বিচিত্রিতা

ইরানি চলচ্চিত্রের দুনিয়া

ঈদ আনন্দ ২০১৮

জোসেফ মেহেদী | ২৯ জুন ২০১৮, শুক্রবার
এক অন্যরকম সকাল। গ্রীষ্মের এই দাবদাহের মধ্যে যখন ঘুম ভাঙে বৃষ্টির শব্দে তখন সকালটা সুন্দর না হয়ে তো উপায় নেই। কিন্তু আমার মন পড়ে আছে বৃষ্টিস্নাত ইরানের দিনগুলোতে। ১৬ই এপ্রিল থেকে ২৪শে এপ্রিল আমার অবস্থান করার সুযোগ হয়েছিল দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার পারস্য উপসাগরের তীরে অবস্থিত অন্যতম মুসলিম রাষ্ট্র ইরানে।
ইরান হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম পর্বতময় দেশগুলোর একটি। এশিয়া মহাদেশের সর্বোচ্চ আগ্নেয়গিরি এবং এলবুর্জ পর্বমালার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ দামভান্দ ইরানের রাজধানী তেহরানেই অবস্থিত। পারস্য উপসাগরের অন্যান্য তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর মতো ইরানেও তেল রপ্তানি বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে তাদের মূল চালিকাশক্তি। দেশটির জনগণ জাতিগত ও ভাষাগতভাবে বিচিত্র হলেও সকলেই মুসলিম (৯৮%)। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি শিয়া মতাবলম্বীদের মূলকেন্দ্র।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে প্রায় পাঁচশো বছরের রাজতন্ত্রের ইতি ঘটে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়।
সংস্কৃতির অন্যতম বাহক হিসেবে যেকোনো দেশের ভাষা, সংগীত, স্থাপত্য ও পোশাক ইতিবাচক প্রভাব রাখলেও ইরানি সংস্কৃতির অন্যতম বাহক হচ্ছে চলচ্চিত্র। আব্বাস কিয়েরোস্তামির- ‘টেস্ট অব চেরি’, ‘হয়্যার ইজ মাই ফ্রেন্ডস হোম’, ‘দ্যা হোয়াইট বেলুন’। মাজিদ মাজিদির ‘চিলড্রেন অব হ্যাভেন’, ‘দ্যা কালার অব প্যারাডাইস’, ‘মুহম্মদ দ্যা ম্যাসেঞ্জার। আসগার ফারহাদির-‘দ্য সেলসম্যান’ ‘অ্যা সেপারেশন’সহ গুণী নির্মাতাদের চলচ্চিত্র ইরানের সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে নিয়ে গেছে এক অন্য উচ্চতায়।
সেই চলচ্চিত্রের দেশ ইরানেই বসেছিল-‘৩৬তম ফজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব।’ এপ্রিলের ১৯ তারিখ সন্ধ্যায় মাজিদ মাজিদি ভারতের জন্য নির্মিত নতুন চলচ্চিত্র ‘বিয়ন্ড দি ক্লাউড’ দিয়ে শুরু হয় উৎসব। ১৯৮২ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করে FIFF। FIFF -এর ৩৬তম অধিবেশনকে রঙিন করে তোলেন অস্কার বিজয়ী যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালক অলিভার স্টোন। তার উপস্থিতি দুই দেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যেও সাংস্কৃতিক সম্পর্কে নতুন দিগন্তের সূচনা করে। উদ্বোধনীতে আরো উপস্থিত ছিলেন ইতালির বিখ্যাত সুরকার নিকোল পিওভানি, ফিলিস্তিনের চলচ্চিত্র পরিচালক রাশিদ মাশরাভি, জার্মান চিত্রগ্রাহক ও প্রযোজক থমাস মাউচ। ইরানি চলচ্চিত্রের অন্যতম নক্ষত্র মাজিদ মাজিদি ছাড়াও ইরানের বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মাতা, গল্পকার, অভিনয়, শিল্পীসহ উৎসবের প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত চূড়ান্ত ১৫টি চলচ্চিত্রের নির্মাতাগণও।
বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বা বড় যে সকল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অনুষ্ঠিত হয় এতে একটি বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে ট্যালেন্ট ক্যাম্পাস। যেখানে সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীদের আহ্বান করা হয়। বিচারকের পছন্দে সীমিতসংখ্যক নতুন নির্মাতাদের একটি দল কর্মশালায় অংশগ্রহণের জন্য উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে থাকেন।
