বিশেষ রচনা

অভিযান চাই আরো অভিযান

ঈদ আনন্দ ২০১৮

মনির হায়দার | ২৯ জুন ২০১৮, শুক্রবার
আচ্ছা বাংলাদেশের ফৌজদারি অথবা দেওয়ানি আইনের কোথাও কি অপরাধের বিচার বা তদন্ত কিংবা আইনি প্রতিকারের প্রক্রিয়ায় অভিযান শব্দটির কোনো অস্তিত্ব আছে? দেশি-বিদেশি একাধিক বাংলা অভিধান এবং ইংরেজি ডিকশনারি ঘাঁটাঘাঁটি করে অভিযান কথাটির  যেসব অর্থ পাওয়া গেছে তাতে কোথাও কিন্তু শব্দটির সঙ্গে এসবের কোনো যোগসূত্র মেলে না। খোদ বাংলা একাডেমির অভিধান অভিযান শব্দের ইংরেজি অর্থ করেছে  expedition for military conquest or adventurous exploration।
অনলাইনের জনপ্রিয় ডিকশনারিগুলোতে প্রায় অভিন্ন ভাষায় অভিযান শব্দের অর্থ করা হয়েছে ‘দেশ জয় বা আবিষ্কারের উদ্দেশে সদলবলে গমন’। ছেলেবেলায় আমরাও পড়েছি চন্দ্র অভিযানের গল্প, পড়েছি আমাজন জঙ্গল অভিযানের  কাহিনীও। এছাড়া দিগ্বিজয়ী শাসকদের বিভিন্ন অঞ্চল অভিযান এবং অগণিত মানুষ হত্যার ইতিহাস তো বইয়ের পাতায়ই আছে। একই জিজ্ঞাসা অপারেশন শব্দটি নিয়েও। কিশোরকালে আমরা অপারেশন বলতে কেবল বুঝতাম অস্ত্রোপচার বা সার্জারি। তারপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কত ধরনের অপারেশনের সঙ্গে যে পরিচিত হয়েছি! আর এখন তো অপারেশনের মধ্যেই কাটছে গোটা জাতির দিন-রাত।
যদিও এটা অজানাই রয়ে গেল যে, অপারেশনের বাংলা অভিযান, নাকি অভিযানের ইংরেজি অপারেশন?
স্বাধীনতার পর আজ অবধি গত ৪৭ বছরে বাংলাদেশে বহু রকমের অভিযান চলেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশিবার সম্ভবত হয়েছে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান। এগুলো চালানো হয় আবার নানা চিত্তাকর্ষক নামে। যেমন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে  দেশবাসী সাক্ষী হয়েছে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামের এক অভিযানের। সশস্ত্র বাহিনীর অংশগ্রহণে আমজনতার হার্ট ক্লিন করার সেই অভিযানে অনেক মানুষকে হার্ট অ্যাটাকে(?) জীবন দিতে দেখা গেছে। যদিও সেই সময়ের ক্ষমতাসীনরা বলার চেষ্টা করেছিল যে, ওই অভিযানে তাদের দলের সমর্থকরাই বেশি আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু বোধসম্পন্ন মানুষেরা এ ধরনের ধাপ্পাবাজির যুক্তি গ্রহণ করেনি। বাস্তবে সেই অভিযানে সমাজ বা রাষ্ট্রের হার্ট এতটুকুনও ক্লিন হয়নি। বরং অনেক বেশি কালিমালিপ্ত হৃদয়েই মসনদ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল  জোট সরকারকে। ২০০৭-০৮ সালে ‘মইনুদ্দিন-মাসুদউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের’ জরুরি সরকারের সময় দেখা গেছে দুর্নীতি দমন অভিযান! টানা প্রায় দুই বছর ধরে রাষ্ট্র ও সমাজে সীমাহীন এক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টির পর সেই চক্র তাদের বর্ণিত দুর্নীতিবাজ-দুর্বৃত্তদের হাতেই জাতিকে সঁপে দিয়ে বিদায় নিয়েছে। এমন দুর্নীতিই তারা দূর করেছেন যে, উপরোল্লিখিত তিনজনের দু’জন এখন আর দেশেই ফিরতে পারেন না। আর একজন রাষ্ট্রদূতের চাকরির মেয়াদ দফায় দফায় বাড়িয়ে ভোগ-উপভোগের পর দেশে ফিরে বিরাট ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন। এই ব্যবসার পুঁজি কোথা থেকে কীভাবে এলো সেই প্রশ্নের জবাব দিতে তার বইয়েই গেছে। কারণ একইসঙ্গে তিনি এখন ঢাকায় ধনীদের জনপদ বলে পরিচিত একটি এলাকার অভিজাত ক্লাবের সভাপতির পদও অলঙ্কৃত করেছেন।
