বিচিত্রিতা

কবি রবার্ট ফ্রস্ট ও তাঁর মেরামতের প্রাচীর

ঈদ আনন্দ ২০১৮

রিজভী আহমেদ | ২৯ জুন ২০১৮, শুক্রবার
বিংশ শতাব্দির কবি রবার্ট ফ্রস্ট শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বিশ্বজুড়ে কবিতাপ্রেমী মানুষের কাছে সমাদৃত একটি নাম। তাঁর কবিতা পরিহাস ও দ্ব্যর্থবোধক রহস্যময়তার নানা স্তরবিন্যাস সৃষ্টি করে কবিতানুরাগী মানুষের হৃদয়ে। তাঁর কবিতার সার্বজনীন মূলভাবে রয়েছে মগ্ন চৈতন্যের ঘনতমিশ্রায় আত্মানুসন্ধান। প্রকৃতির নানা বৈচিত্র্য ও সম্ভারে আধুনিক ইংরেজি কবিতার প্রাণ-পূরুষ রবার্ট ফ্রস্টের ক্ষণিক অবলোকনে ধরা দেয় এক মায়াবী রহস্যালোক।
মার্কিনীদের প্রিয় কবি রবার্ট ফ্রস্টের বহুল পঠিত কবিতা Mending Wall  বা মেরামতের প্রাচীর-কবির কাব্য রচনার প্রথম পর্যায়ের এক অনন্য সৃষ্টি। কবিতাটি ফ্রস্টের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ  `North of Boston’ এর অন্তর্ভুক্ত। গীতিধর্মী নাটকীয়তা ও স্বগত সংলাপের শৈলীতে কবিতাটি রচিত।
১৯১৫ সালে ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এসে যুক্তরাষ্ট্রে কবি তাঁর এই কবিতাটি প্রকাশ করেন। ইংল্যান্ডে পরিবার নিয়ে বসবাস করার সময় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যামশ্যায়ারে ফেলে আসা কৃষি খামারটি নিয়ে তিনি স্মৃতিকাতরতায় ভুগতেন-যদিও তিনি খামার পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছিলেন।
ফ্রস্টের সমগ্র কাব্য সৃষ্টিতে এই নিউ হ্যামশায়ারের শান্তিময়, গ্রামীন অনুভবি প্রত্যয়ের প্রভাব বিদ্যমান।
‘মেন্ডিং ওয়াল’ স্তববে স্তবকে বিন্যস্ত নয়, এটি উত্তম-পুরুষে ৪৫ লাইনে ধারাবাহিক বর্ণনাধর্মী কবিতা। এখানে চিরায়ত ছন্দের বাঁধন নেই, নেই অন্তমিলের আতিশয্য। তবে কবিতার অন্তরে ছন্দের গতি ক্রিয়াশীল। প্রচলিত ছন্দের নিয়মে নয়, বরং বেশ কিছু চরণ অন্তর ধ্বনিসাদৃশ্য শব্দ কবিতাটিকে দিয়েছে এক অনন্য কাব্যসূষমা। যেমন  Thing, hiding, hill, ball, wall  ইত্যাদি।
দু’জন ব্যক্তির বিপরীতধর্মী ধারণা নিয়ে কিছুটা হেঁয়ালীর বাতাবরণে কবিতাটিতে বিধৃত করা হয়েছে স্বচ্ছ ও সাবলীল সংলাপ। অপেক্ষাকৃত একজন তরুণ যিনি এই কবিতায় একজন কথক ও অপরজন তাঁর বয়স্ক প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর তন্নিষ্ঠ মননে প্রথা, ঐতিহ্য ও প্রাচীনতা। কথক আধুনিক ও মুক্ত চিন্তার দিশারী। দু’জন ব্যক্তিগতভাবে পরস্পরের সুপ্রতিবেশী হয়ে ওঠা নিয়ে তাদের দু’জনের বিপরীত ধারণা আলোচ্য বিষয়ের মূল প্রতিপাদ্য। যদিও বয়স্ক প্রতিবেশীর চেয়ে কথকের মনোভাবকেই কবিতায় আন্তরিকতার সঙ্গে চিত্রিত করা হয়েছে, তারপরও তাতে কবিতার সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশিত হয় না, প্রচ্ছন্নে গুরুত্ব রয়েছে প্রতিবেশীর ধারণারও।
প্রতি বছর দুই প্রতিবেশী কোন এক সময়ে তাদের সম্পত্তির বিভাজক রেখায় স্থাপিত পাথুরে প্রাচীর মেরামত করার জন্য উপস্থিত হতেন। সম্পত্তি বিভাজনে প্রাচীর স্থাপনের এই প্রথার প্রতি কথক ছিলেন সন্দেহপ্রবণ। কারণ যেহেতু তাদের কেউই গবাদিপশু পালন করতো না সেহেতু যার যার সম্পত্তি প্রাচীরের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখার প্রয়োজন কী? সেখানে বর্তমানে দন্ডায়মান আপেল ও পাইন গাছই তো যথেষ্ট। শুধুমাত্র নিজ নিজ অধিকারের সম্পত্তির অস্তিত্ব জানান দেয়ার জন্যই সীমানা বিভাজনের দেয়ালের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না কবিতায় বর্ণিত বক্তা বা কথক। তাই কথকের অভিমত সম্পূর্ণভাবে তার প্রতিবেশীর বিপরীত- There where it is we do not need the wall/he is all pine and I am apple orchard...

