ভিসি যখন গোয়েন্দা

প্রথম পাতা

সাজেদুল হক | ১০ জুলাই ২০১৮, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:২৪
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র ভূমিতে এ এক বিস্ময়কর উদ্ভাবন। আবিষ্কারক আর কেউ নন। স্বয়ং ভিসি প্রফেসর আখতারুজ্জামান। চাঞ্চল্য তৈরি করেছেন তিনি। তার আবিষ্কারে লা জবাব সবাই। মাসুদ রানা কোন ছার! যেন তিনিই সবচেয়ে বড় গোয়েন্দা। সময় কত কিছুই না বদলে দেয়। তাই বলে এতোটা।
তিন মাস আগে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন প্রফেসর আখতারুজ্জামান। বলেছিলেন, যৌক্তিক দাবির সঙ্গে ঢাবি প্রশাসন একমত। আর রোববার তিনি যে আবিষ্কারের কথা জানালেন, তা অবিশ্বাস্য। তবে অবিশ্বাস, বিস্ময় কাটিয়ে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো- ঢাবি ভিসি কাকে ডোবালেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস মোটাদাগে দু’ভাগে বিভক্ত। একটি জাতি-রাষ্ট্রের জন্মে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা দুনিয়ার আর কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেই। যদিও সাম্প্রতিককালে শিক্ষা-গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিছু হটা নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে রোববার নতুন এক তত্ত্ব দিয়ে অতীতের সব দুর্নামের রেকর্ড যেন অতিক্রম করে ফেললেন আখতারুজ্জামান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভয়ঙ্কর এক বদনাম ডেকে আনলেন তিনি। কোটা সংস্কারের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তালেবান, শাবাব, বোকো হারাম, লাদেন, মোল্লা ওমরের কার্যক্রমের মিল দেখতে পান তিনি। অকপটে সাংবাদিকদের আবার সে কথা বললেনও। এ নিয়ে চারদিকে ছি ছি! রব উঠলেও তার যেন কিছু যায়-আসে না।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সাম্প্রতিককালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কপালে এতো বড় কলঙ্ক তিলক আর কেউ আঁকতে পারেননি। নিজ প্রতিষ্ঠানকে ডোবানোর এ কৃতিত্ব তাকে দিতেই হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ পর্যবেক্ষকদের বিপুল দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। সমাজে, রাষ্ট্রে নারীর অগ্রগতির চিহ্ন হিসেবেই একে দেখতে পেয়েছেন তারা। অথচ এখানেও জঙ্গিবাদের ভূত দেখছেন আখতারুজ্জামান। গুলশান হামলার পর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ইস্যুটি নতুন করে বড় রকমের আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ সরকার বরাবরই এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতির অনুসরণ করে আসছে। জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলোচনায় এলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কখনো এ তালিকায় আসেনি। সে তালিকায় নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত করতে কী আপ্রাণ চেষ্টাই না করছেন ঢাবি ভিসি।
প্রফেসর আখতারুজ্জামানের আলোচিত এ বক্তব্যের ঘণ্টা দুয়েক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশ ক্যাম্পাসে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করে। যেখানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানানো হয়। সমর্থন জানানো হয় কোটা সংস্কার আন্দোলনে। সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন। তিনি ছাত্রদের ওপর হামলার ঘটনাকে লজ্জাজনক এবং দুঃখজনক হিসেবে অভিহিত করেন। এটাও বলেন যে, বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। আমাদের কপাল ভালো যে, ওই শিক্ষকদের এখনো পর্যন্ত জঙ্গি বলেননি আখতারুজ্জামান। হয়তো বলতেও পারেন।

প্রয়াত লেখক আহমদ ছফার বিখ্যাত উপন্যাস গাভী বিত্তান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, তার বাসার গাভীকে ঘিরে কীভাবে পরিচালিত হয় নষ্ট শিক্ষক রাজনীতি তার ছবি এঁকেছেন মহাত্মা ছফা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আখতারুজ্জামানের জঙ্গি তত্ত্ব প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সেই গাভীটি। অনেকেই বলছেন, আহমদ ছফা এখন বেঁচে থাকলে কী লিখতেন?