এই লেখা যখন লিখছি তখন দেশজুড়ে মাদক বিরোধী অভিযানের পরিণামে দেড় শতাধিক বাড়িতে চলছে পিতা, ভাই কিংবা সন্তান হারানোর শোকের মাতম। প্রতিরাতেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খালি হচ্ছে অনেক মায়ের বুক, এতিম হচ্ছে অনেক শিশু, অকালে বিধবা হচ্ছেন বহু নারী। এই পর্যায়েই পত্রিকায় খবর প্রকাশ হয়েছে যে, ঈদের পর শুরু হবে দুর্নীতি দমন অভিযান এবং তারপর অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান। এভাবে একের পর এক অভিযানের সিঁড়ি বেয়েই সোনার বাংলা এগিয়ে চলেছে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল এবং তারপর উন্নত দেশের পথে।
প্রশ্নটির উত্তর দিতে কেউ বসে নেই জানি, তবুও খুব জানতে ইচ্ছে করে যে, অভিযান কিংবা অপারেশন চালিয়ে কি দুনিয়ার কোনো দেশে আইনের শাসন বা রুল অফ ল’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? এমন দৃষ্টান্ত কি কারো জানা আছে? তা থাকুক বা নাই থাকুক সোনার বাংলার জনগণ বরাবরই দেখেছে যে, সরকারগুলোর এ ধরনের অসুস্থ ও বিকৃত চিন্তাপ্রসূত অভিযানসমূহ তথাকথিত জ্ঞানী-গুণীদের বড় একটি অংশের সমর্থন পেয়েছে সব সময়। আর আমজনতার জন্য তো এ ধরনের সমস্যা ও বিপদগুলোকে এমন অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হয় যে, তখন সাধারণ মানুষও কথিত এসব বিশেষ অভিযানকে আশীর্বাদ হিসেবেই বিবেচনা করে। এসব জ্ঞানী-গুণীরা কখনও প্রশ্ন করেন না যে, স্বাধীনতার চার যুগ পরও একটি সার্বভৌম দেশে এ ধরনের অভিযান চালানোর প্রয়োজন কেন পড়ে? যেখানে নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান এবং আইনশৃঙ্খলা বাস্তবায়নের জন্য জনগণেরই করের টাকায় পরিচালিত একটি ব্যাপকভিত্তিক পুলিশি ব্যবস্থা বিদ্যমান সেখানে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য কেন কিছুকাল পরপর যৌথবাহিনীর অভিযান চালাতে হয়? মাদক ঠেকাতে রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সীমান্তে রয়েছে বিরাট সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশেরও রয়েছে মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আইনি এখতিয়ার। তাহলে হঠাৎ করেই গত কয়েক সপ্তাহে ইয়াবা তথা মাদকে ছেয়ে গেছে পুরো দেশ! নাকি এদের সবার চোখের সামনেই দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা প্রকাশ্যেই বিস্তার ঘটেছে এসব ভয়ঙ্কর মাদকের? তখন এসব জ্ঞানী-গুণীরা যেমন নীরব দর্শক থেকেছেন তেমনি রাষ্ট্রের দণ্ডমুণ্ডের কর্তারাও ছিলেন অনেকটা নির্বিকার। অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি, সর্বগ্রাসী দুর্নীতির মহোৎসবের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। সাম্প্রতিক মাদকবিরোধী অভিযানে টেকনাফের  আওয়ামী লীগ নেতা ও  পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর সরকার সমর্থক দশজন জ্ঞানী-গুণী মানুষ একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিটির এক স্থানে তারা উল্লেখ করেছেন, “সারা দেশে যে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে, তার যৌক্তিকতা আমরা অনুধাবন করি। দেশে খুব কম পরিবার আছেন, যারা মাদকের ভয়াবহতা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছেন।” এখানে খুব পরিষ্কার যে, এ ধরনের অভিযানকে তারা অযৌক্তিক মনে করেন না। তার মানে আগামীতে সম্ভাব্য কথিত দুর্নীতি দমন অভিযান বা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানকেও তারা যৌক্তিকই মনে করবেন।