কথক লক্ষ্য করেছেন যে, প্রকৃতি তার মতোই দেয়ালের বিভাজক অবস্থান অপছন্দ করে। যেমন কোন যুক্তি ছাড়াই প্রাচীর থেকে পাথরের পতন হলে সেখানে একটা ফাঁক তৈরি হয় এবং প্রতি বছর দুই প্রতিবেশীকেই আবারও পাথর দিয়ে ফাঁক পূরণ করতে হয়। এভাবে সামনের মাসগুলোতেও হয়তো প্রাচীরের কিছু অংশ খসে পড়বে। এই ধারা হয়তো চলতেই থাকবে। এই প্রক্রিয়ার নিহিতার্থ হচ্ছে প্রকৃতি নিজেই মনুষ্য সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা সহ্য করে না। কিন্তু ভেঙে পড়া কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা অবিরামভাবে মেরামত করাটাই যেন মানুষের অভ্যাস এবং ঐহিত্য। অন্যদিকে কথকের প্রতিবেশীর রক্ষণশীল চেতনায় প্রাচীর হচ্ছে অতি গুরুত্বপূর্ণ-যা দুই প্রতিবেশীকে সুসম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ করে বলে তার বিশ্বাস। সেজন্যই  Good fences make good neighbours -এই আপ্তবাক্যটির প্রতি প্রতিবেশীর গভীর আস্থা। পিতৃ-পুরুষদের সেকেলে চিন্তা ও বচনে অন্তর্লীন প্রতিবেশীর মধ্যে আদিম মানুষের ছায়াই বিস্তার করেছে বলে মনে করে কথক। আর সেজন্যই তার মনে জন্ম নিয়েছে নানা প্রশ্ন, কথক তার প্রতিবেশী সম্পর্কে যেমন বলেছেন-He moves in darkness as it seem to me/not of woods only and the shade of trees.