জঙ্গিবাদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আলী রীয়াজ। আখতারুজ্জামানের বক্তব্যে বিস্মিত আলী রীয়াজ এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মীদের ‘জঙ্গি’ বলে বর্ণনার সময় তাদের তুলনা করেছেন তালেবান, আল শাবাব এবং বোকো হারামের সঙ্গে। তিনি বলেছেন যে, তিনি ফেসবুক ব্যবহার করেন না, কিন্তু তার একজন সহকর্মী তাকে এমন কোনো ভিডিও দেখিয়েছেন যা থেকে তার এই উপসংহার। আমি দীর্ঘদিন ধরে উগ্র সহিংসবাদ এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিষয়ে পঠন-পাঠনের চেষ্টা করছি; বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে সামান্য গবেষণার অভিজ্ঞতাও আছে; সেই আগ্রহ থেকে এবং আমার গবেষণার প্রয়োজনেই আমি জানতে চাইছি- সেই ভিডিওটা কোথায়? তা ছাড়া উপাচার্য যেহেতু দেখেছেন সেহেতু এটা কোথাও আছে; সেটা দেখার অধিকার বাংলাদেশের মানুষের নিশ্চয় আছে। যদি এটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে চান সেইভাবে বিবেচনা করেই উপাচার্য মহোদয় বলুন কোথায় সেই ভিডিও?”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামও ভিসি আখতারুজ্জামানের যুক্তি মেনে নিতে পারেননি। তিনি বলেছেন, ‘সমস্ত পৃথিবীতে তরুণরা যার মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে সেটি হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সেটি জঙ্গিরা ব্যবহার করে আর এরা ব্যবহার করছে বলেই জঙ্গি হয়ে গেল এই যুক্তি আমি মেনে নিতে কোনো দিনই পারবো না। আমি এদের অনেককেই চিনি। এরা আমাদেরই সন্তান। তাদের প্রতি আমাদের বিশ্বাস থাকা উচিত, তাদেরকে আমাদের সম্মান করা উচিত।’

ইতিহাস নানা ধরনের শিক্ষক দেখেছে। কেউ নিজ ছাত্রদের রক্ষা করতে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছেন। আর কেউ ক্ষমতাসীনদের তোষামোদির রেকর্ড গড়েছেন। প্রফেসর আখতারুজ্জামানকে ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে সে বিচার ইতিহাসের।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মোহম্মাদ ইসলাম

২০১৮-০৭-১০ ১৯:০৭:১৫

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যাবহারকারী যদি জংগি হয়, তাহলে মার্কিন রাস্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প হলেন সবচাইতে বড় জংগি।

অ্যাডভোকেট আমিন আহমে

২০১৮-০৭-১০ ০৮:৫৯:৫৫

আমার সৌভাগ্য যে, আমি মান্যবর (!) ভি.সি মহোদয়ের ছাত্র নই।

Milon

২০১৮-০৭-১০ ০৭:৫১:১২

Because of some idiot you can find out the real. It's not something new, there is always some people like him. I am not surprise.

মিনহাজুল ইসলাম রাসেল

২০১৮-০৭-১০ ০৩:৪৩:৪৩

ঢাবি অধিভুক্ত কলেজের ছাত্র হয়ে আমরাও লজ্জিত.....

খলিফা সাহাব সুমন

২০১৮-০৭-১০ ০১:১২:২৩

ভিসিকে কি বলব?মতামত দিতেও লজ্জা লাগতেছে,

জেসিন

২০১৮-০৭-০৯ ২২:৪৪:২২

আমাদের দেশের ভিসিরাত নিজেদের গুনে ভিসি হয়নি। হয়েছে বিশেস কারনে। তাদের কাছে এর চাইতে আর কি আসা করবে জাতি । প্রাচের অক্সফোর্ড এর ভিসি উনি কি ভাবে কথা বলতে হয় এটাই জানেনা । আমি জানতাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক লোকজন এবং পুলিশ মিথ্যা কথা বলে। উনিত সবাইকে হার মানিয়ে দিয়েছে । এ লজ্জা কার।