আচ্ছা আমরা কি কেউ মনে করতে পারি যে, গত এক দশকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সব টাকা লুটে নেয়া, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে রীতিমতো ডাকাতির কায়দায় হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে দেয়ার মতো ঘটনায় এসব জ্ঞানী-গুণীরা কোনো বিবৃতি দিয়েছিলেন? বিটিআরসি’র আওতায় টেলিকম খাতের লুটপাট নিয়ে কখনও তাদের কোনো আওয়াজ পাওয়া গেছে? সরকারের অনেক মন্ত্রী ও এমপি থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অর্থ-সম্পদের জাদুকরী প্রবৃদ্ধির ব্যাপারেও কি এসব বিশিষ্টজনদের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখেছিলাম আমরা? একইভাবে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও যুব সংগঠন যখন অসংখ্যবার প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজির মাধ্যমে খুনোখুনি করেছে কেউ কি এসব অস্ত্রের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছে? আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার নির্লিপ্ততা নিয়েও কি কারো কোনো মাথাব্যথা ছিল? তার মানে এটা পরিষ্কার যে, সমাজকে নিরাপত্তাহীন ও বিপর্যস্ত করে তুলবার প্রতিটি প্রবণতাকেই অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে এই রাষ্ট্রব্যবস্থা কার্যত সাহায্যই করে। আর জ্ঞানী-গুণীদের বড় একটি অংশ নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়াকে প্রকৃত অর্থে সমর্থনই দিয়ে যান। এরপরই প্রয়োজন পড়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনার। রাষ্ট্রের সুচতুর নীতিনির্ধারকরা এ ধরনের অভিযান চালিয়ে একদিকে জনসাধারণের বাহবা কুড়ানোর চেষ্টা করেন, পাশাপাশি সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের একটি সহজ উপায়ও পেয়ে যান। কিন্তু আখেরে এ ধরনের অভিযান বিনা বিচারে কিছু জীবন কেড়ে নেয়া এবং সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি ব্যতীত রাষ্ট্র ও এর বাসিন্দাদের তেমন কোনো সুফল যে দেয় না তা প্রমাণিত।
এ কথা কে না জানে যে, পুলিশি ব্যবস্থাসহ আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় কাজ করছে না। সব সময়কার ক্ষমতাসীনরা এসব প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষকে দমন ও নাজেহাল করা এবং নিজেদের লোকদেরকে বেআইনি সুবিধা প্রদানের কাজে অপব্যবহার করার কারণেই এগুলোর পেশাদারী দক্ষতা তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। অথচ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেলে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোও যে উন্নত পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম তার প্রমাণ অল্পস্বল্প হলেও আমরা মাঝেমধ্যে দেখেছি। কিন্তু সেই সুযোগ এখন রীতিমতো উধাও। আর সে কারণেই এত এত ব্যবস্থা থাকতেও মাদকের ভয়াল থাবার বিস্তার এখন প্রায় অপ্রতিরোধ্য, দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে,  অবৈধ অস্ত্রের কারবার বাড়ছে আতঙ্কজনক হারে, পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থা ইতিহাসের সবচেয়ে ভঙ্গুর দশায় নিপতিত হয়েছে এবং নাগরিকদের নিরাপত্তাবোধ স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে নিচুতে গিয়ে ঠেকেছে।
এমন পরিস্থিতিতে আমাদের নিত্যনতুন অভিযান বা অপারেশনের মুখোমুখি হওয়া ছাড়া কি বিকল্পই বা আর আছে। সুতরাং চলুন অভিযান দেখি আর সরকারের প্রশংসা করি। এভাবেই হয়তো একদিন আমরা পৌঁছে যাবো উন্নত দেশের কাতারে!



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

আপনার মতামত দিন

সশস্ত্র বাহিনী দিবসে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

কারওয়ান বাজারে আগুন

৬৪ আসনে মনোনয়ন তুলেছে জামায়াত

ঝিনাইদহে জঙ্গি অভিযান, গ্রেপ্তার ১

‘অস্তিত্ব সংকটে আছি আমরা’

পাবনায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১

ট্রাক্টরের চাপায় ছাত্রলীগ নেতা নিহত

ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, নিহত ৪৩

গণভবনে এরশাদ-বি. চৌধুরী

৬৪ জেলায় মেনটর নিয়োগ পরে বাতিল

প্রার্থী তালিকায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম

আমাদের নির্বাচনের দিনটি চুরি-ডাকাতির দিন হয়ে গেছে

সচিব, ডিএমপি কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দাবি

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ

রফিকুল ইসলাম মিয়া গ্রেপ্তার

এতোগুলি মানুষের স্বাধীনতাকে ভালোবাসাই আশার জায়গা