শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদ

যারা শিক্ষকের ওপর আঙ্গুল তোলে তারা ছাত্র নামের কলঙ্ক

শেষের পাতা

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার | ১৭ জুলাই ২০১৮, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৪৫
হামলা-নির্যাতনের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পৃথক কর্মসূচি থেকে তারা হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দাবি করেছেন। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সামনে মানববন্ধন করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

রোববার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এক কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে ছাত্রলীগের হাতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজীম উদ্দিন খানসহ কয়েকজন শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার প্রতিবাদ ও লাঞ্ছনাকারীদের বিচারের দাবিতে এ মানববন্ধনে বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সায়েমা আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক শেখ সামস মোরসালিন, প্রভাষক মোহাম্মাদ আলী সিদ্দিকী প্রমুখ অংশ নেন। মানববন্ধন শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল মধুর ক্যান্টিন হয়ে ডাকসু, কলা ভবন, অপরাজেয় বাংলা প্রদক্ষিণ করে আবার সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সামনে গিয়ে শেষ হয়।  মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড বহন করে। যেখানে লেখা ছিল-‘শিক্ষকের মর্যাদা আজ কোথায়’, ‘এবার তোরা ছাত্র হ’, ‘শিক্ষক আজ লাঞ্ছিত কেন?’ ‘আমার ক্যাম্পাস কার দখলে’, ‘মূল্যবোধ আজ কোথায়’ ইত্যাদি ।

বিভাগের শিক্ষক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘গতকাল শহীদ মিনারে যে ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত ন্যক্কারজক।
যারা শিক্ষকদের উপর আঙ্গুল তুলে শাসায় তারা মানুষ নয়। এ জন্য তাদের, আবার নতুন করে মানুষ হওয়া দরকার।’ মোহাম্মাদ আলী সিদ্দিকী বলেন, ‘শিক্ষকদের উপর আঙ্গুল তুলেছে সরকার দলীয় একটি বিশেষ সংগঠন (ছাত্রলীগ)। তারা ছাত্র কি না বা তারা তাদের সংগঠনের নীতি-আদর্শ মানে কি না তা আমার জানা নেই। আর যারা শিক্ষকদের উপর আঙ্গুল তুলেছে তারা যে গর্হিত কাজ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা ছাত্র নামের কলঙ্ক। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।’

বিভাগের শিক্ষার্থী সৌমি বলেন, ‘তানজীম স্যার আমাদের কাছে বাবার মতো। একটি ন্যায্য দাবিতে দাঁড়ানোর কারণে তাকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। ?শুধু তার উপরে নয়, অন্যান্য যেসব শিক্ষকরা ছিলেন তারাও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। তাদের উপর আঙ্গুল তোলার সাহস ছাত্রলীগ কোথা থেকে পায়? এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সেজন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই।’ এদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এ প্রতিবাদ মিছিলও ভণ্ডুল করতে চেয়েছে ছাত্রলীগ।

মিছিলটির পেছনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক দিদার মোহাম্মদ নিজামুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক সাইফ বাবুর নেতৃত্বে প্রায় ১০-১২ জন নেতাকর্মীকে যেতে দেখা গেছে। এ সময় তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখায়। মিছিলের পেছনে পেছনে অবস্থান নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রচার সম্পাদক সাইফ বাবু বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব আমাদের। আমরা তাদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য এখানে এসেছি।’

সহপাঠীদের মারধরের বিচার চায় অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীরা
এদিকে গত শনিবার সহপাঠীর হাত ধরায় ছাত্রলীগের হাতে অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের দুই শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় গতকাল ক্যাম্পাসে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে বিভাগটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সামনে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। মানববন্ধন থেকে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির চেয়ে আগামী তিন দিন ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধনে অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ শফিকুজ্জামান, অধ্যাপক এমএম আকাশ, অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানসহ বিভাগের অন্তত দুই শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।

মানববন্ধন থেকে অবিলম্বে নির্যাতনকারীদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবি করা হয়। এ ঘটনায় তিন জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হলেও অভিযুক্ত সবাইকে শাস্তির আওতায় আনতে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ দেখার দাবি করে শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধনে নিজেদের দাবির পক্ষে বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড বহন করেন শিক্ষার্থীরা। যাতে লেখা- ‘আমার ভাই বোনের ওপর হামলা কেন?’, ‘আমরা নিরাপদ ক্যাম্পাস চাই’, ‘হামলা আমার ক্যাম্পাসে, বিচার চাইবো কোনখানে’ ইত্যাদি।

এ সময় কোন কর্তৃত্ববলে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী আরেকজন শিক্ষার্থীর পরিচয়পত্র দেখতে চায়? এই সাহস তাদের কে দিলো? সেই প্রশ্নও রাখেন বিভাগের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। অর্থনীতি বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের উপর হামলা কোনো ভালো লক্ষণ নয়। আমরা ভিসি স্যারের কাছে গিয়েছিলাম।

তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে তিনি জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করবেন। আমরা তার প্রমাণ দেখতে চাই।’ মানববন্ধনে হামলার শিকার দুই শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান আসাদ ও রোকেয়া গাজী লিনাও উপস্থিত ছিলেন। তারা বলেন, ‘অন্যায়ভাবে তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে। তারা ট্রমায় ভুগছেন উল্লেখ করে আসাদ ও লিনা বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসে আমাদের ওপর কেন হামলা করা হলো শুধু এটুকুর জবাব চাই।’ উল্লেখ্য, গত রোববার রাতে মারধরের ঘটনায় জড়িত তিন ছাত্রলীগ কর্মীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃতরা হলেন- উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সিফাত উল্লাহ সিফাত, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের আল ইমরান পলাশ ও ইংলিশ ফর স্পিকারস অব আদার ল্যাঙুয়েজেস বিভাগের মাহমুদুর রহমান। তারা তিন জনই প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত।

ঢাবিতে শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে জাবি ও রাবিতে বিক্ষোভ
জাবি প্রতিনিধি জানান, কোটা সংস্কারের পক্ষে  আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর ছাত্রলীগের হামলা এবং ঢাবি প্রক্টরের দায়হীন বক্তব্যের প্রতিবাদে মুখে কালো কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়  শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্যমঞ্চ।

মিছিলটি গতকাল সকাল ১১ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদ ভবন থেকে শুরু হয়ে নতুন কলা ভবন ও রেজিস্ট্রার ভবন হয়ে  শহীদ মিনার এসে শেষ হয়।

মিছিলে নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, একই বিভাগের অধ্যাপক মানস চৌধুরী, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক স্বাধীন সেন, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামছুল আলম, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মোস্তফা নাজমুল মানছুর,অধ্যাপক মুহাম্মদ তারেক চৌধুরী, রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. এনামউল্লাহ্‌ পারভেজ ও ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার উপস্থিত ছিলেন।
 
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থীরাও অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেন।

দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিভাগের রুমের সামনে বিভিন্ন দাবি সম্মলিত পোস্টার টাঙিয়ে দেন। বিভাগের শিক্ষার্থী হাসান জামিল বলেন, “কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবি মেনে না নিয়ে বরং প্রধানমন্ত্রী দেশের ছাত্র সমাজকে তাচ্ছিল্য  করে বক্তব্য দিচ্ছেন,যা খুবই দুঃখজনক। কোটার যৌক্তিক সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন চলবে।”

রাবি প্রতিনিধি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধন থেকে হামলাকারীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। গতকাল বেলা ১১টায় বিভাগের সামনে তারা এ মানববন্ধনের আয়োজন করেন।
মানববন্ধনে বক্তরা বলেন, গণতান্ত্রিক একটি দেশে যে কোনও দাবি নিয়ে শিক্ষার্থীরা মাঠে নামতে পারে। তাহলে তাদের ওপর কেন হামলা করা হবে? সংবিধানে যে বাক্‌ স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে তা ইতিমধ্যে লুণ্ঠিত হয়েছে। হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন করতে গিয়ে আবারও হামলার শিকার হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। যারা শিক্ষকদের ওপর হামলা করে, সরকারের উচিত তাদের মুখোশ উন্মোচন করা।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হুসাইন মিঠুর সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন বিভাগের শিক্ষার্থী রাশেদ রিন্টু, গোলাম মোস্তফা, চতুর্থ বর্ষের মোল্লা মোহাম্মদ সাঈদ, আহমেদ ফরিদ, জয়শ্রী রানী সরকার প্রমুখ।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

kazi

২০১৮-০৭-১৭ ০০:০৪:৩৪

যারা শিক্ষক লাঞ্ছনা কারি ছাত্রদেরকে উৎসাহ দেয় তাদের কি নামে আখ্যা দিবেন ? এরাই তো দেশের হর্তাকর্তা

আপনার মতামত দিন

আইসিইউতে রাজধানী

ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টির চক্রান্ত করছে বিএনপি

ওয়ান ইলেভেনের বেনিফিশিয়ারি আওয়ামী লীগ

যেভাবে ঢাকার মেরামত সম্ভব

গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার ফারিয়া রিমান্ডে

৪০ লাখ বাংলাভাষী হবে বৃহত্তম রাষ্ট্রবিহীন জনগোষ্ঠী!

ইমরান খানই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী

মওদুদের বাড়ি ঘেরাও করে রাখায় মির্জা ফখরুলের নিন্দা

বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য ও আন্দোলনের খসড়া রূপরেখা তৈরি

আত্মমর্যাদা ও মানবাধিকারের স্বপক্ষে একক কণ্ঠস্বর

ঈদের আগে ছাত্রদের মুক্তি দিন: ড. কামাল

‘কার কাছে গেলে ছেলেকে ফেরত পাবো’

বাজপেয়ীকে শেষ বিদায়

পশুবোঝাই ট্রাক ‘ছিনতাই’ শঙ্কায় সিলেটের বেপারিরা

ভোগান্তি মাথায় নিয়ে ঈদযাত্রা

মওদুদ আহমদকে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