দ্ব্যর্থবোধক ও স্ববিরোধী প্যারাডক্স কবিতাটিকে দিয়েছে এক অনন্য ব্যঞ্জনা। কথকের মন ঋজু ও স্পষ্টতার অভিক্ষেপে আধুনিক মননস্নাত, এর সঙ্গে অন্তঃশলীলা স্রোতের মতো বয়ে যাওয়া হেঁয়ালী ও উন্মুক্ত সাবলীল আদিম মনোভাবও একেবারে মুছে যাওয়া সম্ভব হয়নি। প্রকৃতির সামগ্রিক বিন্যাসে মৌলিক অন্তর্নিহিত শক্তির প্রতি কথকের মমত্বের কারণ হচ্ছে যে, প্রকৃতি সব দেয়াল, বিভাজন ও সীমানা অস্বীকার করে। সে মনে করে, অন্তরে অতিলৌকিক অপরিসীম ক্ষমতা ক্রিয়াশীল বলেই প্রকৃতি সবধরণের দেয়াল বা প্রতিবন্ধকতার পরিপন্থী, অর্থাৎ Something there is that does not love a wall/That wants it down......  
বিপরীত ভাবনার দোলাচলে কবিতায় বর্ণনার ধারাবাহিকতায় হঠাৎ নাটকীয় মোড় ফেরা আমাদের কৌতুহলের উদ্রেক করে। যে কথক প্রাচীরের বাৎসরিক মেরামতের বিষয়ে নিজেই রুষ্ট সেই তিনিই আবার প্রাচীরের মেরামতের দিন ধার্য করে প্রতিবেশীকে অবহিত করেন। কথক নিজেই প্রাচীরের সেই ভাঙ্গা অংশ মেরামতের জন্য হেঁটে যান, যা বছরের কোন এক সময়ে স্থানীয় শিকারীর দল ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রাচীর মেরামত নিয়ে কথকের সন্দেহপ্রবণ মনোভাব সত্ত্বেও, মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, তার প্রতিবেশীর চেয়েও কথক অজান্তে প্রাচীর মেরামতের স্বপক্ষে প্রথা ও ঐতিহ্যের নিগড়ে বাঁধা।
কথক নিজেকে পুরনো ও সেকেলে হিসেবে অভিহিত করার স্থলে একজন আধুনিক মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করেন। কিন্তু তবুও কথক তার প্রাচীনপন্থি প্রতিবেশীর তূলনায় প্রকৃতপক্ষে কোনভাবেই পৃথক নন। তিনিও সম্পত্তি, সীমান বিভাজন, মালিকানা ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের প্রত্যয়গুলির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত।
মূলত সম্পত্তির মধ্যে প্রাচীরের উপস্থিতি দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্কের উৎকর্ষতার ভিত তৈরি করে। সম্পত্তির মধ্যে নিজ সীমানা বজায় রেখে কথক ও তার প্রতিবেশী নিজেদের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তিগত পরিচিতি টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হন। যেমন একজনের সীমানার মধ্যে আপেল গাছ ও অন্যজনের সীমানায় পাইন গাছ। মোটের ওপর বাৎসরিক প্রাচীর মেরামত দুই প্রতিবেশীর একে অন্যের মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও নিবিড় যোগাযোগ নিশ্চিত হয়। গ্রামীন বিচ্ছিন্ন পরিবেশে যা খুবই কমই ঘটে। যদি প্রত্যেকে তাদের পৃথক সম্পত্তিতে বিচ্ছিন্ন অবস্থান বজায় থাকে তাহলে বিভাজন রেখায় নির্মিত প্রাচীর মেরামতের কাজকে কেন্দ্র করে মিলিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয় যা শুধু দু’জন প্রতিবেশীই নয় বরং স্থানীয় জনসম্প্রদায়ের মধ্যেও সুসম্পর্কের উন্নতি বিধান করে।
অখন্ড জমিতে দুই প্রতিবেশীর সীমানা নির্ধারণে দেয়ালের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রগতিশীল কথক বা বক্তার নানা প্রশ্ন বা কন্ট্র্যাডিকশনই কবিতার মূল থীম। ঐতিহ্যপ্রিয় প্রতিবেশী কথকের প্রশ্নের উত্তর দেয়াটাকে প্রয়োজনীয় মনে করেন না। তিনি তার বিশ্বাসকে Good fences make good neighbours এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে ভালোবাসেন। প্রতিবেশী নিয়েই মানব সমাজের কাঠামো। আমরা সবাই জানি দেয়াল বা প্রাচীর মেরামত করা দরকার হয়। দেয়াল মানুষকে আলাদা এবং তাদের যাতায়াতের অধিকারকে অস্বীকার করলেও মানুষকে নিরাপত্তা জোগায়। যদিও কবিতার প্রথম লাইনে আমরা দেখি-কথকের মনোভাবে দেয়ালের প্রতি বিতৃষ্ণা- Something there is that does not love wall/That sends the frozen-ground-swell under it...... তবুও দেয়ালের কার্যকারিতার একটি রূপও আমরা এই কবিতায় দেখি। গোঁড়া ও অনড় মনোবৃত্তির বিপরীতে কবি ফ্রস্ট নিউ ইংল্যান্ডে সচরাচর ব্যবহৃত সংযমী রীতিতে সেখানে প্রচলিত চলতি ভাষার শৈলীতে কবি রবার্ট ফ্রস্ট রচিত এই কবিতায় গ্রামীণ সৎ জীবন-যাপন, সহিষ্ণুতা ও ভ্রাতৃত্বের দর্শন ব্যক্ত হয়েছে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

আপনার মতামত দিন

রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রাখার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে এগোচ্ছে সরকার: ফখরুল

ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ তিতাসের ৮ কর্মকর্তাকে দুদকে তলব

‘বাংলাদেশে এখনও জঙ্গি হামলার ঝুঁকি রয়েছে’

দুই পার্সেলে ২০৮ কেজি ’খাট’

দুটি আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

সাবেক তিন খেলোয়াড়কে ফ্ল্যাট দিলেন প্রধানমন্ত্রী

জনগণের বিরুদ্ধে নয়, কল্যাণে আইন করতে হবে

পুলিশের লাঠিচার্জে জোনায়েদ সাকি সহ আহত অর্ধশত (ভিডিওসহ)

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে স্বাক্ষর না করতে প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুরোধ

খালেদার অনুপস্থিতিতেই চলবে বিচার কাজ

গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে ফেলতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন : রিজভী

চাপ, হুমকির মুখে দেশ ত্যাগ করেছি (ভিডিওসহ)

বন্দরে বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার

এসকে সিনহা মনগড়া কথা বলছেন

সরকারি কর্মকর্তাদের বিমানের ফ্লাইটে যাতায়াত বাধ্যতামূলক

‘প্রকাশের আগে ভাবিনি এত সাড়া মিলবে’