৩৬তম ফজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও এই ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক হাজার নতুন চলচ্চিত্র নির্মাতার মধ্যে থেকে ৫৫ জনকে ইরানের তেহরানে চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের সঙ্গে সাত দিনের কর্মশালার জন্য নির্বাচন করা হয়। ফজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এই ৩৬তম অধিবেশনের ট্যালেন্ট ক্যাম্পাস প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ থেকে আমি এবং মাহাদী মুনতাসির নির্বাচিত হই। এর আগে ৩৫তম অধিবেশনেও বাংলাদেশ থেকে একজন নির্মাতা এই ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসে অংশ নিয়েছিল।
ফজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এই ৩৬তম অধিবেশন সাত দিনের কর্মশালায় ১৪ জন ফিল্ম স্কলার শিক্ষাদানের পাশাপাশি তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এবারের আসরে বিভিন্ন দেশ থেকে নির্বাচিত ৫৫ জন নতুন চলচ্চিত্র নির্মাতার সঙ্গে ৫৫ জন ইরানি নতুন নির্মাতাদেরকেও কর্মশালায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। FIFF -এর এই আসরে অংশগ্রহণের জন্য মনোনীত আমরা বাংলাদেশি দু’জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, ফিল্ম এন্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। আর আমাদের অংশ নেয়ার পেছনে যে মানুষটির অবদান অনস্বীকার্য তিনি হচ্ছেন প্রিয় শিক্ষক হায়দার রিজভী। স্যারের উৎসাহ, সহযোগিতার জন্যই ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসে অংশগ্রহণের জন্য মনোনীত হই।
আমি একদশক বাংলাদেশের মিডিয়ায় কাজ করছি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সহকর্মী জুয়েল ভাইয়ের পরামর্শে ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টেলিভিশন, ফিল্ম এন্ড ফটোগ্রাফি বিভাগে ভর্তি না হলে হয়তো চলচ্চিত্রের এমন জৌলুসের সঙ্গে কখনই সম্পৃক্ত হওয়া হতো না।
নতুন দেশ, শহর, জাতি, পরিবেশ, সংস্কৃতি মানেই হচ্ছে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের হাতছানি।
বিশেষ করে যেখানে এমন সুযোগ পাওয়াটা ভাগ্যের বিষয় সেখানে সুযোগটা পেয়েও যেন হারাতে বসেছিলাম। আর্থিক অসঙ্গতি এবং কর্মক্ষেত্র থেকে টানা১০ দিনের ছুটির অনিশ্চয়তা রোমাঞ্চকর এই ভ্রমণ থেকে আমাকে পিছু টানছিল। কিন্তু শেষমেশ সম্মানিত শিক্ষক, সহকর্মী ও পরিবারের সহযোগিতায় ইরানে যেতে পেরেছি। প্রতিকূলতা সত্বেও আমার সিদ্ধান্তটি যে শতভাগ সঠিক ছিল তা ইরানে সফল (বিশেষ করে বড় ভাই সাহিল রনির বিশেষ সহযোগিতায়) ভ্রমণ শেষে বুঝতে পারি। কিন্তু ওই সময়ে মাত্র তিন দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় কার্যাবলি বিশেষ করে দু’দিনে ভিসা প্রক্রিয়া শেষ করা ছিল লড়াই। তবে বর্তমানে ইরানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আমার ইরানে ভ্রমণ নিয়ে সহকর্মী ও পরিবারের অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি ইমিগ্রেশনে পৌঁছালে বাংলাদেশ পুলিশের কর্মরত কর্মকর্তারাও সন্দেহ প্রকাশ করেন। প্রায় ২০ মিনিটি তারা সকল কাগজপত্রাদি যাচাই-বাছাই করে বিমানে ওঠার ছাড়পত্র দেন।
এর পূর্বে দু’বার বিদেশে যাওয়ার সুযোগ হলেও দুঃখজনকভাবে একবারও বিমানে চড়ার সুযোগ হয়নি। এ জন্য প্রথমবারের মতো বিমানে চড়ার জন্য উত্তেজনার কোনো কমতি ছিল না। বারবার স্মৃতির পাতায় ফিরে যাচ্ছিলাম সেই ছোট্ট বয়সে। যখন মাথার উপর দিয়ে বোঁ বোঁ শব্দে উড়ে যেতো বিমানগুলো। তখন ভাবতাম আমিও বড় হয়ে, বিমান চালাবো। যদিও জীবনের বাস্তবতায় পাইলট হতে পারিনি ঠিকই তবে আকাশে উড়ার স্বপ্নটা পূরণ হয়েছে।
সব ধোঁয়াশাকে পেছনে ফেলে ১৫ই এপ্রিল সন্ধ্যা ৭.৪০ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ই-আর ফ্লাইট-এ ৫৮৭-তে চড়ে দুবাই এর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম।