আব্দুল্লাহ

২০১৮-০৭-০৯ ২২:৩৪:৩৬

শিক্ষক নামের কলঙ্ক ৷ ওনার পদত্যাগ তাই৷

Tamy

২০১৮-০৭-১০ ০৯:৫৯:০১

ইতিহাস তাদের মীরজাফরের পেতাত্তা বলবে

kazi

২০১৮-০৭-০৯ ১৯:৫৪:৪১

মন্তব্য করতেও ঘৃণা হচ্ছে। ছিঃ।

অাবুসাঈদ

২০১৮-০৭-০৯ ১৮:৩২:৪৪

মাছের পচন নাকি শুরি হয় তার মাথা থেকে অার রাষ্ট্র নামক দেহের মাথা হচ্ছে সেই দেশের বুদ্ধিজীবীরা সেই বুদ্ধিজীবীদের মাথা যখন পচন ধরা শুরু করে তখন রাষ্ট্র দেহের অবস্থা কি হবে সেটা সহজে অনুমেয়।

মিজানুর রহমান

২০১৮-০৭-০৯ ১৭:৩২:০১

প্রফেসর আখতারুজ্জামানকে তোষামোদ সম্রাট উপাধিতে ভূষিত করুন।

সুমন

২০১৮-০৭-০৯ ১৬:৩৪:১৯

মহাকালে তিনি মিশে যাবেন 'মহাখল নায়ক' ও 'মহাভন্ড' হিসেবে।

লবিব

২০১৮-০৭-০৯ ১৪:০৬:২৩

এরা জজ্ঞি, এরা রাজাকারের বাচছা। তার পর কি? কোন রাষ্ট্রের ডোন হামলা ! না এরা আমাদের সন্তান।

এডভোকেট মফিজুর রহমান

২০১৮-০৭-০৯ ১৩:৪৫:৪৫

শিক্ষক নামের কলঙ্ক। জাতী হিসেবে আমি লজ্জিত যে,দেশের সর্বোচ্ছ বিদ্যাপীঠের ভিসি হিসেবে তারমত লোক নিয়োগ পায়।

রেজা শাহরিয়ার

২০১৮-০৭-০৯ ১২:১৫:০৮

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম এটা ভেবে নিজেকে অত্যন্ত লজ্জিত মনে হচ্ছে। এই লোকের সরাসরি ছাত্র আমি,শুদ্ধ ভাবে কথা তো তিনি বলতে পারেন ই না,যেটুকু বলেন সেটুকুও আবর্জনার স্তুপে ফেলে দেওয়ার যোগ্য। রাজনৈতিক পতিতাবৃত্তির সর্বোচ্চ উদাহরণ এইসব ভিসি আখতারুজ্জামান কিংবা সোবহান এবং আনোয়ারেরা। এদের ভাগ্য ভালো আহমেদ ছফা আজ বেঁচে নেই। জনাব আখতারুজ্জামান, এই লেখা যদি কোনোদিন আপনার দৃষ্টিগোচর হয় আর আমার নাম দেখে যদি আমাকে চিনতে পারেন তাহলে আপনাকে বলছি,আপনি শিক্ষক নামের কলঙ্ক,আপনি শিক্ষক নন,আপনি একজন রাজনৈতিক পতিতা মাত্র,আপনার ছাত্র ছিলাম এটা মানুষ হিসেবে আমার জন্য সর্বোচ্চ লজ্জাজনক ঘটনা,আপনার ছাত্র ছিলাম এটা ভেবে নিজের প্রতি একদলা থু থু মারলাম ঘৃণায়।

আপনার মতামত দিন

নির্বাচন বর্জন নয়, কেন্দ্র পাহারা দিন

হঠাৎ কবিতা খানমের সুর বদল

ফাঁকা মাঠে গোল নয়

রেজা কিবরিয়া ঐক্যফ্রন্টে

সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীদের নির্বাচনে মনোনয়ন না দেয়ার দাবি

‘ফের বাংলাদেশের বিরুদ্ধে’

মামলার বাদী যখন খুনি

ক্ষমতায় গেলে যেসব কাজ করবে ঐক্যফ্রন্ট জানালেন ডা. জাফরুল্লাহ

‘নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে’

বিএনপিতে মনোনয়ন যুদ্ধে সাবেক ছাত্র নেতারা

তলাফাটা নৌকা নিয়ে কতদূর যেতে পারেন দেখাতে চাই

সিলেটে জামায়াতকে ছাড় দিতে চায় না বিএনপি

রাষ্ট্র ভিন্নমতাবলম্বীদের সহ্য করতে পারছে না

নয়া মার্কিন দূত মিলার ঢাকা আসছেন আজ

দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে নাগরিক ঐক্য

ভোট পর্যবেক্ষণের আবেদন ২১ নভেম্বরের মধ্যে