেলে তুমি। আমার খুনসুটির মানুষটা হারিয়ে গেল নিমিষেই। অনেক অনেক ভালো থেকো তুমি ওপারে সবসময়। মো. আবু আশরাফ নামে আরেকজন লিখেছেন, কাকে দোষ দেবেন? বিচারটাই বা কাকে দেবেন! কয়জন মানে ট্রাফিক আইন? হাফ-ফিট বাসগুলা এই দেশে বেপরোয়াভাবে চালানোর সুযোগ পায়। টাকার বিনিময়ে লাইসেন্স ফিটনেস বিক্রি হয়। দেশটা তো মরে গেছে অনেক আগেই। এখন মানুষগুলোও মরে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। যারা বাইক চালান, একটু সাবধানে চালাবেন।

দেব কুমার ঠাকুর লিখেছেন, কী লিখবো বুঝতে পারছি না... বড্ড অসময়ে চলে গেলি। তোর সঙ্গে পরিচয় আমার রুমমেট জুয়েল রানার মাধ্যমে। একসঙ্গে কত সময় কাটিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে।
তাহের ভাইয়ের দোকানে আড্ডা, কামালউদ্দিন হলে আমার আর জুয়েলের রুমে বসে তোদের বিভাগের কতশত গল্প। তোদের সঙ্গে সম্পর্কটা এতটাই ভালো ছিল আমার নিজ ডিপার্টমেন্টের বন্ধুরাও হিংসা করতো। এইভাবে চলে যাবি কখনো ভাবিনি। আপনজন হারানোর বেদনা সহ্য করা যায় না। পরপারে ভালো থাকিস। স্রষ্টা মুনিয়াকে শোক সহ্য করার সমর্থ দিক। কিছুদিন আগে মুনিয়া ইসলাম মজুমদারের সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। থাকতেন মিরপুরে।
ঠিক এই ঘটনার পরদিনই মিরপুরে বাসচাপায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) শিক্ষার্থী মাসুদ রানা নিহতের ঘটনায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। মিরপুর চিড়িয়াখানা সড়কের ঈদগাহ মাঠ মোড়ে সোমবার সকাল ৯টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ সময় কয়েকটি যানবাহনে ভাঙচুর চালায় শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভে সোমবার বেলা ১১টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত প্রায় ৩ ঘণ্টা মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচলে বাধার সৃষ্টি হয়। বাসচাপায় নিহত সৈয়দ মাসুদ রানা বিইউবিটির বিবিএ চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

শাহ আলী থানার বরাত দিয়ে জানা যায়, সকালে রিকশায় চড়ে ক্যাম্পাসে যাচ্ছিলেন মাসুদ রানা। সনি সিনেমা হলের সামনে দিশারী পরিবহনের একটি বাস রিকশার পেছনে ধাক্কা দিলে মাসুদ পড়ে যান। পরে বাসটি তাকে চাপা দিয়ে চলে যায়।
সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, প্রধানত দুই কারণে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে চলছে। সড়ক দুর্ঘটনার দু’টি কারণ, একটি চালকদের বেপরোয়া ও কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে গাড়ি চালানো। দ্বিতীয়ত, ছোট ছোট রাস্তার ছেলেরা বেপরোয়াভাবে বাস চালাচ্ছেন। ঢাকা শহরে যারা বাস চালাচ্ছেন তাদের অধিকাংশের বয়সই ১২ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। অনেকের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। এর ফলেই দুর্ঘটনা ঘটছে। বাসের সুপারভাইজার ও সহকারীদের আচরণে প্রতিনিয়ত যাত্রীরা হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন। এজন্য আমাদের আরো অনেক বেশি কঠোর হতে হবে। আমরা সমন্বিতভাবে এটাকে মোকাবেলা করতে চাই। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার আরেক কারণ নাগরিক অসচেতনতা। আমাদের সচেতনতার বড় অভাব রয়েছে। রাস্তায় চলাচল করার সময় প্রায় দেখা যায় মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হচ্ছে। আবার অনেকে কানে হেডফোন-ব্লুটুথ ব্যবহার করেও রাস্তা পার হচ্ছে, যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এজন্য নগরবাসীকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি জেব্রা ক্রসিং, সিগন্যাল বাতি দেখে রাস্তা পার হওয়ার আহ্বান জানান মেয়র সাঈদ খোকন।


বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে বলা হয় চলতি বছরের প্রথম ৪ মাসে ১ হাজার ৮৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ১২৩ জন নিহত ও ৫ হাজার ৫৫৮ জন আহত হয়েছেন। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে এ বছর দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
চলতি বছর ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) সংগঠনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন ২০১৭ সালের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মোট ৩ হাজার ৩৪৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০১৬ সালের চেয়ে ২০১৭ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে ১ হাজার ৩৩টি। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৯০৮ জন, যা ২০১৬ সালের চেয়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ বেশি। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি পথচারী। এই সংখ্যা ২ হাজার ৮০৪ জন। ঢাকা জেলায় সবচেয়ে বেশি ৪০১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪২৭ জন। এরপরই রয়েছে চট্টগ্রামের অবস্থান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানী তৌহিদুল হক বলেন, ঢাকা শহরে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হলো, মোটা দাগে জনগণের মাঝে শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণকে শৃঙ্খল বা অর্ডারফুল করতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত এই ধরনের দুর্ঘটনা বাড়তেই থাকবে।

বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ডিপার্টমেন্টের (এআরআই) অধ্যাপক ড. মোহম্মদ মাহবুব আলম তালকুদার বলেন, ঢাকা শহরে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হচ্ছে চালকদের চাকরি স্থায়ী না। তার উপর বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীদের টাকা দিতে হয়। উক্ত টাকা উঠানোর জন্য চালকরা ওভারটেক করে। কার আগে কে যাবে এমন প্রতিযোগিতায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। তাই উন্নত বিশ্বের মতো প্রতিটা রোডে যদি একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির গাড়ি দেয়া হয় এবং নির্দিষ্ট রং ব্যবহার করা হয় তাহলে এই ধরনের ঘটনা ঘটবে না। একই সঙ্গে চালকদের যথেষ্ট ভদ্রতা, কার্টেসি, ম্যানার শিখাতে হবে। আমাদের দেশের অনেক মানুষই শুধু মাত্র সাধারণ চালকদের গালির ভয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়ি চালায় না। অথচ শিক্ষিত বা প্রশিক্ষিত লোকেরা গাড়ি চালালে দুর্ঘটনা কমে আসতো। শিক্ষিত লোকের এই ধরনের পেশায় আসতে চায় না কারণ এই চাকরির নিশ্চয়তা নেই, স্ট্যাটাস নেই। তাছাড়া ড্রাইভারদের বিভিন্নভাবে গালি গালাজ করা হয়।
 
ড্রাইভারদের মানসিক প্রশিক্ষক মনিরা আক্তার বলেন, চালকদের জন্য কোনো প্রশিক্ষণ বা গাইডলাইন নেই। এবং ভালো চালক হওয়ার জন্য যে শিক্ষা দরকার তার কোনাটাই চালকরা কখনোই শিখতে পায় না। তাদের নাই কোনো নির্দিষ্ট মজুরি ব্যবস্থা, চাকরির সিকিউরিটি, বেতন কাঠামো কোনো কিছুই ঠিক নেই। এতো নেই এর মধ্যে দিয়ে চালকদের দিয়ে দুর্ঘটনার বাইরে কি আশা করতে পারি। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে, গাড়িচালকদের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। কারণ আমাদের দেশের গাড়ি চালকরা কোনো প্রকার প্রশিক্ষণ ছাড়াই ঘুষ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স পায়। এছাড়া অন্যান্য পেশার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠানো হয় সেখানে চালকদের জন্য ঘরে বাইরে কোথাও কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। চালকরা প্রশিক্ষণ চাইলেও আমরা মালিক হিসেবে দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে সেটা ভাবি না। বা ভাবতে চাই না। কোনো মালিককে চালকদের প্রশিক্ষণের কথা বলা হলে তারা হেসে উড়িয়ে দেয়। তারা বলে এতো বছর ধরে গাড়ি চালায় নতুন করে আর কি শিখবে তারা। আমরা শিক্ষিত লোকেরা চালকদের প্রশিক্ষিত করতে যেখানে দেন-দরবার করি সেখানে আমার নিজের গাড়ি চালককে প্রশিক্ষিত করার কথা ভুলেও ভাবি না। যার উপর আমার জীবন নির্ভর করে। তাই চালকদের প্রশিক্ষিত করতে সরকার নিজে নয় বেসরকারি অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

‘আমাদের উন্নয়ন সবার জন্য’

শরণখোলা ও সাতক্ষীরায় বজ্রপাতে নিহত ৩

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ শিক্ষার্থী জামিন পেল

‘বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে সরকার বিভিন্ন কৌশল করছে’

খাগড়াছড়িতে ৬ জন নিহতের ঘটনা তদন্তে কমিটি

শহীদুল আলমের মুক্তি দাবি ১১ নোবেলজয়ী ও ১৭ বিশিষ্ট ব্যক্তির

‘এই নির্বাচনে বিএনপির সাথে আলোচনা নয়’

হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু,মুসল্লিদের পদচারণায় মুখর মিনা

প্রশান্ত মহাসাগরে আঘাত হেনেছে শক্তিশালী ভূমিকম্প

ভোগান্তিতে ঘরমুখো মানুষ

প্রধানমন্ত্রীর ফেসবুক আইডি নেই

ফতুল্লায় যাত্রীবাহী লঞ্চের ধাক্কায় ট্রলার ডুবে ২৬ গরু নিখোঁজ (ভিডিও)

ঝিনাইদহে ডাকাতের হাতে সেনা কর্মকর্তা নিহত

সৌদি আরবে বাংলাদেশী হজযাত্রীর মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধশত ছাড়ালো

‘স্বার্থের জন্যই কেউ কেউ অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে’

আত্মগোপনে