যথাসময়েই বিমান যাত্রা শুরু করলো। পূর্ব পরিকল্পনানুসারে জানালার পাশে সিট নেয়ার পরও তেমন কিছু দেখতে পারলাম না কারণ রাতের আকাশ। এই বিমানে করে দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা যাত্রা শেষে আমরা দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামবো। কারণ বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইরানের কোন ফ্লাইট নেই। তাই দুবাই বিমানবন্দরে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছার তিন ঘণ্টা পর কানেক্টিং ফ্লাইট এমিরেটস এয়ারলাইন্স ইকে-৯৭৫ ধরে যেতে হবে ইরানে।
ইতিমধ্যে আমাদের বিমান প্রায় ৪ ঘণ্টার পথ অতিক্রম করেছে। যখন বিমানের গতিবেগ ৬০০ কি. মি./প্রতি ঘণ্টায় তখন পাইলট সতর্ক বার্তা জানালো যে আমরা এখন ভূমধ্যসাগরের উপরে অবস্থান করছি। এটা জানার পর মনের মধ্যে খুব আগ্রহ কাজ করছিল যে যদি এই ৩৫,০০০ ফিট উপর থেকে সাগরের দৃশ্য দেখতে পেতাম কতই না ভালো লাগতো। সেই ভাবনা ভাবতেই কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পরই বিমানের স্বাভাবিক যাত্রার যেন ছন্দ পতন ঘটে। হঠাৎ বিমান যেন তার সঠিক নির্দেশনা মেনে চলছে না। যাত্রীরা সকলেই নড়েচড়ে বসে। সেই মুহূর্তে পাইলটের সতর্কবার্তা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার জন্য বিমানের রুট পরিবর্তন করা হচ্ছে এবং সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে। প্রতিকূল অবস্থা থেকে প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যেই পাইলট বিমানকে স্বাভাবিক পথে নিতে সক্ষম হন। আর বিকল্প পথ অনুসরণের জন্য আমাদের বিমান নির্দিষ্ট সময়ের থেকে প্রায় ৩০ মি. বেশি সময় নিয়ে যখন দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে অবস্থান করছে তখন পাইলট জানিয়ে দিলেন যে আমরা আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা অবতরণ করবো। কিছুক্ষণ পর বিমানটি সফলভাবে অবতরণও করলেও আর আমার চোখ যেন তখন কপালে উঠে গেছে। দুবাই নেমে এতগুলো বোয়িং বিমান একসঙ্গে দেখতে পারবো সেটা ভাবতেই পারিনি। এতগুলো বিমান একসঙ্গে দেখে ৬ ঘণ্টার ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তেই উবে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে এটাও স্মরণ হলো যে, আমি এখন বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম বিমানবন্দরে অবস্থান করছি। জীবনের প্রথম বিমান ভ্রমণেই যে এতগুলো অবাক বিষ্ময় অপেক্ষা করছে তা কল্পনাতেও ছিল না। আমরা যখন দুবাই বিমানবন্দরে পৌঁছি তখন স্থানীয় সময় রাত ১১টা। আর আমাদের পরবর্তী ফ্লাইট তিন ঘণ্টা বিরতি দিয়ে রাত দু’টায়। এই তিনঘণ্টা কিভাবে অতিবাহিত করবো তা দু’জন আলোচনা করতেই আগে সিদ্ধান্ত নিলাম এশার নামাজ আদায় করি। নামাজ শেষে আমরা দুবাই বিমানবন্দরে শপিংমল ঘুরে দেখা শুরু করলাম। দীর্ঘ সময় যখন শপিংমল ঘুরতে ঘুরতে আমাদের মূল গন্তব্য ইরানের কানেক্টিং ফ্লাইটের ইমিগ্রেশন ২৪নং কাউন্টারের সামনে পৌঁছে যাই। অবশ্য তখনও হাতে ১ ঘণ্টা বাকি ফ্লাইটের। অপেক্ষার পালা শেষে এবার আমরা দুবাই থেকে ইরানের পথে রওনা হলাম। এবারও আমরা এমিরেটস-এর বিমানে করেই রওনা হলাম। মাত্র দেড় ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাই ইরানের ইমাম খোমেনী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
আব্বাস কিয়েরোস্তামির দেশে যখন আমরা অবতরণ করলাম তখন ঘড়িতে রাত ৩টা ৪০ মিনিট। যেহেতু যাত্রী সংখ্যা অনেক কম তাই ইমিগ্রেশনের লাইনও তেমন দীর্ঘ না। কিন্তু ইরান পৌঁছালেও সব থেকে বড় যে সমস্যা আমাদের সামনে হাজির হলো ইমিগ্রেশন শেষে আমরা কোথায় অবস্থান করবো। এই মধ্যরাতে নতুন দেশ, নতুন শহরে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ইন্টারনেটের খুব অভাব বোধ করছিলাম। কারণ আমাদের কাছে ফজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পক্ষ থেকে যে হোটেলের ঠিকানা দেয়া হয়েছে সেখানে পৌঁছানোর জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এই নিয়ে দু’জন ভাবনা চিন্তা করতেই ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হয়ে গেল। একটা ভিন্ন ঘটনা ঘটলো আমাদের ইমিগ্রেশনের কিছু আগেই। একটি মেয়ে, বয়স ২৪-২৫ হবে। পোশাক দেখে ওয়েস্টার্ন বলা যেতে পারে। সে যখন ইমিগ্রেশনের জন্য অফিসারের সঙ্গে কথা বলছিল তখন কর্তব্যরত ইরানের পুলিশ তাকে তার পোশাক পরিবর্তনের জন্য বলে। অন্যথায় তাকে ইরানে প্রবেশ করতে দেবে না। কিন্তু মেয়েটি নাছোড়বান্দা। সে তার পোশাক পরিবর্তন করে মাথায় কাপড় দিয়ে ইমিগ্রেশন পার হতে রাজি নয়। আমরা যখন ইমিগ্রেশন শেষ করছিলাম মেয়েটি তখনও তার সিদ্ধান্তে অটল থেকে পাশে বসা চেয়ারে বসে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষা করছিল। শেষ পর্যন্ত মেয়েটির ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে পেরেছে কিনা তা আর জানার সুযোগ হয়নি। তবে এটা শেয়ার করার কারণ আগ থেকেই জানতাম ইরান একটি মুসলিম দেশ। কিন্তু কতোটা কট্টোরপন্থি তা ইরানে প্রবেশের সময়ই কিছুই ধারণা পেয়ে যাই। লাগেজ সংগ্রহের জন্য অগ্রসর হতেই আমাদের অবাক করে দিয়ে দুই তরুণ আমাদের জিজ্ঞাসা করলো Are Yor come for FIFFÑTelent Campus?  কথাটা শুনে পাশ ফিরে তাকাতেই তাদের পোশাক আর পরিচয়পত্র দেখে বুঝতে বাকি রইলো না যে ফ্যাস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষ তাদের পাঠিয়েছে। তারা দু’জন মিলে আমাদের লাগেজ সংগ্রহ করতে সহযোগিতা করলেন এবং আমাদেরকে নিয়ে হোটেলের পথে পা বাড়ালেন। এবার যখন এয়ারপোর্ট পেরিয়ে রাস্তায় পা বাড়ালাম, কিছুক্ষণের মধ্যেই আবিষ্কার করলাম আমার হাত যেন শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেছে। আমরা যখন বিমানে ছিলাম এবং বিমানবন্দরের তাপমাত্রা প্রায় একই ছিল। মনে হয় ২২ক্ক/২৫ক্ক কিন্তু দরজার এপাশে ইরানের ভূখণ্ডে তখন নিম্নচাপ সঙ্গে ঝুমবৃষ্টি। তাপমাত্রা ৪ক্ক/৫ক্ক। অথচ আমার গায়ে শুধুমাত্র টিশার্ট। যা হোক কোন মতে সহ্য করলাম। এর মধ্যেই তারা দ্রুত একটি ট্যাক্সি নিয়ে এলো। আমাদের বললো গাড়িতে বসতে। এর মধ্যেই সুঠামদেহী ৩০/৩১ বছর বয়সী একজন স্মার্ট যুবক আমাদের লাগেজ ট্যাক্সির পেছনে তুলে দিল। তখন বুঝলাম যে তিনিই ট্যাক্সি চালক। কিন্তু তাকে দেখে মনে হলো একজন প্রতিষ্ঠিত মডেল বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় কোন কর্মকর্তা হবেন। যা হোক উৎসব কমিটির দু’জনের কেউই আমাদের সঙ্গে হোটেলে যাবেন না। তারা এখানেই অপেক্ষা করবেন পরবর্তী যে আসছেন তাকে স্বাগত জানানোর জন্য। ফলে তাদেরকে বিদায় জানিয়ে চালক আমাদের নিয়ে ছুটলেন হোটেলের পানে। রাতের ইরান যেন ঘুমাচ্ছে শুধু রাস্তার দু’পাশে রঙিন নিয়ন আলো হেসে-হেসে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। প্রশস্ত রাস্তা তার মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে। ইরানের ও প্রশস্ত আর ফাঁকা রাস্তা দেখে নিজেদের ঢাকা শহরের যানজটের কথা মনে হচ্ছিল। কিছুদূর এগুনোর পর চালককে জিজ্ঞাসা করলাম হোটেল পৌঁছাতে কত দেরি? তিনি জানিয়ে দিলেন তিনি ইংরেজি তেমন বুঝেন না, অপরদিকে আমরা দু’জনের কেউই ফারসি বুঝি না। ফলে কয়েকবার কিছু বিষয়ে জানতে চেয়েও অগত্য গাড়িতে বসে বসে ইরানের রাতের দৃশ্য অবলোকন করা ছাড়া আমাদের গত্যন্তর ছিল না।
আমরা একটু অস্বস্থিতেও পড়ে গিয়েছিলাম। কারণ এমনিতেই আমরা নতুন। তার মধ্যে ড্রাইভারও আমাদের সঙ্গে কথা বলছেন না নিজের ইংরেজি না পারার অজুহাতে। বৃষ্টি আবার হানা দিল। আমি এবার লোভ সামলাতে পারলাম না। গাড়ির গ্লাসটা নামিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে এখানে এখন নিম্নচাপ চলছে। ফলে ঠাণ্ডায় সিক্ত হয়ে দ্রুত গ্লাস তুলে দিলাম। প্রায় ১ ঘণ্টার যাত্রা শেষে আমাদের গন্তব্যস্থল হোটেল পারশিয়ায় পৌঁছালাম। লবিতে ঢুকতেই ঘড়িতে চোখ পড়লো তখন ভোর ৪টা ৫০ মিনিট। দায়িত্বরত হোটেল ম্যানেজার এগিয়ে এসে স্বাগত জানালেন লবিতেই। হোটেলের একটি কোণে একটা টেবিলে দুটো প্রদর্শনীর ব্যানারসহ একজন যুবক বসেছিলেন। তিনিও এগিয়ে এলেন। বাংলাদেশ থেকে এসেছি কিনা জানতে চাইলেন। বুঝলাম আমাদের অপেক্ষায় ছিলেন। হোটেল বয়কে ডেকে লাগেজগুলো রুমে পাঠিয়ে দিলেন আর বললেন, পাসপোর্ট জমা দিতে এবং হোটেল বুকে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে। সব প্রক্রিয়া শেষ হলে আমাদের রুমে গিয়ে আরাম করতে বললেন আর জানিয়ে দিলেন হোটেল-এর নিচ তলায় রেস্তোঁরা রয়েছে। নাস্তার সময় সকাল ৭টা থেকে ৯টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। দ্বিতীয়তলার ২৩১নং রুমে আমাদের দু’জনের জন্য থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা রুমে পৌঁছে দেখি তখন ঘড়িতে ৫টা ১০ মিনিট। প্রথমেই আমরা দুজন ফ্রেস হয়ে ফজরের নামাজ আদায় করলাম। দুইজন পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে নাস্তা করেই ঘুমাবো। যেহেতু খুব একটা ক্লান্তি বোধ করছি না তাই দুইজনে মনে করলাম বাইরে একটু হেঁটে আসি। যেহেতু আমাদের কর্মশালা শুরু হবে একদিন পর ১৭ই এপ্রিল থেকে সেহেতু আজ পুরো দিনটটি আমরা ফাঁকা। তাই এই দিনটা সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে চাই। কারণ কর্মশালা শুরু হবে প্রতিদিন সকাল ১০টায় চলবে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। যদিও ইরানে সন্ধ্যা হতে হতে ৭টা ৪০ মিনিট।
যেই ভাবনা সেই কাজ। পোষাক বদল করে আমরা সকালের তেহরান উপভোগ করতে অগ্রসর হলাম কিন্তু আবহাওয়া আমাদের অনুকূলে ছিল না। তখনও বৃষ্টি ঝরছে। যার জন্য আর ঘুরে দেখা হলো না। আমরা রুমে না ফিরে হোটেল লবিতেই অপেক্ষা করলাম। কারণ আর ৪০ মিনিট পরই আমরা নাস্তা করতে পারবো। আমাদের অপেক্ষা দেখে হোটেল ম্যানেজার খবর নিয়ে জানালেন যে নাস্তা প্রায় প্রস্তুত। ১০ মিনিট পরই নাস্তা করার জন্য আমন্ত্রণ জানালো। ইরানের খাবার তালিকা সত্যিই আলাদা। ইরানের খাবারে মশলার পরিমাণ খুবই কম। তারা মরিচ খায় না বললেই চলে। ইরানে অবস্থানের নয় দিনে আমরা যতটা সম্ভব ইরানি প্রচলিত খাবারগুলো চেকে দেখার চেষ্টা করেছি। প্রথম দিন সকালেই কিছুটা অস্বস্তিবোধ করি বিকল্প ধরণের খাবার দিয়ে নাস্তা করতে। তাদের সকালের খাবার তালিকার অন্যতম হচ্ছে-বিশেষ ধরনের রুটি যা দেখতে অনেকটা আমাদের দেশে প্রচলিত তন্দুর রুটির মতো হলেও তাদের রুটি যথেষ্ট শক্ত। স্বাদেও আলাদা এবং এই রুটি সব সময় ঠাণ্ডা পরিবেশন করা হয়। যার সঙ্গে দেয়া হয় বাটার, পনির, অমলেট, স্ম্যাশ এগ (যা টমেটো ও ডিমের সমন্বয়ে তৈরি খাবার), দুধ, ফলের জুস, টমেটো, শশা, খেজুর ও এক ধরনের সীমের বিচি সেদ্ধ অন্যতম। তবে বর্তমানে তেহরানে আধুনিক রেস্তোঁরাগুলো নানা জাতীয় খাবারের জন্য সুপরিচিত। সেগুলোতে ইরানের ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের খাবারও পাওয়া যায়।
ইরানের অন্যতম বা ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চেলো কাবাব, গোরমে সবজি, গেইমেহ, জোর্জে চিকেন কাবাব, চেলো মোর্গ, কোপ্তে তাবরিজি অন্যতম। ইরানে ৯ দিনে চেষ্টা করেছি এই সবগুলো খাবারের সাথে আরও জনপ্রিয় যেগুলো খাবার রয়েছে তা খেয়ে দেখা। যদিও কোন কোন খাবার খাওয়া ছিল কিছুটা অস্বস্তির। আমার সহযাত্রী মুনতাসির ভাই তো তিন দিন কষ্ট করে খেলেও পরের দিনগুলো শুধুমাত্র বিভিন্ন ধরনের পিৎজা দিয়ে তার পেট ভরিয়েছেন। যদিও চিকেন পিৎজা ছাড়া অন্যগুলোও তিনি তেমন পছন্দ করেননি। এটা আসলেই আমাদের বাঙালিদের জন্য যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। লবণ কম, ঝালবিহীন, স্বল্প মশলা দিয়ে তৃপ্তি করে খাবার খাওয়া হোক তা গরু, খাসি বা ভেড়ার মাংসের কাবাব বা গ্রিল।

ইরানে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে আবহাওয়া। আমি বরাবরই শীত ও বর্ষা ঋতু পছন্দ করি। বাংলাদেশে ষড়ঋতু হলেও ইরানে ৪টি ঋতু। আর সবচেয়ে মজার বিষয় একই সময়ে তেহরানের একদিকে যদি তাপমাত্রা ৩৫ক্ক-৩৮ক্ক ঠিক একই সময় তেহরানেরই অন্য প্রান্তে ২ক্ক-৩ক্ক। এমনকি কখনও তাপমাত্রা -১০ক্ক তেও নেমে যায়। আমরা যে কয়দিন তেহরানে অবস্থান করেছি প্রথম দিন তাপমাত্রা ৪ক্ক/৫ক্ক থাকলেও ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে আমরা ফিরে আসার দিন তাপমাত্রা ছিল ১৮ক্ক।
ইরানের অন্যান্য শহরের তুলনায় তেহরান অধিক প্রাচীন। এই নগরীর রয়েছে নিজস্ব কিছু কৃষ্টি। এখানে একদিকে যেমন পর্বতের সমারোহ, অন্যদিকে সমতল। একদিকে যেমন শহুরে ব্যস্ততা, অন্যদিকে রয়েছে পার্কগুলোতে নিরিবিলি পরিবেশে বেড়ানোর সুযোগ। বর্তমানে তেহরান একটি জনবহুল নগরী হলেও এর একদিকে যেমন রয়েছে প্রাচীন ভবন, অন্যদিকে নতুন নতুন স্থাপনা। তেহরানের সুউচ্চতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আযাদী টাওয়ার। যেটি পারস্য শাসনের ২৫০০ বছরপূর্তি উপলক্ষে নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে বেশ কিছু বছর আগে তেহরানে ‘মিলাদ টাওয়ার’ নামে একটি স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে যা বর্তমানে তেহরান তথা ইরানের সর্বোচ্চ টাওয়ার। এটি বিশ্বের ৬ষ্ঠ সুউচ্চ টাওয়ার। এতে রয়েছে অনেক রেস্তোঁরা, পাঁচতারকা হোটেল, কনভেনশন সেন্টার, বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র ও আইটি সেন্টার। এই টাওয়ারে সংস্থাপন করা হয়েছে বিশ্বের দ্রুতগামী লিফট যা মিনিটের মধ্যেই আপনাকে পৌঁছে দেবে এই টাওয়ারের শীর্ষে। মিলাদ টাওয়ারের পাশাপাশি উৎসব কর্তৃপক্ষ আমাদের সকলকে ইরানের ন্যাশনাল মিউজিয়ামেও নিয়ে যায়। যেখানে রয়েছে ইরানের ইতিহাসের সাক্ষী স্বরূপ অনেক শিল্পকর্ম ও দৈনন্দিন ব্যবহারের আসবাবের অংশ বিশেষ। যেগুলো ইরানের প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী। এছাড়াও তেহরানে রয়েছে- তেহরান সিটি থিয়েটার, মিল্লাত পার্ক, ওয়াটার এন্ড ফায়ার পার্ক, সালাম হল, নওরোজ পার্কের আবারশাম ব্রিজ, ময়দানে মাস্‌গ, জামশীদে মাউনটেন পার্ক, প্লাসওয়ার ও সিরামিক মিউজিয়াম, লা’লেহ পার্কে বেরোনিয়াসের ভাস্কর্য, ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষিত গোলেস্তান প্যালেস, হোয়াইট হাউজ। এছাড়া রয়েছে-নিয়াভারান কমপ্লেক্স, তাজরীসের ফেরদৌস গার্ডেন, আগা স্কয়ার, বাহারেস্তান স্কয়ার, হাসান আবাদ স্কয়ার, ইমাম জোমে হাউজ, মারমার প্যালেস অন্যতম। আর জাদুঘরের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-কনটেম্পোরারি আর্ট মিউজিয়াম, কার্পেট মিউজিয়াম, এলাহী গ্যালারি, টাইম মিউজিয়াম, মানি মিউজিয়াম, ন্যাশনাল আর্ট মিউজিয়াম।
এবার আসি ট্যালেন্ট ক্যাম্পাস প্রসঙ্গে-আমরা যে ৫৫ জন আন্তর্জাতিক নতুন নির্মাতা ৩৬তম ফজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণকারী ছিল ইতালি থেকে। ইতালি থেকে সাত জন এই কর্মশালায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। তাদের মধ্যে বিশেষ একজন বন্ধুর কথা ভুলবো না। কারণ তার স্বভাব এবং তার সঙ্গে দ্বিতীয় দিনে যৌথভাবে স্ক্রিপ্ট তৈরির বিষয়গুলো। স্বভাব বলতে আমি আমার এই ২৮ বছরের জীবনে অনেক বন্ধু বা পরিচিতদের পেয়েছি যাদের দাঁত দিয়ে নখ কাটার অভ্যাস আছে। কিন্তু এই ইতালীয় বন্ধু জুলিয়া ছিল সবাইকে ছাপিয়ে। আমরা দু’জনে এক গ্রুপে যখন গল্প তৈরির জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি ততক্ষণে আমাদের দু’জনের বোঝাপড়াও হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর যখন ওর হাতের নখের দিকে দৃষ্টি যায় কেমন যেন অসংগতি লক্ষ্য করি। তখন ভালো করে অবলোকন করে দেখি ওর দু’হাতের ১০টা নখের কোনটার বিশ ভাগ চাড়াও অবশিষ্ট নেই। সব সে দাঁত দিয়ে কেটেছে। ওকে এই বিষয়ে বলায় কিছুটা লজ্জায় পড়ে গিয়ে বলল আসলে এটা ছোটবেলার অভ্যাস এতদিন ছাড়তে পারিনি, হয়তো পারবেও না। ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের বিদায় ঘণ্টায় সব থেকে বেশি কষ্টটাও মনে হয় সে-ই পেয়েছিল। আর ওই ছিল সবচেয়ে চঞ্চল। আরো কয়েকজন বন্ধুকে স্মরণ না করলেই নয়, তাদের মধ্যে জার্মানির বন্ধু মার্কো। স্মার্ট, লম্বা, হিরো হিরো ছেলেটার মুখে যেন হাসির কোনো শেষ নেই। আমার আর মুনতাসিরের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যেই বন্ধুটা সময় দেয় সে মার্কো। আমার অনেক ছবিও ওরই তুলে দেয়া। ভবিষ্যতে আমাদের দেশেও একটি সাম্প্রতিক ইস্যু নিয়ে কাজ করার জন্য আসার কথা মার্কোর। ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের অভিজ্ঞতা FIFF দিয়েই শুরু হলেও মার্কোর এটি সপ্তম ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসে অংশগ্রহণ। ওর মতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্যালেন্ট ক্যাম্পাস হচ্ছে বার্লিন ট্যালেন্ট ক্যাম্পাস। সেখানেও এতটা গোছানো না যতটা ফজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব।
ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের ১১০ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে হয়তো ভবিষ্যতে অনেকেই ভালো ছবি নির্মাণ করবেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে ট্যালেন্ট বিষয়টা কি সেটা হয়তো বুঝতামই না যদি না ইরানের মেয়ে মোজহেদা আর নরওয়ের হ্যাম্পাসের সাক্ষাৎ পেতাম। যে কোনো চলচ্চিত্রপ্রেমীর পক্ষে নিশ্চয় প্রতিদিন ৫-৬টা চলচ্চিত্র দেখা এবং যা প্রায় মুখস্থ করে ফেলা অসম্ভব। কিন্তু মোজহেদার চলচ্চিত্রের প্রতি একনিষ্ঠতায় মুগ্ধ হয়েছি। অন্যদিকে নিজেকে এ বয়সেই যেন বোদ্ধার পর্যায়ে নিয়ে গেছে হ্যাম্পাস। নেদারল্যান্ডসের বন্ধু হ্যাতির কথাও বলা দরকার। একদম শান্ত মেয়েটা যে এত দ্রুত হাঁটতে পারে তা ওর সঙ্গে ঘুরতে না বের হলে বুঝতাম না। এই মেয়েটার সর্বপ্রথম ১৬ তারিখে গ্রুপ ম্যাসেঞ্জারে মেসেজ করে ঘুরতে বের হবার জন্য। ওর ডাকে সাড়া দিয়ে আমি ও মুনতাসির এগিয়ে গেলে হ্যাম্পাসকে পেয়ে যাই। মোটামুটি এই চারজনই আমরা প্রথম তিন দিন খুব বেশি একসঙ্গে চলাচল করি। সেটা ক্লাস থেকে শুরু করে ঘোরাঘুরি বা খাবার খাওয়ার সময় পর্যন্ত। দিন যায় আমাদের সখ্যতা বাড়ে, বন্ধু সংখ্যাও বাড়ে। যদিও তুলনামূলকভাবে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া সবার সঙ্গে কথা হয়নি। ইরানের ছেলে সাইহানের বন্ধুসুলভ আচরণের কথা ভোলার সুযোগ নেই। সেই সঙ্গে ইরাকি বন্ধু মোহাম্মদকেও। নাম ধরে বলতে গেলে অনেকের কথাই বলতে হবে। তবে দু’জন বন্ধুর কথা না বললে অনেক কিছুই বাদ পরে যাবে। তারা আমাদের রুমমেট ইরানের বন্ধু মাহদী ও মঈন। নয় দিনের ইরান জীবনে প্রথম তিন দিন আমাদের পাশের রুমে কেউই ছিল না। আহ্‌ বলতেই ভুলে গেছি অন্য রুমগুলো শুধুমাত্র দু’জন করে থাকার ব্যবস্থা হলেও আমাদের রুমটা অনেকটা ছোট ফ্ল্যাটের মতো ছিল। দুটো ছোট ছোট রুমের মাঝে একটা ড্রইং রুম ছিল। তিন দিন অতিবাহিত করার পর তারা দু’জনে আমাদের পাশের রুমে যোগ দেয়। মঈন একজন গুণী বাদ্যযন্ত্রী। যদিও ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসে সে এসেছে একজন নির্মাতা হিসেবেই। তবে নির্মাণ থেকে সঙ্গীতই তাকে বেশি টানে। পরবর্তী ৬ দিন প্রতি রাতেই আমরা ঘুমানোর আগে তার তারের শব্দে বিমোহিত হতাম। তার হচ্ছে এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র দেখতে অনেকটা দোতারার মত। অপরজন মাহাদী। ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসে পাওয়া কাছের বন্ধু। যার আতিথেয়তায় মধ্যরাতে নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাদের নিয়ে গিয়েছিল তেহরানের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ে। সেখানে আমরা পৌঁছি রাত দেড়টায়। কিন্তু সেখানের পরিবেশ দেখে মনে হয়েছিল হয়তো সন্ধ্যা। কর্মশালার এত ক্লাসের চাপ থাকলেও নয় দিনেও যেন আমরা তেহরানের তেমন কিছুই দেখতে পারিনি। মনে হয় আবার যদি যেতে পারি তেহরানে তাহলে শত ব্যস্ততার মধ্যেও দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে ভুলবো না। মজার কথা হচ্ছে রাতে আমাদের সঙ্গে পাহাড় দেখতে যাবার জন্য আমাদের আরেকজন বন্ধু আলজেরিয়ার সালিমা যোগ দিতে চেয়েছিল। সুন্দর লম্বা মিষ্টি মেয়েটা ঐ মধ্যরাতে আমাদের সঙ্গে রাতের তেহরান দেখার পরে জন্য বের হলেও গাড়িতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় নিজ থেকে পিছু হটে। পরে রাগ করে এক দিন আমাদের সঙ্গে কথা বলেনি। এখন অবশ্য এই মেয়েটার সঙ্গেই বেশি যোগাযোগ হয়। তবে সবার মধ্যেও যার কথা বলা সবচেয়ে জরুরি সে হচ্ছে  FIFF-এর কর্মকর্তা মারিয়াম। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দায়িত্ব পালন করে আসছেন গত দু’বছর ধরে। ফলে আমাদের সঙ্গে এই সুদর্শন মারিয়ামের সখ্যতা ছিল সবচেয়ে বেশি।
বন্ধুদের কথা বলতে থাকলে শেষ করা কঠিন হবে। কারণ তেহরানে ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের প্রায় সবার সঙ্গে রয়ে গেছে মিষ্টি কিছু সুখস্মৃতি যা বয়ে নিয়েই ফিরে এসেছি। এবার যেটা বলতে চাই তা হল ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের অভিজ্ঞতা। এটা সত্যিই কল্পনার মতো যা আপনি শুধু স্বপ্নেই ভাবতে পারেন যে- বিশ্বের এক প্রান্তে বসে যেই নির্মাতার চলচ্চিত্র আপনি অনুরোধ করেন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ছবি তোলা, কথা বলা তাও কিনা সেটা তারই দেশে গিয়ে এটা যেন স্বপ্নের বাস্তবায়ন।
আমাদের প্রথম দিনের ক্লাস শুরু করেন ইরানের অন্যতম চিত্রনাট্যকার নাগমে সিমিনি। দ্বিতীয় দিনও সম্পূর্ণ দিন চিত্রনাট্যের উপরই ক্লাস নেন আরেক সফল চিত্রনাট্যকার মেহরান কাশানি। তিনি মাজিদ মাজিদির ও আব্বাস কিয়েরোস্তামির সঙ্গেও কাজের সুযোগ পেয়েছেন। তিনি কিয়েরোস্তামির সঙ্গে তার চলচ্চিত্রে সহযোগী হিসেবেও কাজ করেছেন এবং তার চিত্রনাট্যে অনেক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তবে শিক্ষকের মধ্যে বেশি ভালো লেগেছিল নাদের তালেবজাদের ক্লাস। তিনিও ইরানের বর্তমান সময়ের অন্যতম একজন পরিচালক। তিনি সুন্দর করে আমাদের কাছে তুলে ধরেন একজন সফল পরিচালকের করণীয়। ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের যে বিষয়টি খুব বেশি ভালো লাগতো সেটা হচ্ছে প্রতিদিন সবাই একসাথে নাস্তা করে দলবেঁধে হেঁটে হেঁটে ক্লাসে যেতাম। হোটেল পারশিয়া থেকে চারশু কমপ্লেস (যেখানে কর্মশালা এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হয়) এর দূরত্ব হাঁটা পথ ১৫ মিনিট।
সাত দিনের কর্মশালায় ১৪ জন স্কলার আমাদের সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ও ভবিষ্যতে করণীয় বিষয়ে নির্দেশনা দেন। এদের মধ্যে একজনই চিত্রগ্রাহক ছিলেন থমাস মাউচ। জার্মান এই সফল চিত্রগ্রাহক একটা কথাই স্মরণ করিয়ে দেন যে-‘তুমি যদি ভালো কাজ করতে চাও প্রথমে তোমার পরিচালকের চিন্তাকে পরিষ্কারভাবে বুঝো।’
এছাড়া আর্ট ডিরেকশনের ক্লাস নেন আমির এসবাতি। আমাদের কর্মশালার সর্বশেষ ক্লাস নেন অস্কার বিজয়ী যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালক অলিভার স্টোন। এই মানুষের পুরো ক্লাস জুড়ে ছিল আনন্দের জোয়ার। তিনি ছিলেন গোটা চলচ্চিত্র উৎসবের মধ্যমণি। কিন্তু বাস্তবতার অন্য আরেক রূপ দেখি আমরা মাজিদির ক্লাসের সময়। ইরানের জনগণের কাছে তিনি তাদের চলচ্চিত্রের আদর্শ সেটা নতুন করে বলার কিছু নেই। আব্বাস কিয়েরোস্তামির পর তাকেই নতুন দিনের নির্মাতা সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করেন। যদিও আসগার ফারহাদি বা জাফরপানাহিও খুব একটা পিছিয়ে নেই এই তালিকায়।
সাত দিনের সফল কর্মশালা শেষে ২৩শে এপ্রিল বিকেলে এক প্রীতিভোজ আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের সবার হাতে ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের সম্মাননা সার্টিফিকেট তুলে দেন ফজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৩৬তম অধিবেশনের সম্মানিত সভাপতি ও ইরান চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচালক রেজা কারিমি।
পরদিন বিকালের ফ্লাইটে দেশে ফেরার পূর্ব মুহূর্তে বিষাদ ছেয়ে যায় মনের আকাশে। আসতে ইচ্ছা করছিল না চলচ্চিত্রের দেশ ইরান ছেড়ে। যা হোক বাস্তবতা বলে কথা। ফিরতে যে হবেই।
জীবনের অনেক কিছুই থাকে যা মানুষ কখনও চাইলেও ভুলতে পারে না বা চাইলেও ফিরে পায় না। আমার জীবনে প্রথম ইরান সফর তেমনি। আর ভুলতে চাই না আমার প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘পোস্টার’-এর সঙ্গে জড়িত বন্ধুদের। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্যই আমি ঘুরে এলাম চলচ্চিত্রের অনুপ্রেরণা আব্বাস কিয়েরোস্তামির দেশ থেকে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

আপনার মতামত দিন

গৃহবধুকে শ্বাসরোধ করে হত্যা,স্বামী আটক

‘তার সঙ্গে খুবই স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করছি’

প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে ইসির অনাপত্তি, মুহিতকে নিষেধ

নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের স্ট্যাটাস কী হবে জানতে চান কূটনীতিকরা

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের উদ্বেগ

টেনশনে প্রার্থীরা

কারাগারে থেকে ভোটের প্রস্তুতি

শহিদুল আলমের জামিন

ধানের শীষে লড়বে ঐক্যফ্রন্ট

নিপুণ রায় চৌধুরী গ্রেপ্তার

আতঙ্ক উপেক্ষা করে পল্টনে ভিড়

বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত

কুলাউড়ায় সুলতান মনসুরের বিপরীতে কে?

ঢাকার প্রচেষ্টা ব্যর্থ

নির্বাচন পেছাবে না ইসির সিদ্ধান্ত

ঝিনাইদহে ৩৭৪ মামলায় আসামি ৪১ হাজার